السلام عليكم

যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার (তওবা) করবে আল্লাহ তাকে সব বিপদ থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেবেন। [আবূ দাঊদ: ১৫২০; ইবন মাজা: ৩৮১৯]
Showing posts with label রাসূল(সাঃ). Show all posts
Showing posts with label রাসূল(সাঃ). Show all posts

রাসূল (সাঃ) এর পোষা প্রাণীগুলো

| comments

রাসুল সা. এর আনুমানিক ১০০ টি সাধারণ ছাগল ছিলো এবং ৭ টি পাহাড়িয়া ছাগল এবং ৯ টি দুদ্ধপোষ্য বকরী ছিলো। এই ৯টি ছাগলের দুধ প্রতিদিন সন্ধ্যায় আল্লাহর রাসুলের ঘরে পৌঁছে দেওয়া হতো। সেই ছাগলগুলোর নাম – আজওয়াহ, সাকিয়্যাহ, যমযম, বারাকাহ, ওয়ারাছাহ, ইতলাল, আতরাফ, গিফাহ ও ইমিরাহ।

ইউমন নামের একটি প্রিয় খাসি ছিলো রাসুল(সঃ) এর। তার কামার নামে একটি প্রসিদ্ধ ছাগল ছিলো।

মাওলানা তারিক জামিল বলেন, কী বিস্ময়কর বিষয়! আল্লাহ তায়ালা কেবলমাত্র রাসুল সা. এর জীবন ও সীরাতকেই সংরক্ষণ করেননি; তার ছাগলগুলোর নাম পর্যন্ত সংরক্ষণ করেছেন।

তিনি বলেন, এমনিভাবে রাসুলের উঠ, খচ্চর, গাধা এবং ঘোড়ার নামও সংরক্ষণ করেছেন তিনি। 

হযরত রাসুল সা. এর আনুমানিক ৪৫ টি উট ছিলো।

কাসওয়া নামে একটি উটনী ছিলো। এতে চড়েই তিনি হিযরত করেন। এছাড়াও আদবা, শাহবা, জাদআ ও ককাসওয়া নামের উঠে তিনি সওয়ার হয়েছেন।  


দুলদুল ও আফীর নামে রাসুলের দুটি খচ্চর ছিল। 

মুহাম্মাদ(সঃ) বিভিন্ন সময়ে তার বিভিন্ন ঘোড়া ব্যবহার করেছেন। তার আনুমানিক ১১টি ঘোড়া ছিলো। 


  • তিনি সাকার নামের একটি ধূসর বর্ণের ঘোড়া ব্যবহার করতেন। এতে দাজ নামে একটি গদী ছিলো।
  • নাহিফা নামের একটি ঘোড়া ব্যবহার করতেন অনেক সময়।
  • দুলদুল নামের সাদা ঘোড়া ছিলো। এটা মিসর রাষ্ট্রনায়ক মুকাওকাশের উপঢৌকন।
  • মুহাম্মাদ(সঃ) সাকাবম, সাবহা, লাহিফ তাররায প্রভৃতি ঘোড়ার উপর আরোহণ করেছেন।
  • এছাড়াও মুর্তাযিজ, লুযায, যরব, সাজা ওয়ার্দ নামের ঘোড়া ছিলো।

রসূল (স.)-এর প্রত্যেক উম্মতই বেহেশেত যাবে

| comments

পৃথিবীতে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (স.) এর সুপারিশ ছাড়া পরকালীন জীবনের কঠিন দুঃসময়ে মুক্তির কোনো রাস্তা নেই। আর যারা তাঁর উম্মত নন তার জন্য তিনি কোনোক্রমে সুপারিশ করবেন না। রসূল (স.) বলেন, "মান তরাকা সুন্নাতি ফালাইসা মিন্না" যে ব্যক্তি আমার কোনো সুন্নতকে অস্বীকার করবে সে আমার উম্মত নয়। যারা রসূলের (স.) উন্মত হতে চায় তাদের প্রত্যেকের উচিত হলো তাঁর প্রত্যেকটি সুন্নতের অনুসরণ করা। রসূল (স.) কে আল্লাহ তায়ালা সমগ্র জগত্বাসীর জন্য আদর্শ করেছেন। কুরআনের ঘোষণা- "লাক্বদ কানা লাকুম ফি রসূলিল্লাহি উসওয়াতুন হাসানা" অর্থাত্ তোমাদের জন্য আমার নবী মুহাম্মদ (স.) এর জীবনে রয়েছে উত্তম আদর্শ। অন্যস্থানে রসূল (স.) বলেছেন- "কুল্লু উম্মাতুই ইয়াদখুলুনাল জান্নাহ, ইল্লা মান আবা, কিলা মান আবা ইয়া রসূলুল্লাহ (স.)? মান আতা আনি ফাদাখালাল জান্নাহ, অমান আছানি ফাক্বদ আবা" অর্থাত্ আমার প্রত্যেক উম্মত বেহেশতে যাবে, কেবলমাত্র আবা (অসম্মত) ছাড়া। সাহাবিরা বললেন, হে রসূল (স.) কে সেই আবা (অসম্মত)? যে আমার অনুসরণ করবে, সে বেহেশতে যাবে, আর যে ব্যক্তি আমার সুন্নতের অবজ্ঞা করবে, সেই আবা (অসম্মত)। কুরআনে বলা হয়েছে- মা আতাকুমুর রসূলু ফাখুজুহু অমা নাহাকুম আনহু ফানতাহু অর্থাত্ আমার নবী তোমাদের যা কিছু দিয়েছেন তোমরা সেগুলো আঁকড়ে ধর আর যেগুলো নিষেধ করেছেন তা পরিহার কর। অন্য হাদীসে বলা হয়েছে- 'মান তামাসসাখা সুন্নাতি ইন্দা ফাসাদান উম্মতি ফালাহু আজরুহু মিয়াতাশ শহীদ' অর্থাত্ যদি কোনো ব্যক্তি রসূল (স.) এর কোনো হারিয়ে যাওয়া সুন্নতকে উজ্জীবিত করে তাহলে তার নামে একশত শহীদের দরজা (সম্মান) লিখে দেয়া হবে। সুতরাং রসূল (স.) এর অনুসরণের কোনো বিকল্প নাই। আজ পৃথিবীর মানুষ বিভিন্ন মনীষী, নেতা, পীর-বুজুর্গদের অনুসরণ করে এবং তাদের ওছিলায় মুক্তির রাস্তা তালাশ করে। অথচ কুরআন ও হাদীস রোমন্থন করলে কোথাও এমন কোনো সহীহ বর্ণনা নাই যে, রসূল (স.) এর অনুসরণ ও তাঁর সুপারিশ ছাড়া মুক্তির কোনো রাস্তা রয়েছে। যদি এই পৃথিবীতে একজন ব্যক্তিকে অনুসরণ করা যায়- তিনি হলেন হযরত মুহাম্মদ (স.)। যার জীবনের এমন কোনো দিক ও বিভাগ নাই যেখানে লাল কালির দাগ দেয়া যায়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা স্বয়ং তাঁর চরিত্রের সার্টিফিকেট প্রদান করেছেন- "ইন্নাকা লাআলা খুলুকীন আজিম" হে রসূল (স.) নিশ্চয় আপনি সবচেয়ে উন্নত চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত। রসূলের (স.) চরিত্রের সার্টিফিকেটের শেষে আজিম শব্দটি ব্যবহূত হয়েছে যার অর্থ সুমহান। আরবীতে চওড়া বুঝাতে হারিক শব্দ ব্যবহূত হয়। গভীরতা বুঝাতে আমীক শব্দ ব্যবহূত হয়। আর কত গভীর যা মাপার কোনো ফিতা নাই। কত প্রশস্ত যা মাপার কোনো যন্ত্র নাই আরবীতে সেটাকে বলা হয় আজীম অর্থাত্ রসূলের চরিত্র এমন যা মাপার কোনো যন্ত্র পৃথিবীতে নাই। এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কিছুদিন পর একদল কৌতূহলী সাহাবি উম্মুল মৌমেনীন আয়শা সিদ্দিকা (রা.) এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আয়শা (রা.)! রসূল (স.) এর চরিত্র কেমন? আয়াশা (রা.) পাল্টা প্রশ্ন করে বললেন, তোমরা কি কুরআন পড় না? সাহাবিরা বললেন, হ্যাঁ আমরা কুরআন পড়েছি। আয়শা (রা.) বললেন, গোটা কুরআন শরীফই হলো- রসূল (স.) এর চরিত্র। আর রসূল (স.) বলেন, "বুইসতু লিউতিম্মা মাকারিমাল আখলাফ" উন্নত চরিত্রকে মানুষের মাঝে পৌঁছে দেয়ার জন্যই আমি প্রেরিত হয়েছি। আর তাছাড়া এই পৃথিবীতে অন্যান্য ধর্মের যারা বিখ্যাত ধর্মবেত্তা তারাও রসূল (স.) এর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন বিশেষ করে মাইকেল এইচ হার্ট দ্যা হানড্রেড গ্রন্থে জগত্ বিখ্যাত একশত মনীষীর মধ্যে সবার ওপর যাকে স্থান দিয়েছেন তিনি হলেন- হযরত মুহাম্মদ (স.)।

পরকালে মুক্তি পেতে হলে অবশ্যই রসূলের (স.) উম্মত হতে হবে। কারণ সেইদিন হাশরের ময়দানে অগণতি মানুষের মধ্যে তিনি কেবল তাঁর উম্মতদের বাছাই করে হাউজে কাওছারের পানি পান করাবেন। তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে বেহেশতে যাবেন। রসূল (স.) যে সময় তার সকল উম্মতদের সঙ্গে নিয়ে বেহেশতে যাবেন তখন একদল মানুষ রসূল (স.) যাদের উম্মত হিসেবে বাছাই করেননি তারা রসূল (স.) এর সামনে বসে বলবে- আমরাও তো আপনার উম্মত, আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। রসূল (স.) "রহমাতাল্লিল আলামীন" দয়ার নবী তিনি তাদের জন্যও সুপারিশ করতে উদ্যত হবেন- তখন আল্লাহ তায়ালা গায়েব থেকে আওয়াজ দেবেন- হে নবী (স.) ওরা আপনার উম্মত নয়। আপনি জানেন না, তারা কিভাবে আপনার আদর্শের বিরোধী পথে চলেছে- রসূল (স.) বলবেন- ছোহকান ছোহকান লিমান গায়রা মিমবাআদি- সরে যাও; দূর হয়ে যাও যারা আমার আদর্শ বিরোধী কাজ করেছো। সেই সময় ঐ লোকদের এমন অসহায় অবস্থা হবে যার চেয়ে অসহায় অবস্থা আর হতে পারে না। কারণ যে সময় সব মানুষ, নবী-রসূল ইয়া নাফছি, ইয়া নাফছি— আমার কি হবে? আমার কি হবে? বলবে সেই সময় রসূল (স.) বলবেন ইয়া উন্মাতি, ইয়া উম্মাতি আমার উম্মতের কি হবে, আমার উম্মতের কি হবে? যিনিই একমাত্র ভরশাস্থল তিনি যদি দূর দূর করে সেদিন বিদায় করে দেন তাহলে এর চেয়ে কষ্টের; যন্ত্রণার আর কি হতে পারে? রসূল (স.) তাদের রেখে তাঁর উম্মদদের নিয়ে বেহেশতে চলে যাবেন। আর আল্লাহ ফেরেশতাদের হুকুম করবেন- ওদের কপালের সামনের অংশের চুল ও পা ধরে জাহান্নামে নিক্ষেপ কর এবং সাথে সাথে তাইই করা হবে। যারা রসূল (স.) এর হাদীসের সাথে উদাসীনতা প্রদর্শন করবে, তার সুন্নতের অবজ্ঞা করবে তাদের পরিণতি হবে এমনি ভয়াবহ। আমরা আর একটি বিষয় স্মরণ করতে পারি-যখন কোনো মানুষ মৃত্যুবরণ করে তখন তার জানাজা নামাজ শেষ করে দাফন করার সময় বলা হচ্ছে বিসমিল্লাহে আলা মিল্লাতে রসুলিল্লাহ- আল্লাহর নামে ও মুহাম্মদ (স.) এর মিল্লাতের ওপর তোমাকে সমাহিত করে গেলাম। গভীরভাবে চিন্তা করুন, যেই মানুষটি কখনো রসূলের মিল্লাতের মধ্যে চলাফেরা করেনি তার জীবদ্দশায়, সেই মানুষকে মৃত্যুর পর রসূলের মিল্লাতের ওপর সোপর্দ করে রাখা হচ্ছে। তাহলে রসূল (স.) কেনো এই মরা লাশটিকে তাঁর মিল্লাতে নিতে যাবেন, যে বেঁচে থাকতে তাঁর মিল্লাতের বিরুদ্ধে চলেছে?

রসূলের খাঁটি উম্মত হওয়া ছাড়া প্রকৃত অর্থেই মুক্তির কোনো উপায় নাই। আর তার প্রকৃত উম্মত হওয়ার জন্য অবশ্যই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ওয়াক্তমত মসজিদে গিয়ে জামায়াতবদ্ধভাবে পড়তে হবে-এটা আল্লাহর নির্দেশ ও রসূলের শ্রেষ্ঠ আদর্শ। কিন্তু একশ্রেণির মানুষ আজকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে অবজ্ঞা-অবহেলা করে কখনো ঠিকমত পড়ে না অথবা নামাজের বিষয়টিকে অহেতুক কাজ হিসেবে মন্তব্য করেন। রোজাকে উপোস থাকা সার বলে অভিমত দেন। হজ্বকে নিয়ে কটাক্ষ করেন, কুরবানিকে নিয়ে আজেবাজে কথা বলেন, ঐসব মানুষের নাম যতই মুসলিম নাম হোক, পোশাক-আশাকে ইসলামী গাম্ভীর্য থাক- তারা স্পষ্টই মুনাফেক। কিন্তু কারো নাম করে মুনাফেক বলা যাবে না। কেননা রসূল (স.) বলেছেন, তোমরা কাউকে কাফের, ফাসেক ও মুনাফেক বলে সম্মোধন করো না। রসূল (স.) এর জামানায় এমন অনেক লোক ছিল যারা মুসলমান নামধারী ছিল। মুসলমানদের সাথে মিশলে তাদের পক্ষে কথা বলতো আবার কাফেরদের সাথে মিশলে তাদের পক্ষে কথা বলতো। এরা ইসলামের জন্য সাধারণ কাফের, মুশরিক, ইহুদী হতে মারাত্মক ক্ষতিকর। মাদানী জীবনের একদিন রসূল (স.) সাহাবীদের বলেছিলেন- কাফের-মুশরিকরা ইসলামের যে ক্ষতি করে নাই তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে মুনাফেকরা। কারণ কাফের-মুশরিকদের অবস্থান স্পষ্ট কিন্তু মুনাফেকদের অবস্থান স্পষ্ট নয়। তাদের মনে রয়েছে শয়তানী। রসূলের জামানায় এমন মুনাফেক যারা ছিল তাদের সরদার ছিলো আব্দল্লাহ ইবনে ওবায়। ওহুদের যুদ্ধে রসূলের (স.) মারাত্মক জখম হওয়া ও সত্তরজন সাহাবী শহীদ হওয়ার মূলে এই মুনাফেকদের ষড়যন্ত্র ছিল। রসূল (স.) এই যুদ্ধে ১ হাজার সৈন্য নিয়ে ৩ হাজার সৈন্যের সাথে মোকাবিলা করতে আসছিলেন। কিন্তু পথিমধ্যে ৩ শত সৈন্য নিয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে ওবায় কাফেরদের সঙ্গে মিশে যায়। যার কারণে ওহুদের যুদ্ধে ভয়াবহ প্রতিকূল অবস্থার শিকার হতে হয় মুসলমান বাহিনীকে। তারপর যখন ঐ মুনাফেক সরদার আব্দুল্লাহ ইবনে ওবায় মৃত্যুবরণ করে তখন খবর পেয়ে রসূল (স.) সেখানে যান এবং যখন তার জানাজা নামাজ পড়তে সামনে অগ্রসর হচ্ছিলেন হযরত ওমর (রা.) তখন বাধা দেয়ার চেষ্টা করছিলেন। অবশেষে যখন জানাজা নামাজ শেষ হয় তখন আল্লাহর নির্দেশ নিয়ে জিব্রাইল (আ.) এলেন এবং বললেন, হে রসূল (স.), আপনি যদি ৭০ বারও এই মুনাফেক এর জানাজা নামাজ পড়ান তবুও আল্লাহ এটা কবুল করবেন না। অথচ রসূল (স.) এর কোনো দোয়াই আল্লাহ ফেরত দেন নাই। সুতরাং যারা— "উদখুলু ফিস সিলমে কাআফফা" ইসলামে যারা যথার্থভাবে প্রবেশ করেনি এবং রসূল (স.) পূর্ণাঙ্গ আদর্শ মেনে জীবন পরিচালনা করেনি ঐসব মুনাফেক শ্রেণীর লোকদের যতবারই জানাজা নামাজ পড়ানো হোক না কেন আল্লাহ তা কবুল করবেন না। আর তাছাড়া এ বিষয়টিও আমাদের বুঝতে হবে, ইসলাম কোনো অনুষ্ঠানসর্বস্ব ধর্ম নয় যে, বিশেষ বিশেষ দিবসে ইবাদত-বন্দেগী করলেই আল্লাহকে পাওয়া যাবে! নবীর খাঁটি উম্মত হওয়া যাবে! পরিপক্ব ধার্মিক হওয়া যাবে! বরং দুনিয়া ও আখেরাতের জীবন যদি সুন্দর, সাবলীল ও পরিচ্ছন্ন করতে হয়, তাহলে অবশ্যই কুরআন ও সুন্নাহেক বুকে জড়িয়ে ধরতে হবে। পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে হবে। বিদায় হজ্বের ভাষণে রসূল (স.) তাই বললেন, "তারাকতু ফিকুম আমরাইন অলান তাদিল্লু মা তামাস সাখতুম বিহিমা কিতাবাল্লাহে ওয়া সুন্নাতি" অর্থাত্ আমি তোমাদের মাঝে দু'টি জিনিস রেখে যাচ্ছি, একটি হলো আল্লাহর কেতাব (আল কুরআনুল কারীম) আরেকটি হলো আমার সুন্নাত বা আদর্শ বা হাদীস। আর আল্লাহকে পেতে হলে রসূলকে (স.) ভালোবাসতে হবে আর তাহলেই আল্লাহ তাদের ভালোবাসবেন ও তাদের জীবনের পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেবেন এবং তাদেরকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার নিচ দিয়ে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হবে। সুতরাং আমরা চাই ইসলাম ধর্মের মধ্যে জন্মগ্রহণকারী ও জীবন যাপনকারী প্রত্যেক ব্যক্তি যেন কুরআন-হাদীস অনুযায়ী জীবন যাপন করে প্রকৃত মুসলমান ও রসূলের খাটি উম্মত হয়ে পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় হতে পারেন। আল্লাহ সেই তাওফীক দান করুন, আমীন।

ক্বিয়ামত সংঘটিত হবার ১০টি নিদর্শন

| comments

নবী করীম (সাঃ) বলেন, দশটি নিদর্শন না আসা পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না। আর তা হচ্ছে-

১. ধোঁয়া, যা পূর্ব হ’তে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত এক নাগাড়ে চল্লিশ দিন বিস্তৃত থাকবে।
২. দাজ্জাল বের হবে।
৩. চতুষ্পদ জন্তু বের হবে।
৪. পশ্চিমাকাশ হ’তে সূর্য উদিত হবে।

৫. ঈসা ইবনু মারিয়াম আকাশ হ’তে অবতরণ করবেন।
৬. ইয়া‘জূজ মা‘জূজ বের হবে।
৭. পূর্বাঞ্চলে ভূমিধস হবে।
৮. পশ্চিমাঞ্চলে ভূমিধস হবে।
৯. আরব উপদ্বীপে ভূমিধস হবে।

১০. সবশেষে ইয়ামান হ’তে এমন এক আগুন বের হবে যা মানুষকে তাড়িয়ে একটি সমবেত হওয়ার স্থানে নিয়ে যাবে। অপর এক বর্ণনায় আছে, আদন (এডেন)-এর অভ্যন্তর হ’তে আগুন বের হবে। যা মানুষকে সমবেত হওয়ার স্থানের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে।

অপর এক বর্ণনায় দশম লক্ষণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, এমন বাতাস প্রবাহিত হবে, যে বাতাস কাফেরদেররে নিক্ষেপ করবে।(২) আর বিশেষ করে ক্বিয়ামত তখনই সংঘটিত হবে যখন যমীনে ‘আল্লাহ, আল্লাহ বলার কোন মানুষ থাকবে না’।(৩) যখন মানুষ আল্লাহ তা‘আলাকে স্মরণ করবে না, তাঁর দাসত্ব করবে না তখনই ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে।

কারণ আল্লাহর যিকির ও ইবাদত হচ্ছে দুনিয়ার স্থায়ীত্বের প্রমাণ। আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার মধ্য থেকে নেক আমলকারী ব্যক্তি ও সৎ, ঈমানদার ব্যক্তিদের উঠিয়ে নিবেন এবং খারাপ ও নিকৃষ্ট মানুষের উপর ক্বিয়ামত সংঘটিত করবেন।(4)

২. মুসলিম, বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৬২৩০।
৩. মুসলিম, মিশকাত হা/৫২৮২।
৪. মুসলিম, মিশকাত হা/৬২৮৩।

দুরুদ শরীফ

| comments

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ، وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ، وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ، وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ

"আল্লাহুম্মা ছাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন্ কামা ছাল্লাইতা আলাইব্রাহীমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহীমা, ইন্নাকা হামিদুম্মাজিদ। আল্লাহুম্ম বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা বারাকতা আলা ইব্রাহীমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহীমা ইন্নাকা হামীদুম্মাজীদ।"

হেরা পর্বত

| comments (2)





রাসুল (সাঃ) এই হেরা পর্বত এ ধ্যান করতেন। মহা-পবিত্র গ্রন্থ আল কোরআন নাজিল হওয়ার আগে রাসুল (সাঃ) টানা ৪০ দিন এই ৩০০০ ফুট উচু পর্বতে ধ্যান করেছিলেন। চুড়ায় উঠে আরো ৪০ ফুট নিচে নামলে একটি গুহা আছে, সেখানে বসে তিনি ভাবতেন। মক্কায় প্রায় ৬,৫০০ পর্বত রয়েছে; কিন্তু, রাসুল (সাঃ) হেরা কে বেছে নেন কারন -- এই গুহা হতে তাকালে সরাসরি ৪ কিলোমিটার দূরে পবিত্র বায়তুল্লাহ দেখা যায়।
একদিন রাসুল (সাঃ) বসে আছেন, হঠাৎ তিনি অস্থির বোধ করেন। তিনি আকাশের দিকে চাইলেন। দেখলেন-- একজন কেউ বিরাট এক চেয়ারে বসে আছেন; রাসুল (সাঃ) প্রচণ্ড ভয় পেলেন। তিনি ছিলেন-- জিব্রাইল (আঃ)। ধীরে ধীরে তিনি নেমে এলেন। রাসুল (সাঃ) কে বুকে একবার চেপে ধরে বললেনঃ "পড়ুন"। রাসুল (সাঃ) বললেনঃ "আমি তো পড়তে পারিনা। আবারো জিব্রাইল (আঃ) একবার বুকে চেপে দিয়ে বললেনঃ "পড়ুন"। রাসুল (সাঃ) একই উত্তর দিলেন। আবারো জিব্রাইল (আঃ) সজোরে বুকে চেপে ধরে বললেনঃ "পড়ুন"। এবার আল্লাহ-র আদেশে রাসুল (সাঃ) পড়তে শিখলেন। তাঁর উপরে নাজিল হল-- "ইক্করা বিসমি রাব্বি কাল্লাজি খালাক.........।" (পড়, তোমার প্রভূর নামে............)। অবতীর্ণ হল মহাগ্রন্থ আল কোরআন। সুবহানআল্লাহ।



উৎসঃ ‌১

রাসুল (সাঃ)'র উপর আল্লাহ্‌'র নির্দেশ

| comments

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ

মহান আল্লাহ্‌ আমাকে নয়টি নির্দেশ দিয়েছেন। সেগুলো হলো :



১. গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহ-কে ভয় করতে



২. সন্তুষ্টি এবং অসন্তুষ্টি উভয় অবস্থাতে ন্যায় কথা বলতে



৩. দারিদ্র ও প্রাচুর্য উভয় অবস্থাতে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে



৪. যে আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তার সাথে সম্পর্ক জুড়তে



৫. যে আমাকে বঞ্চিত করে, তাকে দান করতে



৬. যে আমার প্রতি অবিচার করে, তাকে ক্ষমা করে দিতে



৭. আমার নীরবতা যেনো চিন্তা গবেষণায় কাটে



৮. আমার কথাবার্তা যেনো হয় উপদেশমূলক



৯. আমার প্রতিটি দৃষ্টি যেনো হয় শিক্ষা গ্রহণকারী ।



এ ছাড়া ও মহান আল্লাহ্‌ আমাকে আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছেন। সেগুলো হলো :



১. আমি যেনো ভালো কাজের আদেশ করি এবং



২. মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করি।



[বুখারী]

রাসূল (সাঃ) এর সাথে বিয়ের সময় আয়শা (রাঃ) র বয়স ৬ বছর ছিল এটা এক বিরাট ঐতিহাসিক ভ্রান্তি

| comments (3)

গত ২১ তারিখে দৈনিক প্রথম আলোর একটা আর্টিকেলের ওপরে পোস্ট দিয়েছিলাম । ইয়েমেনে কচি শিশুদের বিয়ে নিয়ে। তাতে কেউ কেউ এ ঘটনার জন্য মহানবী (সাঃ) ও ইসলাম ধর্মকে দায়ী করেছেন। দেখে মনে হলো এবিষয়ে একটু অনুসন্ধান করি।

রাসুল (সাঃ) এর সম্বন্ধে বলা হয় তিনি হযরত আয়েশা (রাঃ) কে আয়েশার ৬ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন। অথচ আমি অনুসন্ধান করে দেখতে পেলাম রাসূল (সাঃ) এর সাথে বিয়ের সময় হযরত আয়শা (রাঃ) র বয়স মাত্র ৬ বছর ছিল এটা মস্তবড় এক ঐতিহাসিক ভ্রান্তি।

সহীহ বুখারী, মুসলিম সহ অনেক হাদীস গ্রন্থে হযরত আয়েশা (রাঃ) র বয়স নিয়ে যে রেফারেন্স এসেছে তা হাইসাম (বা হিসাম) বিন উরওয়াহ কর্তক বর্নিত একটি হাদিসেরই উৎস এবং এটা সম্বন্ধে সংশয় প্রকাশ করবার মতো যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

তার মধ্যে প্রথম কারণ হলো হাদীসের কোন বিষয়বা রাসুল (সাঃ) এর জীনযাপন পদ্ধতি কোনভাবেই আল কোরআনের বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারেনা। কাজেই বিবাহযোগ্য বয়সের বিষয়ে আল কোরআনের যে নির্দেশ, এই ঘটনা তার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তাহলে? উত্তর একটাই, এই হাদীসটা সঠিক নয়, সঠিক হতেই পারেনা।

যা হোক, এবারে আসি ঐতিহাসিক সত্যগুলো নিয়েঃ

রাসুল (সাঃ) এর সাথে আয়েশা (রাঃ) র বিয়ে হয় ৩য় হিজরী সনের সাওয়াল মাসে যা ইংরেজী ৬২৩-৬২৪ সাল।

যদিও বলা হয় হযরত আয়েশা (রাঃ)র জন্ম ৬১৪ খৃষ্টাব্দে কিন্তু সহীহ বুখারীতে এসেছে আল কোরআনের ৫৪ তম অধ্যায় নাজিল কালে আয়েশা (রাঃ) একজন কিশোরী (Jariyah) বয়স্কা ছিলেন। উল্লেখ্য ৫৪তম উক্ত অধ্যায় নাযিল হয় ৬১২ খৃষ্টাব্দের দিকে। সে হিসাবে হযরত আয়েশার বয়স তখন ১০ বছর হলেও ৬২৩-৬২৪ খৃষ্টাব্দ সালে তাঁর বয়স কোনভাবেই ২০ বছরের নিচে নয়।

(Sahih Bukhari, kitabu'l-tafsir, Arabic, Bab Qaulihi Bal al-sa`atu Maw`iduhum wa'l-sa`atu adha' wa amarr)

অধিকাংশ বর্ণনাকারির মতে হযরত আয়েশা (রাঃ) বদরের যুদ্ধ (৬২৪ খৃষ্টাব্দে) ও ওহুদের যুদ্ধে (৬২৫ খৃষ্টাব্দে) অংশগ্রহন করেছেন। উল্লেখ্য যে রাসুল (সাঃ) এর বাহিনীতে ১৫ বছর এর কম বয়স্ক কেউ গ্রহনযোগ্য ছিলনা এবং তাদের ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। সুতরাং সেসময় যে হযরত আয়েশার বয়স ৬ বা ৯ ছিলনা তা বলাই বাহুল্য।

A narrative regarding Ayesha's participation in the battle of `Uhud is given in Bukhari, (Kitabu'l-jihad wa'l-siyar, Arabic, Bab Ghazwi'l-nisa' wa qitalihinna ma`a'lrijal; that all boys under 15 were sent back is given in Bukhari, Kitabu'l-maghazi, Bab ghazwati'l-khandaq wa hiya'l-ahza'b, Arabic).

অধিকাংশ ইতিহাসবিদ মতে হযরত আয়েশার বোন আসমা ছিলেন তাঁর চেয়ে দশ বছরের বড়। ইতিহাস থেকে জানা যায় আসমা ৭৩ হিজরী সনে যখন মৃত্যুবরণ করেন তাঁর বয়স ছিল ১০০ বছর। সে হিসাবে ১লা হিজরীতে তাঁর বয়স হয় ২৭ বছর। তাহলে সে হিসেবে হযরত আয়েশার বয়স যে তখন ১৭ র কম ছিলনা তা বোঝা যায়। তাহলে ৬২৩-৬২৪ খৃষ্টাব্দ তাঁর বয়স ১৮/১৯ বছর।
(For Asma being 10 years older than Ayesha, see A`la'ma'l-nubala', Al-Zahabi, Vol 2, Pg 289, Arabic, Mu'assasatu'l-risalah, Beirut, 1992. Ibn Kathir confirms this fact, [Asma] was elder to her sister [Ayesha] by ten years" (Al-Bidayah wa'l-nihayah, Ibn Kathir, Vol 8, Pg 371, Arabic, Dar al-fikr al-`arabi, Al-jizah, 1933). For Asma being 100 years old, see Al-Bidayah wa'l-nihayah, Ibn Kathir, Vol 8, Pg 372, Arabic, Dar al-fikr al-`arabi, Al-jizah, 1933). Ibn Hajar al-Asqalani also has the same information: "She [Asma (ra)] lived a hundred years and died in 73 or 74 AH." Taqribu'l-tehzib, Ibn Hajar Al-Asqalani, Pg 654, Arabic, Bab fi'l-nisa', al-harfu'l-alif, Lucknow).

প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আল তাবারী র বই থেকে পাওয়া যায় হযরত আবু বকর (রাঃ) র চার সন্তান ছিলেন যাঁরা সকলেই ইসলামপূর্ব যুগে জন্মগ্রহন করেন। (ইসলামপূর্ব যুগ ৬১০ খৃষ্টাব্দ শেষ হয়)। তাহলে নিশ্চয়ই হযরত আয়েশা (রাঃ) র জন্ম ৬১০ খৃষ্টাব্দ এর পূর্বে। সে হিসাবেও তিনি বিবাহের সময় ৬/৯ বছর বয়স্কা ছিলেন না।

Tarikhu'l-umam wa'l-mamlu'k, Al-Tabari, Vol 4, Pg 50, Arabic, Dara'l-fikr, Beirut, 1979).

আরেক প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে হাইসাম থেকে জানা যায় হযরত আয়েশা (রাঃ) হযরত উমর ইবন আল খাত্তাব (রাঃ) এর বেশ আগে ইসলাম গ্রহন করেন। (উমর ইবন আল খাত্তাব (রাঃ) ৬১৬ খৃষ্টাব্দে ইসলাম গ্রহন করেন)। আবার হযরত আবু বকর (রাঃ) ইসলাম গ্রহন করেন ৬১০ খৃষ্টাব্দে। সুতরাং হযরত আয়েশা (রাঃ) ও ৬১০ এর কাছাকাছি সময়েই ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেন। তার অর্থ আবারো দাঁড়ায় যে তিনি ৬১০ খৃষ্টাব্দের আগেই জন্মগ্রহন করেছিলেন এবং কোন ধর্ম গ্রহন করবার নূন্যতম বয়স (৬/৭ হলেও) তাঁর ছিল। তাহলে ৬২৩-৬২৪ সালে তার বয়স প্রায় ১৮-২০ হয়।
(Al-Sirah al-Nabawiyyah, Ibn Hisham, vol 1, Pg 227 – 234 and 295, Arabic, Maktabah al-Riyadh al-hadithah, Al-Riyadh)

হাম্বলি মাযহাবের ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন বিবি খাদিযাহ (রাঃ) র মৃত্যুর পরে (৬২০ খৃষ্টাব্দ) হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জন্য খাউলাহ নামের একজন ২টা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসেন। যার মধ্যে হযরত আয়েশার (রাঃ) র কথা উল্লেখ করবার সময় একজন পূর্ণবয়স্ক যুবতী হিসেবেই উল্লেখ করেন কোন ছোট্ট শিশু হিসেবে নয়।

(Musnad, Ahmad ibn Hanbal, Vol 6, Pg 210, Arabic, Dar Ihya al-turath al-`arabi, Beirut).

আবার ইবনে হাযর আল আসকালানি র মতে হযরত ফাতেমা (রাঃ) আয়েশা (রাঃ) র থেকে ৫ বছর বড় ছিলেন। আর ফাতেম (রাঃ) র জন্মের সময় রাসুল (সাঃ) এর বয়স ছিল ৩৫ বছর। সে হিসেবে আয়েষা (রাঃ) র জন্মের সময় মুহাম্মদ (সাঃ) এর বয়স ৪০ হবার কথা। আর তাঁদের বিয়ের সময় আয়েশা (রাঃ) ৬/৯ না বরং ১৪-১৫ বছর বয়স হবার কথা।

(Al-isabah fi tamyizi'l-sahabah, Ibn Hajar al-Asqalani, Vol 4, Pg 377, Arabic, Maktabatu'l-Riyadh al-haditha, al-Riyadh,1978)

ওপরের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হলো হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে বিয়ের সময় যে ৬/৯ বছরের শিশু ছিলেননা সেটাই দেখানো। আর কোন হাদীস যদি আল কোরআনের নির্দেশনার সাথে অসামন্জস্যপূর্ণ হয় তাহলে নিশ্চিতভাবেই সেই হাদীসের ওপর ভরসা রাখা যুক্তিযুক্ত না। তা সে বুখারী মুসলিম বা সমস্ত সিহাহ সিত্তাহতেই থাকুকনা কেন। আর এই বৈপরিত্য ধরবার জন্য নিজেদের বিবেককেও ব্যাবহার করা উচিত সকল মুসলমানের।

খোদ আল কোরআনেও যেখানে বিবাহ যোগ্য বয়সের বিষয়ে প্রাপ্তবয়সকে ইঙ্গিত করা হয়েছে সেখানে মহানবী (সাঃ) নিজে কিভাবে তার বিপরীতে যেতে পারেন?

লিখেছেন গুপী গায়েন

দেশের স্বাধীনতা সুরক্ষায় মহানবী (সা.)

| comments

পরাধীনতার নাগপাশ থেকে দেশকে মুক্ত করার আজীবন সংগ্রামে অনেক মহৎপ্রাণ ব্যক্তি তাঁর যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে স্বাধীনতা আন্দোলনকে বেগবান করে স্বতন্ত্র আবাসভূমি নির্মাণের প্রয়াস পান। ইসলামের ইতিহাসে এমনি একজন মহামানব ছিলেন বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.), যিনি আজ থেকে প্রায় ১৪০০ বছর আগে মদিনা নগরে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নবী করিম (সা.) শত্রুদের অত্যাচারে যখন প্রাণপ্রিয় জন্মভূমি মক্কা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন, যাওয়ার সময় তিনি বারবার মাতৃভূমি মক্কা ও কাবা শরিফের দিকে ফিরে তাকাচ্ছিলেন আর আফসোস করে বলেছিলেন, ‘হে আমার স্বদেশ! তুমি কতই না সুন্দর! আমি তোমাকে ভালোবাসি! আমার গোত্রীয় লোকেরা যদি ষড়যন্ত্র না করত, আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যেতাম না!’
মহানবী (সা.) একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের জন্য অনেক ত্যাগ-সাধনা করেছেন। এমনকি সাহাবায়ে কেরামদের নিয়ে হিজরত করে মদিনাকে একটি স্বাধীন ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে গঠন করেন। এ স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে তিনি তাঁর দাওয়াতি মিশনকে আরও তীব্র গতিতে পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে মক্কার বিজয় সূচিত হয়। তিনি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিত মজবুত করার নিমিত্তে মদিনা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মুসলমান, ইহুদি, খ্রিষ্টান ও পৌত্তলিকদের নিয়ে সব জাতি ও সম্প্রদায়ের মানবিক ও ধর্মীয় অধিকারকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পাদন করেন, যা ‘মদিনা সনদ’ নামে খ্যাত। একটি স্বাধীন কল্যাণমূলক রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য এটিই পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম লিখিত শাসনতন্ত্র। এ সংবিধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ।
এ ছাড়া জনগণের চিন্তা ও মতামত প্রকাশের পূর্ণ সুযোগ প্রদান করে মহানবী (সা.) ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বতোরূপে প্রতিষ্ঠা করেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র মদিনায় ধর্ম-বর্ণ-দল-মতনির্বিশেষে সবার ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছিল। ফলে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর লোকদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব হয়। মদিনা রাষ্ট্র পৃথিবীর ইতিহাসে যেকোনো সময়ের, যেকোনো কালের জন্য শান্তি, শৃঙ্খলা, মানবতা ও উদারতার প্রতীক হয়ে থাকবে। নবী করিম (সা.) মদিনার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সব রকমের ব্যবস্থা করেছেন, এমনকি অনেক আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ ও সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছেন। নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করাকে নবীজি উৎসাহিত করেছেন। তিনি স্বাধীনতার প্রতি শুধু উদ্বুদ্ধই করেননি, সার্বভৌমত্ব অর্জন ও রক্ষায় জীবনদানকে শাহাদতের মর্যাদা দিয়েছেন। যেমন হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, ‘শহীদের রুহগুলো চির শান্তির স্থান জান্নাতে ভ্রমণ করতে থাকে এবং সেখানকার ফল ও নিয়ামতগুলো আহার করে থাকে।’
অবশেষে জীবনে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত ও আক্রমণ প্রতিহত করে অষ্টম হিজরি মোতাবেক ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে মহানবী (সা.) জালিম, সন্ত্রাসী ও পৌত্তলিকতার পঞ্জিকা থেকে মক্কাকে স্বাধীন করলেন। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বাধীন দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য কিছু করতে পারা গৌরবের বিষয়। নবী করিম (সা.) এ শিক্ষাই মানব জাতিকে দিয়ে গেছেন।
তিনি যখন বিজয়ীবেশে জন্মভূমি মক্কায় প্রবেশ করলেন, তখন তাঁর স্বগোত্রীয় লোকেরা অপরাধী হিসেবে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ানো। এমনি মুহূর্তে স্বদেশবাসীর প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে বিশ্বের ইতিহাসে তিনি অতুলনীয় দেশপ্রেম, উদারতা ও মহানুভবতার অনুপম আদর্শ স্থাপন করেন।
স্বাধীন দেশে বহিঃশত্রুর আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য মহানবী (সা.) সুসংগঠিত, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও ঈমানের বলে বলীয়ান এমন একটি সেনাবাহিনী গঠন করেন, যারা স্বদেশের মাটির জন্য, মানুষের জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে সদা প্রস্তুত থাকত। সীমান্ত প্রহরায় নিয়োজিত নৌবাহিনীর মর্যাদা প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘ইসলামি রাষ্ট্রের সীমান্ত প্রহরায় এক রাত সমুদ্রতীরে যাপন করা ঘরে অবস্থান করে এক হাজার রাকাত নফল নামাজ আদায়ের চেয়ে উত্তম।’
হাদিস শরিফে আরও বর্ণিত আছে, ‘যারা দেশরক্ষার উদ্দেশ্যে সীমান্ত পাহারায় বিনিদ্র রজনী যাপন করে তাদের জন্য জান্নাত।’ হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, দুই প্রকারের সেই চক্ষুকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না।
প্রথমত, সেই চক্ষু, যা আল্লাহর ভয়ে কাঁদে; দ্বিতীয়ত, যে চক্ষু আল্লাহর পথে (সীমান্ত) পাহারাদারি করতে করতে রাত কাটিয়ে দেয়।’ (তিরমিজি)। মহানবী (সা.) আরও বলেছেন, ‘মৃত ব্যক্তির সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, ফলে তার আমল বৃদ্ধি পেতে পারে না। তবে ওই ব্যক্তির কথা ভিন্ন যে ব্যক্তি কোনো ইসলামি রাষ্ট্রের সীমান্ত প্রহরায় নিয়োজিত থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। তার আমল কিয়ামত পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং কবরের প্রশ্নোত্তর থেকেও সে বেঁচে থাকবে।’ (তিরমিযি ও আবু দাউদ)
নবী করিম (সা.)-এর সুমহান আদর্শকে অনুসরণ করে বীর বাঙালিরাও বহু রক্ত, জীবন ও ত্যাগের বিনিময়ে শত শত বছরের অধীনতা আর গোলামির শৃঙ্খল ভেঙে ১৯৭১ সালে ছিনিয়ে এনেছে স্বাধীনতার লাল সূর্য। যাঁদের মহান ত্যাগ ও প্রাণদানের বিনিময়ে আমরা আমাদের মহান স্বাধীনতা লাভ করেছি, যাঁদের অবদানে এ জাতি গৌরব অনুভব করে আমরা তাঁদের ভুলব না। যাঁরা শহীদ হয়েছেন তাঁদের আমরা সব সময় শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি এবং দেশের জাতীয় দিবসগুলোতে তাঁদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষভাবে দোয়া করি।

-ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার প্রতীক রসূল (স.)

| comments

বিদায় হজ্জের ভাষণে উপদেশ দিতে গিয়ে হযরত মুহাম্মদ (স.) বলেন, "ক্ষয়ক্ষতি বিপদে যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করবে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষতিপূরণ দান করবেন। যে ব্যক্তি আপদে বিপদে সর্বক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণকারী হবে আল্লাহতাআলা তাকে অনেকগুণ সওয়াব দেবেন।

নবুয়ত প্রাপ্তির পর যখন থেকে তিনি আল্লাহর বাণী প্রচার করতে থাকতেন তখন থেকেই শুরু হয় নির্যাতন এবং তখন থেকেই তিনি সে নির্যাতন সহ্য করে ধৈর্য ধারণ করতে শুরু করেন। নবুয়তের ৭ম, ৮ম এবং ৯ম বৎসর এ অত্যাচার চরমে পেঁৗছে। তিনি এবং তার পরিবার বনী হাশেম ও বনী মোত্তালিবের সঙ্গে সংকটপূর্ণ জীবন যাপনে বাধ্য হলেন। হঠাৎ এমন অবরুদ্ধ হয়ে পড়বেন তা কারও জানা ছিল না। কাজেই খাদ্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় বস্তুসামগ্রী তারা প্রচুর পরিমাণে সংগ্রহ করার সময় পাননি। শেষে তারা গাছের পাতা খেয়ে এবং শুষ্ক চামড়া সিদ্ধ পানি পান করে এই নিদারুণ কষ্টের মোকাবেলা করতে লাগলেন। তবু তাদের অভিশাপ দিলেন না। অবশেষে আলস্নাহ্ তাদের এ অবস্থা থেকে মুক্ত করলেন।

বোখারী শরীফের ১৭১৭ নং হাদিসে আবু হোরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, "(আনসার ও মোহাজেরদের মধ্যে ভাই-বন্ধুত্ব হওয়ার পর) আনসারগণ হযরত (স.) এর খেদমতে আরজ করলেন, আমাদের এবং মোহাজের ভাইদের মধ্যে আমাদের সম্পত্তি বন্টন করে দিন। হযরত (স.) তা অস্বীকার করলেন। অতঃপর তারা বললেন, তবে মোহাজের ভাইগণ আমাদের জমিতে কাজ করবেন। সে সূত্রে তারা এর উৎপন্নে আমাদের শরীক হবেন। এতে সকলেই সম্মতি দান করলেন।"

আলী (রা.) বর্ণনা করেছেন, 'এক ইহুদী পন্ডিত নবীজী (স.)র কাছে কিছু টাকা পেত। সে. ঐ টাকার তাগাদায় আসল। ঐ সময় নবীজী (স.)র হাতে টাকা ছিল না। তাই তখন পরিশোধে অক্ষমতা প্রকাশ করলেন। ইহুদী পণ্ডিত বলল, টাকা উসুল না করে আমি যাব না এবং আপনাকে ছাড়ব না। নবীজী বললেন, আচ্ছা-টাকার ব্যবস্থা করতে সক্ষম না হওয়া পর্যন্ত আমি তোমার কাছ থেকে দূরে কোথাও যাব না। সে হতে নবীজী (স.) দুপুর হতে এশার নামাজ পর্যন্ত ঐ ইহুদী পন্ডিতের কাছাকাছি থাকলেন। এমনকি রাতেও সে ওখানে থাকল এবং নবীজীও (স.) বাড়ি ছেড়ে কোথাও গেলেন না। এ অবস্থায় ফজরের নামাজ পড়া হলে ছাহাবীগণ ঐ ইহুদীকে মন্দ বললেন এবং ভয় দেখালেন। নবীজী তাদের ঐ আচরণ করতে নিষেধ করলেন এবং বললেন, আল্লাহ তা'আলা আমাকে নিষেধ করেছেন কারও প্রতি, এমনকি কোন অমুসলিম নাগরিকের প্রতিও অন্যায় করতে। বেলা একটু বেশি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধনাঢ্য ইহুদী কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেল এবং তার সমুদয় সম্পত্তির অর্ধেক আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিল। ধৈর্য এবং সহিষ্ণুতার দ্বারাই এমনিভাবে তিনি মানুষকে সঠিকপথে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।

আনাছ (রা.) বর্ণনা করেছেন, একদিন অশিক্ষিত গ্রামের একজন লোক নবীজীর মসিজিদে এসে হঠাৎ মসজিদের ভিতরেই এক জায়গায় প্রস্রাব করতে লাগল। ছাহাবীগণ তার প্রতি তিরস্কার আরম্ভ করলে নবীজী তাদের বাধা দিয়ে বললেন, তার প্রস্রাব বন্ধ কোর না। (হঠাৎ প্রস্রাব বন্ধ করায় রোগের আশঙ্কা থাকে)। অত:পর ঐ লোকটিকে ডেকে নবীজী (সা.) তাঁর কাছে আনলেন। ঐ লোকের নিজের বর্ণনা, কসম আল্লাহর! নবী (সা.) আমাকে একটুও ধমকালেন না, কোন প্রকার কঠোরতা দেখালেন না'। তিনি মোলায়েমভাবে আমাকে বোঝালেন, মসজিদ আল্লাহর এবাদতের ঘর, মল-মূত্র ইত্যাদি অপবিত্র ও ঘৃণার বস্তুর স্থান এটা নয়। অত:পর ঐ স্থানে পানি বইয়ে দিলেন (মুসলিম শরীফ)।

আবু হোরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, একদিন এক লোক নবীজীর (স.) কাছে তার প্রাপ্যের তাগাদায় আসল এবং কঠোর ভাষায় কথা বলল। ছাহাবীগণ ঐ লোকের ওপর ক্ষেপে গেল। নবীজী (স.) তাঁদের বললেন, তাকে মন্দ বোল না; পাওনাদারের বলার অধিকার থাকে (বোখারী শরীফ)।

আনাছ (রা.) বর্ণনা করেছেন, একদিন আমি নবীজীর (স.) সাথে পথ চলছিলাম। নবীজীর (স.) গায়ে একখানা চাদর ছিল, যার পাড় মোটা, শক্ত ও পুরু। হঠাৎ এক গ্রাম্য লোক এসে নবীজী (স.) কে ঐ চাদরে জড়িয়ে খুব জোরে টান দিল এবং বলল, জনসাধারণকে দেওয়ার যে মাল আপনার হাতে রয়েছে তা থেকে আমাকে কিছু দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। তার টানে নজীবীর (স.) গ্রীবার ওপর চাদরের পাড়ের রেখা পড়ে গেল। নবীজী (স.) তার প্রতি তাকিয়ে হাসলেন এবং তাকে মাল দেওয়ার আদেশ দিলেন। (বোখারী শরীফ)। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, আমি একদিন হযরত মুহম্মদ (স.)কে জিজ্ঞাসা করলাম ওহুদ রণাঙ্গনের থেকেও কঠিনতর অবস্থা আপনার জীবনে আর কখনও উপস্থিত হয়েছিল কি? উত্তরে হযরত (স.) তায়েফবাসীদের নির্যাতনের সর্বাধিক দুঃখ-কষ্ট পাওয়ার কথা উলেস্নখ করে তাদের অত্যাচারের লোমহর্ষক কাহিনী তুলে ধরলেন। নবীজী (স.) যখন তায়েফের পথে হেঁটে যেতেন, ওখানকার লোকেরা তাঁর পিছনে গালাগালি দিতে দিতে চলত। শুধু তাই নয়, পাষন্ডরা তাঁর প্রতি ইট-পাথর মারতে মারতে তার দেহ মোবারক রক্তাক্ত করে ফেলতো। তাঁর পা রক্তাক্ত হয়ে যেত। এমনকি পায়ের রক্ত শুকিয়ে জমাট বেঁধে জুতা পায়ে আটকে যেত। পাথরের আঘাত সহ্য করতে না পেরে নজীবী (স.) অবসন্ন হয়ে বসে পড়লে তারা তাঁকে দুবাহু তুলে ধরত। চলতে আরম্ভ করলে পুনরায় পাথর মারতে শুরু করত। এ সময় নরাধমদের হাসি এবং হৈ হৈ ধ্বনির রোল পড়ে যেত।

ফেরেশতারা এসেছিল তায়েফবাসীকে ধ্বংস করতে। কিন্তু দয়ার সাগর ধৈর্যের পাহাড় রহমাতুলিস্নল আলামীন (স.) অনুমতি দেননি। বরাং তাঁকে চেনে না বলে তিনি তাদেরকে হেদায়েত দান করার জন্য দোয়া করেছেন। বলেছেন, যদিও বর্তমানে তায়েফবাসী আমার প্রতি ঈমান আনল না, আমাকে আঘাত করে তাড়িয়ে দিল কিন্তু তারা বেঁচে থাকলে তাদের ওরশের সন্তান-সন্ততি হয়ত ঈমান আনবে। তাই হয়েছিল। ওহুদের জেহাদে নবীজীর দাঁত ভেঙ্গেছিল, মাথা ফেটেছিল, তার ওপর সারা দেহ মোবারকে শতের অধিক আঘাত লেগেছিল। প্রিয় পিতৃব্য হামযা (রা,) মর্মান্তিক শাহাদাত বরণ এবং আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হেন্দা কর্তৃক তার বুক ফেঁড়ে কলিজা চিবানোর দৃশ্যসহ সত্তরজন ছাহাবীর শাহাদতের মানসিক আঘাতও কম ছিল না। নিকটবতর্ী সময়ের সেই ওহুদের দুঃখ-কষ্ট অপেক্ষা প্রায় ছয় বছর আগের তায়েফের ঘটনার দুঃখকষ্টকে অধিক বলা অবশ্যই তাৎপর্যবহ।

-রওশান আখ্তার

নবী জীবনের ঘটনা ইতমিনানের শুভ্র আবীর

| comments

মারের আঘাতে গোলামটি চিত্কার করছিল।
কোনো একটি অপরাধের কারণে নিজের এক ক্রীতদাসকে মারছিলেন আবু মাসউদ আনসারী (রা.)। এমনিতে তিনি সহনশীল, মমতাবান ও হৃদয়ের মূল্যায়নকারী একজন মানুষ। অত্যাচার, নিপীড়ন কিংবা শোষণ তার স্বভাবের অন্তর্গত নয়। তথাপি নিজের ক্রীতদাসের প্রতি তার রাগ ও ক্রোধটাকে তিনি সংবরণ করতে পারেননি। অনেক সময়ই যেমন হয়, মানুষ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে সম্পূর্ণ সক্ষম হয় না। ধৈর্যের বাঁধভাঙা স্রোতে যখন অসহিষ্ণুতার শ্যাওলা এসে ভিড় করে। তখন বিচার-বিবেচনা ও সৌজন্যের সুউচ্চ মিনার থেকে কিছুক্ষণের জন্য মানুষ মাটির সমান্তরালে চলে আসে। এমন জটিল পরিস্থিতিতে সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-পরিজনেরও ব্যবধান লোপ পেয়ে যায় অনেকাংশে; ক্রীতদাসের ব্যাপার তো আরও দূরে।
এমনই কিংবা এরই কাছাকাছি এক অবস্থায় আবু মাসউদ আনসারী (রা.)। প্রহার করছেন তিনি তার ক্রীতদাসকে, এ সময়েই সেখানে তাশরিফ আনলেন হজরত রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। মমতা ও দয়ার একটি সফেদ আকাশ যাঁর বুকের মধ্যে আশ্রয় গেড়ে বসে আছে, সেই শ্রেষ্ঠতম মানব এক ক্রীতদাসের প্রতি একজন মনিবের ক্রোধ লক্ষ্য করলেন। মার খাওয়া ক্রীতদাসের বেদনা-যন্ত্রণা লক্ষ্য করলেন। একজন মানুষের কাছে অন্য একজন মানুষের করুণ অসহায়ত্ব লক্ষ্য করলেন। ব্যথায় ব্যথায় তার হৃদয় আকাশে কালো মেঘ জমে উঠল। দুনিয়ার, সব মজলুমের অসহায়ত্ব শুষে, সমব্যথী স্বরে তিনি শুধু বললেন—
‘আবু মাসউদ! এই ক্রীতদাসের ওপর তোমার যতটুকু ক্ষমতা রয়েছে, তোমার ওপর আল্লাহতায়ালার ক্ষমতা তার চেয়ে অনেক বেশি।’
রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘না তুমি মার বন্ধ করো। তোমার এ কাজ খুব খারাপ।’ তিনি শুধু একজন মুমিনকে, একজন সাহাবিকে স্মরণ করিয়ে দিলেন আল্লাহর সর্বময় ক্ষমতার কথা, জাগিয়ে দিলেন একজন মুমিনের হৃদয়ে পরকালে জবাবদিহিতার ভীতি, সৃষ্টি করলেন জুলুমের পরিণতির ভয়াবহ আশঙ্কা। এর চেয়ে বেশি তো কিছু নয়! সঙ্গে সঙ্গেই ভয়ে কেঁপে উঠলেন আবু মাসউদ (রা.)। মাটির সমান্তরাল থেকে এক দৌড়ে উঠে এলেন আত্মনিয়ন্ত্রণের সুউচ্চ মিনারে। ধৈর্যহীনতার শ্যাওলার সব জঞ্জাল সরিয়ে আত্মার বিশুদ্ধ এক পুকুরে যেন অবগাহন করে উঠলেন। অনুশোচনা, অনুতাপ আর ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে প্রত্যাবর্তনের জন্য ব্যাকুল হয়ে গেলেন। অনতিবিলম্বে আরজ করলেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি এই ক্রীতদাসকে এখন থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত, স্বাধীন করে দিলাম।’
দম বন্ধ অবস্থায় ভয়াবহতা থেকে যেন দম ফিরে পাওয়ার অনুভূতি, ডুবে যেতে যেতে বেঁচে যাওয়ার আকুতি আর হারিয়ে যেতে যেতে পথ চিনে নিঃশ্বাস ছাড়ার আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে আবু মাসউদ (রা.)-এর মুখে। তার কথা শুনলেন, তার দিকে লক্ষ্য করলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। পৃথিবী থেকে উধাও হয়ে যাওয়া মানবতার ভুবন যিনি আবার গড়ে তুলেছেন, শোষক আর জান্তব মানবাচরণে যিনি ইছলাহের শৃঙ্খল বসিয়েছেন, মজলুম ও জালিমকে বাঁচানোর ব্যতিক্রমী, বিস্ময়কর ফরমান যিনি শুনিয়েছেন, সেই হাবিবে খোদা (সা.) এবার বললেন ভরাট কণ্ঠে—
‘এমন না করলে জাহান্নামের আগুন তোমাকে স্পর্শ করত।’
শান্তি ও শাস্তির কথা তার পবিত্র মুখে পাশাপাশি আন্দোলিত হয়, প্রত্যাশা ও ভীতির কথা তার মুবারক জবানে পাশাপাশি উঠে আসে। তিনি মুক্তির অনন্য সওগাত নির্লিপ্তভাবেই বিতরণ করে যান। আবু মাসউদ (রা.) হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। জুলুমের দায় থেকে, জাহান্নামের আগুনের ছোবল থেকে বেঁচে যাওয়ায়, তাঁর চেহারায় অনুতাপ ও বিগলনের পাশাপাশি ইতমিনানের শুভ্র আবীর ছেয়ে গেল।
মার খাওয়া ক্রীতদাস অবাক হয়ে দেখল, সে এখন স্বাধীন।

-শরীফ মুহাম্মদ

বিজ্ঞানের আয়নায় প্রিয়নবীর সুন্নত

| comments

রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কথা-কাজ, আচার-আচরণ, ইশারা-ইঙ্গিত তথা সব কর্মকাণ্ডকে শরিয়তের পরিভাষায় সুন্নত বলা হয়। শাব্দিক অর্থে সুন্নত যদিও সবার ক্ষেত্রে ব্যবহার হতে পারে, কিন্তু পরিভাষাগত সুন্নতের ব্যবহার রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পৃৃক্ত। রাসূলের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড তথা সুন্নতই মূলত দ্বীন। ইসলামের বাহ্যিক পরিচয় ও মূল স্পিরিট সুন্নতে নববীতেই পরিব্যাপ্ত। ইসলামকে পূর্ণাঙ্গরূপে জানতে ও মানতে হলে সুন্নতে নববীর জ্ঞান এবং এর ওপর পরিপূর্ণ আমল অতীব জরুরি। রাসূল (সাঃ) দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, 'আমি তোমাদের মধ্যে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, তোমরা যতদিন পর্যন্ত এ দুটি জিনিসকে আঁকড়ে ধরবে, ততদিন পথভ্রষ্ট হবে না_ এর একটি হচ্ছে আল্লাহর কিতাব আল কোরআন আর অপরটি প্রিয়নবীর হাদিস তথা সুন্নত। মানুষের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক সফলতার চাবিকাঠি সুন্নতে রাসূলের মধ্যে নিহিত। রাসূল (সাঃ) ছিলেন সমগ্র মানবতার আলোকদিশা। মানবতার কল্যাণ সাধনই ছিল তার জীবনের ঐকান্তিক সাধনা। মানুষের সামগ্রিক জীবন সম্পর্কে তিনি দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। বাস্তবে প্রয়োগ ঘটিয়ে, হাতে-কলমে শিখিয়ে প্রতিটি জটিল ও কষ্টসাধ্য বিষয় সহজ করে দিয়েছেন।
মুসলমান হিসেবে ইমানের অনিবার্য দাবি হচ্ছে, সুন্নত অনুযায়ী জীবন পরিচালিত করা। সুন্নত মোতাবেক পরিচালিত জীবন উভয় জাহানে সাফল্যমণ্ডিত হয়। পরকালীন লাভের কথা বাদ দিলে সুন্নতের জাগতিক ফায়দাও কোনো অংশে কম নয়। মানুষ স্বভাবগতভাবেই লোভাতুর। যেদিকে লাভ দেখে সে দিকেই ঝুঁকে এবং তা অর্জনের অবিরাম প্রয়াস চালায়। মানুষের কাছে তার বাহ্যিক ও নগদ লাভটিই অগ্রগণ্য। বিশেষত বর্তমান জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের এই যুগে মানুষ প্রতিটি কাজের পেছনে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তালাশ করে। বিজ্ঞানের নিরিখে তাদের কার্যক্রম যাচাই-বাছাই করে। সে হিসেবে সুন্নতের ওপর আমল করার জন্যও মানুষের সামনে এর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও ফায়দা উলেল্গখ থাকলে তাতে আমল করতে বিশেষ সহায়ক হয়। যদিও সুন্নতের ওপর আমল করা বৈজ্ঞানিক বিশেল্গষণের ওপর নির্ভর করে না।
রাসূল (সাঃ) থেকে এমন কোনো সুন্নত বর্ণিত নেই, যা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ক্ষতিকর কিংবা ফায়দাহীন। দেড় হাজার বছর আগে বর্ণিত সুন্নতকে বর্তমান বিজ্ঞান শুধু সমর্থনই করেনি বরং মানুষের সমৃদ্ধিময় জীবনযাপনের জন্য তা পালনের জোরালো তাগিদ পর্যন্ত করেছে। ইসলাম-সুন্নত ও বিজ্ঞানের মধ্যে পারস্পরিক কোনো সংঘাত নেই। মানুষের জ্ঞানের পরিধির স্বল্পতার কারণে কোথাও অসামঞ্জস্য মনে হলেও প্রকৃত পক্ষে তা নয়। মহাপ্রজ্ঞাময় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের আধার মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কোনো নির্দেশনা ও কাজ মানুষের প্রকৃতির অনুপযোগী বা বিরূপ হবে_ এটা ধারণা করাও অন্যায়। রাসূল (সাঃ) ছিলেন উম্মতের রুহানি ডাক্তার। মানুষের কল্যাণ-অকল্যাণের সবদিক ছিল তার নখদর্পণে। তার প্রতিটি কথা, কাজ ও আচরণে মানবতার কল্যাণ ও মঙ্গল সাধনই ছিল মুখ্য। আর বিজ্ঞানের উদ্দেশ্যও মানুষের জীবনকে সাবলীল, গতিময়, আরামপ্রদ ও কল্যাণকর করা। সুতরাং উদ্দেশ্যের নিরিখে সুন্নতে নববী ও আধুনিক বিজ্ঞান একটি আরেকটির সহায়ক ও সম্পূরক।
বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ইসলামের প্রতিটি আহকাম এবং সুন্নতের প্রতিটি পর্বেই রয়েছে অফুরন্ত কল্যাণ ও উপকার। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে শয্যা ত্যাগ থেকে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি কাজে যে সুন্নত বর্ণিত হয়েছে, তার প্রত্যেকটির পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক উপকারিতার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও বিশেল্গষণ। যেমন মিসওয়াক ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। এই একটি মাত্র সুন্নত পালনে সত্তরেরও অধিক ফায়দা রয়েছে। এর প্রথম ফায়দা হচ্ছে দাঁত পরিষ্কার হয় এবং শেষ ফায়দা হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন হয়। তেমনিভাবে অজু, নামাজ, রোজা, ইসলামী পোশাক, খাদ্যগ্রহণ প্রভৃতি সুন্নতে অসংখ্য ফায়দা নিহিত আছে। সুতরাং এ কথা প্রমাণিত সত্য যে, বর্তমান বিজ্ঞানময় এই পৃথিবীতে সুখ-সমৃদ্ধির সঙ্গে বাস করতে হলে বিজ্ঞান সমর্থিত সুন্নতে রাসূলের ওপর আমল করার কোনো বিকল্প নেই। সুন্নতকে আঁকড়ে ধরা এবং সুন্নত অনুযায়ী জীবন পরিচালনাই হচ্ছে মানবজীবনে ঐকান্তিক সাফল্যের চাবিকাঠি।
-জহির উদ্দিন বাবর
zahirbabor@yahoo.com

পিতার জননী হজরত ফাতেমা (রা.)

| comments

রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চতুর্থ কন্যা হজরত ফাতেমা (রা.)। হজরত খাদিজার পঞ্চাশ বছর বয়সে তার গর্ভে হজরত ফাতেমা (রা.) জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্ম সংবাদ শুনে রাসূলেপাক (স.) অত্যন্ত আনন্দিত হন। এই দিনে তার জন্ম সবার কাছে শুভ লক্ষণ হিসেবে গৃহীত হয়। কেননা, কুরাইশ কর্তৃক বাইতুল্লাহ শরীফ নির্মিত হওয়ার পর হজরে আসওয়াদকে যথাস্থলে রাখার ব্যাপারটি নিয়ে তাদের মধ্যে ভীষণ মতানৈক্য চরম পর্যায়ে পেঁৗছায় এবং পরস্পর সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দেয়। অতঃপর যে সিদ্ধান্তের কারণে এ জটিল সমস্যার সমাধান এবং সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়েছিল, তা ছিল তারা সিদ্ধান্ত নেয়, যে লোকটি প্রথম কাবাগৃহে প্রবেশ করবেন তিনিই তাদের বিরোধের মীমাংসা করে দেবেন। সৌভাগ্যক্রমে সিদ্ধান্তের পর যে লোকটি মসজিদে প্রথম প্রবেশ করলেন তিনি ছিলেন হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তারা রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখে অতি আনন্দের সঙ্গে বলে উঠল, 'মুহাম্মদ খুবই ন্যায় বিচারক, আমরা তাঁর সিদ্ধান্ত অবশ্যই মেনে নেব।' রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথম তাদের মধ্যে মতানৈক্যের কারণ কি তা জেনে নেন। অতঃপর একটি চাদর বিছিয়ে বলেন, 'তোমরা পাথরটিকে এই বিছানো চাদরের উপর রাখ! তারা তাই করল। এবার রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমাদের প্রত্যেক গোত্রপ্রধান চাদরের আঁচল ধরে উঠাও এবং হজরে আসওয়াদ যেখানে রাখা হবে সেখানে নিয়ে যাও।' সবাই মিলে তাই করল। অতঃপর রাসূলে পাক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে পাথরটিকে যথাস্থলে রাখলেন। তাতে কারও কোনো আপত্তি হয়নি। এভাবে আল্লাহর রহমতে ফিতনার আগুন নির্বাপিত হলো।

এই ফিতনা নিবারণ এবং হজরে আসওয়াদ স্থাপন করার কাজ সমাধা করে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাড়িতে ফিরে শুনতে পান যে, আদরের স্ত্রী হজরত খাদিজার গর্ভে হজরত ফাতেমা (রা.) জন্মগ্রহণ করেছেন। একটি জটিল সমস্যা সমাধানের পর একই দিনে ফাতেমার জন্মের সংবাদ সবাইকে আনন্দিত করে। তারা সবাই এটাকে শুভ লক্ষণ হিসেবে ধরে নেয়। একই দিনে দুটি ঘটনা_ ফাতেমার জন্ম এবং হজরে আসওয়াদ নিয়ে ঝগড়ার নিরসন। প্রকৃতপক্ষে উল্লেখযোগ্য ঘটনাই বটে। আর ফাতেমা শব্দের অর্থ দুগ্ধপোষ্য শিশুকে দুগ্ধপান করানো এবং দুগ্ধপান ছাড়ানো। অতঃপর তার নাম ফাতেমা রাখার পেছনে ইঙ্গিত এই ছিল যে, সে একাধিক সন্তানের জননী হবে এবং সন্তানকে দুগ্ধপান করাবে ও ছাড়াবে। বাস্তবেও তাই হয়েছে।

নিঃসন্দেহে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দীনের দাওয়াত ও তাবলীগে হজরত ফাতেমা (রা.)-এর অনন্য ভূমিকা এবং অবদান রয়েছে। ফাতেমা (রা.)-এর মাত্র পাঁচ বছর বয়সের সময় তার পিতা নবুওয়াতপ্রাপ্ত হন। তাই তিনি দাওয়াত ও তাবলীগের শীতল ছায়ার পরশে লালিত-পালিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেন। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি প্রথমেই ইমান আনতে সক্ষম হয়েছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি কুরাইশদের বৈরিতা, প্রতিবন্ধকতা এবং নির্যাতন-নিপীড়ন স্বচক্ষে অবলোকন করেছেন। এসব কিছু দর্শন করে যেমন তিনি চিন্তিত এবং দুঃখিত হতেন তেমনি শ্রদ্ধেয় পিতার প্রতি মায়া-মমতায় অন্তর উদ্ভাসিত হয়ে উঠত। ফলে অত্যন্ত ধৈর্য ও সহ্যের সঙ্গে পিতার পক্ষে প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনায় সম্ভাব্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতেন। হজরত খাদিজা (রা.)-এর মৃত্যুর পর পিতা রাসূলেপাক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে তিনি আরও অধিক যত্নবান হয়ে ওঠেন, যে কারণে মানুষ তাকে 'পিতার জননী' বলে আখ্যায়িত করত।

লেখক: মাওলানা মাহমূদুল হাসান; খতিব গুলশান সেন্ট্রাল জামে মসজিদ, ঢাকা

রসূল (স.)-এর বিদায় হজ্বের ভাষণ

| comments

দশম হিজরীর ৯ যিলহজ্ব শুক্রবার দিন ভোরে নামায পড়ে আরাফাতের দিকে রওয়ানা হলেন রসূল (স.)। ঐদিনটিই ছিল ইসলামের গৌরব এবং মর্যাদা বিকাশের দিন। যার ফলে অন্ধকার যুগের যাবতীয় অহেতুক ও বাতিল কাজকর্ম বিলুপ্ত হয়ে গেল। রাসূলে পাক (স.) এরশাদ করলেন, জেনে রেখ, অন্ধকার যুগের সব দস্তুর ও লোকাচার আজ আমার পদতলে সংস্থাপিত হল। রাসূলে পাক (স.) এরশাদ করলেন, হে লোকগণ! অবশ্যই তোমাদের প্রতিপালক এক এবং তোমাদের পিতাও এক; সুতরাং কোন আরবের আজমের ওপর প্রাধান্য নেই। শ্বেতবর্ণের লোকের কালো বর্ণের লোকের ওপর এবং কালো বর্ণের লোকের শ্বেত বর্ণের লোকের ওপর কোনই প্রাধান্য নেই; কিন্তু তাকওয়া ও পারহেজগারী হল মর্যাদার একমাত্র মানদণ্ড।

তার পর রাসূলে পাক (স.) বললেন, প্রত্যেক মুসলমান একে অন্যের ভাই এবং সব মুসলমান ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ। অতঃপর রাসূলে পাক (স.) বললেন, হে লোকগণ! তোমাদের গোলাম, তোমাদের গোলাম! যা তোমরা নিজেরা ভক্ষণ করবে তা তাদেরকেও খেতে দেবে। যা তোমরা পরিধান করবে তা তাদেরকেও পরিধান করাবে। আরবে কোন বংশের কেউ যদি কারো হাতে নিহত হত তবে এই হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করা বংশের ওপর অপরিহার্য হয়ে দাঁড়াত। এমনকি হাজার বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও এই ফরজ অবশিষ্ট থাকত। এতে করে যুদ্ধ ও রক্তপাতের এক অনন্তকালীন অধ্যায়ের সূচনা হত। এ কারণে আরবের যমিন সর্বদাই রক্তরঞ্জিত থাকত। তাই এসব আরবের পুরাতন পদ্ধতি ও লোকাচার, আভিজাত্যবোধ, বংশের গৌরব গাঁথার রেশ সর্বাংশে খতম করা হল। এর জন্য নবুয়তের এই ঘোষণা বিশ্ববাসীর সামনে সত্যিকার আদর্শের নমুনা পেশ করল। এই প্রেক্ষিতে ঘোষণা করা হল, অন্ধকার যুগের সব রক্তপাত বাতিল করে দেয়া হল এবং সর্বপ্রথম আমি আমার বংশের রক্ত অর্থাৎ রাবীআ বিন হারেছ-এর রক্তশোধ বাতিল ঘোষণা করলাম। ঘোষণা করা হল অন্ধকার যুগের সর্বপ্রকার সুদের কারবার বাতিল করা হল এবং সর্বপ্রথম আমার নিজের বংশের সুদ অর্থাৎ আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিবের সুদী কারবার বাতিল ঘোষণা করা হল। স্মরণ রাখা দরকার যে, রাসূলে পাক (স.)-এর চাচা আব্বাস (রা.) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে সুদের কারবারে জড়িত ছিলেন। সেসময় সব লোকের কাছেই তিনি সুদের টাকা পাওনাদার ছিলেন। রাসূলে পাক (স.) তা বাতিল করে দিলেন। ঘোষণা করলেন, তোমরা নারীদের বিষয়ে আল্লাহকে ভয় কর। অবশ্যই তাদের হক তোমাদের ওপর আছে এবং তোমাদের হকও তাদের উপর আছে। আরবের জান ও মালের কোন মূল্য ছিল না। তারা ইচ্ছানুযায়ী যাকে ইচ্ছা তাকেই হত্যা করত এবং মানুষের কাছ থেকে জোরপূর্বক ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নেয়া হত। তাই শান্তি ও নিরাপত্তা প্রদানকারী সম্র্রাট রাসূলে পাক (স.) সারা দুনিয়ার সামনে সন্ধি, স্বস্তি ও নিরাপত্তার আশ্বাস প্রদান করলেন এবং ঘোষণা করলেন, তোমাদের ধন-সম্পদ, তোমাদের রক্ত কেয়ামত পর্যন্ত এমনি হারাম, যেমন এই মাসে, এই দিনে, এই স্থানে এইসব বস্তু হারাম। এই নির্দেশ তোমাদের আলস্নাহ পাকের সামনে হাজির হওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। আমি তোমাদের কাছে একটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। তোমরা তা দৃঢ়ভাবে ধরে রাখলে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। ঐ বস্তুটি হল, আল্লাহর কিতাব। এরপর রাসূলে পাক (স.) কতিপয় বিধান জারি করলেন। হুকুম করা হল, আল্লাহ পাক সব হকদারকে তাদের ন্যায্য হক প্রদান করেছেন; সুতরাং এখন কোন উত্তরাধিকারীর জন্য অছীয়ত করবার দরকার নেই। জেনে রেখো, ছেলে ঐ ব্যক্তির বলেই সাব্যস্ত হবে যার শয্যায় সে জন্ম লভ করেছে। আর ব্যভিচারের শাস্তি হল প্রস্তরাঘাতে হত্যা করা এবং তার হিসাব আল্লাহ পাকই গ্রহণ করবেন। আর যে ছেলে নিজের পিতার বদলে অন্য কারো ঔরসে জন্ম নিয়েছে বলে দাবি করে এবং গোলাম স্বীয় মনিব ছাড়া অন্য কারো মালিকানায় নিজেকে সংযুক্ত করে তার ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত অবধারিত। আর মহিলাদের স্বামীর সম্পত্তিতে তাদের সম্পত্তি ছাড়া কোন কিছু দান করা জায়েয নয়। ধার করা বস্তু অবশ্যই ফেরত দিতে হবে। উপহারের বদলা উপহার প্রদান করতে হবে এবং কোন বস্তুর জিম্মাদার হলে এর পরিপূরণ অবশ্যই তাকে করতে হবে। রাসূলে পাক (স.)-এর আরাফাতের ময়দানে ভাষণদানকালেই এই আয়াত অবতীর্ণ হয়, "আল ইয়াওমা আকমালতু লাকুম দ্বীনাকুম ওয়া আতমামতু আলাইকুম নি'মাতী ওয়া রাদ্বীতু লাকুমুল ইসলামা দ্বীনা।" অর্থাৎ আজ আমি তোমাদের জন্য দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং আমার নেয়ামত তোমাদের ওপর পরিপূর্ণ করলাম। আর তোমাদের ধর্ম হিসাবে ইসলামকে মনোনীত করলাম।

হে লোক সকল! তোমরা কি জান আজকের দিনটি কোন্ দিন? লোকজন উত্তর করল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। রাসূলে পাক (স.) দীর্ঘ সময় নিশ্চুপ রইলেন। এতে লোকজন মনে করল, হয়তো রাসূলে পাক (স.) এই দিনটির নতুন করে কোন নামকরণ করবেন। দীর্ঘ সময় চুপ থাকার পর রাসূলে পাক (স.) বললেন, এটা কি কুরবানীর দিন নয়? লোকজন বলল, অবশ্যই কুরবানীর দিন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, এটা কোন্ মাস? লোকজন পূর্ববৎ উত্তর দিল। রাসূলে পাক (স.) অনেক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, এটা কি যিলহজ্জের মাস নয়? লোকজন বলল, হঁ্যা, নিশ্চয়ই যিলহজ্জ মাস। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, বল দেখি এটা কোন্ শহর? লোকজন আগের মতই উত্তর দিল। রাসূলে পাক (স.) দীর্ঘক্ষণ নিশ্চুপ থাকার পর বললেন, এটা কি শহরে হারাম নয়? লোকজন বলল, হঁ্যা, অবশ্যই সম্মানিত শহর। যখন শ্রোতাদের মনে এই দিন, এই মাস ও এই শহরের মর্যাদা ও সম্মান নতুন করে জেগে উঠল এবং তারা বিশ্বাস করল যে, এই দিনে, এই মাসে, এই শহরে যুদ্ধ-বিগ্রহ ও রক্তপাত জায়েয নয়, তখন তিনি এরশাদ করলেন, তোমাদের রক্ত, তোমাদের মাল-সম্পদ ও তোমাদের ইযযত-হুরমত (কিয়ামত পর্যন্ত) এভাবেই পবিত্র। যেমন-এই দিন, এই মাস ও এই শহর সম্মানিত ও পবিত্র। তিনি বুলন্দ আওয়াজে ঘোষণা করলেন, হে লোকগণ! তোমরা পরে যেন গোমরাহ হয়ে যেও না, একে অন্যের গর্দান উড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে। তোমাদেরকে আল্লাহর সামনে হাজির হতে হবে এবং তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে তোমাদের কৃত-কর্মের ব্যাপারে। তিনি দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করলেন, জেনে রেখ, অপরাধী নিজের অপরাধের জন্য দায়ী থাকবে আর পিতার অপরাধের ভার ছেলে বহন করবে না। এমন কি ছেলের অপরাধের জবাবও পিতাকে দিতে হবে না। রাসূলে পাক (স.) এরশাদ করলেন, যদি হাবশী অন্ধ গোলামও তোমাদের আমীর হয় এবং আল্লাহর কিতাব অনুসারে তোমাদেরকে পথ প্রদর্শন করে, তবে তার ফরমাবরদার হওয়াও তোমাদের কর্তব্য। মরু আরবের প্রতিটি ধূলিকণা ইসলামের নূরে সমুজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল এবং খানায়ে কা'বা চিরকালের জন্য মিল্লাতে ইব্রাহিম (আ.)-এর প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।

সত্য প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে যাবতীয় অশুভ বস্তু নিমর্ূল হয়ে যাচ্ছিল। এই অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রেখেই রাসূলে পাক (স.) এরশাদ করেছিলেন, জেনে রেখ, শয়তান অবশ্যই জেনে গেছে যে, রোজ কেয়ামত পর্যন্ত তোমাদের এই শহরে তার ইবাদাত-বন্দেগী কখনো হবে না। তবে হ্যাঁ, কিছু কিছু ছোট-খাট কাজে তোমরা তার পায়রবী করলেও এতেই সে সন্তুষ্ট থাকবে। সর্বপ্রথম রাসূলে পাক (স.) ইসলামের প্রাথমিক ফরজগুলো তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিলেন। একই সাথে এরশাদ হল, "স্বীয় প্রতিপালকের ইবাদাত করবে। পাঁচ ওয়াক্তের নামায আদায় করবে, রমজান মাসের রোযা রাখবে এবং নেতা ও আমীরের নির্দেশাবলীর আনুগত্য করবে। তাহলে তোমরা বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে।" আমি তোমাদের মাঝে দুইটি বস্তু রেখে যাচ্ছি যা আঁকড়ে ধরলে কখনো কেউ পথভ্রষ্ট হবে না। তা হলো কুরআন ও আমার সুন্নাত। এতটুকু বলার পর তিনি জনসমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি কি তোমাদের কাছে আলস্নাহর পয়গাম পৌঁছে দিয়েছি? সবাই সমস্বরে বলে উঠল, হ্যাঁ, আপনি দায়িত্ব পূর্ণ করেছেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাক। অতঃপর জনসমুদ্রকে লক্ষ্য করে বললেন, যারা এখন এখানে উপস্থিত আছো, তারা এই ভাষণ অন্যদের কাছে পৌঁছে দেবে যারা এখানে উপস্থিত নেই। খুৎবাহর শেষ পর্যায়ে তিনি সব মুসলমানকে লক্ষ্য করে বললেন, বিদায়, বিদায়।

_মাওলানা জাকির হোসাইন আজাদী

রসূল (স.) এর মাদানী জীবন

| comments

পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে, এই ধরাধমে নানারকমের সংস্কারক, দার্শনিক, চিন্তাবিদ, দিগ্বিজয়ী বীর, দোর্দণ্ড প্রতাপশীল বিপস্নবী নেতা, মহাবীর ইত্যাদি জাতীয় ব্যক্তিত্ব পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছেন। তাদের একেকজনের কৃতিত্ব তাঁর সময়ে হয়তবা কিছু সাড়া জাগিয়েছিল। কিংবা তদানীন্তন মানবগোষ্ঠীকে আলোড়িত করেছিল। তাদের শিক্ষা ও রেখে যাওয়া কর্ীতি এবং অবদান পৃথিবীতে পূর্ণাঙ্গ কল্যাণ কিংবা স্থায়ী সুফল বয়ে আনতে পারেনি। কিংবা তাঁদের সংস্কারের ফলে একটি জাতিকে বদলে দিতে পারেনি।

কিন্তু পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে আমরা একজন মহামানবকে দেখতে পাই। যিনি সমাজকে আমূল পরিবর্তন করে পরিবর্তনের ধারা অব্যাহত রেখে মানুষের মন, মগজ, চিন্তাধারা, দৃষ্টিভঙ্গি, রীতিনীতি, অভ্যাস ইত্যাদির মধ্যে একটি বৈপস্নবিক পরিবর্তন আনয়ন করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি আর কেউ নন বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত, খাতেমুন নবীয়্যীন হযরত মুহাম্মদ (স.)। তাঁর এই পরিবর্তনের ধারা যুগ যুগ ধরে মানব ইতিহাসের বিভিন্ন সভ্যতার মাঝে অনুপ্রবেশ ঘটল। বিশেষ করে যে সামাজের লোক এক আলস্নাহর ওপর বিশ্বাসী, যাঁরা হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর রিসালাতকে স্বীকার করে এবং আখেরাতকে বিশ্বাস করে তাদের সমাজে রাসূলের (স.)-এর আদর্শ কালজয়ী হয়ে রইল। সত্যিকারভাবে যারা আলস্নাহর একত্ববাদের ওপর অটল বিশ্বাস রাখে এবং তদীয় রাসূল (স.)-এর জীবনাদর্শকে জীবনের একমাত্র অবলম্বন বলে মেনে নিয়েছে তারাই প্রকৃত সফলতার দ্বারপ্রান্তে দণ্ডায়মান।

প্রকৃতপক্ষে এই বাইয়াতকে ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর বলা যায়। এভাবে যখন মদিনায় একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হল তখন রসূল (স.) এর মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগ্রহ ও উৎসাহ বেড়ে গেল। তিনি মদিনায় এসে প্রথম যে কাজটি হাতে নিলেন তা হচ্ছে মসজিদ নির্মাণ। জমি ক্রয় এরপর মসজিদে নববীর ভিত্তি স্থাপিত হল। পরবতর্ীকালে এই মসজিদই ইসলামী রাষ্ট্রের সভ্যতার কেন্দ্র ও উৎস হিসেবেই গড়ে তোলা হয়েছিল। মদিনায় রসূলূলস্নাহ (স.) এর আগমনের সাথে সাথে আপনা-আপনি দাওয়াত সমপ্রসারিত হতে লাগলো। কারণ যে সমন্ত মুহাজির মক্কা থেকে হিজরত করে এসেছিলেন তাদেরকে মদিনাবাসীরা যেভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা করেছিলেন ইতিহাসে তার দৃষ্টান্ত বিরল। মোহাজের ভাইদের প্রতি আনসাদের ভালবাসা, সরল-সহজ আন্তরিকতা ও আত্মত্যাগের পরিচয়ও এতে পাওয়া যায়। আবার পক্ষে মুহাজেররাও আনসাদের কাছ থেকে কোনরকম বাড়তি সুবিধা গ্রহণ করেননি।

রসূলূলস্নাহ (স.) মদিনায় এসে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য মদিনার ইহুদি মুশরিক ও মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করেন। রাজনৈতিক ধরনের সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্দেশ্যে একটা লিখিত চুক্তিনামা তৈরি করা হয়। যা একটি লিখিত সংবিধানের মত ছিল। এই চুক্তিনামাটি মদিনার সনদ যাকে যথার্থভাবেই পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম লিখিত সংবিধান বলে অভিহিত করা হয়। ইহুদীদের সঙ্গে এই চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর মদিনা এবং তার আশপাশের এলাকা নিয়ে একটি রাষ্ট্র গঠিত হয়। এই রাষ্র্বের রাজধানী ছিল মদিনা। রসূলূলস্নাহ (স.) ছিলেন সেই রাষ্ট্রের মহানায়ক। এমনি করে মদিনা ইসলামী রাষ্ট্রের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হল। শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে নবী (স.) পরবতর্ী সময়ে অন্যান্য গোত্রের সাথেও একইরকমের চুক্তি করেন। কারণ মদিনার অবস্থান ও তার পরিবেশগত উপযোগিতাকে কাজে লাগাতে হলে তার সমগ্র জনশক্তিকে একটা শৃঙ্খলার মধ্যে আনা অপরিহার্য ছিল। এই উদ্দেশ্য রাসূল (স.) ইহুদী আওস ও যুবরাজ ও অন্যান্য গোত্রকে তাদের ধমর্ীয় সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ভেদাভেদ সত্ত্বেও একটা শৃঙ্খলার ্আওতায় এনে ফেললেন।

এদিকে রসূলূলস্নাহ (স.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার পরও মক্কার কুরাইশদের শত্রুতার রেশ থেমে যায়নি। তারা মদিনায় অবস্থানরত আনসাদের নেতা আদুলস্নাহ ইবনে উবাইর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করল এবং রাসূলুলস্নাহ (স.) কে মদিনা থেকে বের করে দেয়ার জন্য হুমকি প্রদান করতে লাগল। আবদুলস্নাহ ইবনে উবাইও রাসূলূলস্নাহ (স.) এর উপর রুষ্ট ছিল। কারণ তিনি মদিনায় না আসলে মদীনার রাজমুকুট তার মাথায় শোভা পেত। কাজেই আবদুলস্নাহ ইবনে উবাই-এর শত্রুতার ভাব বেড়েই গেল। অপরদিকে মক্কার কুরাইশ নেতৃবৃন্দ তাদের বিরোধিতার জের চালিয়েই যাচ্ছিল। যার ফলশ্রুতিতে শেষ পর্যন্ত মুসলমানদেরকে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হল। তাদেরকে প্রথমে গোযওয়া ও ছারিয়ায় মদিনায় যেয়ে একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠর মাধ্যমে প্রমাণ করলেন যে, মাত্র ১০ বছর সময়ের মধ্যে কিভাবে একটি সমাজের বৈপস্নবিক পরিবর্তন আনয়ন করে একটি সুখী-সমৃদ্ধিশালী সমাজ বিনির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

আরবের অভিশাপ সুদ প্রথা বিলোপ করে যাকাতভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, তিনি কত বড় অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রবর্তক। এসবই সম্ভব হয়েছিল একমাত্র এই কারণে যে, তিনি সরাসরি আলস্নাহ তাবারাকার দেয়া নির্দেশিকা মত তাঁর সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। তাই আমরা দেখি আলস্নাহ তা'আলা আল কুরআনের সর্বশেষ আয়াতে ঘোষণা করেছেন।

"আজ আমি তোমার জন্য আমার দীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমার ওপর আমার নেয়ামতসমূহ সমাপ্ত করে দিলাম এবং ইসলামকে একমাত্র জীবন ব্যবস্থা হিসেবে দিয়ে আমি সন্তুষ্ট হলাম।" আর তাঁর প্রিয় নবী তার ২৩ বছরের নবুওয়াতী জিন্দেগিতে তাঁর এই মিশন পূর্ণ করে বিদায় হাজ্জের বাণীতে ঘোষণা করলেন, "আজ আমি তোমাদের জন্য দ'ুটো জিনিস রেখে যাচ্ছি। একটি হচ্ছে আলস্নাহর কিতাব (আল কুরআন) আর অপরটি হচ্ছে আমার সুন্নাত (সহীহ হাদীসসমূহ) তোমরা যতদিন পর্যন্ত এ দু'টো জিনিস অাঁকড়ে ধরে থাকবে ততদিন পর্যন্ত তোমরা বিভ্রান্ত হবে না। তাই আসুন, আমরা দ্বিধাহীন চিত্তে রসূলূলস্নাহ (স.) এর বিদায়ী এই হিদায়েতকে গ্রহণ করি সেরাতে মুস্তাকীমের পথকে অাঁকড়ে ধরি। না হলে আমাদের নামায, রোযা, হাজ্জ, যাকাত সব বরবাদ হয়ে যাবে। আলস্নাহ আমাদেরকে সব বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত হয়ে আলস্নাহর কালাম ও তদীয় রসূলের বাণী অনুযায়ী জীবন গড়ার তাওফীক দান করুন, আমীন!

-অধ্যাপক মীর আব্দুল ওয়াহ্হাব লাবীব

বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারী

| comments

বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারী, সারওয়ারে কাওনাইন, রাহমাতুল্ লিল্ আলামীন, শাহানশাহে আরব ও আজম বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পৃথিবীতে শুভাগমন নিঃসন্দেহে ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ ঘটনা। রূহানী দুনিয়া থেকে বস্তুজগতে মহানবীর (সা.) আবির্ভাব সত্যি সত্যিই বিশ্বস্রষ্টা মহান রাব্বুল আলামীনের এক অপরূপ করুণা। তাঁর আগমনে শিরক, পৌত্তলিকতা, জাহেলিয়াত ও বর্বরতা দূরীভূত হয়। তাঁর শুভাগমনে বিশ্বের সৌভাগ্যের দ্বার উন্মুক্ত হয়। এমন মহামানবের জীবনচরিত আলোচনা একটি বড় এবাদত। তাঁর পবিত্র জীবনের প্রতিটি ঘটনা মানুষের হেদায়েতের জন্য উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম তারিখ সম্পর্কে ঐতিহাসিক এবং সীরাতকারগণের মধ্যে যদিও মতভেদ রয়েছে, তথাপি তারা এ বিষয়ে একমত যে, মহানবী (সা.) রবিউল আউয়াল মাসের প্রথম পক্ষে সোমবার জন্মগ্রহণ করেছেন এবং তা ৮ থেকে ১২ তারিখের মধ্যকার কোনো একদিন ছিল।
সর্বশ্রেষ্ঠ পয়গাম্বর হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে মহান রাব্বুল আলামীন এমন এক সময় পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন যখন আরবসহ গোটা বিশ্ব অন্ধকারে আচ্ছন্ন ছিল। সে সময় মানবতা, সভ্যতা ও ইনসাফ সমাজে ছিল অনুপস্থিত। এমতাবস্থায় আল্লাহ তা'য়ালা মহানবী (সা.)-কে উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং অতুলনীয় মানবিক গুণাবলী দান করে মানবজাতির হেদায়েতের জন্য প্রেরণ করেন। হজরত আলী (রা.) মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াতের প্রথম থেকে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার খেদমতে ছিলেন। হজরত ইমাম হুসাইন (রা.) একদিন তাঁর কাছে মহানবী (সা.)-এর চরিত্র ও স্বভাব সম্পর্কে প্রশ্ন করলে জবাবে তিনি বলেন, 'তিনি হাসিমুখ, নম্র স্বভাব ও দয়ালু প্রকৃতির লোক ছিলেন; কঠোর স্বভাব, সংকীর্ণ হৃদয়ের ছিলেন না। কথায় কথায় কলহ করতেন না, কোনো প্রকারের মন্দ বাক্য কখনো উচ্চারণ করতেন না। ছিদ্রান্বেষী ও ক্ষুদ্রমনা ছিলেন না, কোনো কথা তার পছন্দ না হলে তা থেকে বিরত থাকতেন। তাঁর কাছে কেউ কোনো কিছুর আবদার করলে তাকে নিরাশ করতেন না। নামঞ্জুরির কথাও প্রকাশ করতেন না। অর্থাৎ, প্রকাশ্যভাবে নিষেধ বা প্রত্যাখ্যান করতেন না। বরং তা পূরণ করা সম্ভব না হলে নীরব থাকতেন। ফলে বিচক্ষণ ব্যক্তিরা সে নীরবতার মধ্যে উদ্দেশ্য বুঝে নিতে পারত। তিনি নিজের জীবন থেকে তিনটি বিষয়কে সম্পূর্ণরূপে দূর করেছিলেন। যেমন, পরস্পরে কূটতর্ক করা, প্রয়োজনাতিরিক্ত কথা বলা এবং লক্ষ্যহীন কোনো কিছুর পেছনে লেগে থাকা। অপর লোকদের ক্ষেত্রেও তিনি তিনটি বিষয়ে সংযমী ছিলেন। কাকেও মন্দ বলতেন না, কাকেও দোষারোপ করতেন না এবং কারও অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে অনুসন্ধানে লিপ্ত থাকতেন না। যে কথা মানুষের কল্যাণকর তাই বলতেন। কথোপকথনের সময় সাহাবীরা এমন নীরব ও নতশিরে তা শুনতেন, যাতে মনে হতো যেন তাদের মাথায় পাখি বসে আছে। যখন তার কথা বলা শেষ হতো তখন সাহাবীরা পরস্পরের কথাবার্তা বলতেন। কেউ কোনো কথা বলা আরম্ভ করলে তার কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি নীরবে শুনতে থাকতেন। যে কথায় মানুষ হাসত, তিনিও সে কথায় মুচকি হাসতেন। যাতে মানুষ বিস্মিত হতো, তিনিও তাতে বিস্মিত হতেন। বহিরাগত কোনো ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে ঔদ্ধত্যের সঙ্গে কথা বললে তা তিনি সহ্য করে নিতেন। লোকমুখে নিজের প্রশংসা শোনা পছন্দ করতেন না। কিন্তু যদি কেউ অনুগ্রহ ও দানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করত, তা গ্রহণ করতেন। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি তার কথা বলা শেষ না করত, ততক্ষণ তার মাঝে ছেদ টানতেন না। তিনি অত্যন্ত উদার, সত্যবাদী ও অতিশয় নম্র স্বভাবী ছিলেন। তাঁর সাহচর্য ছিল মহোত্তম। তাঁর এমন ব্যক্তিত্বপূর্ণ চেহারা ছিল যে, অকস্মাৎ দেখলে অন্তর কেঁপে উঠত। কিন্তু যতই ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হতে থাকত, ততই ভালোবাসা দৃঢ়তর হতো। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কোলে লালিত হিন্দ ইবনে আবীহাল্লা বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) নম্র স্বভাবী ছিলেন, কঠোর প্রকৃতির ছিলেন না। কারও প্রতি তাচ্ছিল্য প্রদর্শন করা ভালো মনে করতেন না। সামান্য বিষয়েও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। কোনো বস্তুকেই খারাপ বলতেন না। যে কোনো খাদ্যদ্রব্য সামনে হাজির করা হলে তা গ্রহণ করতেন এবং ভালোমন্দ কিছুই বলতেন না। যদি কেউ সত্যের বিরোধিতা করত, তাহলে রাগান্বিত হতেন, কিন্তু ব্যক্তিগত কাজে তার পূর্ণ সহযোগিতা করতেন। ব্যক্তিগত ব্যাপারে কখনো তার ক্রোধের উদয় হতে দেখা যায়নি এবং কারও কাছ থেকেও প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে মহানবী (সা.) এর অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

লেখক : মাওলানা সাদেক আহমদ সিদ্দিকী; খতিব, মালিবাগ বায়তুল আজিম শহীদী জামে মসজিদ, ঢাকা।

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)

| comments

'হে মানবমণ্ডলী! তোমাদের কাছে উপদেশ বাণী এসেছে, তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে এবং অন্তরের রোগ নিরাময়, হেদায়েত ও রহমত মুমিনদের জন্য। সুরা ইউনুছ আয়াত-৫৭।'

ঈদে মিলাদুন্নবী আরবি ও ফার্সি শব্দ। ঈদ শব্দটি আউদ শব্দ থেকে আগত। যার শাব্দিক অর্থ হচ্ছে খুশি, আনন্দ। মিলাদ ফার্সি শব্দ_ মাওলুদ থেকে আগত, যার শাব্দিক অর্থ হচ্ছে, জন্মস্থান, জন্ম সময়, জন্মদিন ইত্যাদি। নবী অর্থ আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে আগত একজন মহাপুরুষ। সুতরাং ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর অর্থ হচ্ছে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শুভ জন্মদিনের খুশি/আনন্দ উদযাপন করা। কাল ও সময়ের চাকা ঘুরে, ঋতুর পালা বদলিয়ে বিশ্ব মুসলিমের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে ১২ রবিউল আউয়াল ঈদ-ই মিলাদুন্নবী (সা.)। আজ থেকে প্রায় ১৪৭২ বছর আগে বিশ্বজগত যখন অন্ধকারের কালো আঁধারে আচ্ছন্ন ছিল, মানবতার সব দিক যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত, আইয়্যামে জাহেলিয়াতের কালো ইতিহাস পৃথিবীতে এক কলঙ্কময় অধ্যায় সূচনা করেছিল, ঠিক তখনই বিশ্ব মানবতার কল্যাণে ধরার বুকে মক্কার মরূদ্যানে নতুন সূর্যের এক সোনালি পতাকা উদিত হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দীর কলঙ্কময় ইতিহাসকে ধুয়ে মুছে সু-সভ্যতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করার লক্ষ্যে বিশ্ব ভুবনে আগমন করেন আল্লাহর বন্ধু, উম্মতের কাণ্ডারি, রহমতের ভাণ্ডার, নবী মুহাম্মদ রাসূল (সা.)। তাঁর আগমনে সত্যের জয় অবধারিত হয়, মুক্তির পতাকা পতপত করে উদয় হয়, সর্বকালের সব কলঙ্কময় ইতিহাস মুছে আরব ভূখণ্ডে এক নবজাতি পৃথিবীর বুকে স্থানলাভ করে। যার মাধ্যমে জমিন থেকে সর্বপ্রকার পাপাচার দূর হয়ে মানব সমাজকে মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্যে চূড়ান্ত পদক্ষেপ গৃহীত হয়। সেই মহান ব্যক্তিত্বের শুভ জন্মদিন আজ আমাদের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হচ্ছে। মহান আল্লাহতায়ালা মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে বলেন, 'হে রাসূল! আপনি বিশ্ববাসীদের বলে দিন, তোমাদের কাছে উপদেশ এসেছে তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে, আর অন্তরের রোগ নিরাময়, হেদায়েত ও রহমত মুসলমানদের জন্য। হে রাসূল আপনি বলুন, আল্লাহর অনুগ্রহে এবং তাঁর দয়ায় তোমাদের আনন্দিত হওয়া উচিত, এটি উত্তম, সে সমুদয় থেকে যা তোমরা সঞ্চয় করেছো। সুরা ইউনুস আয়াত-৫৭।

রাসূল (সা.)-এর জন্মের সুসংবাদে আসমান, জমিনসহ আরশে আজীম পর্যন্ত আনন্দের জোয়ার ও খুশির ঢল নেমেছিল। ফেরেস্তাকুল সে খুশি উদযাপন করেছিলেন, যা মানবজাতির শিক্ষণীয় বিষয় হিসেবে স্বীকৃত। ফেরেস্তাদের মিছিলের স্লোগান ছিল_ আসছালাতু আসছালামু আলাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা.), আসছালাতু আসছালামু আলাইকা ইয়া হাবীবাল্লাহ (সা.) ইত্যাদি বাক্যসমূহ। অনন্ত অসীম মহান আল্লাহতায়ালা সর্বপ্রথম তার প্রিয় বন্ধু হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র নূর মোবারক সৃষ্টি করেন। এই নূর থেকে নিখিল বিশ্ব সৃষ্টি করেন। আর আত্মার জগতে উক্ত নূরকে রাসূল উপাধিতে ভূষিত করেন। বহু যুগ পরে রাসূল (সা.)-এর নূর হতে আল্লাহতায়ালা সব নবী-রাসূলগণের আত্মাসমূহ সৃষ্টি করেন।

সব নবী-রাসূলগণই মহানবী (সা.)-এর মিলাদের সংবাদ প্রচার করেছেন। রাসূল (সা.) নিজেই বলেন, শেষ নবীরূপে আমার নাম যখন আল্লাহর কাছে লিখিত ছিল, তখন আদম (আ.)-কে তৈরি করা হয়নি। মিলাদুন্নবী (সা.) সম্পর্কে নেয়ামাতুল কোবরা নামক কিতাবে বলা হয়েছে, হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপনের জন্য একটি মাত্র টাকা ব্যয় করবে, সে আমার সঙ্গে বেহেস্তে থাকবে। হজরত ওমর (রা.) বলেন, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-কে যে ইজ্জত করবে, সে যেন ইসলাম ধর্মকে পুনর্জীবন দান করল।

লেখক : মাওলানা আবুল হোসাইন পাটওয়ারী; খতিব, রাজাবাড়ী বড় জামে মসজিদ, পোস্তগোলা, ঢাকা।

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী

| comments

১২ রবিউল আউয়াল পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী। মানব জাতিকে সত্য সুন্দর কল্যাণের পথে পরিচালিত করতে এই দিন আবির্ভূত হয়েছিলেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। এদিনেই তার ওফাত হয়। আরবের মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণকারী মহানবী (সা.) কে বলা হয় আদর্শ মানব। তিনি ছিলেন মানবতার প্রতীক। সহনশীলতার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এমন এক সময় তিনি পৃথিবীতে আবির্ভূত হন যখন আল্লাহর শিক্ষা ভুলে মানব জাতি বিপথে প্রচলিত হচ্ছিল। হানাহানি আরব জাতিসহ সারাবিশ্বের মানব সমাজের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। নারীর সম্মান সর্বনিম্ন পর্যায়ে পেঁৗছেছিল সে সময়ে। পবিত্র ভূমি মক্কাতে মহানবী (সা.) যে সময়ে জন্মগ্রহণ করেন সে সময় আরবের অবস্থা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। মহানবী (সা.) ছোট বেলা থেকেই ছিলেন শুদ্ধচারী মনোভাবের অধিকারী। যা কিছু অসত্য, যা কিছু অন্যায়, যা কিছু অকল্যাণকর তা থেকে তিনি থাকতেন শত যোজনা দূরে। এই পবিত্র পুরুষের ওপর সর্ব শক্তিমান আল্লাহর ঐশীগ্রন্থ পবিত্র কোরআন নাজিল হয়। মানব জাতিকে অন্ধকার ছেড়ে আলোর পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করেছে এই ঐশীগ্রন্থ। একটি ন্যায়ভিত্তিক শান্তির সমাজ গঠনে পবিত্র কোরআন এবং মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা সর্বযুগেই নন্দিত হয়েছে। মহানবী (সা.) আরবের মদিনায় দুনিয়ার প্রথম কল্যাণ রাষ্ট্রের সূচনা করেন। সর্ব ধর্মের মানুষের অধিকার স্বীকৃত হয় এ রাষ্ট্র ব্যবস্থায়। মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর তার রেখে যাওয়া জীবনব্যবস্থা ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে দেশ থেকে দেশে। মাত্র ৫০ বছরের মধ্যে মুসলমানরা বিশ্ব শক্তিতে পরিণত হয়। বাংলাদেশসহ বিশ্ব জুড়ে ঈদে মিলাদুন্নবী ধর্মীয় মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা বাণী দিয়েছেন। এই পবিত্র দিনে আমরা মহানবী (সা.)-এর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও সালাম জানাই। হানাহানি ও অশান্তিতে ভরা এই বিশ্বে শান্তি স্থাপনে তার রেখে যাওয়া আদর্শ মানব জাতিকে সঠিক পথ দেখাতে পারে। মানব জাতির জন্য যার প্রয়োজন আজ সবচেয়ে বেশি।

সত্য সুন্দরের প্রতীক মহানবী (সা.)

| comments

হজরত ইব্রাহিম, মুসা ও ইসা (আ.)-এর একেশ্বরবাদী ধারণাকে যিনি সামনে এগিয়ে নিয়ে আসেন তিনি সর্বকালের সেরা মানব হজরত মুহাম্মদ (সা.)। সত্য সুন্দর ও কল্যাণের প্রতিচিত্র ছিলেন তিনি। ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মুহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেন ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে। তবে তার জন্মের সুনির্দিষ্ট তারিখ কোনটি সে সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। ঐতিহাসিক ও হাদিস বর্ণনাকারীদের সিংহভাগের মতে, তিনি রবিউল আউয়াল মাসে জন্মগ্রহণ করেন। এ মাসের কোন তারিখে মহানবীর (সা.) জন্ম তা নিয়ে ইসলামের দুটি প্রধান সম্প্রদায় সুনি্ন ও শিয়াদের মত ভিন্নতা লক্ষণীয়। সুনি্ন মতাবলম্বীদের সিংহভাগ ১২ রবিউল আউয়াল সোমবারকে মহানবীর জন্মদিন বলে ভাবেন। অন্যদিকে সিংহভাগ শিয়া ইতিহাসবিদ ও জীবনীকারের মতে, হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ১৭ রবিউল আউয়াল শুক্রবার। শিয়া জীবনীকারদের মধ্যে একমাত্র আল কুলাইনী মনে করেন, ১২ রবিউল আউয়ালেই মহানবী (সা.)-এর জন্ম। মহানবী (সা.)-এর জন্মদিন সম্পর্কে মতভিন্নতার কারণ হলো তিনি যে সময় জন্ম নেন সে সময় আরবদের মধ্যে দিন ও পঞ্জিকা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না। মহানবী (সা.)-এর জীবনীকার তের শতকের ইতিহাসবিদ আল-ইরবিলি এ ধারণাই দিয়েছেন। স্মর্তব্য, শুধু মহানবী (সা.) নয়, খ্রিস্টান ধর্মের প্রবর্তক হজরত ইশা (আ.) বা যিশুখ্রিস্টের জন্ম তারিখ নিয়েও রয়েছে একই ধরনের বিভ্রান্তি। ২৫ ডিসেম্বরকে যিশুর জন্মদিন হিসেবে পালন করা হলেও এর পক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য দলিল নেই। মহানবী (সা.)-এর জন্মদিন মুসলমানদের দুটি প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায় সাধারণভাবে দুটি ভিন্ন তারিখে পালন করে। ইরানের শিয়া মতাবলম্বী ইসলামী সরকার এ মতভেদকে পাশ কাটিয়ে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তকের জন্মদিন পালন করে সপ্তাহজুড়ে। ১২ থেকে ১৭ রবিউল আউয়াল পর্যন্ত সপ্তাহকে তারা ঐক্য সপ্তাহ হিসাবেও ঘোষণা করেছে। মহানবী (সা.) ঠিক কবে জন্মগ্রহণ করেছেন সে সম্পর্কে তথ্য-উপাত্তের অভাবে মতভিন্নতা থাকলেও তিনি যে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের প্রতীক হিসেবে বিশ্বে আবির্ভূত হয়েছিলেন সে সম্পর্কে কোনো সংশয় নেই। মানুষকে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করতে আল্লাহ তাকে বেছে নেন। তার ওপর নাজেল হয় ঐশীগ্রন্থ কোরআন। একেশ্বরবাদী ধর্মীয় চেতনার প্রবর্তক হজরত ইব্রাহিম, মুসা ও ইশা (আ.) এর যথার্থ উত্তরসূরী ছিলেন মহানবী (সা.)। ইহুদী, খ্রিস্টানসহ বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মমত একেশ্বরবাদী চেতনার ভিত্তিতে গড়ে উঠলেও ইসলামকে এ ক্ষেত্রে সুষ্ঠু ও নিখাদ মতবাদ হিসেবে ধরা যায়। বিশ্বনন্দিত রুশ ঔপন্যাসিক লেভ টলস্টয়ের মতে, 'কয়েক খোদার উপাসনা একই সময়ে সম্ভব নয়। এটি একত্ববাদী ধর্মীয় চেতনারও পরিপন্থি। এদিক থেকে ইসলাম খ্রিস্টীয় মতবাদ থেকেও শ্রেষ্ঠ।'
ইসলামী বিশ্বাস অনুসারে মহানবী (সা.)-এর আবির্ভাব ঘটেছিল মানবজাতিকে সত্যের পথে এগিয়ে নিতে। পরধর্ম সহিষ্ণুতার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কুরাইশদের শত্রুতা এড়াতে আল্লাহর নির্দেশে জন্মভূমি মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। তিনি সেখানে সব ধর্মের মানুষকে নিয়ে এক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলেন। ইহুদিরা মহানবীর (সা.) সঙ্গে সহাবস্থানের চুক্তিতেও আবদ্ধ হয়। কিন্তু তারা তাদের বিশ্বাসঘাতকতার অভ্যাস ভুলতে পারেনি। সে সময়কার কথা। ইহুদিরা ফন্দি আঁটছিল কিভাবে ইসলামের উপর আঘাত হানা যায়। একদিন সন্ধ্যায় মহানবী (সা.) সাহাবাদের নিয়ে মসজিদে বসে আছেন। এমন সময় একদল ইহুদি এসে বললো, হে মুসলমানদের নবী, আমরা মদিনার অধিবাসী নই। বহু দূরের বাসিন্দা। নানা কারণে আজ আমরা সন্ধ্যার আগে মদিনা ছেড়ে চলে যেতে পারিনি। আমাদের এতগুলো লোকের রাত কাটানোর পরিচিত কোনো জায়গাও নেই। আপনি কি এই মসজিদে এক রাতের জন্য আমাদের আশ্রয় দেবেন? খুব সকালে আমরা ঘুম থেকে উঠেই নিজেদের এলাকার দিকে যাত্রা করবো। মহানবী (সা.) বললেন, তোমরা সারাদিন ঘোরাঘুরি করে এখন খুবই ক্লান্ত। আজকের রাতটা এ মসজিদেই আমাদের মেহমান হিসাবে অবস্থান কর। আমার এবং সাহাবাদের খেজুরের ভাগও পাবে তোমরা। এ মসজিদেই তোমাদের রাত কাটাবার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। রাতে এশার নামাজ শেষে মহানবী (সা.) এবং সাহাবারা মসজিদ থেকে চলে যাওয়ার আগে ইহুদিদের সেখানে থাকার সু-ব্যবস্থা করে গেলেন। কিন্তু ইহুদীদের মনে ছিল দুষ্টবুদ্ধি। তারা আশ্রয় লাভের জন্য নয়, এসেছিল মসজিদটির ক্ষতিসাধন করতে। শেষ রাতে মসজিদ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার আগে তার ভেতরে তারা মলমূত্র ত্যাগ করল এবং নানা ক্ষতি করল। ভোরের আগে ফজরের নামাজের জন্য মসজিদে এসে মহানবী (সা.) এবং সাহাবারা দেখেন ইহুদিরা নেই। মসজিদটি মলমূত্রে ভরা। তা দেখে সাহবারা ক্রোধে জ্বলে উঠলেন। তারা ইহুদিদের আসল উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে বলে উঠলেন, আমরা এখনই তাদের ধাওয়া করবো এবং তাদের শির ধুলায় লুটাবো।

সাহাবারা এ জন্য ছুটে যাচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের নিবৃত্ত করলেন। নির্দেশ দিলেন, না তোমরা কোথাও যাবে না। এ মসজিদ তোমাদের কাছে পবিত্র, ইহুদিদের কাছে নয়। সেই কারণেই তারা মসজিদকে এভাবে নোংরা করতে পেরেছে। তাদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়া ঠিক হবে না। আল্লাহর ঘরের সম্মান ও পবিত্রতা আল্লাহই রক্ষা করবেন। তোমাদের উত্তেজিত হওয়া ঠিক হবে না। আজ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ যখন ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার শিকার, তখন মহানবী (সা.)-এর এ সহিষ্ণুতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার আছে। প্রতিহিংসা পরায়নতা নয় সহনশীলতা হলো মানব ধর্মের সত্যিকারের সৌন্দর্য। মহানবী (সা.) ছিলেন সে সৌন্দর্যেরই আঁধার।

লেখক : সুমন পালিত; সাংবাদিক ও কলামিস্ট
ই-মেইল : sumonpalit@gmail.com

মহামানব হজরত মোহাম্মদ (সা.)

| comments

আজ ১২ রবিউল আউয়াল। আখেরি নবী হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) এই তারিখে জন্মগ্রহণ করেন ও ইন্তেকাল করেন। মুসলিম বিশ্বের জনগণ ১২ রবিউল আউয়ালসহ এ মাসকে বেশ তাৎপর্যের সঙ্গে স্মরণ করে থাকে। একজন ন্যায়নিষ্ঠ, বিচক্ষণ ও দূরদর্শী শাসক হিসেবে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বিশ্ব মনীষায় গৌরবময় আসনের দাবিদার। বিচারের ক্ষেত্রে যে নিরপেক্ষতা ও ন্যায়নিষ্ঠতার স্বাক্ষর তিনি রাখেন, তা মুসলিম ও অমুসলিম সর্বমহলেই নন্দিত। তাঁর নির্দেশালোকে প্রণীত মুসলিম আইন একবিংশ শতাব্দীতেও সর্বজনের শ্রদ্ধা ও ভক্তির উদ্রেক করে। ওয়ারেন হেস্টিংসের ঐতিহাসিক 'ইমপিচমেন্টে'র ক্ষেত্রেও নিরপেক্ষতার মাপকাঠি হিসেবে বিশ্বখ্যাত বাগ্মী এডমন্ড বার্ক যে আইন শাস্ত্রের কথা উলেল্গখ করেন তা হচ্ছে মুসলিম আইন। বার্ক-এর ভাষায়- মুসলিম আইন_মুকুটধারী সম্রাট হতে সামান্যতম প্রজা পর্যন্ত সবার জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। এটা এমন একটি আইন যা জগতের সর্বোত্তম জ্ঞানানুমোদিত, পাণ্ডিত্যপূর্ণ এবং সর্বোৎকৃষ্ট আইনশাস্ত্রের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ধর্মীয় এবং ধর্মনিরপেক্ষ_ উভয় অঙ্গনেই তাঁর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। স্বভাবতই সে নির্মল, ক্লান্তিময় প্রভাব অনুপ্রাণিত করেছে দেশ ও বিদেশের মুসলিম ও অমুসলিম মনীষীদের। সে যুগের অসহায় ক্রীতদাসদের প্রতি তাঁর সহানুভূতিশীল আচরণ, ক্রীতদাসদের মুক্তি প্রদানে তাঁর সার্বক্ষণিক উৎসাহ ও মমত্বময় নির্দেশাদি অনুপ্রাণিত ও উদ্বুদ্ধ করেছে আব্রাহম লিঙ্কনকে ক্রীতদাস প্রথা অবলুপ্তকরণে। শুধু নির্যাতিত, শৃঙ্খলিত মানুষের দুঃখ মোচনে নয়, পশুপক্ষী, জন্তু-জানোয়ারের কষ্ট লাঘবে হজরত রাসূলুল্লাহর (সা.) সহানুভূতিশীল, মমত্বময় আচার-আচরণও সর্বমহলকে বিস্ময়াভিভূত করেছে। পশুপক্ষী, জীবজন্তু, বৃক্ষরাজি যে মানব জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ_ এ চিন্তা-চেতনার পথিকৃৎ হচ্ছেন ইসলামের নবী (সা.)। জীবজন্তুর প্রতি নিষ্ঠুরতা পরিহার করার, বৃক্ষরাজিকে অহেতুক নিধন করে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করার নিমিত্ত পৃথিবীর ইতিহাসে সার্থক ও সফলভাবে তিনিই প্রথমে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। যদিও বুদ্ধদেব, যিশুখ্রিস্ট, মহাবীর শ্রীকৃষ্ণ প্রমুখ মহান ব্যক্তিত্ব 'জীবে দয়া' করার প্রেরণা জুগিয়েছেন, হজরত রাসূলুল্লাহর (সা.) বাস্তবানুগ, বিজ্ঞানসম্মত জীবপ্রেমেই জন্ম দিয়েছে বিংশ শতাব্দীর বহুল আলোচিত বাস্তববিদ্যা।

মানব সভ্যতার ইতিহাসে নারীর মর্যাদার জন্য যে মহামনীষী প্রথম সোচ্চার হয়ে ওঠেন, নারীকে সংসার ও সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে যিনি প্রথম স্বীকৃতিদান করেন, মানবজীবনে নারীর অধিকার পূর্ণভাবে যে ব্যক্তি প্রতিষ্ঠিত করেন, সত্যিকার অর্থে নারী জাগরণ ও নারী মুক্তির যিনি প্রবক্তা, তিনি হচ্ছেন মোহাম্মদ মোস্তফা (সা.)। পৃথিবীর ইতিহাসের তিনিই প্রথম মহাপুরুষ, যিনি নারী জাতিকে প্রকৃত মর্যাদা ও অধিকার প্রদান করেছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে ক্রাবাইটের ভাষায়_ অর্থাৎ 'মোহাম্মদ (সা.) সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসে নারী-অধিকারের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রবক্তা ছিলেন।'
এ কথা আদৌ অত্যুক্তি হবে না যে, জীবনে অন্য কিছু না করলেও, শুধু নারী জাগরণের ক্ষেত্রে তাঁর অবদানই বিশ্ব মনীষায় হজরত রাসূলুল্লাহকে (সা.) সুদৃঢ়ভাবে অধিষ্ঠিত করবে।

এ কথা উলেল্গখ করা নিশ্চয়ই অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, ইউরোপীয় মনীষার উত্তরণেও হজরত রাসূলুল্লাহর (সা.) আদর্শের প্রভাব সর্বজনস্বীকৃত। জন উইলিয়াম ড্রেপার নিঃসংকোচে স্বীকার করেছেন যে, 'রেনেসাঁর জন্ম হয়েছে ইসলামের দরুন।' তাই ঞযব ঐঁহফৎবফ গ্রন্থে মাইকেল এইচ হার্ট নিঃসংকোচে শীর্ষস্থানে, যাকে সৃষ্টিকুলের সেরা ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্থান নির্ধারণ করেছেন, তিনি হলেন ইসলামের প্রবক্তা মানবতার কাণ্ডারি, বিশ্ব শান্তির প্রতিষ্ঠাতা আমাদের হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.), যিনি সর্বকালের, সর্বযুগের শ্রেষ্ঠতম মহামানব।

-মুফতি এনায়েতুল্লাহ

সিরাতুন্নবীর (সা.) পয়গাম

| comments

বালাগাল উলা বিকামালিহী
কাশাফাদদোজা বিজামালিহী
হাসুনাত জামিউ খিসালিহী
সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহী

প্রায় দেড় হাজার বছর আগের রবিউল আউয়ালের কোনো এক প্রভাত। আরব মরুর মক্কা উপত্যকায় উদিত হয়েছিল আলোকদীপ্ত এক নতুন সূর্য। যার আলোকরশ্মি বিদীর্ণ করেছিল গোমরাহি ও মূর্খতার পুরু পর্দা। সে প্রভাতের বিভায় অবিচার ও অনাচারের লু হাওয়া পরিণত হয়েছিল মলয় সমীরণে। বছরের পর বছর ধরে যে আরবভূমি তথা বিশ্বমানবতা পিপাসায় হাহাকার করছিল, তার ওপর বয়ে যায় রহমতের বারিবর্ষণ। যাতে সততা, নিষ্ঠা, ভ্রাতৃত্ব, হৃদ্যতা, ন্যায় ও সাম্য থেকে বঞ্চিত মানবতার রুক্ষভূমি পূর্ণ হয়ে ওঠে শ্যামল শোভায়। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির জন্মের সেই শুভমুহূর্তে আনন্দের বন্যা বইছিল সর্বত্র। সে খুশির বারতা পেঁৗছে গিয়েছিল দিকদিগন্তে। মহানবীর (সা.) জন্মের শুভমুহূর্তের আলোড়িত সব ঘটনাই জানান দিচ্ছিল বিশ্বমানবতার গগনে প্রদীপ্ত সূর্যের উদয়ের কথা। ঐতিহাসিকরা লিখেছেন, সে রাতে কিসরা প্রাসাদের চৌদ্দটি পাথর খসে পড়ে। পারস্যের অগি্নকুণ্ড নিভে যায়। সাবওয়াহ নদী শুকিয়ে যায়। এগুলো ছিল মূলত চোখে পড়ার মতো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। এছাড়া অনারবের মর্যাদা, রোমের প্রভাব, চীনের অগ্রগতির ধাপগুলো ভেঙে পড়ার কারণও ছিল তাই। এ জন্যই স্তিমিত হয়েছিল অনিষ্টের নরক, কুফরির অগি্নকুণ্ড, মূর্খতার দাবানল। অন্ধকারের কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যাওয়া বসুন্ধরা ফিরে পেয়েছিল নতুন প্রাণের স্পন্দন। মানবতা পেয়েছিল জন্মের সার্থকতা। তিনি ছিলেন রহমাতুলি্লল আলামিন। রাব্বুল আলামিনের ঘোষণা, 'আমি আপনাকে সারা জাহানের জন্য একমাত্র রহমত করেই পাঠিয়েছি।' তাঁর কৃপার বারিধারায় সিক্ত হয়েছিল সৃষ্টিকুলের প্রতিটি বস্তু।
প্রিয়নবী হজরত মোহাম্মদের (সা.) করুণার কারণেই প্রাণিকুল তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রতি দুর্বল। তাঁর নাম শুনলে ভক্তিতে গদগদ করে। কালের বিরামহীন চক্রে দেড় হাজার বছর লীন হয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত তাঁর অবদানের কথা জগদ্বাসীর কাছে ভাস্বর হয়ে আছে। এখনও দুনিয়ার প্রতিটি স্থানে প্রতি মুহূর্তে শ্রদ্ধাভরে উচ্চারিত হচ্ছে তাঁর বরকতময় নাম। নাতিদীর্ঘ কর্মময় জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ইতিহাসের পাতায় রক্ষিত আছে সযতনে। তাঁর সর্বপ্লাবী ব্যক্তিত্বের কাছে দুনিয়ার তাবৎ কৃতিত্ব ও যোগ্যতা ধূসরিত। ঘোর শত্রুর কাছেও তিনি কীর্তিমান, অদ্বিতীয় এক মহাপুরুষ। চরিত্রে তাঁর নেই বিন্দু পরিমাণ কালিমার আঁচড়। চারিত্রিক সার্টিফিকেটে স্বয়ং রাব্বুল আলামিন তাঁকে সর্বযুগের রেকর্ডসংখ্যক মার্ক দিয়েছেন। কৃতিত্ব, অবদান এবং মানবিক যোগ্যতার আকর্ষণীয় দিকগুলোর সম্মিলনের কারণে প্রতিটি মুসলমানের হৃদয়ে নবী করিমের (সা.) প্রতি সহজাত টান রয়েছে। সর্বোপরি মহব্বতে রাসূলের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন ইমানের অনিবার্য দাবি। সে দাবি পূরণার্থে মুসলমান হিসেবে রবিউল আউয়ালে সবাই আন্দোলিত হই। প্রিয়নবীর প্রতি আমাদের ব্যাকুল অন্তরের আকুল অনুভূতির প্রকাশ ঘটে। মহব্বতে রাসূলের নতুন হাওয়া বইতে থাকে চারদিকে।
তবে আমাদের মহব্বতের প্রকাশভঙ্গিটা যথার্থ কি-না তা বিবেচনার দাবি রাখে। অনুষ্ঠানের হিড়িক, চোখ ধাঁধানো চাকচিক্য এবং মহব্বতে রাসূলের সস্তা প্রয়োগের কারণে মাহে রবিউল আউয়াল আমাদের জীবনধারায় কোনোই পরিবর্তন আনতে পারে না। গতানুগতিক বহমান স্রোতে পণ্ড হয়ে যায় রবিউল আউয়ালের প্রকৃত চেতনা ও দাবি। রবিউল আউয়ালের পয়গাম ও দাবি কী_ সেগুলোও আমাদের কাছে আজ স্পষ্ট নয়। আনুষ্ঠানিকতার সব আয়োজনই আমরা সম্পন্ন করি, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও শিক্ষা, বাস্তবজীবনে নববী আদর্শের কোনো ছাপ রাখতে পারি না। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম যথার্থই বলেছেন, 'রবিউল আউয়াল এলে তোমারই গান গাই, রবিউল আউয়াল গেলে তোমায় ভুলে যাই।' মিলাদ, কিয়াম, জশনে-জুলুশ আর অনুষ্ঠানসর্বস্ব রবিউল আউয়াল আমরা যতই উদযাপন করি, প্রাপ্তির খাতায় শূন্যতা থেকেই যাবে। এ জন্য সিরাতুন্নবীর যথার্থ দাবি আদায়ের প্রতি মনোযোগী হওয়া ইমানদীপ্ত চেতনার সর্বপ্রধান দায়িত্ব।
একবিংশ শতাব্দীর সমস্যাসংকুল এই বিশ্বে বছর ঘুরে রবিউল আউয়াল আমাদের দুয়ারে হাজির। প্রিয়নবীর জন্ম-মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মাস হিসেবে এ মাসে নতুন প্রাণে উজ্জীবিত হওয়া সবার কর্তব্য। মুমিনের সামনে স্বচ্ছ আয়নার মতো নববী আদর্শের বাস্তবচিত্র স্থির হয়ে আছে। সিরাতুন্নবীর ডাকে সাড়া দিয়ে সে চিত্রের সঙ্গে নিজেদের জীবনের রূপটা পরখ করে দেখলেই প্রত্যেকের স্ব-স্ব পরিচয় উদ্ভাসিত হয়ে যাবে। অনুমান করতে কষ্ট হবে না, আমাদের জীবনচিত্র সে ছাঁচের কাছে কতটা বেমানান। আদর্শিক বিচারে নবী মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (সা.) পথ ও পদ্ধতি অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। আমি যে কেউই হই না কেন, আমার জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে সিরাতুন্নবীর মধ্যে রয়েছে অনন্ত পাথেয়। অন্ধকারে আলোকদিশা পাওয়ার প্রোজ্জ্বল জ্যোতি একমাত্র সিরাতে রাসূলের (সা.) মধ্যেই বিরাজমান। জীবনের সব ঝঞ্ঝাট, সংকট ও সমস্যাকে জয় করতে হলে সিরাতুন্নবীর ডাকে সাড়া দিতে হবে। কারণ সিরাতুন্নবীই হলো কিয়ামতাবধি আগত-অনাগত সব মানুষের মুক্তি ও সফলতার চিরন্তন অঙ্গীকার।

-জহির উদ্দিন বাবর
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. ইসলামী কথা - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Premium Blogger Template