السلام عليكم

যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার (তওবা) করবে আল্লাহ তাকে সব বিপদ থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেবেন। [আবূ দাঊদ: ১৫২০; ইবন মাজা: ৩৮১৯]
Showing posts with label আলচোনা. Show all posts
Showing posts with label আলচোনা. Show all posts

মৃত্যুর পরে আত্মা কি দুনিয়াতে আসতে পারে?

| comments

 প্রত্যেক মানুষকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। সবাইকে একদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু মৃত্যুর পর কি আত্মা পৃথিবীতে কি আসে? আসুন তাহলে জেনে নেয়া যাক-

উত্তর : না, কোনো ব্যক্তির যখন মৃত্যু হয়ে যায়, এর অর্থ হচ্ছে দুনিয়ার সঙ্গে তার যে সম্পর্ক রয়েছে, সেটা আত্মিক সম্পর্ক হোক অথবা শারীরিক সম্পর্ক হোক, কোনো সম্পর্কই সেখানে আর অবশিষ্ট থাকে না। তাঁর আত্মার কোনো ধরণের আগমন, বহির্গমন, সংযোজন, অর্থাৎ যেকোনো ধরণের তৎপরতা অবশিষ্ট থাকে না।

সুতরাং আত্মা স্বাধীনভাবে যে ঘোরাফেরা করবে অথবা আসবে-যাবে, ব্যাপারটা এমন নয়। মৃত্যুর পরে মানুষ চলে যায় আল্লাহর বারজাখি জিন্দেগিতে এবং বারজাখি জিন্দেগি হচ্ছে এমন যে বারজাখের একটা অর্থই হচ্ছে, এখান থেকে আর কোনোভাবেই বের হওয়ার সুযোগ নেই। তাই বারজাখি জিন্দেগিতে যারা চলে গিয়েছে, তারা একটা আড়ালে চলে গিয়েছে। সম্পূর্ণরূপে আড়ালের একটা জিন্দেগিতে চলে গিয়েছে, দুনিয়ার জগতে তাদের আর আগমন হবে না। যেমনিভাবে তারা দুনিয়াতে আগমন করতে পারবে না, ঠিক তেমনিভাবে তারা আখিরাতের যে জিন্দেগি রয়েছে, পরবর্তী জীবন সে জীবনেও যেতে পারবে না। এখানেই তাঁদের অপেক্ষা করতে হবে।

কোরআনে কারিমের মধ্যে আল্লাহ সুবানাহুতায়ালা এরশাদ করেন, ‘এই বারজাখে তাদের অবস্থান করতে হবে, ওই পরবর্তী পুনরুত্থান পর্যন্ত, ওই দিবস পর্যন্ত তাকে অপেক্ষা করতে হবে।’ পুনরুত্থান পর্যন্ত সেখান থেকে তাদের কোনো ধরনের আগমন, বহির্গমন অথবা কোনো ধরনের তৎপরতা করার অধিকার তাদের থাকবে না। তাই এ ধারণা করার সুযোগ নেই বা আমাদের আকিদার মধ্যে, আমাদের যে চিন্তাধারার রয়েছে, যে বিশ্বাস আকিদার মধ্যে রয়েছে, এই আকিদার বিশ্বাসের মধ্যে কোনোভাবেই এ কথা শুদ্ধ নয় যে, মানুষের আত্মা পৃথিবীর মধ্যে আবার আগমন করে থাকে এবং আগমন করে বিভিন্ন মানুষকে সতর্ক করে থাকে। এটা ভিন্ন দর্শনের বা ভিন্ন চিন্তাধারায় রয়েছে। সুতরাং ইসলাম মূলত যেটা আমাদের শিক্ষা দিয়েছে যে মৃত্যুর পর মানুষগুলোর সব তৎপরতা সীমাবদ্ধ হয়ে যায় এবং তারা বারজাখি জিন্দেগিতে চলে যায়। এই বারজাখি জিন্দেগি কোন ধরনের, তার কোনো সুস্পষ্ট সংজ্ঞা বা পরিচিতি রাসূল (সা.)-এর কোনো হাদিসের মাধ্যমে আমাদের কাছে স্পষ্ট করা হয়নি।

উজ্জ্বল হোসাইন

 

‘মৃত সাগর’ আল্লাহর ক্রোধের নিদর্শন

| comments

ইতিহাসখ্যাত ‘মৃত সাগর’। ইংরেজিতে বলা হয় ‘ডেড সি’ (Dead Sea) এবং আরবদের কাছে তা ‘বাহরুল মায়্যিত’ নামে পরিচিত। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ২০ লাখ বছর আগে এ সাগরের উৎপত্তি। জর্দান নদীর সঙ্গে সংযুক্ত হলেও এটি মূলত একটি হ্রদ। ডেড সি বা মৃত সাগরের দৈর্ঘ্য ৬৭ কিলোমিটার, প্রস্থ ১৮ কিলোমিটার আর গভীরতা ১.২৪০ ফুট। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪২২ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এ সাগরের পশ্চিমে রয়েছে ইসরায়েল ও পূর্বে জর্দান। এখান থেকে পবিত্র জেরুজালেম নগরীর দূরত্ব মাত্র ১৫ মাইল।

মৃত সাগর নানা বিচিত্র খনিজ পদার্থে ভরপুর। এতে প্রচুর পরিমাণে পটাসিয়াম, সালফার, ব্রোমাইন ও কলগেন রয়েছে। মৃত সাগরের পানিতে ম্যাগনেশিয়াম ক্লোরাইড (MgCl2) ও সোডিয়াম ক্লোরাইডের (NaCl) পরিমাণ যথাক্রমে ৫০.৮ ও ৩০.৪ শতাংশ। এ সাগরের পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ ৩৩.৭ শতাংশ। পৃথিবীর অন্যান্য সাগর ও মহাসাগরের তুলনায় লবণাক্ততা বেশি হওয়ায় মৃত সাগরে কোনো মাছ জন্মায় না। জর্দান নদী থেকে মাছ এই নদীতে আসার সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। তবে আশ্চর্যজনকভাবে রয়েছে বিপুল ব্যাকটেরিয়া (Microbe) এবং ক্ষুদ্রকায় ছত্রাক (Encyclopadia Encarta, Chapter-Dead Sea)।

পবিত্র কোরআন ও হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী সমকামিতার মতো জঘন্য পাপ ও অপরাধে লিপ্ত হওয়ার কারণে সডম ও গোমাররাহ নামের লোকালয় মহান আল্লাহর হুকুমে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। ঘটনাটি আজ থেকে প্রায় ছয় হাজার বছর আগের। ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থানটি বর্তমানে মৃত সাগর নামে পরিচিত। আল্লাহর নবী হজরত লুত (আ.)-এর বারবার সাবধান বাণী সত্ত্বেও সে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী অবৈধ যৌন সম্পর্ক ও সমকামিতার অভ্যাস পরিত্যাগ করেনি। পৃথিবীর বুকে একমাত্র তারাই যৌন ক্ষুধা চরিতার্থের উদ্দেশ্যে মহিলাদের বাদ দিয়ে পুরুষদের ওপর উপগত হতো। কোরআনুল কারিমে অত্যন্ত চমৎকারভাবে এই ঘটনা বিধৃত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি লুতকে পাঠিয়েছিলাম। তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, তোমরা এমন কুকর্ম করছ, যা তোমাদের আগে বিশ্বে কেউ করেনি। তোমরা তো কামতৃপ্তির জন্য নারী ছেড়ে পুরুষের কাছে গমন করো, তোমরা সীমা লঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৮০-৮১)

ফলে শাস্তি হিসেবে আল্লাহ তাআলা এ জনপদের চার লাখ মানুষকে বাস্তুভিটাসহ বিধ্বস্ত করে দেন। বর্তমান বিশ্বের খ্যাতনামা ইসলামী স্কলার মুফতি তাকি উসমানি মৃত সাগর পরিদর্শনের পর লেখেন, ‘আমেরিকার বিজ্ঞানীরা সমুদ্রের তলদেশে খননকার্য চালিয়ে মানুষের ব্যবহার্য পাথরের ঘটি, বাটি, চামচ উদ্ধার করেন। বিভিন্ন দেশ থেকে শত শত পর্যটক প্রতিদিন মৃত সাগর দেখার জন্য আসে এবং শিক্ষা গ্রহণ না করে বিনোদন ও ফুর্তিতে মেতে ওঠে।’ (মুফতি তাকি উসমানি, জাহানে দিদাহ, মৃত সাগর অধ্যায়)

অবৈধ যৌনমিলন, অনৈতিক যৌন সম্পর্ক ও সমকামিতার মতো অমানবিক কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকার জন্য আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে হুঁশিয়ার করেছেন। মানবগোষ্ঠীকে অশ্লীলতা, ব্যভিচার ও সমকামিতা থেকে বিরত থাকার জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কঠোর নির্দেশ প্রদান করেছেন। মহানবী (সা.) কিশোর-বালকদের চেহারার দিকে কুদৃষ্টিতে না দেখার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ তাদের চেহারায় বেহেশতের হুরের দীপ্তি আছে। তিনি বলেন, ‘আমার উম্মতের ব্যাপারে যেটা সবচেয়ে বেশি ভয় করি, তা হলো লুত সম্প্রদায়ের অনুরূপ পাপাচার। আমার উম্মতের কিছু লোক লুত জাতির অপকর্মে লিপ্ত হবে। যখন এরূপ হতে দেখবে তখন তাদের ওপরও অনুরূপ আজাব অবতরণের অপেক্ষা কোরো।’

লুত সম্প্রদায়ের মতো যারা সমকামিতায় লিপ্ত হবে, তাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, জিনা, ব্যভিচার, সমকামিতা ও মাদক গ্রহণের মতো ঘৃণিত ও অশ্লীল কাজের ধারেকাছেও না যাওয়ার জন্য ইসলামের রয়েছে কঠোর হুঁশিয়ারি। পাপাচার শুধু নিষিদ্ধ করা হয়নি, বরং যেসব বিষয় ব্যভিচারের দিকে প্রলুব্ধ করে, তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় ইসলাম ধর্মে এগুলো গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। অপরাধ যেমন ঘৃণ্য, শাস্তিও তদ্রূপ কঠিন ও কঠোর। (তাফসিরে মা’আরেফুল কোরআন, খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা ৮০৬; মাওলানা হাকিম আখতার (রহ.), রুহ কি বিমারিয়াঁ, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা ১৯)

অনৈতিক যৌন সম্পর্ক ও সমকামিতার শাস্তিস্বরূপ সাম্প্রতিককালে দেখা দিয়েছে এইডস বা এইচআইভি। ‘এইডস’ মানে নিশ্চিত মৃত্যু। আজ পর্যন্ত এর কোনো কার্যকর ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। ২০১৭ সাল পর্যন্ত এইডসে আক্রান্ত হয়ে তিন কোটি ৫০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছে তিন কোটি ৭০ লাখ মানুষ। বাংলাদেশে এইডস রোগী শনাক্ত হয়েছে সর্বপ্রথম ১৯৮৯ সালে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে এইডসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ১১ হাজার ৭০০। এর মধ্যে মারা গেছে এক হাজার ২২ জন। প্রায় ছয় হাজার ৪৫৫ ব্যক্তি এইচআইভির জীবাণু বহন করছে। এইচআইভি সংক্রমণের প্রধান কারণ হচ্ছে অবৈধ যৌনমিলন ও সমকামিতা।

আল্লাহর এই শাস্তির হাত থেকে বাঁচার পথ হলো একনিষ্ঠ মনে তাওবা করা, তাকওয়া অর্জন, নফল রোজা পালন ও আল্লাহর ওলিদের সান্নিধ্য লাভ করা। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বলেন, কোনো জাতির মধ্যে যদি অবৈধ ও বিকৃত যৌনাচারের প্রকোপ বৃদ্ধি পায় তখন আল্লাহ তাআলা লুত সম্প্রদায়ের মতো বা এর চেয়ে আরো ভয়াবহ শাস্তি প্রদান করেন। ১৯৮৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ড. হিরোশি নাকাজিমার মন্তব্য এই ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য : The spread of AIDS among the general population could mean the extermination of some community or even the disappearance of mankind.

‘সাধারণ জনগণের মধ্যে এইডসের বিস্তারের ফলে কিছু জাতিগোষ্ঠী ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এমনকি সমগ্র মানবজাতিও বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।’ (The New Straits Times, Kuala Lampur, Malaysia, June 23, 1988)

লেখক : ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন; অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ওমর গণি এমইএস কলেজ, চট্টগ্রাম

দাজ্জাল

| comments

দাজ্জালের আগমণ, ফিতনাসমূহ এবং বাঁচার উপায়

আখেরী যামানায় কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে মিথ্যুক দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে। দাজ্জালের আগমণ কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার সবচেয়ে বড় আলামত। মানব জাতির জন্যে দাজ্জালের চেয়ে অধিক বড় বিপদ আর নেই। বিশেষ করে সে সময় যে সমস্ত মুমিন জীবিত থাকবে তাদের জন্য ঈমান নিয়ে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। সমস্ত নবীই আপন উম্মাতকে দাজ্জালের ভয় দেখিয়েছেন। আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)ও দাজ্জালের ফিতনা থেকে সতর্ক করেছেন এবং তার অনিষ্ট থেকে বাঁচার উপায়ও বলে দিয়েছেন। ইবনে উমার (রাঃ) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণনা করেনঃ “একদা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাড়িয়ে আল্লাহর যথাযোগ্য প্রশংসা করলেন। অতঃপর দাজ্জালের আলোচনা করতে গিয়ে বললেনঃ আমি তোমাদেরকে তার ফিতনা থেকে সাবধান করছি। সকল নবীই তাদের উম্মাতকে দাজ্জালের ভয় দেখিয়েছেন। কিন্তু আমি তোমাদের কাছে দাজ্জালের একটি পরিচয়ের কথা বলব যা কোন নবীই তাঁর উম্মাতকে বলেন নাই। তা হলো দাজ্জাল অন্ধ হবে। আর আমাদের মহান আল্লাহ অন্ধ নন।

নাওয়াস বিন সামআন (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সকাল বেলা আমাদের কাছে দাজ্জালের বর্ণনা করলেন। তিনি তার ফিতনাকে খুব বড় করে তুলে ধরলেন। বর্ণনা শুনে আমরা মনে করলাম নিকটস্থ খেজুরের বাগানের পাশেই সে হয়ত অবস্থান করছে। আমরা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর নিকট থেকে চলে গেলাম। কিছুক্ষণ পর আমরা আবার তাঁর কাছে গেলাম। এবার তিনি আমাদের অবস্থা বুঝে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমাদের কি হলো? আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যেভাবে দাজ্জালের আলোচনা করেছেন তা শুনে আমরা ভাবলাম হতে পারে সে খেজুরের বাগানের ভিতরেই রয়েছে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ দাজ্জাল ছাড়া তোমাদের উপর আমার আরো ভয় রয়েছে। আমি তোমাদের মাঝে জীবিত থাকতেই যদি দাজ্জাল আগমণ করে তাহলে তোমাদেরকে ছাড়া আমি একাই তার বিরুদ্ধে ঝগড়া করবো। আর আমি চলে যাওয়ার পর যদি সে আগমণ করে তাহলে প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজেকে হেফাযত করবে। আর আমি চলে গেলে আল্লাহই প্রতিটি মুসলিমকে হেফাযতকারী হিসেবে যথেষ্ট ।[1]

দাজ্জালের আগমণের সময় মুসলমানদের অবস্থাঃ

দাজ্জালের আগমণের পূর্ব মুহূর্তে মুসলমানদের অবস্থা খুব ভাল থাকবে। তারা পৃথিবীতে শক্তিশালী এবং বিজয়ী থাকবে। সম্ভবতঃ এই শক্তির পতন ঘটানোর জন্যই দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে।

দাজ্জালের পরিচয়ঃ

দাজ্জাল মানব জাতিরই একজন হবে। মুসলমানদের কাছে তার পরিচয় তুলে ধরার জন্যে এবং তার ফিতনা থেকে তাদেরকে সতর্ক করার জন্যে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার পরিচয় বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। মুমিন বান্দাগণ তাকে দেখে সহজেই চিনতে পারবে এবং তার ফিতনা থেকে নিরাপদে থাকবে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার যে সমস্ত পরিচয় উল্লেখ করেছেন মুমিনগণ তা পূর্ণ অবগত থাকবে। দাজ্জাল অন্যান্য মানুষের তুলনায় স্বতন্ত্র বৈশিষ্টের অধিকারী হবে। জাহেল-মূর্খ ও হতভাগ্য ব্যতীত কেউ দাজ্জালের ধোকায় পড়বেনা।

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাজ্জালকে স্বপ্নে দেখে তার শারীরিক গঠনের বর্ণনাও প্রদান করেছেন। তিনি বলেনঃ দাজ্জাল হবে বৃহদাকার একজন যুবক পুরুষ, শরীরের রং হবে লাল, বেঁটে, মাথার চুল হবে কোঁকড়া, কপাল হবে উঁচু, বক্ষ হবে প্রশস্ত, চক্ষু হবে টেরা এবং আঙ্গুর ফলের মত উঁচু।[2] দাজ্জাল নির্বংশ হবে। তার কোন সন্তান থাকবেনা ।[3]

দাজ্জালের কোন্‌ চোখ কানা থাকবে?

বিভিন্ন হাদীছে দাজ্জালের চোখ অন্ধ হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। কোন কোন হাদীছে বলা হয়েছে দাজ্জাল অন্ধ হবে। কোন হাদীছে আছে তার ডান চোখ অন্ধ হবে। আবার কোন হাদীছে আছে তার বাম চোখ হবে অন্ধ। মোটকথা তার একটি চোখ দোষিত হবে। তবে ডান চোখ অন্ধ হওয়ার হাদীছগুলো বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে।[4] মোটকথা দাজ্জালের অন্যান্য লক্ষণগুলো কারো কাছে অস্পষ্ট থেকে গেলেও অন্ধ হওয়ার বিষয়টি কারো কাছে অস্পষ্ট হবেনা।

দাজ্জালের দু’চোখের মাঝখানে কাফের লেখা থাকবেঃ

তাছাড়া দাজ্জালকে চেনার সবচেয়ে বড় আলামত হলো তার কপালে কাফের كافر)) লেখা থাকবে।[5] অপর বর্ণনায় আছে তার কপালে (ك ف ر) এই তিনটি বর্ণ লেখা থাকবে। প্রতিটি মুসলিম ব্যক্তিই তা পড়তে পারবে।[6] অপর বর্ণনায় আছে শিক্ষিত-অশিক্ষত সকল মুসলিম ব্যক্তিই তা পড়তে পারবে।[7] মোটকথা আল্লাহ মু’মিনের জন্যে অন্তদৃষ্টি খোলে দিবেন। ফলে সে দাজ্জালকে দেখে সহজেই চিনতে পারবে। যদিও ইতিপূর্বে সে ছিল অশিক্ষিত। কাফের ও মুনাফেক লোক তা দেখেও পড়তে পারবেনা। যদিও সে ছিল শিক্ষিত ও পড়ালেখা জানা লোক। কারণ কাফের ও মুনাফেক আল্লাহর অসংখ্য সুস্পষ্ট দলীল-প্রমাণ দেখেও ঈমান আনয়ন করেনি।[8]

দাজ্জালের ফিতনাসমূহ ও তার অসারতাঃ

আদম সৃষ্টি থেকে কিয়ামত পর্যন্ত মানব জাতির জন্য দাজ্জালের চেয়ে বড় ফিতনা আর নেই। সে এমন অলৌকিক বিষয় দেখাবে যা দেখে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়বে। দাজ্জাল নিজেকে প্রভু ও আল্লাহ হিসেবে দাবী করবে। তার দাবীর পক্ষে এমন কিছু প্রমাণও উপস্থাপন করবে যে সম্পর্কে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আগেই সতর্ক করেছেন। মুমিন বান্দাগণ এগুলো দেখে মিথ্যুক দাজ্জালকে সহজেই চিনতে পারবে এবং আল্লাহর প্রতি তাদের ঈমান আরো বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু দুর্বল ঈমানদার লোকেরা বিভ্রান্তিতে পড়ে ঈমান হারা হবে।

দাজ্জাল নিজেকে রাব্ব বা প্রভু হিসেবেও দাবী করবে। ঈমানদারের কাছে এ দাবীটি সুস্পষ্ট দিবালোকের মত মিথ্যা বলে প্রকাশিত হবে। দাজ্জাল তার দাবীর পক্ষে যত বড় অলৌকিক ঘটনাই পেশ করুক না কেন মুমিন ব্যক্তির কাছে এটি সুস্পষ্ট হবে যে সে একজন অক্ষম মানুষ, পানাহার করে, নিদ্রা যায়, পেশাব-পায়খান করে। সর্বোপরি সে হবে অন্ধ। যার ভিতরে মানবীয় সব দোষ-গুণ বিদ্যমান সে কিভাবে রব্ব ও আল্লাহ হতে পারে!! একজন সত্যিকার মুমিনের মুমিনের বিশ্বাস হলোঃ মহান আল্লাহ সর্বপ্রকার মানবীয় দোষ-ত্রুটি হতে সম্পূর্ণ মুক্ত। কোন সৃষ্টজীবই তার মত নয়। আল্লাহকে দুনিয়ার জগতে কোন মানুষের পক্ষে দেখাও সম্ভব নয়।

দাজ্জাল বর্তমানে কোথায় আছে?

ফাতেমা বিনতে কায়স (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি মসজিদে গমণ করে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর সাথে নামায আদায় করলাম। আমি ছিলাম মহিলাদের কাতারে। তিনি নামায শেষে হাসতে হাসতে মিম্বারে উঠে বসলেন। প্রথমেই তিনি বললেনঃ প্রত্যেকেই যেন আপন আপন জায়গায় বসে থাকে। অতঃপর তিনি বললেনঃ তোমরা কি জান আমি কেন তোমাদেরকে একত্রিত করেছি? তাঁরা বললেনঃ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ আমি তোমাদেরকে এ সংবাদ দেয়ার জন্যে একত্রিত করেছি যে তামীম দারী ছিল একজন খৃষ্টান লোক। সে আমার কাছে আগমণ করে ইসলাম গ্রহণ করেছে। অতঃপর সে মিথ্যুক দাজ্জাল সম্পর্কে এমন ঘটনা বলেছে যা আমি তোমাদের কাছে বর্ণনা করতাম। লাখ্‌ম ও জুযাম গোত্রের ত্রিশ জন লোকের সাথে সে সাগর পথে ভ্রমণে গিয়েছিল। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার শিকার হয়ে এক মাস পর্যন্ত তারা সাগরেই ছিল। অবশেষে তারা সাগরের মাঝখানে একটি দ্বীপে অবতরণ করলো। দ্বীপের ভিতরে প্রবেশ করে তারা মোটা মোটা এবং প্রচুর চুল বিশিষ্ট একটি অদ্ভুত প্রাণীর সন্ধান পেল। চুল দ্বারা সমস্ত শরীর আবৃত থাকার কারণে প্রাণীটির অগ্রপশ্চাৎ নির্ধারণ করতে সক্ষম হলোনা। তারা বললঃ অকল্যাণ হোক তোমার! কে তুমি? সে বললোঃ আমি সংবাদ সংগ্রহকারী গোয়েন্দা। তারা বললোঃ কিসের সংবাদ সংগ্রহকারী? অতঃপর প্রাণীটি দ্বীপের মধ্যে একটি ঘরের দিকে ইঙ্গিত করে বললোঃ হে লোক সকল! তোমরা এই ঘরের ভিতরে অবস্থানরত লোকটির কাছে যাও। সে তোমাদের কাছ থেকে সংবাদ সংগ্রহ করার জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। তামীম দারী বলেনঃ প্রাণীটি যখন একজন লোকের কথা বললোঃ তখন আমাদের ভয় হলো যে হতে পারে সে একটি শয়তান। তথাপিও আমরা ভীত হয়ে দ্রুত অগ্রসর হয়ে ঘরটির ভিতরে প্রবেশ করলাম। সেখানে প্রবেশ করে আমরা বৃহদাকার একটি মানুষ দেখতে পেলাম। এত বড় আকৃতির মানুষ আমরা ইতিপূর্বে আর কখনও দেখিনি। তার হাত দু’টিকে ঘাড়ের সাথে একত্রিত করে হাঁটু এবং গোড়ালীর মধ্যবর্তী স্থানে লোহার শিকল দ্বারা বেঁধে রাখা হয়েছে। আমরা বললামঃ মরণ হোক তোমার! কে তুমি? সে বললোঃ তোমরা আমার কাছে আসতে সক্ষম হয়েছ। তাই আগে তোমাদের পরিচয় দাও। আমরা বললামঃ আমরা একদল আরব মানুষ নৌকায় আরোহন করলাম। সাগরের প্রচন্ড ঢেউ আমাদেরকে নিয়ে একমাস পর্যন্ত খেলা করলো। অবশেষে তোমার দ্বীপে উঠতে বাধ্য হলাম। দ্বীপে প্রবেশ করেই প্রচুর পশম বিশিষ্ট এমন একটি জন্তুর সাক্ষাৎ পেলাম, প্রচুর পশমের কারণে যার অগ্রপশ্চাৎ চেনা যাচ্ছিলনা। আমরা বললামঃ অকল্যাণ হোক তোমার! কে তুমি? সে বললোঃ আমি সংবাদ সংগ্রহকারী গোয়েন্দা। আমরা বললামঃ কিসের সংবাদ সংগ্রহকারী? অতঃপর প্রাণীটি দ্বীপের মধ্যে এই ঘরের দিকে ইঙ্গিত করে বললোঃ হে লোক সকল! তোমরা এই ঘরের ভিতরে অবস্থানরত লোকটির কাছে যাও। সে তোমাদের নিকট থেকে সংবাদ সংগ্রহ করার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। তাই আমরা তার ভয়ে তোমার কাছে দ্রুত আগমণ করলাম। হতে পার তুমি একজন শয়তান- এভয় থেকেও আমরা নিরাপদ নই। সে বললোঃ আমাকে তোমরা ‘বাইসান’ সম্পর্কে সংবাদ দাও। আমরা তাকে বললামঃ বাইসানের কি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছো? সে বললোঃ আমি তথাকার খেজুরের বাগান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছি। সেখানের গাছগুলো এখনও ফল দেয়? আমরা বললামঃ হ্যাঁ। সে বললোঃ সে দিন বেশী দূরে নয় যে দিন গাছগুলোতে কোন ফল ধরবেনা। অতঃপর সে বললোঃ আমাকে বুহাইরাতুত্‌ তাবারীয়া সম্পর্কে সংবাদ দাও। আমরা তাকে বললামঃ বুহাইরাতুত্‌ তাবারীয়ার কি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছো? সে বললোঃ আমি জানতে চাই সেখানে কি এখনও পানি আছে? আমরা বললামঃ তথায় প্রচুর পানি আছে। সে বললোঃ অচিরেই তথাকার পানি শেষ হয়ে যাবে। সে পুনরায় বললোঃ আমাকে যুগার নামক ঝর্ণা সম্পর্কে সংবাদ দাও। আমরা তাকে বললামঃ সেখানকার কি সম্পর্কে তুমি জানতে চাও? সে বললোঃ আমি জানতে চাই সেখানে কি এখনও পানি আছে? লোকেরা কি এখনও সে পানি দিয়ে চাষাবাদ করছে? আমরা বললামঃ তথায় প্রচুর পানি রয়েছে। লোকেরা সে পানি দিয়ে চাষাবাদ করছে। সে আবার বললোঃ আমাকে উম্মীদের নবী সম্পর্কে জানাও। আমরা বললামঃ সে মক্কায় আগমণ করে বর্তমানে মদীনায় হিজরত করেছে। সে বললোঃ আরবরা কি তার সাথে যুদ্ধ করেছে? বললামঃ হ্যাঁ। সে বললোঃ ফলাফল কি হয়েছে? আমরা তাকে সংবাদ দিলাম যে, পার্শ্ববর্তী আরবদের উপর তিনি জয়লাভ করেছেন। ফলে তারা তাঁর আনুগত্য স্বীকার করে নিয়েছে। সে বললঃ তাই না কি? আমরা বললাম তাই। সে বললোঃ তার আনুগত্য করাই তাদের জন্য ভাল। এখন আমার কথা শুন। আমি হলাম দাজ্জাল। অচিরেই আমাকে বের হওয়ার অনুমতি দেয়া হবে। আমি বের হয়ে চল্লিশ দিনের ভিতরে পৃথিবীর সমস্ত দেশ ভ্রমণ করবো। তবে মক্কা-মদীনায় প্রবেশ করা আমার জন্য নিষিদ্ধ থাকবে। যখনই আমি মক্কা বা মদীনায় প্রবেশ করতে চাইবো তখনই ফেরেশতাগণ কোষমুক্ত তলোয়ার হাতে নিয়ে আমাকে তাড়া করবে। মক্কা-মদীনার প্রতিটি প্রবেশ পথে ফেরেশতাগণ পাহারা দিবে।

হাদীছের বর্ণনাকারী ফাতেমা বিনতে কায়েস বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাতের লাঠি দিয়ে মিম্বারে আঘাত করতে করতে বললেনঃ এটাই মদীনা, এটাই মদীনা, এটাই মদীনা। অর্থাৎ এখানে দাজ্জাল আসতে পারবেনা। অতঃপর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মানুষকে লক্ষ্য করে বললেনঃ তামীম দারীর হাদীছটি আমার কাছে খুবই ভাল লেগেছে। তার বর্ণনা আমার বর্ণনার অনুরূপ হয়েছে। বিশেষ করে মক্কা ও মদীনা সম্পর্কে। শুনে রাখো! সে আছে সাম দেশের সাগরে (ভূমধ্য সাগরে) অথবা আরব সাগরে। তা নয় সে আছে পূর্ব দিকে। সে আছে পূর্ব দিকে। সে আছে পূর্ব দিকে। এই বলে তিনি পূর্ব দিকে ইঙ্গিত করে দেখালেন। ফাতেমা বিনতে কায়েস বলেনঃ “আমি এই হাদীছটি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর নিকট থেকে মুখস্থ করে রেখেছি।[9]

দাজ্জালের যে সমস্ত ক্ষমতা দেখে মানুষ বিভ্রান্তিতে পড়বেঃ

ক) একস্থান হতে অন্য স্থানে দ্রুত পরিভ্রমণঃ নাওয়াস বিন সামআন থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে দাজ্জালের চলার গতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “দ্রুতগামী বাতাস বৃষ্টিকে যেভাবে চালিয়ে নেয় দাজ্জালের চলার গতিও সে রকম হবে।[10] তিনি আরো সংবাদ দিয়েছেন যে মক্কা ও মদীনা ব্যতীত পৃথিবীর সমস্ত অঞ্চল সে পরিভ্রমণ করবে। মক্কা ও মদীনার সমস্ত প্রবেশ পথে ফেরেশতাগণ তলোওয়ার হাতে নিয়ে পাহারা দিবে।

খ) দাজ্জালের সাথে থাকবে জান্নাত-জাহান্নামঃ দাজ্জালের সাথে জান্নাত এবং জাহান্নাম থাকবে। প্রকৃত অবস্থা হবে সম্পূর্ণ বিপরীত। দাজ্জালের জাহান্নামের আগুন প্রকৃতপক্ষে সুমিষ্ট পানি এবং জান্নাত হবে জাহান্নামের আগুন। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ “দাজ্জালের সাথে যা থাকবে তা আমি অবগত আছি। তার সাথে দু’টি নদী প্রবাহিত থাকবে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে একটিতে সুন্দর পরিস্কার পানি দেখা যাবে। অন্যটিতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা যাবে। যার সাথে দাজ্জালের সাক্ষাৎ হবে সে যেন দাজ্জালের আগুনে ঝাপ দিয়ে পড়ে এবং সেখান থেকে পান করে। কারণ উহা সুমিষ্ট পানি। তার চোখের উপরে মোটা আবরণ থাকবে। কপালে কাফের লেখা থাকবে। মূর্খ ও শিক্ষিত সকল ঈমানদার লোকই তা পড়তে সক্ষম হবে ।[11]

গ) দাজ্জাল মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করবেঃ দাজ্জাল তার কর্মকান্ডে শয়তানের সহযোগীতা নিবে। শয়তান কেবল মিথ্যা ও গোমরাহী এবং কুফরী কাজেই সাহায্য করে থাকে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ দাজ্জাল মানুষের কাছে গিয়ে বলবেঃ আমি যদি তোমার মৃত পিতা-মাতাকে জীবিত করে দেখাই তাহলে কি তুমি আমাকে প্রভু হিসেবে মানবে? সে বলবে অবশ্যই মানব। এ সুযোগে শয়তান তার পিতা-মাতার আকৃতি ধরে সন্তানকে বলবেঃ হে সন্তান! তুমি তার অনুসরণ কর। সে তোমার প্রতিপালকমুমিন।[12] হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই।

ঘ) জড় পদার্থ ও পশুরাও দাজ্জালের ডাকে সাড়া দেবেঃ দাজ্জালের ফিতনার মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে পরীক্ষা করবেন। দাজ্জাল আকাশকে আদেশ দিবে বৃষ্টি বর্ষণ করার জন্যে। আকাশ তার আদেশে বৃষ্টি বর্ষণ করবে। যমিনকে ফসল উৎপন্ন করতে বলবে। যমিন ফসল উৎপন্ন করবে। চতুষ্পদ জন্তুকে ডাক দিলে তারা দাজ্জালের ডাকে সাড়া দিবে। ধ্বংস প্রাপ্ত ঘরবাড়িকে তার নিচে লুকায়িত গুপ্তধন বের করতে বলবে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ “দাজ্জাল এক জনসমাজে গিয়ে মানুষকে তার প্রতি ঈমান আনয়নের আহবান জানাবে। এতে তারা ঈমান আনবে। দাজ্জাল তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করার জন্য আকাশকে আদেশ দিবে। আকাশ বৃষ্টি বর্ষণ করবে, যমিন ফসল উৎপন্ন করবে এবং তাদের পশুপাল ও চতুষ্পদ জন্তুগুলো অধিক মোটা-তাজা হবে এবং পূর্বের তুলনায় বেশী দুধ প্রদান করবে। অতঃপর অন্য একটি জনসমাজে গিয়ে মানুষকে তার প্রতি ঈমান আনয়নের আহবান জানাবে। লোকেরা তার কথা প্রত্যাখ্যান করবে। দাজ্জাল তাদের নিকট থেকে ব্যর্থ হয়ে ফেরত আসবে। এতে তারা চরম অভাবে পড়বে। তাদের ক্ষেত-খামারে চরম ফসলহানি দেখা দিবে। দাজ্জাল পরিত্যক্ত ভূমিকে তার নিচে লুকায়িত গুপ্তধন বের করতে বলবে। গুপ্তধনগুলো বের হয়ে মৌমাছির দলের ন্যায় তার পিছে পিছে চলতে থাকবেমুমিন।[13]

ঙ) দাজ্জাল একজন মুমিন যুবককে হত্যা করে পুনরায় জীবিত করবেঃ

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ দাজ্জাল বের হয়ে মদীনার দিকে অগ্রসর হবে। যেহেতু মদীনায় দাজ্জালের প্রবেশ নিষেধ তাই সে মদীনার নিকটবর্র্তী একটি স্থানে অবস্থান করবে। তার কাছে একজন মুমিন লোক গমণ করবেন। তিনি হবেন ঐ যামানার সর্বোত্তম মুমিন। দাজ্জালকে দেখে তিনি বলবেনঃ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি সেই দাজ্জাল যার সম্পর্কে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে সাবধান করেছেন। তখন দাজ্জাল উপস্থিত মানুষকে লক্ষ্য করে বলবেঃ আমি যদি একে হত্যা করে জীবিত করতে পারি তাহলে কি তোমরা আমার ব্যাপারে কোন সন্দেহ পোষণ করবে? লোকেরা বলবেঃ না। অতঃপর সে উক্ত মুমিনকে হত্যা করে পুনরায় জীবিত করবে। এ পর্যায়ে যুবকটি বলবেঃ আল্লাহর শপথ! তুমি যে মিথ্যুক দাজ্জাল- এ সম্পর্কে আমার বিশ্বাস আগের তুলনায় আরো মজবুত হলো। দাজ্জাল তাকে দ্বিতীয়বার হত্যা করার চেষ্টা করবে। কিন্তু তাঁকে হত্যা করতে সক্ষম হবেনা।[14] মুসলিম শরীফের বর্ণনায় এসেছে উক্ত যুবক দাজ্জালকে দেখে বলবেঃ হে লোক সকল! এটি সেই দাজ্জাল যা থেকে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে সাবধান করেছেন। অতঃপর দাজ্জাল তার অনুসারীদেরকে বলবেঃ একে ধর এবং প্রহার কর। তাকে মেরে-পিটে যখম করা হবে। অতঃপর দাজ্জাল তাকে জিজ্ঞেস করবে এখনও কি আমার প্রতি ঈমান আনবেনা? নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ উক্ত যুবক বলবেনঃ তুমি মিথ্যাবাদী দাজ্জাল। তারপর দাজ্জালের আদেশে তার মাথায় করাত লাগিয়ে দ্বিখন্ডিত করে ফেলবে। দাজ্জাল দু’খন্ডের মাঝ দিয়ে হাঁটাহাঁটি করবে। অতঃপর বলবেঃ উঠে দাড়াও। তিনি উঠে দাড়াবেন। দাজ্জাল বলবে এখনও ঈমান আনবেনা? তিনি বলবেনঃ তুমি মিথ্যুক দাজ্জাল হওয়ার ব্যাপারে এখন আমার বিশ্বাস আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। অতঃপর তিনি বলবেনঃ হে লোক সকল! আমার পরে আর কারো সাথে এরূপ করতে পারবেনা। অতঃপর দাজ্জাল তাকে পাকড়াও করে আবার যবেহ করার চেষ্টা করবে। কিন্তু তার গলায় যবেহ করার স্থানটি তামায় পরিণত হয়ে যাবে। কাজেই সে যবেহ করতে ব্যর্থ হবে। অতঃপর তাঁর হাতে-পায়ে ধরে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। লোকেরা মনে করবে তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছে। অথচ সে জান্নাতে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। নবী (সাঃ) বলেনঃ “এই ব্যক্তি হবে পৃথিবীতে সেদিন সবচেয়ে মহা সত্যের সাক্ষ্য দানকারীমুমিন।[15]

দাজ্জাল কোথা থেকে বের হবে?

দাজ্জাল বের হওয়ার স্থান সম্পর্কেও রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বর্ণনা দিয়েছেন। সে পূর্ব দিকের পারস্য দেশ থেকে বের হবে। সে স্থানটির নাম হবে খোরাসান। সেখান থেকে বের হয়ে সমগ্র দুনিয়া ভ্রমণ করবে। তবে মক্কা এবং মদীনায় প্রবেশ করতে পারবেনা। ফেরেশতাগণ সেদিন মক্কা-মদীনার প্রবেশ পথসমূহে তরবারি নিয়ে পাহারা দিবে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ “পূর্বের কোন একটি দেশ থেকে দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে যার বর্তমান নাম খোরাসানমুমিন।[16]

দাজ্জাল মক্কা ও মদীনায় প্রবেশ করতে পারবেনাঃ

সহীহ হাদীছের বিবরণ অনুযায়ী দাজ্জালের জন্যে মক্কা ও মদীনাতে প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে। মক্কা ও মদীনা ব্যতীত পৃথিবীর সকল স্থানেই সে প্রবেশ করবে। ফাতেমা বিনতে কায়েস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত দাজ্জালের হাদীছে এসেছে অতঃপর দাজ্জাল বললোঃ আমি হলাম দাজ্জাল। অচিরেই আমাকে বের হওয়ার অনুমতি দেয়া হবে। আমি বের হয়ে চল্লিশ দিনের ভিতরে পৃথিবীর সমস্ত দেশ ভ্রমণ করবো। তবে মক্কা-মদীনায় প্রবেশ করা আমার জন্য নিষিদ্ধ থাকবে। যখনই আমি মক্কা বা মদীনায় প্রবেশ করতে চাইবো তখনই কোষমুক্ত তলোয়ার হাতে নিয়ে ফেরেশতাগণ আমাকে তাড়া করবে। মক্কা-মদীনার প্রতিটি প্রবেশ পথে ফেরেশতাগণ পাহারা দিবে।[17] সে সময় মদীনা শরীফ তিনবার কেঁপে উঠবে এবং প্রত্যেক মুনাফেক এবং কাফেরকে বের করে দিবে। যারা দাজ্জালের নিকট যাবে এবং তার ফিতনায় পড়বে তাদের অধিকাংশই হবে মহিলা। দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচানোর জন্য পুরুষেরা তাদের স্ত্রী, মা, বোন, কন্যা, ফুফু এবং অন্যান্য স্বজন মহিলাদেরকে রশি দিয়ে বেঁধে রাখবে।

দাজ্জাল পৃথিবীতে কত দিন থাকবে?

সাহাবীগণ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে জিজ্ঞেস করেছেন দাজ্জাল পৃথিবীতে কত দিন অবস্থান করবে? উত্তরে তিনি বলেছেনঃ সে চল্লিশ দিন অবস্থান করবে। প্রথম দিনটি হবে এক বছরের মত লম্বা। দ্বিতীয় দিনটি হবে এক মাসের মত। তৃতীয় দিনটি হবে এক সপ্তাহের মত। আর বাকী দিনগুলো দুনিয়ার স্বাভাবিক দিনের মতই হবে। আমরা বললামঃ যে দিনটি এক বছরের মত দীর্ঘ হবে সে দিন কি এক দিনের নামাযই যথেষ্ট হবে? উত্তরে তিনি বললেনঃ না; বরং তোমরা অনুমান করে সময় নির্ধারণ করে নামায পড়বে।[18]

কারা দাজ্জালের অনুসরণ করবে?

দাজ্জালের অধিকাংশ অনুসারী হবে ইহুদী, তুর্কী এবং অনারব লোক। তাদের অধিকাংশই হবে গ্রাম্য মূর্খ এবং মহিলা। ইহুদীরা মিথ্যুক কানা দাজ্জালের অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী দাজ্জাল হবে তাদের বাদশা। তার নেতৃত্বে তারা বিশ্ব পরিচালনা করবে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ দাজ্জালের অধিকাংশ অনুসারী হবে ইহুদী এবং মহিলা।[19] তিনি আরো বলেনঃ “ইস্পাহানের সত্তর হাজার ইহুদী দাজ্জালের অনুসরণ করবে। তাদের সবার পরনে থাকবে সেলাই বিহীন চাদরমুমিন।[20]

গ্রাম্য অশিক্ষিত লোকেরা মূর্খতার কারণে এবং দাজ্জালের পরিচয় সম্পর্কে তাদের জ্ঞান না থাকার কারণে দাজ্জালের অলৌকিক ক্ষমতা দেখে তারা ফিতনায় পড়বে। মহিলাদের ব্যাপারটিও অনুরূপ। তারা সহজেই যে কোন জিনিষ দেখে প্রভাবিত হয়ে থাকে।

দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার উপায়ঃ

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাজ্জালের ফিতনা হতে রেহাই পাওয়ার উপায়ও বলে দিয়েছেন। তিনি উম্মাতকে একটি সুস্পষ্ট দ্বীনের উপর রেখে গেছেন। সকল প্রকার কল্যাণের পথ প্রদর্শন করেছেন এবং সকল অকল্যাণের পথ হতে সতর্ক করেছেন। উম্মাতের উপরে যেহেতু দাজ্জালের ফিতনা সবচেয়ে বড় তাই তিনি দাজ্জালের ফিতনা থেকে কঠোরভাবে সাবধান করেছেন এবং দাজ্জালের লক্ষণগুলো সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন। যাতে মুমিন বান্দাদের জন্য এই প্রতারক, ধোকাবাজ ও মিথ্যুক দাজ্জালকে চিনতে কোনরূপ অসুবিধা না হয়।

ইমাম সাফারায়েনী (রঃ) বলেনঃ প্রতিটি বিজ্ঞ মুসলিমের উচিৎ তার ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী-পরিবার এবং সকল নারী-পুরুষদের জন্য দাজ্জালের হাদীছগুলো বর্ণনা করা। বিশেষ করে ফিতনায় পরিপূর্ণ আমাদের বর্তমান যামানায়। দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার উপায়গুলো নিম্নরূপঃ-

১) ইসলামকে সঠিকভাবে আঁকড়িয়ে ধরাঃ ইসলামকে সঠিকভাবে আঁকড়িয়ে ধরা এবং ঈমানের উপর অটল থাকাই দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়। যে মুমিন আল্লাহর নাম ও তাঁর অতুলনীয় সুমহান গুণাবলী সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করবে সে অতি সহজেই দাজ্জালকে চিনতে পারবে। সে দেখতে পাবে দাজ্জাল খায় পান করে। মু’মিনের আকীদা এই যে, আল্লাহ তা’আলা পানাহার ও অন্যান্য মানবীয় দোষ-গুণ থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। যে পানাহারের প্রতি মুখাপেক্ষী সে কখনও আল্লাহ বা রব্ব হতে পারেনা। দাজ্জাল হবে অন্ধ। আল্লাহ এরূপ দোষ-ত্রুটির অনেক উর্ধে। আল্লাহর গুণাবলী সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণার অধিকারী মুমিনগণের মনে প্রশ্ন জাগবে যে নিজের দোষ থেকে মুক্ত হতে পারেনা সে কিভাবে প্রভু হতে পারে? মু’মিনের আকীদা এই যে, আল্লাহকে দুনীয়ার জীবনে দেখা সম্ভব নয়। অথচ মিথ্যুক দাজ্জালকে মুমিন-কাফের সবাই দুনিয়াতে দেখতে পাবে।

২) দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করাঃ আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আমি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে নামাযের ভিতরে দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাইতে শুনেছি ।[21] তিনি নামাযের শেষ তাশাহুদে বলতেনঃ

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَمِنْ عَذَابِ النَّارِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ

“হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে কবরের আযাব, জাহান্নামের আযাব, জীবন-মরণের ফিতনা এবং মিথ্যুক দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই ।[22]

৩) দাজ্জাল থেকে দূরে থাকাঃ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাজ্জালের নিকট যেতে নিষেধ করেছেন। কারণ সে এমন একজন লোকের কাছে আসবে, যে নিজেকে ঈমানদার মনে করবে। দাজ্জালের কাজ-কর্ম দেখে সে বিভ্রান্তিতে পড়ে ঈমান হারা হয়ে যাবে। মুমিনের জন্য উত্তম হলো সম্ভব হলে সে সময়ে মদীনা অথবা মক্কায় বসবাস করার চেষ্টা করা। কারণ দাজ্জাল তথায় প্রবেশ করতে পারবেনা। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ যে ব্যক্তি দাজ্জাল বের হওয়ার কথা শুনবে সে যেন তার কাছে না যায়। আল্লাহর শপথ! এমন একজন লোক দাজ্জালের নিকটে যাবে যে নিজেকে ঈমানদার মনে করবে। অতঃপর সে দাজ্জালের সাথে প্রেরিত সন্দেহময় জিনিষগুলো ও তার কাজ-কর্ম দেখে বিভ্রান্তিতে পড়ে ঈমান হারা হয়ে তার অনুসারী হয়ে যাবে। হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই।

৪) সূরা কাহাফ পাঠ করাঃ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাজ্জালের ফিতনার সম্মুখিন হলে মুমিনদেরকে সূরা কাহাফ মুখস্থ করতে এবং তা পাঠ করতে আদেশ করেছেন। তিনি বলেনঃ “যে ব্যক্তি সূরা কাহাফের প্রথম দশটি আয়াত মুখস্থ করবে সে দাজ্জালের ফিতনা হতে হেফাযতে থাকবে ।[23]

সূরা কাহাফ পাঠের নির্দেশ সম্ভবতঃ এজন্য হতে পারে যে, এই সূরায় আল্লাহ তা’আলা বিস্ময়কর বড় বড় কয়েকটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। মুমিন ব্যক্তি এগুলো গভীরভাবে পাঠ করলে দাজ্জালের বিস্ময়কর ঘটনা দেখে কিছুতেই বিচলিত হবেনা। এতে সে হতাশ হয়ে বিভ্রান্তিতেও পড়বেনা।

দাজ্জালের শেষ পরিণতিঃ

সহীহ হাদীছের বিবরণ অনুযায়ী ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)এর হাতে দাজ্জাল নিহত হবে। বিস্তারিত বিবরণ এই যে, মক্কা-মদীনা ব্যতীত পৃথিবীর সকল দেশেই সে প্রবেশ করবে। তার অনুসারীর সংখ্যা হবে প্রচুর। সমগ্র দুনিয়ায় তার ফিতনা ছড়িয়ে পড়বে। সামান্য সংখ্যক মুমিনই তার ফিতনা থেকে রেহাই পাবে। ঠিক সে সময় দামেস্ক শহরের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত এক মসজিদের সাদা মিনারের উপর ঈসা (আঃ) আকাশ থেকে অবতরণ করবেন। মুসলমানগণ তার পার্শ্বে একত্রিত হবে। তাদেরকে সাথে নিয়ে তিনি দাজ্জালের দিকে রওনা দিবেন। দাজ্জাল সে সময় বায়তুল মাকদিসের দিকে অগ্রসর হতে থাকবে। অতঃপর ঈসা (আঃ) ফিলিস্তীনের লুদ্দ শহরের গেইটে দাজ্জালকে পাকড়াও করবেন। ঈসা (আঃ)কে দেখে সে পানিতে লবন গলার ন্যায় গলতে শুরু করবে। ঈসা (আঃ) তাকে লক্ষ্য করে বলবেনঃ “তোমাকে আমি একটি আঘাত করবো যা থেকে তুমি কখনও রেহাই পাবেনা।মুমিন ঈসা (আঃ) তাকে বর্শা দিয়ে আঘাত করবেন। অতঃপর মুসলমানেরা তাঁর নেতৃত্বে ইহুদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। মুসলমানদের হাতে দাজ্জালের বাহিনী ইহুদীর দল পরাজিত হবে। তারা কোথাও পালাবার স্থান পাবেনা। গাছের আড়ালে পালানোর চেষ্টা করলে গাছ বলবেঃ হে মুসলিম! আসো, আমার পিছনে একজন ইহুদী লকিয়ে আছে। আসো এবং তাকে হত্যা কর। পাথর বা দেয়ালের পিছনে পলায়ন করলে পাথর বা দেয়াল বলবেঃ হে মুসলিম! আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে, আসো! তাকে হত্যা কর। তবে গারকাদ নামক গাছ ইহুদীদেরকে গোপন করার চেষ্টা করবে। কেননা সেটি ইহুদীদের বৃক্ষ বলে পরিচিত।[24]

সহীহ মুসলিম শরীফে আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ

(لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يُقَاتِلَ الْمُسْلِمُونَ الْيَهُودَ فَيَقْتُلُهُمُ الْمُسْلِمُونَ حَتَّى يَخْتَبِئَ الْيَهُودِيُّ مِنْ وَرَاءِ الْحَجَرِ وَالشَّجَرِ فَيَقُولُ الْحَجَرُ أَوِ الشَّجَرُ يَا مُسْلِمُ يَا عَبْدَ اللَّهِ هَذَا يَهُودِيٌّ خَلْفِي فَتَعَالَ فَاقْتُلْهُ إِلَّا الْغَرْقَدَ فَإِنَّهُ مِنْ شَجَرِ الْيَهُودِ)

“ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত হবেনা যতক্ষণ না মুসলমানেরা ইহুদীদের সাথে যুদ্ধ করবে। অতঃপর মুসলমানগণ ইহুদীরকে হত্যা করবে। ইহুদীরা গাছ ও পাথরের আড়ালে পালাতে চেষ্টা করবে। কিন্তু কেউ তাদেরকে আশ্রয় দিবেনা। গাছ বা পাথর বলবেঃ হে মুসলমান! হে আল্লাহর বান্দা! আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে। আসো এবং তাকে হত্যা করো। তবে ‘গারকাদ’ নামক গাছের পিছনে লুকালে গারকাদ গাছ কোন কথা বলবেনা। এটি ইহুদীদের গাছ বলে পরিচিত ।[25]


[1] -তিরমিজী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[2] - বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[3] - মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[4] - বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[5] - বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[6] - মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[7] - সহীহ মুসলিম, শরহুন্ নববীর সাথে (১৮/৬১)।

[8] - - ফাতহুল বারী, (১৩/১০০)।

[9] - মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[10]- মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[11]- মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।|

[12] - সহীহুল জামে আস্-সাগীর, হাদীছ নং-৭৭৫২

[13]- মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[14]- বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[15] - মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[16] - তিরমিজী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান, সহীহুল জামে আস্-সাগীর, হাদীছ নং-৩৩৯৮। নিশাপুর, হিরাত, মরো, বালখ এবং পার্শ্ববর্তী কতিপয় অঞ্চলের নাম খোরাসান।

[17] - মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[18] - মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[19] - মুসনাদে ইমাম আহমাদ। আহমাদ শাকের সহীহ বলেছেন।

[20] - মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[21] - বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[22]- বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল জানায়েয।

[23] - মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[24] - নেহায়া, আল-ফিতান ওয়াল মালাহিম, (১/১২৮-১২৯)

[25] - সহীহ মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান

Source: islamicalo

তিন শ্রেণীর মানুষের উপর জান্নাত হারাম

| comments


সহিহ হাদিসের আলোকে একথা স্বীকৃত যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তিন শ্রেণীর মানুষের উপর জান্নাত হারাম অর্থ্যাত এই তিন শ্রেণীর মানুষ কখনোই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।

প্রথম শ্রেণী হলো- যারা কোনো প্রকার নেশাদার দ্রব্য পান বা গ্রহণ করে। মদ, বিড়ি, গাজা, ফেনসিডিল, হিরোইন, আফিম, জদ্দা- যে কোনো প্রকার নেশাই গ্রহণ করেন না কেন; খেলে দেহ অপবিত্র হয়ে যাবে আর এই অপবিত্র দেহ কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না। সুতরাং এইসব নেশাদ্রব্য গ্রহণ করা আজকেই ছাড়া উচিত, আজ এবং এখনই তাওবা করা উচিতি এই পাপ কাজ থেকে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমিন।

দ্বিতীয় শ্রেণী হলো- যে বা যারা পিতা-মাতার অবাদ্ধ, এই শ্রেণীভূক্ত মানুষরাও জান্নাতে যাবে না। জান্নাত তাদের উপর হারাম। মৃত্যু পর্যন্ত পিতা-মাতার দেখভাল করতেই হবে। পিতা-মাতাকে কোনো কারণেই ত্যাগ করা যাবেনা। পিতা-মাতার খেদমত করতেই হবে। রাসুল [সা.] পরিস্কারভাবে বলেছেন, পিতা-মাতার অবাদ্ধ সন্তান জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আল্লাহ আমাদের সবাইকে পিতা-মাতার অবাদ্ধ সন্তান না হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

তৃতীয় শ্রেণী হলো- দাইউস। ঐ দাইউস ব্যক্তি যে তার পরিবারে পর্দা প্রথা চালু রাখেনি। পরিবারের সদ্যসের মাঝে বেপর্দা ছিলো, বেহায়াপনা ছিলো কিন্তু সে তা বাধা প্রদান করেনি। পরিবারের কর্তা হিসেবে বেপর্দা-বেহায়াপনা বন্ধ না করার জন্য এই শাস্তি পাবে সে। আপনি যত বড় ইবাদতকারীই হোন না কেন, মক্কার মাটিতে যতবারই হজ পালনে ঘুরে আসুন না কেন, পাঞ্জাবী আপনার যতই সুন্নতি-শক্তিশালী এ সুন্দর হোক না কেন- পরিবারে যদি পর্দা না থাকে রাসুল [সা.] –এর হাদিস অনুযায়ী আপনি জাহান্নামি। জান্নাত এই শ্রেণীর মানুষের জন্য হারাম।

আত্মহত্যাকারীদের শাস্তি

| comments

রাসূলে করীম (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি পর্বত থেকে পড়ে আত্মহত্যা করবে সে জাহান্নামের আগুনে অবস্থান করবে। সার্বক্ষণিক সে তাতে (পর্বতে) উঠতে এবং নামতে থাকবে।

আর যে ব্যক্তি বিষপানে আত্মহত্যা করবে, তার বিষ তার হাতে থাকবে, যা সে জাহান্নামের আগুনে সারাক্ষণ পান করতে থাকবে। আর যে ব্যক্তি কোন লৌহনির্মিত অস্ত্র দ্বারা আত্মহত্যা করবে তার সেই লৌহনির্মিত বস্তুটি তার হাতে থাকবে, যা সে জাহান্নামের আগুনে নিজের পেটে ঢুকাতে থাকবে। (বুখারী)

দাম্ভিকের শাস্তি

রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ইরাশাদ করেন, অহঙ্কারীদেরকে পিপীলিকার সমান অবয়বে কিয়ামতের দিন উঠানো হবে কিন্তু তাদের আকৃতি হবে মানুষের। অতপর তিনি বলেন, চতুর্দিক থেকে লাঞ্ছনা-গঞ্জনা তাদেরকে ঘিরে ধরবে।

তিনি আরও বলেন, তাদেরকে জাহান্নামের কারাগারের দিকে এভাবে হাঁটিয়ে নেয়া হবে- এ কারাগারের নাম ‘বেলিস’। তাদের উপর আগুন প্রজ্জ্বলনকারী আগুন ছড়িয়ে দেয়া হবে এবং তাদেরকে ‘তীনাতুল খাবাল’ অর্থাৎ জাহান্নামীদের শরীর নিঃসৃত পানীয় পান করানো হবে। (মিশকাত)

তিরমিযী শরীফের একটি বর্ণনায় আছে, নিশ্চয়ই জাহান্নামে একটি বিস্তীর্ণ মাঠ রয়েছে যাকে হাবহাব বলা হয়। এতে সীমালঙ্ঘনকারীরা অবস্থান করবে।

ভাষা আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি-নিদর্শন

| comments

আন্তর্জাতিক ভাষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান এথনোলগ -এর তথ্যানুসারে পৃথিবীতে বর্তমানে মোট ভাষার সংখ্যা ৭,১০৫ টি। [১] তন্মধ্যে বাংলাদেশেই আছে ৪৪টি। [২] ভাষাভাষীদের সংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীতে বাংলা ভাষার অবস্থান ৭ম। পৃথিবীর ২০২ মিলিয়ন মানুষ এ ভাষায় কথা বলে, যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৩.০৫ শতাংশ। [৩] সব প্রাণীই একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে থাকে। তবে মানুষ ছাড়া অন্য কোনো প্রাণী শব্দ তৈরি করতে পারে না। পাখি গান গায়, নির্দিষ্ট কিছু ডাক দেয়। অন্যান্য পশু শারীরিক ইঙ্গিত ও কিছু ধ্বনির ব্যবহার করে, যা সীমিত। তবে মানুষই একমাত্র তার আনলিমিটেড ভাব প্রকাশে আনলিমিটেড শব্দ তৈরি করতে পারে। ভাষার অরিজিন বা উৎপত্তি কোথা থেকে, এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের কাছে কোনো সদুত্তর নেই। মূলত মানুষের উৎপত্তি নিয়ে যেমন তাদের কোনো সদুত্তর নেই, ঠিক তেমনি ভাষার উৎপত্তি নিয়েও তাদের কোনো উত্তর নেই।

বিবর্তনবাদীরা বলেন, মানুষও এক সময় পশুর মতো ইঙ্গিত ও ধ্বনি ব্যবহার করত, এরপর হঠাৎ করেই আবিষ্কার করলো যে সে বিভিন্ন শব্দ তৈরি করতে পারছে। এরপর তারপর এরপর... শেষকথা, নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না ভাষা কীভাবে আসল। [৪] অথচ আল-কুরআনে আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে জানাচ্ছেন, "আর তিনি আদমকে শেখালেন সমস্ত বস্তু-সামগ্রীর নাম। তারপর সে সমস্ত বস্তু-সামগ্রীকে ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন। অতঃপর বললেন, আমাকে তোমরা এগুলোর নাম বলো, যদি তোমাদের বক্তব্য সত্য হয়ে থাকে।" [সূরা বাকারা: ৩১] এ আয়াতে এটা সুস্পষ্ট যে, পৃথিবীর প্রথম মানুষ আদম (আ.) -কে সৃষ্টির পর আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সকল বস্তুর নাম শেখান। আমরা জানি, ভাষা হচ্ছে মনের ভাব প্রকাশ। আর ভাব প্রকাশের প্রাথমিক উপাদান হলো শব্দভাণ্ডার বা ভোকাবুলারি, যা আল্লাহ তায়ালা এই আয়াতে আদম (আ.) -কে শিখিয়েছেন বলে জানালেন। ফলে ভাষা যে আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি, তা আর বলার অপেক্ষা থাকে না।

বরং ভাষাকে আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিদর্শন বলেও উল্লেখ করেন। "তাঁর আরো এক নিদর্শন হচ্ছে, নভোমন্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি, এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানীদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।" [সূরা রুম: ২২] এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালাকে ভাষার বৈচিত্র্যকে তাঁর নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেন। কারণ হিসেবে মুফাসসিরগণ বলেন, হাত-পা-মুখমণ্ডলসহ সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একই হওয়া সত্ত্বেও নানা মানুষ নানা ভাষায় কথা বলছে, একে অপরের সাথে যোগাযোগ করছে, এটা তাঁর নিদর্শন বৈ কি! বরং মানুষের ভাষাকে গুরুত্ব দিয়ে আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক নবি-রাসূলকে তাঁদের স্বজাতীয় ভাষায় পাঠিয়েছেন। "আমি সব নবি-রাসূলকেই তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি, যাতে তাদেরকে পরিষ্কার বোঝাতে পারে।" [সূরা ইবরাহীম: ৪]কাজেই এটা স্পষ্ট যে, ভাষা আল্লাহ তায়ালার একটি বিশেষ নিয়ামত। আর নিয়ামতের সর্বোত্তম শুকরিয়া হলো নিয়ামতকে সর্বোত্তম উপায়ে ব্যবহার করা।

ভাষার অপব্যবহার এই নিয়ামতের অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ। কাজেই এর শাস্তিও কঠিন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, "(কল্পনা করো সেদিনের কথা) যেদিন তাদের জিহ্বা (ভাষা), তাদের হাত ও তাদের পা, তারা যা কিছু করত তা প্রকাশ করে দেবে"। [সূরা নূর: ২৪] ভাষার অপব্যবহারের চেয়ে বরং চুপ থাকা উত্তম। রাসূল স. বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ও ক্বিয়ামত দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন উত্তম কথা বলে নতুবা চুপ থাকে। [বুখারি ও মুসলিম]। একজন মুসলিম হিসেবে তাই ভাষার সম্মান হবে ভাষাকে উত্তম কথা ও কাজে ব্যবহার নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে। উত্তম কাজ হতে পারে ঈমানের কথা, নৈতিক ও চারিত্রিক উন্নয়নের কথা, সৎ কাজের আহ্বান, অশ্লীলতা ও নষ্টামি পরিত্যাগের আহ্বান, মানবোন্নয়নের আহ্বান ইত্যাদি।
রাসূল (স.) বলেন, "নিশ্চয়ই কিছু কিছু বক্তব্য জাদুর মতো"। [বুখারি: ৫৪৩৪] অর্থাৎ এসব বক্তব্য ও ভাষার ব্যবহার মানুষ মুগ্ধ হয়ে শুনে ও পাঠ করে। এগুলো মানুষের মাঝে অস্বাভাবিক প্রভাব ফেলে।আমাদের চেষ্টা করতে হবে ভাষার সে যাদুময়ী ব্যবহার আয়ত্ত করে মানুষকে সততার দিকে আহ্বান করা। তাহলেই ভাষা-নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সে তাওফীক দান করুন। আমিন।

সূত্রসমূহ:

[১] http://www.ethnologue.com/statistics
[২] http://www.ethnologue.com/statistics/country
[৩] http://en.wikipedia.org/wiki/List_of_languages_by_number_of_native_speakers
[৪] http://science.howstuffworks.com/life/evolution/language-evolve.htm

মুফতি ইউসুফ সুলতান
নায়েবে মুফতি, ইফতা বিভাগ, জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ

নবজাতকের প্রতি করণীয়

| comments

শিশুকে উত্তমভাবে লালন-পালন করা পিতামাতা উভয়েরই কর্তব্য। শিশু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে ভদ্রতা-শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়া, তার কাজ-কর্ম ও আচরণে ইসলামী রীতিনীতির প্রতিফলন ঘটানো এবং তাকে ইসলামী জীবনযাপনে অভ্যস্ত করা পিতামাতা, অভিভাবক, মুরব্বি, আত্মীয়স্বজন সবারই কর্তব্য, লিখেছেনমোঃ বাকী বিল্লাহ

আল্লাহ তায়ালা মানুষকে যেসব নেয়ামত দিয়েছেন তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সন্তান-সন্ততি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মাধ্যমে মানবজাতি দ্বারা পৃথিবীকে আবাদ রাখার জন্য আল্লাহ তায়ালা যে বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা দান করেছেন তা হচ্ছে বিবাহভিত্তিক পরিবার গঠন করে সন্তান জন্মদান করা। সন্তানকে উপযুক্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হিসেবে গড়ে তুলতে পিতামাতার ওপর গুরুদায়িত্ব রয়েছে। সন্তানের সুস্বাস্থ্য অনেকটাই মায়ের সুস্বাস্থ্যের ওপর নির্ভরশীল এবং অন্তঃসত্ত্বাকালে মায়ের চরিত্র ও মনমানসিকতা ভ্রুণের আত্মায় প্রভাব বিস্তার করে। এ কারণে এ সময় থেকেই অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ মঙ্গলের লক্ষ্যে পিতামাতা উভয়কেই সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।

মায়ের খাদ্য থেকেই ভ্রুণ ও নবজাতকের খাদ্য তৈরি হয়। এজন্য অন্তঃসত্ত্বা ও স্তন্যদানকালে তো বটেই, বরং সর্বাবস্থায়ই মায়ের জন্য হালাল ও সুষম খাদ্যের ব্যবস্থা করা পিতার কর্তব্য। অনাগত সন্তানের পরিপূর্ণ গঠন ও তার শারীরিক সুস্থতার জন্য অন্তঃসত্ত্বাকালে মায়ের স্বাস্থ্যের উপযুক্ত পরিচর্যা করা, পর্যাপ্ত খাদ্য ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করা, নিয়মিত চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করাও পিতার কর্তব্য। অন্তঃসত্ত্বা মায়ের কর্তব্য হচ্ছে ফরজ ইবাদতের সঙ্গে সাধ্যমতো নফল ইবাদত, কোরআন তেলাওয়াত, ইসলামী বইপত্র পাঠ ইত্যাদিতে মনোনিবেশ করা। পিতামাতা উভয়েরই উচিত আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে দোয়া করা, যেন সন্তানটি নেক সন্তান হয়। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর নবজাতককে উত্তমরূপে গোসল করিয়ে (তবে শীতকালে খেয়াল রাখতে হবে, যেন শিশুর গায়ে ঠান্ডা লেগে না যায়) পরিষ্কার কাপড় দিয়ে তার শরীর মুছে দেয়া কর্তব্য। তারপর তার ডান কানের কাছে আজান ও বাম কানের কাছে একামত দেয়া সুন্নত, তথা ইসলামী রীতি। হজরত আবু রাফি (রা.) বলেছেন ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে দেখেছি, ফাতেমা (রা.) ও আলী (রা.) এর পুত্র হাসান (রা.) কে প্রসব করার পর তার কানে নামাজের আজানের মতো আজান দিয়েছেন।’ (সুনানে তিরমিজি ও আবু দাউদ)। এ হাদিসে শুধু আজানের কথা উল্লেখ থাকলেও হজরত হোসাইন (রা.) বর্ণিত অপর এক হাদিসে ডান কানে আজান ও বাম কানে ইকামত দেয়ার কথা উল্লেখ আছে। এরপর নবজাতককে ‘তাহনিক’ করা সুন্নত। ‘তাহনিক’ হচ্ছে, (কোনো ভালো মানুষ কর্তৃক) খেজুর ভালো করে চিবিয়ে তার কিয়দংশ নবজাতকের মুখে দেয়া। খেজুরের অবর্তমানে কোনো মিষ্টান্ন দ্রব্য দ্বারাও তাহনিক করা যেতে পারে। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে নবজাতক শিশুদের আনা হতো; তিনি তাদের জন্য বরকতের দোয়া করতেন এবং তাদের তাহনিক করতেন।’ (সহিহ মুসলিম)। নবজাতকের জন্মের সপ্তম দিবসে তার নাম রাখা ও আকিকা করা পিতা বা অভিভাবকের ওপর কর্তব্য। নাম রাখার ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখা উচিত, নামটি যাতে ভালো হয়। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেয়ামত দিবসে তোমাদের নিজেদের ও তোমাদের পিতার নাম ধরে (যেমনÑ হে অমুকের পুত্র অমুক) ডাকা হবে; অতএব তোমরা তোমাদের নামগুলো সুন্দর করে রাখবে।’ (সুনান আবু দাউদ, মুসনাদে আহমদ)। রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেনÑ ‘কারও সন্তান জন্মগ্রহণ করলে সে যেন তার সুন্দর নাম রাখে এবং তাকে আদব-কায়দা শিখায়।’ (বায়হাকি)। আকিকা হচ্ছে, সন্তান জন্মের পরিপ্রেক্ষিতে ছাগল, ভেড়া বা এ জাতীয় পশু জবেহ করা এবং আত্মীয়স্বজনকে দাওয়াত দিয়ে তাদের এর গোশত খাওয়ানো। পুত্রসন্তানের জন্য দুটি এবং কন্যাসন্তানের জন্য একটি পশু দিয়ে আকিকা দিতে হয়। এর গোশতের হকদার কেবল শিশুর পিতামাতাসহ অন্য আত্মীয়স্বজন। আকিকা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ‘শিশুর (ভূমিষ্ঠ হওয়ার) সঙ্গে আকিকা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অতএব তোমরা তার পক্ষ থেকে রক্ত প্রবাহিত কর (পশু জবেহ কর) এবং তার থেকে কষ্ট দূরীভূত করো।’ (সহিহ বোখারি)। অন্য বর্ণনায় রয়েছে ‘শিশু আকিকার সঙ্গে দায়বদ্ধ। তার পক্ষ থেকে (জন্মের) সপ্তম দিবসে জবেহ করা হবে এবং ওই দিনই তার নাম রাখা হবে।’ (সুনানে তিরমিজি, নাসাঈ, আবু দাউদ)। আকিকার দিনেই শিশুর মাথা মু-ন করা কর্তব্য। মুন্ডিত চুলের ওজনের পরিমাণ রৌপ্যের মূল্য দান করে দেয়া মোস্তাহাব। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর প্রিয় দৌহিত্র হজরত হাসান (রা.) এর আকিকা নিজেই করে দিয়েছিলেন এবং ফাতিমা (রা.) কে তাঁর মাথা মু-ন করে এভাবে দান করার নির্দেশ দিয়েছিলেন মর্মে হাদিসে উল্লেখ আছে। নবজাতককে দুই বছর পর্যন্ত স্তন্যদান করা মাতার কর্তব্য। আর মাতাসহ শিশুর খোরপোষের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করা পিতার কর্তব্য। আল্লাহ বলেছেন ‘মায়েরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দু’বছর স্তন্যদান করবে, যে স্তন্যদানের পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করতে চায়, আর সন্তানের অধিকারী (পিতার) ওপর তাদের খোরপোষের দায়িত্ব রয়েছে, ন্যায়সঙ্গতভাবে।’ (আল কোরআন, সূরা আল বাকারা : ২৩৩)। শিশুকে উত্তমভাবে লালন-পালন করা পিতামাতা উভয়েরই কর্তব্য। শিশু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে ভদ্রতা-শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়া, তার কাজ-কর্ম ও আচরণে ইসলামী রীতিনীতির প্রতিফলন ঘটানো এবং তাকে ইসলামী জীবনযাপনে অভ্যস্ত করা পিতামাতা, অভিভাবক, মুরব্বি, আত্মীয়স্বজন সবারই কর্তব্য। তবে প্রধানত পিতামাতাকেই এ কাজে মুখ্য দায়িত্ব পালন করতে হয়। শিশু জন্মের সময় তার হৃদয়ে সত্য তথা ইসলামকে গ্রহণ করার যোগ্যতা নিয়েই জন্মগ্রহণ করে। পিতামাতার দায়িত্ব হচ্ছে, তার হৃদয়ে বিদ্যমান এ মৌলিক যোগ্যতাকে মূলধারায় প্রবাহিত করার জন্য তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেনÑ ‘প্রত্যেক শিশুই ফিতরাতের (স্বভাবধর্ম) ওপর জন্মগ্রহণ করে (ইসলামকে গ্রহণ করার যোগ্যতা নিয়ে ভূমিষ্ঠ হয়)। তারপর তার পিতামাতা (ইহুদি হলে) তাকে ইহুদি বা (খ্রিস্টান হলে) খ্রিস্টানে অথবা (অগ্নিপূজক হলে) অগ্নিপূজকে পরিণত করে।’ (বোখারী ও মুসলিম)। অতএব মুসলিম পিতামাতার ওপর সন্তান জন্মদানের চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সন্তানের চরিত্র গঠনে যতœবান হওয়া এবং তাকে ইসলামী জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে ভালো মানুষ ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।

আগুনের ব্যবহার ইসলামী দৃষ্টিকোণ

| comments

মাটি পানি, বাতাসের মতো পরিচিত একটি বস্তু হলো আগুন। আগুনকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন দুটি লক্ষ্যে সৃষ্টি করেছেন- ১. পৃথিবীর মানুষের উপকার সাধনের লক্ষ্যে ২. পরপারে মানুষকে শাস্তি প্রদানের লক্ষ্যে। 
পৃথিবীর আগুন আর পরকালের আগুনের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্যও রয়েছে। যেমন, পৃথিবীর আগুন অপেক্ষা পরকালের আগুন ৭০ গুণ বেশি শক্তিশালী এবং সে আগুনের রঙ ভয়ানক কালো। আল কুরআনের ১৪৫ জায়গায় আল্লাহ তায়ালা আগুনের কথা উল্লেখ করেন। এর অধিকাংশ বক্তব্যই পরপারের আগুনকে ঘিরে। সেই আগুনের উত্তপ্ততা স্পষ্টভাবে আঁচ করা পৃথিবীর মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। প্রচন্ড উত্তপ্ত ও ভয়ানক কালো রঙের আগুন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার অবাধ্য বান্দার জন্য প্রজ্বলিত রেখেছেন প্রধানত দুটি কারণে— আল্লাহ তায়ালা মানুষকে এ আগুনে নিক্ষেপ করবেন। 
প্রথমত, আল্লাহর একত্মবাদ অস্বীকার করা বা তার সঙ্গে অন্যকে অংশীদার স্থাপন করা। নবী-রাসূল, ফেরেশতা, পরকাল, আসমানি কিতাব, ভাগ্য, এসব বিষয় অস্বীকার করা। দ্বিতীয়ত, আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসী হয়েও তার বিধিনিষেধ অমান্য করা। পক্ষান্তরে পৃথিবীতে আগুনকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নেয়ামত হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, মানুষ তাদের প্রয়োজনে এ আগুন ব্যবহার করবে; কিন্তু মানুষের নীতি ও নৈতিকতার অবক্ষয় সীমা ছাড়িয়ে গেছে। শক্রতামূলকভাবে দোকানে বা ফ্যাক্টরীতে আগুন ধরিয়ে দেয়। তাতে অসহায় মানুষ পুড়ে মরে। মাঝে মাঝে এমন সংবাদও পাওয়া যায় যে, দোকানের মালিক ইন্স্যুরেন্স এর টাকার লোভে কারখানায় আগুন ধরিয়ে দেয়। শত শত নিরীহ মানুষকে এভাবে আগুনে জ্বালিয়ে দেয়ার পদ্ধতিটি জাহেলিয়া যুগ তথা সভ্যতা-পূর্ব যুগের মানুষের কাছেও অপরিচিত। যারা নিরীহ মানুষকে পৃথিবীর লাল আগুনে পোড়াচ্ছে, তাদের আল্লাহ তায়ালা পরকালে অবশ্যই সেই কালো আগুনে নিক্ষেপ করবেন। বর্তমানে এমন একটি সময় আমরা অতিক্রম করছি, যে সময়ে বিভিন্ন মুসলিম বিশ্বে দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন, জনসাধারণের জীবন ও সম্পদ পুড়ে হচ্ছে ছাই। বিশেষ করে আমাদের দেশে যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই আগুন, রাস্তায়, গাড়িতে, মার্কেট বা দোকানে, সব জায়গাতেই আগুন। আমরা এখন প্রতিদিন আগুনের সঙ্গে বাস করি। আমাদের অনেকেই হারিয়ে যাচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্রের বুলেটের আঘাতে। আবার অনেকে পুড়ে হচ্ছে ছাই। অনেকে অগ্নিকুন্ডের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে কাতরাচ্ছে। যারা মানুষের গাড়ি, বাড়ি ও দোকানপাটে আগুন লাগাচ্ছে এবং নিয়ে যাচ্ছে জীবন, তারা কি একটিবারও স্মরণ করে না যে, আল্লাহ তায়ালা কুরআনের ১৪৫ জায়গায় জাহান্নামের কালো আগুনের কথা উল্লেখ করেছেন? তাদের এসব অসামাজিক ও অমানবিক কাজের জন্য অবশ্যই সেই আগুনে নিক্ষিপ্ত হতে হবে। আগুন। যার আছে বহুগুণ তবে সেকি শুধু জ্বালাতেই জানে? নাকি এই আগুন ছাড়া আমাদের নিত্যদিনের প্রয়োজন আর উন্নয়নও সম্পন্ন হয় না। আমাদের যাপিত জীবনের অতি প্রয়োজনীয় কোন কাজ এমন কোন দিন যায় কি, যেদিন আগুনের ব্যবহার না হয়? অগ্নিক্ষুধা এতটাই একপাক্ষিক ঘটনা যে, জান-মালসহ কিছুই আর অবশিষ্ট রাখে না। প্রতি বছর আমাদের দেশে আকস্মিক অগ্নিকান্ডে কী পরিমাণ জান-মালের ক্ষতি হয় তার কোনো পরিসংখ্যান মূলক তথ্য হাতের কাছে না থাকলেও নাগরিক জীবনে এর ভয়াবহতা ও ভিকটিম হিসেবে আমাদের অসহায়তার অন্ত নেই। বাসা-বাড়ি, অফিস-আদালত থেকে শুরু করে মার্কেট-বহুতল ভবন, যানবাহন ইত্যাদি প্রায় সব ক্ষেত্রে অগ্নিনির্বাপক সিষ্টেমের অভাব বা অপ্রতুলতা এবং আমাদের ভয়ানক অজ্ঞতা-অসচেতনতার কারণে যে কোনো সময় যে কোনো স্থানে যে কেউ এই আগ্রাসী অগ্নিকান্ডের দুঃখজনক ট্র্যাজেডির অসহায় শিকার হয়ে যাওয়া বিচিত্র নয়। গ্রামে-গঞ্জে বা ছোটখাটো শহরগুলোতে হুট করে বাইরে খোলা জায়গায় বেরিয়ে পড়ে প্রাণ বাঁচানোর ছোট্ট সুযোগটুকু পাওয়া গেলেও খাঁচাবদ্ধ নাগরিক জীবনে সেটাও সুদূরপরাহত বলেই মনে হয়। তাই প্রতি মুহূর্তের সমূহ আশঙ্কা আর সম্ভাব্য বিপদ মাথায় নিয়েই আমাদের নাগরিক জীবন। আগুনের লেলিহান শিখার মহাগ্রাস থেকে রক্ষা পাচ্ছে না ভুক্তভোগীদের সহায়-সম্বল, ঘরে জমা রাখা বহু কষ্টের সঞ্চিত অর্থকড়ি। গার্মেন্টে চাকরি করে, শ্রম বিক্রি করে, নিত্যপণ্যের হকারি করে যারা কায়ক্লেশে বেঁচে থাকার স্বপ্ন গড়ছে সামান্য সময়ের মধ্যে তাদের স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। আগুন চেনে না ধনী-গরিব। আগুনের কাজ হচ্ছে সবকিছু পুড়িয়ে ছারখার করা; তা-ই করে সে। আগুন আবিষ্কারের মাধ্যমে মানব সভ্যতার নবযাত্রা শুরু। 
কিন্তু এর অসাবধান, অবহেলার ব্যবহার মানুষের জীবন, সম্পদ কেবল ধ্বংসই করেছে। মানুষের হাতে আগুনের অপব্যবহার কিভাবে মানুষেরই সর্বনাশ করেছে আমরা নিত্য তা দেখে আসছি গার্মেন্ট থেকে শুরু করে বস্তিতে। চলন্ত বাস থেকে শুরু করে দূরপাল্লার ট্রেনে। যুগে যুগে ধ্বংসকারীদেরও প্রধান পছন্দ ছিল আগুন। এর প্রমাণ আমরা পাই সেই মধ্যযুগ থেকে শুরু করে সামপ্রতিক সময়ের অনেক যুদ্ধবিগ্রহ পর্যন্ত। রণাঙ্গনে আগুনের গোলা নিক্ষেপের ইতিহাসও বেশ পুরনো। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে আগুনের ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে।

-মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

কোরআনে দেয়া জীবনব্যবস্থা মানলে ডায়াবেটিস হবে না

| comments (1)

বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে পানাহার করতে হয়। খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা মানব জাতির উদ্দেশে বলেছেন, তোমরা খাও এবং পান কর, তবে অপচয় কর না। অবশ্যই আল্লাহ অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না। (সূরা আরাফ : ৩১)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে কাসির এক হাদিস উদ্ধৃত করেছেন। হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত হজরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমার মনে যা চায় তা-ই খাওয়া অপচয় ও সীমা লঙ্ঘনের অন্তর্ভুক্তি। (তাফসিরে ইবনে কাসির : ২/৭২৭)

উপরোক্ত আয়াত ও হাদিস থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) পানাহারের ক্ষেত্রে পরিমিতিবোধ ও সংযমের নির্দেশ দিয়েছেন। মনের লোভ বা চোখের ক্ষুধাবশত অতিরিক্ত ভূরিভোজন, খাদ্যগ্রহণে সীমা লঙ্ঘন কিংবা ভোজনরসিক হওয়ার ব্যাপারটি ইসলাম নিরুৎসাহিত করেছে। পানাহারে সীমা লঙ্ঘনকারীকে আল্লাহ পছন্দ করেন না। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতেও অতিভোজন মানুষের জন্য বিশেষ ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত। ডায়াবেটিস, উচ্চারক্তচাপ, হৃদরোগসহ নানা ধরনের মারাত্মক রোগের জন্যও অপরিমিত খাবারকে দায়ী করা হয়। উন্নত দেশগুলোতে অতিরিক্ত মোটা বা মেদবহুল হওয়া আজ এক অভিশাপরূপে দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণ মুখরোচক খাবার নিয়ন্ত্রণহীনভাবে খেয়ে চলা, অধিক পরিমাণে ফাস্টফুড নেয়া ইত্যাদি কারণে পাশ্চাত্যের একটি প্রজন্ম নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। বিশ্বব্যাপী প্রধানত অধিক খাবার গ্রহণ, সঞ্চিত ক্যালোরি খরচ করার ব্যবস্থা না রেখেই আরও ক্যালোরি সঞ্চয় প্রভৃতি কারণেই কোটি কোটি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পূর্ব সতর্কতা ও পানাহারে শৃংখলা পালন করলে ডায়াবেটিস থেকে আত্মরক্ষা সম্ভব। বাংলাদেশের শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ ইসলামে বিশ্বাসী। অপরাপর সব নাগরিকই ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি আস্থাশীল। অতএব পবিত্র ইসলাম তথা কোরআন ও হাদিসের আলোকে পানাহারে সংযম-শৃংখলা ও পরিমিতিবোধ বিষয়ক কিছু দিকনির্দেশ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যসচেতন এবং ডায়াবেটিস প্রতিরোধে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।


বারডেম সভাকক্ষে রাজধানীর শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম ও ইসলামী চিন্তাবিদদের এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বর্ষীয়ান আলেমেদ্বীন শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.)। সভায় পানাহার সম্পর্কিত কোরআন-হাদিসের দিকনির্দেশনা সংবলিত কিছু তথ্য উঠে আসে। বক্তারা কিছু পরামর্শ ও প্রস্তাব পেশ করেন। এর ভেতর দেশের আলেম সমাজ, মসজিদের ইমাম, খতিব ও ধর্মীয় প্রচারকদের হাতে একটি বুকলেট তুলে দেয়ার প্রস্তাব রাখেন। পুস্তিকাটি পাঠ করে এর আলোকে আলেম ও ইমাম-খতিবরা জুমার খুতবায় এবং অন্য সময়ও আলোচনা করতে পারেন। সুবিধা মনে করলে কোনো ব্যক্তি এটি বা এর নির্বাচিত অংশ সমবেত মুসল্লিদের সামনে পাঠ করেও শোনাতে পারেন। কোরআন-সুন্নাহর আলোকে রচিত এই পুস্তিকার আলোকে দেশের সম্মানিত ওয়ায়েজরা যদি জনগণকে পানাহারের শৃংখলা সম্পর্কে সচেতন করেন তাহলেও জাতি ডায়াবেটিসসহ অপরাপর বহু রোগব্যাধি থেকে নিরাপদ থাকতে পারবে। পানাহারের ক্ষেত্রে ইসলামী আদর্শের অনুসরণে জাতির খাদ্য ও অর্থও সাশ্রয় হবে।


ইতিহাসে পাওয়া যায়, একবার হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে সিরিয়া থেকে একটি চিকিৎসক দল মদিনা সফরে আসে। খ্রিস্টধর্মাবলম্বী এ চিকিৎসকরা মুসলিম সমাজের নাগরিকদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিতে মনস্থ করলেন। কিন্তু ঘোষণা সত্ত্বেও আশানুরূপ রোগী চিকিৎসা নিতে এলেন না। কদিন পর চিকিৎসক দলের সদস্যরা বিস্মিত হয়ে মদিনায় এক রাখালকে প্রশ্ন করলেন, বিনা পয়সায় উন্নত চিকিৎসা সেবা পেয়েও তোমরা কেন আমাদের শিবিরে আসছ না। এখানে রাখাল তরুণটি যে উত্তর দিয়েছিল তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ সে বলেছিল, আমরা মদিনাবাসী সাধারণত কোনো রোগ-ব্যাধির শিকার হই না। কারণ আমরা আমাদের প্রিয়নবী (সা.)-এর শিক্ষার ওপর আমল করি, তার কথামতো আমরা তৃপ্ত হয়ে খাওয়ার সময়ও পেটকে তিন ভাগে ভাগ করি। এক ভাগ খাদ্য, এক ভাগ পানীয় আর এক ভাগ আরামে শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার জন্য খালি রাখি। তা ছাড়া ক্ষুধা লাগলেই শুধু আমরা খাবার গ্রহণ করি আর কিছু ক্ষুধা থাকা অবস্থায়ই খাওয়া শেষ করি।


পরবর্তীকালে খলিফা হারুনর রশীদের শাসনামলেও একটি ঘটনা ইতিহাসে পাওয়া যায়। সেখানে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক খলিফার কৌতূহলের জবাবে বলেছিলেন, সুস্থতার জন্য বড় পরামর্শ হচ্ছে ইসলামের খাদ্যগ্রহণ রীতি। সেখানে বলা হয়েছে, পূর্ণ ক্ষুধা না পেলে খাবার খেও না। আর কিছু ক্ষুধা থেকে যাওয়া অবস্থায়ই খাওয়া শেষ কর। খলিফা হারুনর রশীদ তখন এ পরামর্শটি গ্রহণের জন্য সবাইকে উৎসাহিত করেন।


কৃত্রিম খাদ্য সংকটের কথা বাদ দিলে বলতে হয় যে, পৃথিবীতে মানুষ যত না খেয়ে মরে তার চেয়ে বেশি মারা যায় অধিক খাওয়ার কারণেই। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্য গ্রহণের ফলেই সাধারণত মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কিংবা ডায়াবেটিস এবং ডায়াবেটিস সজ্ঞাত অন্যান্য রোগে মৃত্যুবরণ করতে দেখা যায়। অতিভোজনের ফলে বাড়তি মেদ ও অতিশয় মোটা হয়ে যাওয়ার দরুন দুর্বিষহ জীবনযাপনের নজিরও পৃথিবীতে কম নয়। এক্ষেত্রে পবিত্র কোরআনের এই আয়াতটি জানা জরুরি। মহান আল্লাহ বলেন, আমার দেয়া পবিত্র সামগ্রী থেকে আহার কর, তবে এতে সীমা লঙ্ঘন কর না। তাহলে তোমাদের ওপর আমার অসন্তোষ নেমে আসবে। আর আমার অসন্তোষ বা ক্রোধ যার ওপর আপতিত হয় সে বরবাদ হয়ে যায়। (সূরা তোয়াহা : ৮১)। বেশি খাওয়ার ফলে যত রোগ হয় সেসবকেও আমরা মহান আল্লাহর গজব বা ক্রোধ তথা প্রকৃতির প্রতিশোধ বলে আখ্যায়িত করতে পারি।


হজরত মিকদাদ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি নবী করিম (সা.)-কে বলতে শুনেছি, মানুষ যত পাত্র তার শরীরে ধারণ করে এর ভেতর সবচেয়ে মন্দ পাত্র হচ্ছে তার পেট। আদম সন্তানের জন্য তো কয়েকটি লোকমাই যথেষ্ট, যা তার শিরদাঁড়া সোজা রাখতে পারে। আর যদি তৃপ্ত হয়েই খেতে হয় তাহলে পেটের এক ভাগ খাদ্য, এক ভাগ পানীয় আর এক ভাগ শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার জন্য রাখবে। (তিরমিজি ২/৬৩)


বিজ্ঞানীরা বলেন, প্রয়োজনীয় খাদ্যটুকু ছাড়া বাকি খাবার মানুষের কোনো কাজে আসে না। অব্যাহতভাবে পেট ভরা থাকলে হজমশক্তিসহ মানবদেহের অনেক ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। মাঝে মাঝে রোজা রাখলে মানুষ সবদিক দিয়ে সুস্থ থাকে। নবী করিম (সা.) বলেছেন, তোমরা রোজা রাখ সুস্থ থাকবে। (আত তারগিব ওযাত তাহরিব ২/৮৩)। ইসলামী জীবনে প্রতি বছর এক মাস ফরজ রোজা ছাড়াও মাসিক ও সাময়িক নফল রোজার প্রশংসনীয় রীতি চালু রয়েছে।


কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, যারা কাফের তারা ভোগবিলাসে মত্ত থাকে এবং চতুষ্পদ জন্তুর মতো যত পারে আহার করে। দোজখের আগুনই তাদের আবাসস্থল। (সূরা মুহাম্মাদ : ১২)


উন্নত ও আদর্শ জীবনবোধের ফলে মুমিনদের পানাহার তাদের পরকালীন বিশ্বাসের আলোকেই সংযত, নিয়ন্ত্রিত ও সুপরিমিত হওয়া স্বাভাবিক, যা কাফেরদের মাঝে পাওয়া খুবই দুষ্কর।


বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সব অঞ্চলের মানুষ যদি ইসলাম নির্দেশিত খাদ্যরীতি গ্রহণ করে অল্পে তুষ্ট থাকে এবং জীবন চলার পরিমাণ রিজিকে সন্তুষ্ট হয়ে যায় তাহলে সীমিত সঞ্চয়েই বরকত হবে এবং সীমিত উৎপাদন এই বিশ্ববাসীর ক্ষুধা নিবৃত্তি সম্ভব হবে। মুসলিমরা যদি পরকালে পাওয়ার আশায় নিজের অংশ থেকে অপর ভাইকে খাবার দেন তাহলে সমাজে অভাবের তাড়নায় কৃত অন্যায়-অপকর্মও কমে আসবে। ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগসহ নানা ধরনের বড় রোগ থেকে বাঁচার উপায় হিসেবে পানাহার ও জীবনযাপনে শৃংখলা আনা একান্ত জরুরি। আসুন কোরআনের আলোকে খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে আমরা রোগ প্রতিরোধ করি। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমিন।
- ফাতাহ মামুন

রসূল (স.)-এর প্রত্যেক উম্মতই বেহেশেত যাবে

| comments

পৃথিবীতে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (স.) এর সুপারিশ ছাড়া পরকালীন জীবনের কঠিন দুঃসময়ে মুক্তির কোনো রাস্তা নেই। আর যারা তাঁর উম্মত নন তার জন্য তিনি কোনোক্রমে সুপারিশ করবেন না। রসূল (স.) বলেন, "মান তরাকা সুন্নাতি ফালাইসা মিন্না" যে ব্যক্তি আমার কোনো সুন্নতকে অস্বীকার করবে সে আমার উম্মত নয়। যারা রসূলের (স.) উন্মত হতে চায় তাদের প্রত্যেকের উচিত হলো তাঁর প্রত্যেকটি সুন্নতের অনুসরণ করা। রসূল (স.) কে আল্লাহ তায়ালা সমগ্র জগত্বাসীর জন্য আদর্শ করেছেন। কুরআনের ঘোষণা- "লাক্বদ কানা লাকুম ফি রসূলিল্লাহি উসওয়াতুন হাসানা" অর্থাত্ তোমাদের জন্য আমার নবী মুহাম্মদ (স.) এর জীবনে রয়েছে উত্তম আদর্শ। অন্যস্থানে রসূল (স.) বলেছেন- "কুল্লু উম্মাতুই ইয়াদখুলুনাল জান্নাহ, ইল্লা মান আবা, কিলা মান আবা ইয়া রসূলুল্লাহ (স.)? মান আতা আনি ফাদাখালাল জান্নাহ, অমান আছানি ফাক্বদ আবা" অর্থাত্ আমার প্রত্যেক উম্মত বেহেশতে যাবে, কেবলমাত্র আবা (অসম্মত) ছাড়া। সাহাবিরা বললেন, হে রসূল (স.) কে সেই আবা (অসম্মত)? যে আমার অনুসরণ করবে, সে বেহেশতে যাবে, আর যে ব্যক্তি আমার সুন্নতের অবজ্ঞা করবে, সেই আবা (অসম্মত)। কুরআনে বলা হয়েছে- মা আতাকুমুর রসূলু ফাখুজুহু অমা নাহাকুম আনহু ফানতাহু অর্থাত্ আমার নবী তোমাদের যা কিছু দিয়েছেন তোমরা সেগুলো আঁকড়ে ধর আর যেগুলো নিষেধ করেছেন তা পরিহার কর। অন্য হাদীসে বলা হয়েছে- 'মান তামাসসাখা সুন্নাতি ইন্দা ফাসাদান উম্মতি ফালাহু আজরুহু মিয়াতাশ শহীদ' অর্থাত্ যদি কোনো ব্যক্তি রসূল (স.) এর কোনো হারিয়ে যাওয়া সুন্নতকে উজ্জীবিত করে তাহলে তার নামে একশত শহীদের দরজা (সম্মান) লিখে দেয়া হবে। সুতরাং রসূল (স.) এর অনুসরণের কোনো বিকল্প নাই। আজ পৃথিবীর মানুষ বিভিন্ন মনীষী, নেতা, পীর-বুজুর্গদের অনুসরণ করে এবং তাদের ওছিলায় মুক্তির রাস্তা তালাশ করে। অথচ কুরআন ও হাদীস রোমন্থন করলে কোথাও এমন কোনো সহীহ বর্ণনা নাই যে, রসূল (স.) এর অনুসরণ ও তাঁর সুপারিশ ছাড়া মুক্তির কোনো রাস্তা রয়েছে। যদি এই পৃথিবীতে একজন ব্যক্তিকে অনুসরণ করা যায়- তিনি হলেন হযরত মুহাম্মদ (স.)। যার জীবনের এমন কোনো দিক ও বিভাগ নাই যেখানে লাল কালির দাগ দেয়া যায়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা স্বয়ং তাঁর চরিত্রের সার্টিফিকেট প্রদান করেছেন- "ইন্নাকা লাআলা খুলুকীন আজিম" হে রসূল (স.) নিশ্চয় আপনি সবচেয়ে উন্নত চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত। রসূলের (স.) চরিত্রের সার্টিফিকেটের শেষে আজিম শব্দটি ব্যবহূত হয়েছে যার অর্থ সুমহান। আরবীতে চওড়া বুঝাতে হারিক শব্দ ব্যবহূত হয়। গভীরতা বুঝাতে আমীক শব্দ ব্যবহূত হয়। আর কত গভীর যা মাপার কোনো ফিতা নাই। কত প্রশস্ত যা মাপার কোনো যন্ত্র নাই আরবীতে সেটাকে বলা হয় আজীম অর্থাত্ রসূলের চরিত্র এমন যা মাপার কোনো যন্ত্র পৃথিবীতে নাই। এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কিছুদিন পর একদল কৌতূহলী সাহাবি উম্মুল মৌমেনীন আয়শা সিদ্দিকা (রা.) এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আয়শা (রা.)! রসূল (স.) এর চরিত্র কেমন? আয়াশা (রা.) পাল্টা প্রশ্ন করে বললেন, তোমরা কি কুরআন পড় না? সাহাবিরা বললেন, হ্যাঁ আমরা কুরআন পড়েছি। আয়শা (রা.) বললেন, গোটা কুরআন শরীফই হলো- রসূল (স.) এর চরিত্র। আর রসূল (স.) বলেন, "বুইসতু লিউতিম্মা মাকারিমাল আখলাফ" উন্নত চরিত্রকে মানুষের মাঝে পৌঁছে দেয়ার জন্যই আমি প্রেরিত হয়েছি। আর তাছাড়া এই পৃথিবীতে অন্যান্য ধর্মের যারা বিখ্যাত ধর্মবেত্তা তারাও রসূল (স.) এর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন বিশেষ করে মাইকেল এইচ হার্ট দ্যা হানড্রেড গ্রন্থে জগত্ বিখ্যাত একশত মনীষীর মধ্যে সবার ওপর যাকে স্থান দিয়েছেন তিনি হলেন- হযরত মুহাম্মদ (স.)।

পরকালে মুক্তি পেতে হলে অবশ্যই রসূলের (স.) উম্মত হতে হবে। কারণ সেইদিন হাশরের ময়দানে অগণতি মানুষের মধ্যে তিনি কেবল তাঁর উম্মতদের বাছাই করে হাউজে কাওছারের পানি পান করাবেন। তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে বেহেশতে যাবেন। রসূল (স.) যে সময় তার সকল উম্মতদের সঙ্গে নিয়ে বেহেশতে যাবেন তখন একদল মানুষ রসূল (স.) যাদের উম্মত হিসেবে বাছাই করেননি তারা রসূল (স.) এর সামনে বসে বলবে- আমরাও তো আপনার উম্মত, আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। রসূল (স.) "রহমাতাল্লিল আলামীন" দয়ার নবী তিনি তাদের জন্যও সুপারিশ করতে উদ্যত হবেন- তখন আল্লাহ তায়ালা গায়েব থেকে আওয়াজ দেবেন- হে নবী (স.) ওরা আপনার উম্মত নয়। আপনি জানেন না, তারা কিভাবে আপনার আদর্শের বিরোধী পথে চলেছে- রসূল (স.) বলবেন- ছোহকান ছোহকান লিমান গায়রা মিমবাআদি- সরে যাও; দূর হয়ে যাও যারা আমার আদর্শ বিরোধী কাজ করেছো। সেই সময় ঐ লোকদের এমন অসহায় অবস্থা হবে যার চেয়ে অসহায় অবস্থা আর হতে পারে না। কারণ যে সময় সব মানুষ, নবী-রসূল ইয়া নাফছি, ইয়া নাফছি— আমার কি হবে? আমার কি হবে? বলবে সেই সময় রসূল (স.) বলবেন ইয়া উন্মাতি, ইয়া উম্মাতি আমার উম্মতের কি হবে, আমার উম্মতের কি হবে? যিনিই একমাত্র ভরশাস্থল তিনি যদি দূর দূর করে সেদিন বিদায় করে দেন তাহলে এর চেয়ে কষ্টের; যন্ত্রণার আর কি হতে পারে? রসূল (স.) তাদের রেখে তাঁর উম্মদদের নিয়ে বেহেশতে চলে যাবেন। আর আল্লাহ ফেরেশতাদের হুকুম করবেন- ওদের কপালের সামনের অংশের চুল ও পা ধরে জাহান্নামে নিক্ষেপ কর এবং সাথে সাথে তাইই করা হবে। যারা রসূল (স.) এর হাদীসের সাথে উদাসীনতা প্রদর্শন করবে, তার সুন্নতের অবজ্ঞা করবে তাদের পরিণতি হবে এমনি ভয়াবহ। আমরা আর একটি বিষয় স্মরণ করতে পারি-যখন কোনো মানুষ মৃত্যুবরণ করে তখন তার জানাজা নামাজ শেষ করে দাফন করার সময় বলা হচ্ছে বিসমিল্লাহে আলা মিল্লাতে রসুলিল্লাহ- আল্লাহর নামে ও মুহাম্মদ (স.) এর মিল্লাতের ওপর তোমাকে সমাহিত করে গেলাম। গভীরভাবে চিন্তা করুন, যেই মানুষটি কখনো রসূলের মিল্লাতের মধ্যে চলাফেরা করেনি তার জীবদ্দশায়, সেই মানুষকে মৃত্যুর পর রসূলের মিল্লাতের ওপর সোপর্দ করে রাখা হচ্ছে। তাহলে রসূল (স.) কেনো এই মরা লাশটিকে তাঁর মিল্লাতে নিতে যাবেন, যে বেঁচে থাকতে তাঁর মিল্লাতের বিরুদ্ধে চলেছে?

রসূলের খাঁটি উম্মত হওয়া ছাড়া প্রকৃত অর্থেই মুক্তির কোনো উপায় নাই। আর তার প্রকৃত উম্মত হওয়ার জন্য অবশ্যই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ওয়াক্তমত মসজিদে গিয়ে জামায়াতবদ্ধভাবে পড়তে হবে-এটা আল্লাহর নির্দেশ ও রসূলের শ্রেষ্ঠ আদর্শ। কিন্তু একশ্রেণির মানুষ আজকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে অবজ্ঞা-অবহেলা করে কখনো ঠিকমত পড়ে না অথবা নামাজের বিষয়টিকে অহেতুক কাজ হিসেবে মন্তব্য করেন। রোজাকে উপোস থাকা সার বলে অভিমত দেন। হজ্বকে নিয়ে কটাক্ষ করেন, কুরবানিকে নিয়ে আজেবাজে কথা বলেন, ঐসব মানুষের নাম যতই মুসলিম নাম হোক, পোশাক-আশাকে ইসলামী গাম্ভীর্য থাক- তারা স্পষ্টই মুনাফেক। কিন্তু কারো নাম করে মুনাফেক বলা যাবে না। কেননা রসূল (স.) বলেছেন, তোমরা কাউকে কাফের, ফাসেক ও মুনাফেক বলে সম্মোধন করো না। রসূল (স.) এর জামানায় এমন অনেক লোক ছিল যারা মুসলমান নামধারী ছিল। মুসলমানদের সাথে মিশলে তাদের পক্ষে কথা বলতো আবার কাফেরদের সাথে মিশলে তাদের পক্ষে কথা বলতো। এরা ইসলামের জন্য সাধারণ কাফের, মুশরিক, ইহুদী হতে মারাত্মক ক্ষতিকর। মাদানী জীবনের একদিন রসূল (স.) সাহাবীদের বলেছিলেন- কাফের-মুশরিকরা ইসলামের যে ক্ষতি করে নাই তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে মুনাফেকরা। কারণ কাফের-মুশরিকদের অবস্থান স্পষ্ট কিন্তু মুনাফেকদের অবস্থান স্পষ্ট নয়। তাদের মনে রয়েছে শয়তানী। রসূলের জামানায় এমন মুনাফেক যারা ছিল তাদের সরদার ছিলো আব্দল্লাহ ইবনে ওবায়। ওহুদের যুদ্ধে রসূলের (স.) মারাত্মক জখম হওয়া ও সত্তরজন সাহাবী শহীদ হওয়ার মূলে এই মুনাফেকদের ষড়যন্ত্র ছিল। রসূল (স.) এই যুদ্ধে ১ হাজার সৈন্য নিয়ে ৩ হাজার সৈন্যের সাথে মোকাবিলা করতে আসছিলেন। কিন্তু পথিমধ্যে ৩ শত সৈন্য নিয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে ওবায় কাফেরদের সঙ্গে মিশে যায়। যার কারণে ওহুদের যুদ্ধে ভয়াবহ প্রতিকূল অবস্থার শিকার হতে হয় মুসলমান বাহিনীকে। তারপর যখন ঐ মুনাফেক সরদার আব্দুল্লাহ ইবনে ওবায় মৃত্যুবরণ করে তখন খবর পেয়ে রসূল (স.) সেখানে যান এবং যখন তার জানাজা নামাজ পড়তে সামনে অগ্রসর হচ্ছিলেন হযরত ওমর (রা.) তখন বাধা দেয়ার চেষ্টা করছিলেন। অবশেষে যখন জানাজা নামাজ শেষ হয় তখন আল্লাহর নির্দেশ নিয়ে জিব্রাইল (আ.) এলেন এবং বললেন, হে রসূল (স.), আপনি যদি ৭০ বারও এই মুনাফেক এর জানাজা নামাজ পড়ান তবুও আল্লাহ এটা কবুল করবেন না। অথচ রসূল (স.) এর কোনো দোয়াই আল্লাহ ফেরত দেন নাই। সুতরাং যারা— "উদখুলু ফিস সিলমে কাআফফা" ইসলামে যারা যথার্থভাবে প্রবেশ করেনি এবং রসূল (স.) পূর্ণাঙ্গ আদর্শ মেনে জীবন পরিচালনা করেনি ঐসব মুনাফেক শ্রেণীর লোকদের যতবারই জানাজা নামাজ পড়ানো হোক না কেন আল্লাহ তা কবুল করবেন না। আর তাছাড়া এ বিষয়টিও আমাদের বুঝতে হবে, ইসলাম কোনো অনুষ্ঠানসর্বস্ব ধর্ম নয় যে, বিশেষ বিশেষ দিবসে ইবাদত-বন্দেগী করলেই আল্লাহকে পাওয়া যাবে! নবীর খাঁটি উম্মত হওয়া যাবে! পরিপক্ব ধার্মিক হওয়া যাবে! বরং দুনিয়া ও আখেরাতের জীবন যদি সুন্দর, সাবলীল ও পরিচ্ছন্ন করতে হয়, তাহলে অবশ্যই কুরআন ও সুন্নাহেক বুকে জড়িয়ে ধরতে হবে। পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে হবে। বিদায় হজ্বের ভাষণে রসূল (স.) তাই বললেন, "তারাকতু ফিকুম আমরাইন অলান তাদিল্লু মা তামাস সাখতুম বিহিমা কিতাবাল্লাহে ওয়া সুন্নাতি" অর্থাত্ আমি তোমাদের মাঝে দু'টি জিনিস রেখে যাচ্ছি, একটি হলো আল্লাহর কেতাব (আল কুরআনুল কারীম) আরেকটি হলো আমার সুন্নাত বা আদর্শ বা হাদীস। আর আল্লাহকে পেতে হলে রসূলকে (স.) ভালোবাসতে হবে আর তাহলেই আল্লাহ তাদের ভালোবাসবেন ও তাদের জীবনের পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেবেন এবং তাদেরকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার নিচ দিয়ে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হবে। সুতরাং আমরা চাই ইসলাম ধর্মের মধ্যে জন্মগ্রহণকারী ও জীবন যাপনকারী প্রত্যেক ব্যক্তি যেন কুরআন-হাদীস অনুযায়ী জীবন যাপন করে প্রকৃত মুসলমান ও রসূলের খাটি উম্মত হয়ে পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় হতে পারেন। আল্লাহ সেই তাওফীক দান করুন, আমীন।

ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যভিচার সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ ও হারাম

| comments

শুধু ইসলাম নয়, কোনো ধর্মেই ব্যভিচারের শিক্ষা নেই। ইসলাম ব্যভিচারকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ এবং হারাম আখ্যায়িত করেছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা প্রকাশ্য অশ্লীলতা এবং অত্যন্ত মন্দ পথ' (সুরা বনি ইসরাইল : ৩২)। আর বাইবেলে বলা হয়েছে, 'তোমরা ব্যভিচার করবে না।' কয়েক দিন ধরে দেশ-বিদেশের সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সবচয়ে বেশি যে সংবাদ আলোচনা হয়েছে, তা মনে হয় নারীঘটিত বিষয় নিয়ে। গত মাসে দিল্লিতে চলন্ত বাসে ছয় নরপশুর গণধর্ষণের কবলে পড়ে মেডিক্যাল ছাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা শুধু ভারতকেই নয়, বরং কাঁপিয়ে দিয়েছে গোটা উপমহাদেশ ও বিশ্ববাসীকে। জাতিসংঘের মহাসচিব স্বয়ং গভীর শোক প্রকাশ করেছেন জ্যোতির মৃত্যুতে। তাঁর পরিবারসহ গোটা বিশ্বের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি। ভারতে এর জন্য প্রচলিত আইন সংশোধনেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইনে দণ্ডিত ধর্ষকের ফাঁসি অথবা রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগে খোজা করে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। দিল্লির এই ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই বাংলাদেশের টাঙ্গাইলে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে নবম শ্রেণীর এক ছাত্রী। দরিদ্র পরিবারের মেয়েটিকে তার এক বান্ধবী প্রলোভিত করে নিয়ে যায় মধুপুরের এক নির্জন বাড়িতে। সেখানে আগে থেকেই ওত পেতে থাকা কয়েকজন পালাক্রমে ধর্ষণ করে মেয়েটিকে। তারা এটুকু করেই ক্ষান্ত হয়নি। ভিডিও ক্যামেরায় ধর্ষণের চিত্রও ধারণ করে। কয়েক দিন ধরে চলে এ নারকীয় তাণ্ডব। পরে অজ্ঞান অবস্থায় মেয়েটিকে ফেলে রেখে যায় রেললাইনের ওপর। মেয়েটি এখন গুরুতর অসুস্থ- শারীরিক ও মানসিক উভয় অর্থে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে অসহায় মেয়েটি চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকের ভাষ্যমতে, মেয়েটি বর্তমানে মানসিকভাবে হতবিহ্বল ও অসুস্থ। তার ধর্ষিত হওয়ার ছবি ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোনে ছেড়ে দেওয়ার হুমকিতে সে দিশেহারা ও আতঙ্কিত। দেখা যায়, আমাদের দেশে ২০১২ সালে ৮০০ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। সম্প্রতি কয়েক দিনের ব্যবধানে গ্যাংরেপসহ এমন কিছু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যা মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছে। সবশেষ রাজধানীর মিরপুরস্থ শাহআলীতে ১০ বছরের শিশু চাঁদনী গ্যাংরেপের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। আড়াই বছরের শিশু থেকে বৃদ্ধা পর্যন্ত ধর্ষণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আদিবাসী নারীদের ওপর নির্যাতন। ভারতসহ বিশ্বব্যাপী তোলপাড় করা চলন্ত বাসে ধর্ষণ-ঘটনার চার দিন পরই ২১ ডিসেম্বর রাঙামাটির কাউখালীতে অষ্টম শ্রেণীর এক আদিবাসী ছাত্রীকে ধর্ষণ শেষে খুন করা হয়। ২০১১ সালের ১৫ জুন লংগদুর ইয়ারেংছড়ি গ্রামের সপ্তম শ্রেণীর আদিবাসী স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এ ধরনের ধর্ষণের ঘটনা প্রচুর রয়েছে। একের পর এক ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। যারা এ ধরনের অপকর্ম করে, তাদের মনে হয় পশু বলাটাও ভুল হবে। কারণ পশুরাও এমন অপকর্ম করে না। ধর্ষণ নামের এই সামাজিক ব্যাধি নির্মূল করতে ধর্ষকের দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে অন্য অপরাধীরাও সচেতন হয়ে যায়। পবিত্র কোরআন এবং হজরত রাসুল করিম (সা.) আমাদের এ শিক্ষাই দেয়, তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যাবে না। আমাদের এমন সব কর্ম থেকে দূরে থাকতে হবে, যা নিজেদের মনে কুপ্রভাবের সৃষ্টি করে। হজরত রাসুল করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, 'যে ব্যক্তি তার দুই চোঁয়ালের হাড্ডির মাঝখান অর্থাৎ জবানের এবং দুই পায়ের মাঝখানের অর্থাৎ লজ্জাস্থানের জামানত আমাকে দেবে, আমি তার জান্নাতের জামিন' (বুখারি)। হজরত নবী করিম (সা.) আরো বলেছেন, 'অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে উপার্জন করা ব্যভিচার। নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি দৃষ্টিপাত করা চোখের ব্যভিচার। যা শ্রবণ করা নিষিদ্ধ, তা শোনা কর্ণের ব্যভিচার, যে কথা বলা নিষেধ, তা বলা জিহ্বার ব্যভিচার। নিষিদ্ধ জিনিসে হাত দেওয়া হাতের ব্যভিচার, নিষিদ্ধ স্থানে যাওয়া পায়ের ব্যভিচার' (বুখারি ও মুসলিম)। নিজ স্ত্রী ছাড়া কারো সঙ্গে কোনোরূপ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করাকে ইসলাম কঠিনভাবে নিষিদ্ধ করেছে এবং এটিকে মহাপাপ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাই পবিত্র কোরআনের সুরা নিসায় যুদ্ধবন্দিনীকেও বিবাহ না করা পর্যন্ত তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের অনুমতি তো দেয়ইনি, বরং কোরআনে স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে যে এই বন্দিনীদের স্ত্রী হিসেবে রাখার আগে স্বাধীন নারীদের ন্যায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করতে হবে। এই যে একের পর এক নারী নির্যাতিত হচ্ছে এর কি শেষ হবে না? যারা এসব অপকর্মে লিপ্ত তারাও তো কোনো না কোনো মা-বাবারই সন্তান। প্রত্যেকেই যদি তার পরিবারের প্রতি সব সময় খেয়াল রাখতেন, তাহলে হয়তো আপনার-আমার সন্তানটি এ ধরনের জঘন্য কাজটি করতে পারত না। আমাদের সন্তানরা কোথায় যায়, কী করে, কার সঙ্গে সময় কাটায়, তা নিয়ে কি আমরা আদৌ চিন্তিত? আমরা যদি আমাদের সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই উত্তমভাবে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করতাম, তাহলে কি আজ এ পর্যায়ে যেত? আমরা আমাদের সন্তানদের উত্তম তরবিয়তের প্রতি কোনো দৃষ্টি দেব না আর তাদের কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করব, তা তো হতে পারে না। এ জন্যই ইসলাম সন্তানের জন্মের পরই তাকে উত্তম শিক্ষায় গড়ে তোলার আদেশ প্রদান করেছে। সন্তান যেন উত্তম গুণের অধিকারী হয়, সে জন্য মা-বাবাকে সব সময় দোয়াও করতে হয়। যেভাবে পবিত্র কোরআনে সন্তানদের জন্য দোয়ার উল্লেখ রয়েছে, 'হে আমাদের প্রভু-প্রতিপালক! তুমি আমাদের জীবনসঙ্গিনী ও সন্তানসন্ততিকে আমাদের জন্য চোখ জুড়ানো করে দাও এবং আমাদের প্রত্যেককে মুত্তাকিদের ইমাম বানাও' (সুরা আল ফুরকান : ৭৪)। তাই সর্বদা আমাদের সন্তানদের জন্য দোয়া করতে হবে, তবে তার আগে আমাদের পবিত্র হতে হবে। আমি নিজেই যদি খারাপ কাজে লিপ্ত থাকি আর সন্তানকে ভালো কাজের উপদেশ দিই, তাহলে তা কোনো কাজে লাগবে না। হজরত নবী করিম (সা.) বলেছেন, 'কোনো বাবা তাঁর সন্তানকে উত্তম শিষ্টাচার অপেক্ষা অধিক শ্রেয় কোনো বস্তু দান করতে পারে না' (তিরমিজি)। অন্য এক জায়গায় মহানবী (সা.) বলেছেন, 'প্রতিটি মানবসন্তান ইসলামের ওপর জন্মগ্রহণ করে, কিন্তু পরে তার মা-বাবা তাকে ইহুদি অথবা নাসারায় পরিণত করে' (বুখারি)। তাই এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, সন্তান খারাপ হওয়ার পেছনে মা-বাবাও দায়ী রয়েছেন। আজ একের পর এক যেসব জঘন্য কাজ সংঘটিত হচ্ছে, তা তো সবই কোনো না কোনো মা-বাবারই সন্তানের কাজ। অপকর্ম করার অপরাধে কোনো মা-বাবা কি তার সন্তানকে ধরে নিজেই আইনের হাতে তুলে দিয়েছেন? আজ যদি প্রতিটি পরিবার এই অঙ্গীকার করে যে- আমার সন্তান যদি কোনো খারাপ কাজ করে, তাহলে প্রথমে আমিই তাকে আইনের হাতে তুলে দেব। সরকারি বাহিনী কেন লাগবে, আপনার-আমার সন্তানকে গ্রেপ্তার করতে। আমরা নিজেরাই কি পারি না, এ ধরনের কুসন্তানকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে? আমরা যদি নিজেরা আদর্শবান হই, তাহলে আমাদের সন্তানরাও আদর্শবান হবে, যদি দু-একটি ব্যতিক্রম হয়, তাহলে তাকে তার শাস্তি ভোগ করারও ব্যবস্থা আমাদেরই নিতে হবে। আমার সন্তান আরেক মায়ের বুক খালি করবে আর আমি সেই সন্তানকে আবার আশ্রয় দেব- এটা কোন ধর্মের শিক্ষা? তাই প্রতিটি পরিবারকে প্রথমে সোচ্চার হতে হবে, অপরাধী যে-ই হোক না কেন, তাকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে প্রকৃত ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার এবং নিজেদের পরিবারকে সঠিক তরবিয়ত করার তাওফিক দান করুন। 

 লেখক : মাহমুদ আহমদ সুমন, ইসলামী গবেষক ও কলামিস্ট
masumon83@yahoo.com

কারবালার শিক্ষা

| comments

কারবালার যুদ্ধের প্রেক্ষাপট এতই বিস্তৃত যে, তা স্থান ও কালকে অতিক্রম করে বর্তমান সময়ে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়েছে। হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) বলেছেন, 'আমি সৎকাজের আদেশ দান ও অসৎ কাজে বাধা প্রদানের উদ্দেশ্যে সংগ্রামে নেমেছি।' সে হিসেবে বলা যায়, হোসাইন (রা.) নৈতিক ও মানবীয় মূল্যবোধ সমুন্নত রাখার লক্ষ্যেই এই আন্দোলন ও যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
কারবালার যুদ্ধে হোসাইন (রা.) ও তার সঙ্গীরা ধৈর্যের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন। কারবালায় শাহাদতের কয়েক দিন আগে থেকেই তিনি সঙ্গীদের ধৈর্য ধারণের শিক্ষা দিয়ে আসছিলেন। আল্লাহর ওপর নির্ভরতা ও তার প্রতিশ্রুত পুরস্কারপ্রাপ্তির আশায় তার সঙ্গীরাও এ ব্যাপারে ছিলেন দৃঢ়চিত্ত।
হোসাইনের (রা.) সঙ্গীরা কারবালার ময়দানে আনুগত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। যুদ্ধের আগের রাতে তিনি সঙ্গীদের লক্ষ্য করে বলেন, যার ইচ্ছা সে চলে যেতে পারে। কারণ, তার সঙ্গে থাকার অর্থ হচ্ছে নির্ঘাত মৃত্যু। কিন্তু সঙ্গীরা আনুগত্যের শপথ করে তাকে ত্যাগ করবেন না বলে ঘোষণা দেন। মুসলিম ইবনে উজ্জাহ নামে এক সঙ্গী বলেন, 'আমাকে যদি একবার হত্যা করে পুনরায় জীবিত করা হয় এবং ৭০ বার এ প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি ঘটানো হয়, তবুও আমি আপনাকে ছেড়ে যাব না। আমি নিজের জীবন দিয়ে আপনাকে রক্ষার চেষ্টা করব, যাতে কিয়ামতের ময়দানে বিশ্বনবীকে (সা.) বলতে পারি, নিজের অস্তিত্ব দিয়ে আমি আপনার বংশধরকে রক্ষার চেষ্টা করেছি!'
কারবালার ময়দানের এসব ঘটনা প্রমাণ করে_ হোসাইন (রা.) ও তার সঙ্গীরা পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর আরও কাছে পেঁৗছতে সচেষ্ট ছিলেন। শত্রু শিবিরকে উপদেশ দান অথবা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সময় হোসাইন (রা.) ও তার সঙ্গীরা বিন্দুমাত্র মানবীয় ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ বিসর্জন দেননি। তার শিবিরে যখন পানি ছিল, তখন তিনি পিপাসার্ত শত্রুসেনাদের তৃষ্ণা মেটাতে কার্পণ্য করেননি। আবার যুদ্ধের ময়দানে চরম সাহসিকতার সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। হোসাইনের (রা.) এ নমনীয়তা ও দৃঢ়তা প্রমাণ করে_ তিনি অতি উচ্চ লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। মানবতার মুক্তি এবং মানবীয় ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ জাগ্রত করাই ছিল হোসাইনের (রা.) উদ্দেশ্য। এই মহান লক্ষ্য অর্জনের প্রয়োজনীয়তা কিয়ামত পর্যন্ত শেষ হবে না বলে ইমামের শিক্ষা মানব জাতির পাথেয় হয়ে থাকবে চিরকাল। 

শাহীন হাসনাত

মহররম ও আশুরার তাৎপর্য

| comments

আরবি মাসের মধ্যে মহররম এমনই একটি মাস, কোরআনের ভাষায় যাকে 'হারাম মাস' হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজাই ছিল মুসলমানদের ওপর ফরজ। অনেকেই মনে করে থাকেন, রাসূলের নাতি হোসাইন (রা.) শহিদ হওয়ার কারণেই এদিনের মর্যাদা। অথচ এটা সঠিক নয়। রাসূল (সা.) এদিনের তাৎপর্যের কথা বলেছেন। কোরআনেও এর কথা উল্লেখ হয়েছে। আর হোসাইনের (রা.) শহিদ হওয়ার ঘটনা রাসূলের ইন্তেকালের অনেক পরের। তবে এই ঘটনা এদিনের তাৎপর্যকে আরও বাড়িয়েছে নিঃসন্দেহে। আশুরার দিনটিকে অন্য দিনের ওপর কেন প্রাধান্য দিয়েছেন_ এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য আল্লাহই ভালো জানেন। তবে লোকমুখে প্রসিদ্ধ যে, এদিনে বিভিন্ন নবীর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো ঘটেছে। কিয়ামতও এদিনে হবে। কিন্তু এসবের পক্ষে শক্তিশালী কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই। শুধু ফেরাউনের কবল থেকে মুসার (আ.) সম্প্রদায়ের মুক্তি পাওয়ার বিষয়টি এদিনে হয়েছে বলে শক্তিশালী বর্ণনায় পাওয়া যায়। মূলত, আল্লাহতায়ালা ইচ্ছা করলে যে কোনো দিনকে অন্য দিনের ওপর মর্যাদাবান ও প্রাধান্য দিতে পারেন। আমাদের উচিত সেদিনের মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য বুঝে এর ওপর আমল করা। যেহেতু আল্লাহ এদিনটিকে তার রহমত ও বরকতের জন্য নাজিল করেছেন, এজন্য এদিনের পবিত্রতা হলো, দিনটি এমনভাবে কাটাবে, যেভাবে কাটানোর কথা রাসূলের হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। সুন্নত হিসেবে এদিনে শুধু রোজা রাখার কথা বলা হয়েছে। এক হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন, এদিন রোজা রাখলে সারা বছরের গোনাহর প্রতিদান হয়ে যায়। তবে রাসূলের নির্দেশ হলো, ইহুদিদের সামঞ্জস্যতা থেকে বাঁচার জন্য ১০ মহররমের সঙ্গে আগে-পরে মিলিয়ে আরও একদিনের রোজা রাখা। তবে কেউ শুধু আশুরার রোজা রাখলে গোনাহগার হবেন না। রাসূলের এ নির্দেশ দ্বারা আমাদের একটি শিক্ষা লাভ হয় যে, অমুসলিমদের সঙ্গে সামান্য বিষয়ে সামঞ্জস্যতাও আল্লাহর রাসূল পছন্দ করতেন না। সুতরাং একজন মুসলমানের বাহির এবং ভেতর অমুসলিমদের থেকে স্বতন্ত্র হওয়া চাই। তার চালচলন, লেনদেন, আমল-আখলাক_ সবই অমুসলিমদের চেয়ে সেরা হওয়া চাই। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, আজকের মুসলমান রাসূলের এই শিক্ষা থেকে দূরে সরে পড়ার কারণে চারদিক থেকে নানা দুর্দশা নেমে এসেছে তাদের ওপর। আশুরার দিন রোজা ছাড়া অন্য কোনো আমলের কথা জোরালোভাবে প্রমাণিত নয়। যেমন অনেকেই মনে করেন, আশুরার দিন শিরনি পাকিয়ে বিতরণ করতে হবে। এসবের কোনোই ভিত্তি নেই। এগুলো দীনে সংযোজিত বিদআত হিসেবেই গণ্য। তবে একটি দুর্বল হাদিসের সূত্রে উল্লেখ আছে, যিনি এদিন পরিবার-পরিজন ও অধীনদের জন্য ভালো খাবারের ব্যবস্থা করবেন, আল্লাহ তার উপার্জনে বরকত দেবেন। হাদিসটি সূত্রের দিক থেকে ততটা শক্তিশালী না হলেও এতে আমলে কোনো বাধা নেই। বরং এটা করলে আল্লাহর রহমত লাভের আশা করা যায়। শিয়ারা এদিনে তাজিয়া মিছিলসহ যেসব আনুষ্ঠানিকতা পালন করে, এর সঙ্গে ইসলামের কোনো যোগসূত্র নেই। প্রকৃত মুসলমান কারও জন্য এ ধরনের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া সমীচীন নয়।

জহির উদ্দিন বাবর

অধ্যাত্মবাদ পরিচিতি

| comments

অধ্যাত্মবাদের সংজ্ঞা : অধ্যাত্মবাদ বা সুফিদর্শন ইসলামের এমন এক দর্শন, যেখানে আত্মার অবস্থা সম্পর্কিত আলোচনা মুখ্য বিষয়। আত্মার পরিশুদ্ধি বা তাজকিয়ায়ে নফসের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনই হলো এই দর্শনের মূলকথা। পরম সত্তা মহান আল্লাহকে জানার ও চেনার আকাঙ্ক্ষা মানুষের চিরন্তন। স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে আধ্যাত্মিক ধ্যান ও কোরআন-হাদিসের জ্ঞানের মাধ্যমে জানার প্রচেষ্টা হলো সুফিদর্শন বা অধ্যাত্মবাদ।
* মারুফ আল কারখি বলেন, 'অধ্যাত্মবাদ ঐশী সত্তার উপলব্ধি।' * জুনায়েদ বাগদাদি বলেন, 'জীবন, মৃত্যু ও অন্য সব ব্যাপারে আল্লাহর ওপর নির্ভরতাই অধ্যাত্মবাদ।' * জাকারিয়া আনসারি বলেন, 'চিরন্তন ও নিখুঁত আনন্দলাভের জন্য ব্যক্তিসত্তাকে শুদ্ধীকরণ, নৈতিক চরিত্রের উন্নতিবিধান এবং বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ জীবনকে সঠিকভাবে গড়ে তোলাই অধ্যাত্মবাদ।' * ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-এর মতে, আল্লাহ ছাড়া অন্য মন্দ সব কিছু থেকে আত্মাকে কোরআন-হাদিসের আলোকে তাজকিয়ায়ে নফসের মাধ্যমে পবিত্র করে সর্বদা আল্লাহর আরাধনায় নিমজ্জিত থাকা এবং সম্পূর্ণরূপে আল্লাহতে নিমগ্ন হওয়ার নামই অধ্যাত্মবাদ।
অধ্যাত্মবাদের স্তরপরিক্রমা : ১. শরিয়ত, ২. তরিকত, ৩. মারিফত ও ৪. হাকিকত।
শরিয়ত : ইসলামী জীবনব্যবস্থার যাবতীয় বিধানকে শরিয়ত বলা হয়। সর্বপ্রথম শরিয়তের পূর্ণ অনুসারী হতে হয়। শরিয়তের যাবতীয় বিধানের মধ্য দিয়ে একজন সাধক তাঁর প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আত্মার অনুগত করেন। শরিয়তের পূর্ণ অনুসরণ ছাড়া কেউ সুফি হতে পারবেন না।
তরিকত : অধ্যাত্মবাদের পরিভাষায় তরিকত হচ্ছে, শরিয়তের যাবতীয় বিধান অনুশীলনের পর থেকে আধ্যাত্মিক গুরুর শরণাপন্ন হতে হবে। বিনা প্রশ্নে গুরুর আনুগত্য করতে হবে।
মারিফত : অধ্যাত্মবাদের পরিভাষায় মারিফত হচ্ছে এমন এক স্তর, যার মাধ্যমে বান্দা সৃষ্টিরহস্য সম্পর্কে অবগতি অর্জন করতে পারে। এ স্তরে পেঁৗছতে পারলে তাঁর অন্তর আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। তখন তিনি বস্তুর নিকট-তত্ত্ব উপলব্ধি করতে শুরু করেন।
হাকিকত : আন্তরিকভাবে খোদাপ্রেমের স্বাদ ও পরমাত্মার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। এটা হচ্ছে আধ্যাত্মিক সাধনার চূড়ান্ত স্তর। এ স্তরে উন্নীত হলে সুফি ধ্যানের মাধ্যমে নিজস্ব অস্তিত্ব খোদার কাছে বিলীন করে দেন।
অধ্যাত্মবাদের ক্রমবিকাশ : ১. রাসুল (সা.)-এর যুগে অধ্যাত্মবাদ : রাসুল (সা.)-এর জীবদ্দশায় এর সূত্রপাত ঘটে। তিনি হেরা গুহায় আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। একদল সাহাবি মসজিদে নববীর এক পাশে উপাসনা ও আল্লাহর ধ্যানে নিমগ্ন থাকতেন।
২. খোলাফায়ে রাশেদার যুগে অধ্যাত্মবাদ : খলিফারা বিরাট সাম্রাজ্যের মালিক হয়েও পার্থিব সুখ-শান্তি কামনা করতেন না; তাঁরা আল্লাহর চিন্তায় ও ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। তাঁদের অনুসরণ করে একদল সাহাবি ও তাবেয়ি মোরাকাবা ও মোশাহাদায় সর্বদা লিপ্ত থাকতেন।
৩. উমাইয়া শাসনামলে অধ্যাত্মবাদ : উমাইয়া শাসনামলে অধ্যাত্মবাদের চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়। এ সময় কয়েকজন সাধক আল্লাহর ধ্যানধারণাকেই জীবনে চরম ও পরম ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। এসব ধর্মতাপসদের মধ্যে ইমাম হাসান আল বসরি, আবু হাশিম, জাবির ইবনে হাইয়ান, রাবেয়া বসরি, ইব্রাহিম ইবনে আদহাম, মারুফ আল-কারখি অন্যতম।
৪. আব্বাসীয় শাসনামলে অধ্যাত্মবাদ : আব্বাসীয় শাসনামলে সুফি মতবাদ নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হতে থাকে। এ যুগকে ইসলামের ইতিহাসে জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ বলা হয়। এ যুগে সুফি মতবাদের ওপর বিদেশি প্রভাব বিস্তার হতে থাকে। একপর্যায়ে সুফিদের মধ্যে দুটি দলের সৃষ্টি হয়।
ক. ইনকিশাফি দল : এ দলের পুরোধা ছিলেন হজরত আবদুল কাদের জিলানি (রহ.), জুনায়েদ বাগদাদি (রহ.) প্রমুখ।
খ. ইসতিদলালি দল : এ দলের সুফিদের মধ্যে স্পেনের মহিউদ্দিন ইবনুল আরাবি ও রোমের মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি (রহ.) অন্যতম।
৫. এ স্তরে ইমাম গাজ্জালির খেদমত অপরিসীম। তিনি অধ্যাত্মবাদের ওপর অনেক বই রচনা করেন। এসব রচনার মাধ্যমে তিনি অধ্যাত্মবাদকে জনপ্রিয় করে তোলেন। অধ্যাত্মবাদের প্রথম উৎপত্তি আরবে, পরে এটা ইরানে প্রসারিত হয় এবং ব্যাপক উৎকর্ষ সাধন করে। ওমর খৈয়াম, ফেরদৌসি, সাদি, জামি প্রমুখ সুফি ইরানেই জন্মগ্রহণ করেন। অতঃপর এই অধ্যাত্মবাদ ভারতবর্ষেও অনুপ্রবেশ করে। বর্তমানে প্রায় সব দেশে তরিকতের ইমামরা অধ্যাত্মবাদ প্রচার করে চলেছেন। উপমহাদেশে এর খ্যাতি ও প্রসিদ্ধি আরব দেশগুলোর তুলনায় বেশি।
অধ্যাত্মবাদের মূলনীতি : অধ্যাত্মবাদ একরকম রহস্যময় হৃদয়ভিত্তিক ও আত্মাপলব্ধিমূলক মতবাদ। একে রুহানি প্রশিক্ষণও বলা হয়। ব্যক্তির আত্মার পরিশুদ্ধি ও পরম সত্তার সন্ধানই এর লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে পেঁৗছার জন্য সুফিরা কতকগুলো মূলনীতি তৈরি করেছেন_
১. তাওবা : অন্যায় ও পাপের ওপর আন্তরিক অনুশোচনা, অন্যায়ের স্বীকৃতি এবং ভবিষ্যতে এ কাজ না করার দৃপ্ত শপথ। তাওবা হচ্ছে অধ্যাত্মবাদের প্রথম মূলনীতি।
২. তাওয়াক্কুল : সর্বাবস্থায় দয়াময় আল্লাহ তায়ালার ওপর ভরসা করাই তাওয়াক্কুল।
৩. পরিবর্জন : এ প্রসঙ্গে নিজামুদ্দিন আউলিয়া বলেন, 'স্বল্প আহার, স্বল্প কথন, স্বল্প মেলামেশা, স্বল্প নিদ্রার মধ্যেই নিহিত আছে মানুষের পূর্ণতা।'
৪. সবর বা ধৈর্য : যেকোনো অবস্থায় অস্থির না হয়ে আল্লাহর সিদ্ধান্তকে মাথা পেতে মেনে নেওয়াই সবরের একমাত্র দাবি।
৫. আত্মসমর্পণ : গুরুর কাছে নিজ আত্মাকে সোপর্দ করে দিতে হবে।
৬. ইখলাস : নিছক আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সব কাজ করতে হবে।
৭. আল্লাহর প্রেম : অন্তরে পার্থিব জগতের কোনো কিছুর প্রেম ও মোহ থাকতে পারে না। সর্বক্ষণ আল্লাহকে পাওয়ার চিন্তায় মগ্ন থাকতে হবে।
৮. আল্লাহর জিকির : আধ্যাত্মিক উন্নতিসাধন ও অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার জন্য চাই সর্বদা আল্লাহর জিকির।
৯. শোকর : আল্লাহর অফুরন্ত নিয়ামতের স্বীকৃতি প্রদান ও আনুগত্য করাকে শোকর বলা হয়।
১০. কাশফ : সুফিরা যখন আধ্যাত্মিক সাধনার চরম পর্যায়ে উপনীত হন, তখন তাঁর অন্তর্দৃষ্টি খুলে যায়। এবং তাঁর সামনে গোপনীয় সব রহস্যদ্বার খুলে যায়। একপর্যায়ে তিনি আল্লাহর অসীমতার মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন।


লেখক : এম মিজানুর রমাহন সোহেল, প্রাবন্ধিক
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. ইসলামী কথা - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Premium Blogger Template