السلام عليكم

যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার (তওবা) করবে আল্লাহ তাকে সব বিপদ থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেবেন। [আবূ দাঊদ: ১৫২০; ইবন মাজা: ৩৮১৯]
Showing posts with label রোজা. Show all posts
Showing posts with label রোজা. Show all posts

রোজাদারের পুরস্কার

| comments

সারাদিন উপোস থাকার পর ইফতার আনন্দের একটি মুহূর্ত। ইফতারের মাধ্যমে রোজার পূর্ণতা আসে। এ সময়টি আল্লাহ মুমিনের পুরস্কারের জন্য নির্ধারণ করেছেন। নানা ধরনের খাবার সামনে পড়ে থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর বিধান না থাকায় খাচ্ছে না-এটা আল্লাহর কাছে খুবই পছন্দের। রাসুল সা. বলেছেন, রোজাদারের খুশির মুহূর্ত দুটি :

এক. ইফতারের মুহূর্ত,

দুই. তাকে যেদিন জান্নাতে স্বাগত জানানো হবে।

বান্দা যখন ইফতার সামনে নিয়ে বসে থাকে, আল্লাহ তখন ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করেন। ইফতারের সময় দোয়া করলে তা কবুল হওয়ার বিশেষ সম্ভাবনা থাকে। ইফতারের কোনো দোয়া বৃথা যায় না। হাদিসে আছে, রাসুল সা. বলেছেন, ‘‘আল্লাহ তায়ালা রমজান মাসে প্রতিদিন ইফতারের সময় দশ লাখ লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।’

ইফতারের সময় এ দোয়াটি পড়ার কথা হাদিসে আছে : ‘আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া আলা রিজকিকা আফতারতু।’ ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার জন্যই রোজা রেখেছিলাম এবং তোমার রিজিক দ্বারাই ইফতার করলাম।’

রোজাদারকে ইফতার করানোর মধ্যেও বিশেষ সওয়াব রয়েছে। রাসুল সা. বলেছেন, ‘‘যিনি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবেন, তা তার অপরাধ ক্ষমা এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হবে। তিনি রোজাদারের সমান সওয়াব পাবেন।’’ তবে রোজাদারের সওয়াব থেকে সামান্যও কমানো হবে না। সামান্য খেজুর বা পানি দিয়ে ইফতার করালেও পুরো সওয়াব পেয়ে যাবে।

সময় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করে নেয়া সুন্নত। অযথা ইফতারে দেরি করতে নেই। তবে সূর্যাস্থের বিষয়টি অবশ্যই নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে। কেউ যদি সময় হয়ে গেছে মনে করে সময়ের আগেই খেয়ে ফেলে তার রোজা ভেঙে যাবে। তাকে এ রোজার কাজা করতে হবে।

ইফতারের মুহূর্তে অযথা গল্প-গুজবে লিপ্ত না হওয়াই ভালো। এ সময় মনে মনে জিকির ও তওবা করা উচিত। অনেকে এক সঙ্গে ইফতার করলে সম্মিলিতভাবে দোয়াও করা যেতে পারে।

রোজা তাকওয়া ও বেহেশত

| comments

মুক্তির এই দশকেই রোজাদার লাভ করে বেহেশতের আশ্বাস। এই আশ্বাস বয়ে আনে আল্লাহর ভয়। একজন ঈমানদারের শ্রেষ্ঠ গুণ হলো তাকওয়া। তাকওয়া ও আল্লাহভীতি অর্জনের শুভপ্রহর এই রমজান_ এ কথা জেনেছি আমরা রোজার শুরুতে। তারপর কী বয়ে আনে এই তাকওয়া? আল্লাহতায়ালা স্পষ্ট করে বলেছেন_ 'তোমরা এগিয়ে যাও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমার প্রতি এবং সেই বেহেশতের প্রতি_ যার বিস্তৃতি আসমান ও জমিনের ন্যায়_ যা প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্য। যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় করে এবং যারা ক্রোধ সংবরণকারী ও মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল; আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদেরকে ভালোবাসেন।' (আলেইমরান :১৩৩-১৩৪)
তাকওয়ার জন্য রমজান_ এ কথা আমরা জানি। উলি্লখিত আয়াত দুটিতে আল্লাহতায়ালা জানিয়েছেন_ এ গুণে যারা বিভূষিত হবে তাদের নিবাস হবে বেহেশত। অধিকন্তু মুত্তাকী হতে হলে নিজের মধ্যে কী কী গুণ ও চরিত্র ধারণ করতে হয় তাও বলে দিয়েছেন আল্লাহতায়ালা। দান, ধৈর্য ও মানুষের প্রতি সদয়প্রাণ হওয়া তন্মধ্যে অন্যতম। আবু মালিক আশয়ারী (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন_ বেহেশতে এমন অনেক কক্ষ আছে যার ভেতর থেকে বাইরের সবকিছু এবং বাইরে থেকে ভেতরের সবকিছু দেখা যাবে। এর অধিকারী হবে তারাই যারা মানুষকে খেতে দেয়, নিয়মিত রোজা রাখে আর মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তারা তখন থাকে নামাজে মশগুল (মাজমাউয যাওয়াইদ_ আননিহায়া ফিলকিতাব : ইবনে কাছর :৪৭৮ পৃ.)
সুরা যুমার-এ আল্লাহতায়ালা তাকওয়া অর্জনকারীদের পুরস্কার সম্পর্কে বলেছেন_ 'যার ওপর দণ্ডাদেশ অবধারিত হয়েছে; তুমি কি সেই ব্যক্তিকে রক্ষা করতে পারবে যে দোজখে আছে? তবে যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে (মুত্তাকীগণ)_ তাদের জন্য রয়েছে অনেক প্রাসাদ_ যার পাদদেশে প্রবাহিত নদীর পর নদী। এটা আল্লাহর অঙ্গীকার। আল্লাহতায়ালা অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন না। (যুমার :১৯-২০)
কী মান ও মর্যাদায় বেহেশতে প্রবেশ করবে এই মুত্তাকীগণ তাও বর্ণিত হয়েছে পাক কোরআনের পবিত্র পাতায়। আল্লাহতায়ালা বলেছেন_ 'যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করত (মুত্তাকীগণ) তাদেরকে দলে দলে বেহেশতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। যখন তারা বেহেশতের কাছে উপনীত হবে এবং তার দ্বারসমূহ খুলে দেওয়া হবে তখন বেহেশতের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে_ সালামুন আলাইকুম_ তোমাদের প্রতি সালাম! তোমরা সুখী হও এবং স্থায়ীভাবে থাকার জন্য বেহেশতে প্রবেশ করো। তারা বেহেশতে প্রবেশ করে বলবে : সকল প্রশংসা আল্লাহর_ যিনি আমাদের প্রতি তার অঙ্গীকার পূর্ণ করেছেন এবং আমাদেরকে অধিকারী করেছেন এই ভূমির_ আমরা বেহেশতের যেখানে খুশি বসবাস করব। সদাচারীদের পুরস্কার কত উত্তম! (যুমার :৭৩-৭৪)।
মানবজীবনের এই তো সফলতা। সফলতা ও সৌভাগ্যের এই রাজ আশীর্বাদ নিয়েই এসেছে রমজান। আজ পঁচিশতম দিন। এই আশীর্বাদ কতটুকু অর্জন করতে পেরেছি আমি_ এটাই এখন বড় জিজ্ঞাসা! 

রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতি লাঘবে ফিতরা

| comments

মাহে রমজানের পূর্ণাঙ্গ একটি মাস মুমিন মুসলমানরা সিয়াম সাধনা করে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত বন্দেগিতে মশগুল হন। রোজাদার ব্যক্তি ফরজ, সুন্নত ও নফল ইবাদতগুলো যথাসাধ্যভাবে আদায় করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু এসব দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অজান্তে কোনো সময় ভুলভ্রান্তি হয়ে যায়, রমজান মাসে রোজা পালনে বা সিয়াম সাধনায় অত্যন্ত সতর্কতা সত্ত্বেও যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি হয় তার প্রতিকার ও প্রতিবিধান বা ক্ষতিপূরণের জন্য ইসলামি শরিয়তে মাহে রমজান শেষে ‘সাদাকাতুল ফিতর’ প্রদানকে ওয়াজিব করে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় হিজরিতে উম্মতে মুহাম্মদীর ওপর মাহে রমজানের রোজা ফরজ করার সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলমানদের ‘সাদাকাতুল ফিতর’ আদায় করার নির্দেশ দেন। একে সাধারণত ‘ফিতরা’ বলা হয়। এটা মূলত মাহে রমজানেরই নির্ধারিত সাদকা বা দান। ইসলামের পরিভাষায় রমজান মাস শেষে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্যাপন উপলক্ষে মাথাপিছু যে নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক সাহায্য গরিব-মিসকিনদের সাদকা করা হয়, একে ‘সাদাকাতুল ফিতর’ বলে।
‘ফিতরা’র অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হচ্ছে ঈদের খুশিতে গরিব শ্রেণীর লোককেও শামিল করে নেওয়া। কেননা, ঈদের নামাজের আগে যখন একজন অভাবী, অনাহারি লোক কিছু নগদ অর্থ পায়, তখন তা তার চরম আনন্দের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ‘ফিতরা’ দ্বারা রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতির ক্ষতিপূরণও হবে এবং গরিব-দুঃখী মুসলমান নিশ্চিন্ত মনে খাওয়া-পরার জিনিসপত্র সংগ্রহ করে অন্যান্য মুসলমানের সঙ্গে ঈদের জামাতে শরিক হতে পারবে। ‘ফিতরা’র মাধ্যমে ধনী-গরিবের মধ্যে অর্থনৈতিক ব্যবধান কমে আসে এবং সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি গড়ে ওঠে।
রমজান মাসে দান-খয়রাত বা সাদকা করলেও অধিক সওয়াব বা পুণ্য লাভ করা যায়। যেমন, মাহে রমজানে সব ইবাদতের সওয়াব অনেক গুণ বৃদ্ধি পায়, নফল ইবাদত ফরজের সমান এবং একটা ফরজে ৭০টি ফরজের সমান সওয়াব পাওয়া যায়। একদা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সর্বোত্তম দান-সাদকা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘দাতার কাছে যা সর্বোৎকৃষ্ট এবং যার মূল্যমান বেশি।’ (বুখারি) রমজান মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাদকা করার ব্যাপারে উৎসাহ-উদ্দীপনা বেড়ে যেত। তিনি মাহে রমজানকে সহানুভূতির মাস বলে আখ্যায়িত করেছেন। যে ব্যক্তির কাছে ঈদের দিন সুবহে সাদিকের সময় জীবিকা নির্বাহের অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ ব্যতীত সাড়ে সাত তোলা সোনা অথবা সাড়ে ৫২ তোলা রুপা অথবা সমমূল্যের অন্য কোনো সম্পদ থাকে, তার ওপর সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। এ পরিমাণ সম্পদকে শরিয়তের পরিভাষায় নিসাব বলা হয়। প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। কেউ যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক নাও হন, অথচ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সাদাকাতুল ফিতর আদায় করেন, তা হলে তিনি অশেষ সওয়াব পাবেন।
রমজান মাসের শেষ দশক আসার সঙ্গে সঙ্গে রোজাদারের অপরিহার্য কর্তব্য হলো নির্ধারিত পরিমাণে ‘সাদাকাতুল ফিতর’ বা ‘ফিতরা’ আদায় করা। খেজুর, কিশমিশ, মুনাক্কা এবং যব দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা হলে ১ সা অর্থাৎ তিন কেজি ৩০০ গ্রাম অথবা এর মূল্য আদায় করতে হবে। আটা বা গম দ্বারা সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা হলে অর্ধ সা অর্থাৎ এক কেজি ৬৫০ গ্রাম বা এর সমান মূল্য আদায় করতে হবে। মাথাপিছু এক কেজি ৬৫০ গ্রাম গম বা আটা অথবা এর স্থানীয় বাজারমূল্যের সমান ফিতরা দিতে হয়। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক এবারের ফিতরা জনপ্রতি সর্বনিম্ন ৫৫ ও সর্বোচ্চ এক হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সামর্থ্যবান বাবার ওপর তার নাবালক ছেলেমেয়েদের পক্ষ থেকেও সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। সুতরাং নিজের ও নাবালেগ সন্তানদের পক্ষ থেকে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে। নারীদের কেবল নিজের পক্ষে ফিতরা দেওয়া ওয়াজিব। নাবালেগ সন্তানের নিজের সম্পদ থাকলে তা থেকেই ফিতরা দেওয়া হবে। আর বালেগ সন্তানের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করা মুস্তাহাব। গৃহকর্তা এবং তার পোষ্যদের সংখ্যাকে হিসাব করে প্রতিজনের বিপরীতে নির্ধারিত অর্থমূল্যে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা বাঞ্ছনীয়। ফিতরা সেসব গরিব-মিসকিনই পাবে, যারা জাকাত পাওয়ার উপযুক্ত। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই সাদকা বা জাকাত দরিদ্র, মিসকিন, জাকাত আদায়কারী কর্মচারী, ইসলামের প্রতি যাদের মন আকৃষ্ট করার প্রয়োজন, বন্দী, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর রাস্তায় নিয়োজিত বিপদগ্রস্ত পথিকের জন্য (ব্যয়িত হবে), এটি আল্লাহর নির্ধারিত বিধান, আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ (সূরা আত-তওবা, আয়াত: ৬০)
ফিতরা ঈদের দুই-তিন দিন আগে আদায় করলে অধিক সওয়াব পাওয়া যায়। সাদাকাতুল ফিতর ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে আদায় করা সুন্নত। তবে ঈদের নামাজের আগে আদায় করতে না পারলে ঈদের নামাজের পর অবশ্যই আদায় করতে হবে। হজরত ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সাদাকায়ে ফিতরের ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তা লোকেরা সালাতের উদ্দেশে বের হওয়ার আগেই আদায় করে। নবী করিম (সা.) নিজেও ঈদের দু-এক দিন আগে ফিতরা আদায় করে দিতেন।’ (আবু দাউদ)
ফিতরা ঈদের নামাজের আগেই দিয়ে দেওয়া উত্তম, নতুবা পরে আদায় করতে হবে। নবী করিম (সা.) ঈদের দুই-তিন দিন আগেই লোকদের একত্র করে ফিতরা বের করার নির্দেশ দিতেন। এতে করে গরিব-মিসকিনরা নিজ নিজ প্রয়োজন পূরণে সক্ষম হবেন এবং ঈদের দিনে তাঁরাও পানাহারের ব্যবস্থা করতে সমর্থ হবেন। হাদিসে উল্লেখ আছে যে, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) রোজাদার ব্যক্তির অসৎ কাজকর্ম থেকে সিয়ামকে পবিত্র করার জন্য এবং অভাবীদের ঘরে খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য সাদাকাতুল ফিতরের বিধান দিয়েছেন। যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের আগে এ ফিতরা আদায় করে দেবে তা জাকাত হিসেবে কবুল হবে আর নামাজের শেষে আদায় করা হলে তখন তা সাদকা হিসেবে কবুল হবে।’ (আবু দাউদ, ইবনে মাজা)
সাদকা-ফিতরা যাদের দেওয়া হবে তাদের এ কথা জানানোর প্রয়োজন নেই যে তোমাকে ফিতরা দিচ্ছি অথবা এটা জাকাতের টাকা প্রভৃতি। বরং গরিব আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীকে জাকাত-ফিতরা বা দান-সাদকা প্রদানের সময় তা কিসের বাবদ দেওয়া হচ্ছে তা না বলাই শ্রেয়। দাতার কথাবার্তা বা কার্যকলাপ দ্বারা যেন এ কথা প্রকাশ না পায় যে সে গ্রহীতাকে সাহায্য করছে। এ সাদকা তো দাতার দান নয়, বরং সাদকা দিয়ে সে ত্রুটিমুক্ত হলো মাত্র। গ্রহীতা তা গ্রহণের ফলেই দাতা দায়িত্বমুক্ত হতে পেরেছেন। এ অর্থে বরং গ্রহীতাই দাতার উপকার করেছেন। এ জন্য মাহে রমজানে সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা যথাসম্ভব রোজা শেষ হওয়ার আগেই দিয়ে দেওয়া উচিত।

ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও কলাম লেখক।

রোজার প্রধান শিক্ষা 'তাকওয়া'

| comments

মানুষ পৃথিবীতে মহান আল্লাহর খলিফা। জীবন ও জগতের যাবতীয় কাজ আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পরিচালনা করবে- এটাই মানবজীবনের মূল লক্ষ্য। কিন্তু এ লক্ষ্যে পৌঁছাতে শয়তান, তার নিজের প্রবৃত্তি ও পার্থিব মোহ বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সব বাধার প্রাচীর ডিঙিয়ে, সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে আত্মার যে গুণটি তাকে দুর্বার গতি ও অক্ষত শক্তি জোগায় এর নাম হলো তাকওয়া। আর এই তাকওয়া হলো রোজার প্রধান শিক্ষা। আল্লাহ এ মর্মে ইরশাদ করেছেন, 'হে ইমানদাররা তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তা ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।' (সুরা বাকারা : ১৮৩ আয়াত)
তাকওয়া আরবি শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো ভয় করা, আত্মরক্ষা করা, বিরত থাকা ইত্যাদি। তাকওয়া শব্দটির বাংলা অনুবাদের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ উলামা খোদাভীতি শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় তাকওয়া বলতে মুমিন ব্যক্তির হৃদয়ের এমন অবস্থাকে বোঝায়, যা তাঁকে সর্বদা আল্লাহর ভয়ে ভীত রাখে। অর্থাৎ তাকওয়া মুমিন ব্যক্তিকে তাঁর জীবনের প্রতিটি কাজে এ কথা ভাবতে বাধ্য করে, জীবনের ছোট-বড় সব কাজের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে হিসাব দিতে হবে। জীবনের কোনো ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর বিধান লঙ্ঘিত হলে, এর জন্য মৃত্যুর পরে ভীষণ শাস্তি ভোগ করতে হবে। অর্থাৎ তাকওয়া সব সময় মুমিন ব্যক্তিকে আল্লাহর নির্দেশ পালনে ও নিষেধাজ্ঞা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করে। অন্যভাবে বললে, তাকওয়া হলো আত্মার এমন এক শক্তি, যা ব্যক্তির আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। মুত্তাকি ব্যক্তি হয় আত্মনিয়ন্ত্রিত। সে সব সময় প্রতিটি পদক্ষেপে নিজের আত্মার শাসনাধীন থাকে। যে কাজটি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানে সহায়ক হবে বলে তার আত্মা অনুমোদন দেয়, কেবল সে কাজটিই সে করতে পারে। আর যে কাজ দ্বারা মহান মাওলার অসন্তোষ নেমে আসবে, জাহান্নামের শাস্তির কারণ হবে, সে কাজ সে কিছুতেই করতে পারে না। তাই মুত্তাকি ব্যক্তির জন্য জাগতিক অনুশাসন আর বিধিবিধানের কোনো প্রয়োজন পড়ে না। অতএব বলা যায়, জীবনের পবিত্রতা ও মুক্তি আর সামাজিক শৃঙ্খলা ও শান্তির মূল চাবিকাঠি হলো তাকওয়া। কারণ ব্যক্তির আত্মা যদি কলুষিত হয়, তার অভ্যন্তরীণ শক্তি যদি তাকে কুপথে পরিচালিত করে, তাহলে কোনো অনুশাসনই তার আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ফলে সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও অশান্তিও কোনো উপায়েই বন্ধ করা যায় না।
মহান আল্লাহ মানুষের জীবন ও সমাজকে শান্তিপূর্ণ করতে, সাফল্য ও পূর্ণতার সর্বোচ্চ শিখরে উন্নীত করতে, মহামূল্যবান গুণ তাকওয়ার শক্তি অর্জন করতে রমজানের মাসব্যাপী রোজা পালন ফরজ করে দিয়েছেন। একজন রোজাদারের জন্য সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাদ্য-পানীয় ও যৌনতা হারাম। তাই সে রমজান মাসের দিনের বেলায় জীবনের সব থেকে হালাল খাদ্য ও পানীয় যদিও তা মদিনার সর্বোৎকৃষ্ট আজওয়া খেজুর বা জমজমের পানিই হোক না কেন এবং বিবাহিত স্ত্রীকেও বর্জন করে। কারণ মহান আল্লাহ তাঁর ফরমান দ্বারা এসব হালাল বিষয়কে সাময়িকভাবে হারাম করে দিয়েছেন। আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করলে জাহান্নামে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। এভাবে ৩০ দিন রোজার অনুশীলনের মাধ্যমে রোজাদার সত্যিকার মুমিন ভাবতে বাধ্য হয়, যে বিষয়গুলোকে মহান আল্লাহ সারাটি জীবনের জন্য হালাল করেছেন, যে বিষয়গুলোকে আল্লাহর রাসুল সাওয়াবের কারণ বলেছেন, সাময়িক নিষেধাজ্ঞার কারণে ওই বিষয়ে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করলে যদি জাহান্নামের এত কঠিন শাস্তি অবধারিত হতে পারে, তাহলে যে বিষয়গুলো গোটা জীবনের জন্য হারাম, জীবনের কোনো ক্ষেত্রে কোনো সময়ে যা হালাল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, সে বিষয়ে যদি আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করা হয়, তা হলে তার শাস্তিটা কত ভয়াবহ হতে পারে! অর্থাৎ এক মাস রোজা পালনের মাধ্যমে প্রত্যেক রোজাদার তাঁর গোটা জীবনে হালাল অর্জন ও হারাম বর্জনের নৈতিক শিক্ষা অর্জন করবে তথা তাকওয়া অর্জন করবে- এটাই রোজার আসল শিক্ষা।
তাকওয়া চারটি বর্ণের সমষ্টি ছোট্ট একটি শব্দ হলেও জড়বাদী, দুনিয়া পূজারির কাছে তা অত্যন্ত কঠিন একটি বিষয়। যখন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রঙিন জীবনের হাতছানি দেখা যায়, যখন চরম দারিদ্র্য, জঠরজ্বালা আর চরম উপেক্ষার মধ্যে বিপুল বিত্ত-বৈভব আর নেতৃত্বের আহ্বান শোনা যায়, যখন প্রচণ্ড যৌন উত্তেজনার মধ্যে সুন্দরী ষোড়শীর যৌনাবেগ দুর্বার আকর্ষণ করে, তখন নীতির বিষয়টি ভাববার সাধ্য আছে কার? হ্যাঁ, একজন জড়বাদীর কাছে যে বিষয়টি সব থেকে কঠিন অসম্ভব, একজন খাঁটি ইমানদারের কাছে সেটাই সব থেকে সহজ এবং তাতেই তার তৃপ্তি। কারণ তাকওয়া তাকে শক্তি জোগায় অন্যায়কে এড়িয়ে চলার ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তাকে সব সংকট উত্তরণের পথ বের করে দেন। আর তাকে এমনভাবে রিজিকের ব্যবস্থা করেন, যা সে ভাবতেও পারে না। আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট।' (সুরা আত্-ত্বালাক : ২ ও ৩ আয়াত)। একজন মহিলা সাহাবি ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার পর নিজেকে ইসলামী দণ্ড- প্রস্তরাঘাতে মৃত্যুর জন্য এগিয়ে দিয়েছিলেন তাকওয়ার কারণেই। কারণ পৃথিবীর মৃত্যু যন্ত্রণার চেয়ে জাহান্নামের শাস্তি অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক, ভয়াবহ ও চিরস্থায়ী। তবুক অভিযানে অংশগ্রহণ না করার কারণে রাসুল (সা.) প্রদত্ত শাস্তি সামাজিক বয়কট চলাকালে হজরত কাব ইবনে সালেকের পক্ষে গায়সান গোত্রের নেতৃত্বের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব হয়েছিল তাকওয়ার কারণে। পূর্ণ যৌবনে হজরত ইউসুফ (আ.)-এর পক্ষে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দরী-যুবতী জুলেখার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে কারাবরণ করা সম্ভব হয়েছিল তাকওয়ার কারণে।
রোজার আসল শিক্ষা হলো তাকওয়া। আর তাকওয়ার সার কথা হলো ব্যক্তির ওপর তার আত্মার নিয়ন্ত্রণ। রমজানের একটি মাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে প্রতিটি রোজাদারের অন্তর ভরে উঠুক তাকওয়ার গুণে, দেশে-দেশে গড়ে উঠুক পাপাচারমুক্ত সুশৃঙ্খল-শান্তিপূর্ণ সমাজব্যবস্থা।

লেখক :মোহাম্মদ মাকছুদ উল্লাহ, পেশ ইমাম ও খতিব, রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদ

পবিত্র রমজানের ফজিলত ও মাহাত্ম্য

| comments

পবিত্র রমজানুল মুবারক আমাদের মাঝে সমাগত। রসূল (স.) রোজা শুরু হওয়ার আগে তার সাহাবীদেরকে কিভাবে সচেতন করতেন নিম্নের হাদীস হতে আমরা তা উপলব্ধি করতে পারি। হযরত সালমান ফারসী (রা.) প্রমুখ হতে বর্ণিত হয়েছে যে, শা’বান মাসের শেষ দিন রসূলুল্লাহ (স.) আমাদিগকে খুত্বা শুনালেন, যাতে তিনি বললেন—‘হে জনগণ! তোমাদের ওপর একটি মহান ও পবিত্র মাস আসছে, যার মধ্যে এমন একটি রাত্র রয়েছে যা হাজার রাত্র হতেও উত্তম।’ ‘যে মাসের দিনগুলোতে আল্লাহ রোযাকে ফরয করেছেন এবং রাত্রিতে নামাযকে (তারাবীহকে) নফল করেছেন (উম্মতের জন্য সুন্নত)।’ ‘যে ব্যক্তি ঐ মাসে কোন একটি সদভ্যাস (বা সত্কাজ) করে তা ছওয়াবের দিক দিয়ে অন্য মাসের একটি ফরয কার্যের সমতুল্য হয়ে থাকে।’ আর একটি ফরয আদায় করলে, তা অন্য মাসের ৭০টি ফরয আদায়ের সমতুল্য ছওয়াবের হয়ে থাকে। ‘এটা হল ধৈর্যের মাস। আর ধৈর্য অবলম্বনের প্রতিদান হচ্ছে বেহেশতে। এটা পরোপকার ও সহানুভূতির মাস এবং এটা এমন একটি মাস যাতে ঈমানদারগণের রুযী বৃদ্ধি করা হয়ে থাকে।’ ‘এ মাসে যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে ইফতার করায়, ইহার বিনিময়ে তার সমস্ত গুণাহ মাফ হয়ে যায় এবং সে জাহান্নাম হতে মুক্ত হয়।’ ‘তাছাড়া সে উক্ত রোযাদার ব্যক্তির তুল্য ছওয়ারও পাবে। এতে অবশ্য উক্ত রোযাদারের ছওয়াবে একটুও কমতি করা হবে না।’ আমরা বললাম ইয়া রসূলুল্লাহ (স.)! আমাদের এমন কিছু সংস্থান নাই যা দ্বারা আমরা রোযাদারকে ইফতার করাতে পারি। তদুত্তরে হুযুর (স.) বললেন, ‘এই ছওয়াব আল্লাহতায়ালা ঐ ব্যক্তিকেও প্রদান করবেন, যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে এক ঢোক দুধ বা একটি খোরমা কিংবা সুমিষ্ট পানি দ্বারা ইফতার করাবে।’ ‘আর যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে পরিতৃপ্ত করে খাওয়াবে, আল্লাহ তাকে আমার ‘হাউজ কাওছার’ হতে এমনভাবে পর্যাপ্ত করে পান করাবেন যে, বেহেশতে না যাওয়া অবধি তার আর পিপাসা লাগবে না। আর ঐ মাসের প্রথম দশক রহমতের, দ্বিতীয় দশক ক্ষমার ও তৃতীয় দশক জাহান্নাম হতে মুক্তির জন্য নির্ধারিত।’ ‘যে ব্যক্তি ঐ মাসে স্বীয় চাকরের ওপর কার্যভার লাঘব করে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন এবং জাহান্নাম হতে আযাদ করে দেন।’ প্রিয় রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘রামাজান মাসের প্রথম রাত্রি সমাগত হতেই শয়তান ও দুষ্টমতি জ্বিনগুলো শৃঙ্খলিত হয় এবং জাহান্নামের দ্বারগুলো রুদ্ধ করে দেয়া হয়, একটি দরোজাও মুক্ত থাকে না। আর বেহেশতের দ্বারগুলো খুলে দেয়া হয়, ইহার একটাও বন্ধ থাকে না।’ আর কোন একজন গায়েবী আহ্বানকারী উচ্চৈঃস্বরে বলতে থাকেন যে, ‘হে পুণ্যার্থীগণ—অগ্রসর হও! হে পাপাত্মার দল—পিছিয়ে যাও! এইসময় আল্লাহর পক্ষ হতে বহু দোযখী মুক্তিপ্রাপ্ত হয়। এমনি করে প্রত্যেক রাত্রিতেই আহ্বান করা হয়।’ রসূলুল্লাহ (স.) আরো বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রামাজান মাসে ঈমানের সাথে ও ছওয়াবের আশায় রোযা রাখে, তার অতীত গোণাহ মাফ হয়ে যায়।’ ‘আর যে ব্যক্তি এই মাসে ঈমানসহ ছওয়াবের আশায় রাত জেগে (তারাবীহ) নামায পড়ে, তার অতীত সকল গোনাহ মাফ করে দেয়া হয়।’ ‘যে ব্যক্তি শবে ক্বদর রাতে ঈমানের সাথে ছওয়াবের আশায় রাত জাগরণ করে নামায পড়ে, তারও অতীত সকল গোনাহ মাফ করে দেয়া হয়।’ হযরত নবীয়ে করীম (স.) বলেছেন, ‘মানুষের প্রত্যেক সত্কর্মের ছওয়াব দশ হতে সাতশত গুণ বৃদ্ধি হয়ে থাকে।’ তবে আল্লাহ বলেন, ‘কেবল রোযা ব্যতীত। কেননা ইহা একমাত্র আমার জন্য সুতরাং ইহার পুরস্কার আমিই স্বহস্তে প্রদান করব। যেহেতু রোযাদার স্বীয় কামপ্রবৃত্তিকে দমন ও আহারাদি পরিহার করে থাকে কেবলমাত্র আমারই জন্য।’ হুযুর (স.) বলেছেন, ‘রোযাদারের জন্য দুইটি আনন্দ। একটি ইফ্তার কালে এবং অপরটি আল্লাহর সাথে দীদারকালে।’ তিনি আরো বলেন, ‘রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মেশ্ক হতেও অধিক সুগন্ধময়। তিনি বলেন, (রোযাদারগণের পক্ষে) রোযা হচ্ছে ঢালস্বরূপ।’ ‘সুতরাং তোমাদের মধ্যে কেউই রোযা অবস্থায় নির্লজ্জ কথা বলবে না এবং বাজে বকবে না। যদি কেউ রোযাদারকে গালি দেয় অথবা তার সাথে লড়াই করতে আসে, তবে সে যেন বলে দেয় যে, আমি রোযাদার।’ হযরত নবীয়ে করীম (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রোযা অবস্থায় মিথ্যা কথা ও মিথ্যা কাজ হতে বিরত রইল না, তার উপবাসে আল্লাহর কিছুই যায় আসে না।’ তিনি সাবধান করে বলেন যে, ‘বহু রোযাদার এমনও রয়েছে যে, ক্ষুধায়-পিপাসায় কষ্ট পাওয়া ব্যতীত তাদের রোযা রাখায় আর কোন ফল নেই। এমনিভাবে বহু রাতজাগা নামাযী রয়েছে, যাদের রাত জাগরণ ব্যতীত অন্য কোন লাভ হয় না।’ হযরত নবীয়ে করীম (স.) বলেছেন যে, ‘আল্লাহ রব্বুল আ’লামীন বলেন, যে রোযাদারের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আমার নিষিদ্ধ বস্তুসমূহ হতে বিরত থাকল না, তার শুধু পানাহার হতে বিরত থাকায় কোন লাভ নেই।’ আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তোমাদের রবের দেয়া ক্ষমার দিকে দ্রুত অগ্রসর হও। আর ঐ বেহেশতের দিকে যার প্রশস্ততা আসমান ও জমীনব্যাপী! যা তিনি কেবল মুত্তাকীন বা পরহেজগারদের জন্যই প্রস্তুত করে রেখেছেন।

লেখক: প্রফেসর ড. মুমতাজুল বুখারী

রমজান ও কুরআন

| comments

মানবজাতির একমাত্র জীবনব্যবস্থা আল কুরআন। কুরআন মানুষকে আলোর পথ দেখায়, কল্যাণের পথ দেখায়। কুরআন পড়লে, দেখলে, ছুঁলে এমনকি শ্রদ্ধাভরে চুমু খেলেও পুণ্য হয়। পবিত্র রমজানে এ পুণ্যের মাত্রা বহু গুণে বাড়িয়ে দেয়া হয়। কারণ এ মাসেই পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হয়ে রমজানের রোজা হাদিয়া নিয়ে এসেছে। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমনভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল।’ অন্যত্র এরশাদ হয়েছে, ‘রমজান এমনই একটি মাস যাতে কুরআন নাজিল করা হয়েছে, যা সমগ্র মানবজাতির জন্য হেদায়তস্বরূপ, যা সত্য পথপ্রদর্শনকারী, স্পষ্ট শিার সাথে সংশ্লিষ্ট এবং হক ও বাতিলকে সুস্পষ্ট করে উপস্থাপন করে।’
এ কুরআন শুধু আরব জাতির জন্য নয়, বরং পুরো মানবজাতির কল্যাণের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। এর পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের মাধ্যমেই রয়েছে দ্বীন-দুনিয়ার সফলতা। এ থেকে স্পষ্টই বোঝা যায়, রমজান ও কুরআনের মধ্যে একটা সুসম্পর্ক বিদ্যমান। আর কুরআনের সাথে মানুষের হেদায়াত ও পথনির্দেশনা জড়িত। কেউ কুরআনের অনুশাসন অনুসরণ করলে সফল হবেই। কারণ মানুষের এমন কোনো সমস্যা নেই, যা পবিত্র কুরআনে আলোচনা করা হয়নি। এ কুরআনের আলোকে স্বয়ং মহানবী সা: ব্যক্তিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সব সমস্যার সমাধান করেছেন। তার প্রিয় সাহাবিগণও এ কুরআনের ওপর আমল করে সোনার মানুষে পরিণত হয়েছেন। কুরআনের এসব শ্রেষ্ঠত্বের কথা বললেই মাহে রমজানের শ্রেষ্ঠত্বের কথা চলে আসে।
রমজানের অনন্য সব বৈশিষ্ট্যের বেশির ভাগই কুরআন নাজিলকেন্দ্রিক। সেই কুরআনের প্রতি আমাদের দায়িত্ব-কর্তব্য কী, তা ঠিক করে নেয়া উচিত। কুরআন যেহেতু আল্লাহ তায়ালার বাণী, সেহেতু তা বিশুদ্ধ পড়ার বিকল্প নেই। বিশুদ্ধ করে তেলাওয়াতের একটা সুবর্ণ সুযোগ হয় রমজানে। রমজানে এক দিকে যেমন পড়ার আগ্রহ থাকে, তেমনি পড়ার সুযোগও থাকে পর্যাপ্ত।
রাসূল সা:-এর জীবদ্দশায় তাকে প্রতি রমজানে হজরত জিব্রাইল আ: এসে তার প্রতি অবতীর্ণ হওয়া কুরআনের সবটুকু তেলাওয়াত করে শোনাতেন। মাহে রমজানের রাতে তারাবি-তাহাজ্জুদসহ দিন-রাতের বিভিন্ন সময় কুরআন তেলাওয়াতের প্রেরণা হাদিসে বিদ্যমান। হজরত আয়েশা রা:-কে নবী করিম সা:-এর চরিত্র-বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘তাঁর চরিত্র ছিল হুবহু কুরআনের মতো’, অর্থাৎ তিনি ছিলেন কুরআনের জীবন্ত রূপ।
কুরআনের প্রতি আমাদের প্রথম দায়িত্বই হলো বিশুদ্ধভাবে তেলাওয়াতের চেষ্টা করা। তার পর বেশি বেশি তেলাওয়াত করা। রমজানে এক খতম কুরআনÑ অন্য যেকোনো মাসের চেয়ে ৭০ গুণ বেশি সওয়াব। তাই তারাবি, তাহাজ্জুদ ছাড়াও দিনে কুরআন তেলাওয়াত করা যেতে পারে।
দ্বিতীয় দায়িত্ব হিসেবে অর্থ বা মর্ম উপলব্ধি করে কুরআন তেলাওয়াত করার চেষ্টা করা। আজ-কাল বাজারে কুরআনের বহু সহজ তরজমা বেরিয়েছে, সেগুলোতে বোঝার চেষ্টা করলেও সুফল পাওয়া যেতে পারে। সেই সাথে কুরআন তেলাওয়াতের আদব ও নিয়ম-পদ্ধতিগুলো খেয়াল করাও জরুরি। যেসব আয়াত তেলাওয়াত করতে মনস্থ করা হয়, অন্তরকে তার অনুগত বানিয়ে ফেলা জরুরি। রহমতের আয়াত তেলাওয়াতের সময় আনন্দ-খুশি অনুভব করা এবং আজাব ও শাস্তির আয়াত তেলাওয়াত কালে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে যাওয়া। এমনভাবে তেলাওয়াত করা যেন আল্লাহ তায়ালা সে তেলাওয়াত শুনছেন। এটি অবশ্য তখনই সম্ভব যখন আয়াতের মর্ম অনুধাবনের যোগ্যতা সৃষ্টি হবে।
তৃতীয় দায়িত্ব হিসেবে কুরআনের আদেশ-নিষেধ মেনে জীবনকে পরিচালনা করা। একজন মুসলমানের জন্য কুরআন অনুযায়ী জীবন গঠনের চেয়ে ভালো কাজ আর নেই। রাসূলে করিম সা: নিজে ও সাহাবায়ে কেরামও এ মাসে বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করতেন। পরবর্তী যুগের ইমাম, মুহাদ্দিস ও সাধক-বুজুর্গদের জীবনেও রমজানে কুরআন তেলাওয়াত ও চর্চার বিস্ময়কর বিভিন্ন ঘটনা রয়েছে।
মাহে রমজানের সিয়াম সাধনা ও কুরআনের অব্যাহত চর্চা আমাদের মধ্যে তাকওয়া জাগিয়ে তুলতে পরিপূরক ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত, হক আদায় করে রোজা রাখার পাশাপাশি পবিত্র কুরআনের গভীর চর্চায় আত্মনিয়োগ করা; তবেই রমজানের পরিপূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়।

লেখক : হাসনাইন হাফিজ, প্রবন্ধকার

শাওয়ালের ছয়টি সুন্নত রোজার মাহাত্ম্য

| comments

মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তারই ইবাদতের জন্য। এ মহান সৃষ্টি দ্বারা তার আর কোন উদ্দেশ্য নেই। তিনি চান বান্দা যেন সর্বদা আমার-ই ইবাদত করে। আমাকেই তার আপনভাবে। এ মর্মে পবিত্র কোরআনে মহান প্রভু ইরশাদ করেছেন এবং আমি জ্বিন ও মানব জাতিকে একমাত্র আমারই ইবাদতের জন্য তৈরি করেছি। আল-কোরআন

এই মানব জাতি যেন তাদের বাস্তব জীবনে একে অন্যকে আপন ভেবে একে অন্যের দ্বারা উপকৃত হতে পারে এজন্য দিয়ে দিয়েছেন জীবন বিধান। সামাজিক জীবনে তারা পরস্পরে যেন ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে সেজন্য কোরআন হাদিসে মানব সেবার অনেক ফযীলত বর্ণনা করা হয়েছে।

রাসূলে কারীম (সা.) ইরশাদ করেছেন!

যে ব্যক্তি দুনিয়ার বুকে কোন মুমিন ব্যক্তির পেরেশানী/বিপদাপদ দূর করবে আখেরাতের বুকে আল্লাহ পাক তার পেরেশানী/বিপদাপদ দূর করে দিবেন। আর যে কোন মুসলমানের দোষত্রুটিকে গোপন রাখবে আল্লাহপাক ইহকাল ও পরকালে তার দোষ-ত্রুটিকে গোপন রাখবেন। আর যতক্ষণ পর্যন্ত কোন ব্যক্তি তার অপর ভাইয়ের সহযোগিতায় লিপ্ত থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহপাক তাকে তার সহযোগিতা দ্বারা বেস্টন করে রাখবেন। আল-হাদিস

উক্ত হাদিসে রাসূল (সা.) মানব সেবার ফযীলতকে বর্ণনা করেছেন। আর এ দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেল মানব সেবা অনেক ফযীলতের কাজ।

অন্য এক হাদিসের মধ্যে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন-‘যারা অন্যের উপর দয়া করে মহান আল্লাহপাক রাব্বুল আলামীন তাদের ওপর দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীর বুকে যারা রয়েছে তাদের প্রতি দয়া কর। আকাশের অধিবাসী (মহান প্রভু) তোমাদের উপর দয়া করবেন। আল-হাদিস

উক্ত হাদিসের মধ্যে ঐদিকে ইশারা করা হয়েছে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত কারো হƒদয়ে সৃষ্টি জীবের প্রতি দয়া হবে না। ততক্ষণ পর্যন্ত সে ব্যক্তি তাকে মুসলমান বলে দাবী করার অধিকার রাখে না। একজন মুমিনের জীবন এই সমস্ত গুণে গুণান্বিত হওয়া উচিত। কেননা পবিত্র কোরআনে আল্লাহ পাক এই জাতিকে লক্ষ্য করে বলেছেন, এবং আমি বনী আদমকে সম্মানিত করেছি। (আল কোরআন)

অন্য হাদিসে এসেছে-‘হযরত সাহল ইবনে সা’দ (রা.) সূত্রে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন জান্নাতের মধ্যে একটি দরজা রয়েছে যার নাম হল ‘রাইয়্যান’ একমাত্র রোযাদারদেরকেই সেই দরজা দিয়ে আহ্বান করা হবে। সুতরাং রোযাদার-ই সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। অতএব সেথায় যে প্রবেশ করে ফেলবে সে কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না।’-আল হাদিস অন্য হাদিসে ইরশাদ হচ্ছেø হযরত আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন! রোযাদারের জন্য দু’টি আনন্দ রয়েছে একটি হল যখন সে ইফতার করে। আর অপরটি হল যখন সে তার মহান প্রভুর সাথে সাক্ষাৎ করবে।-আল হাদিস

মুসলমান ব্যক্তি যাতে শুধু রমযানের রোযা রেখে থেমে না যায় বরং সে কি করে সহজেই পূর্ণ বছরটা মহান প্রভুর ভালবাসার পাত্র হয়ে থাকতে পারে এবং কি করে জান্নাতের স্থায়ী বাসিন্দা হতে পারে। কিয়ামতের ভয়াবহ দিবসেও সে কি করে হাসতে পারে। থাকতে পারে আনন্দের সাথে। রাসুল (রা.) উম্মতের সামনে এই পথটি স্পষ্ট করে দিয়ে গেছেন। হাদিস শরীফে এসেছে-‘হযরত আবু আইয়ূব (রা.) সূত্রে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেছেন! যে ব্যক্তি রমযানের রোযা রাখল অতঃপর তার সাথে সাথে শওয়াল মাসের ছয়টি রোযা রাখল সে যেন পূর্ণবছরই রোযা রাখল।’-আল হাদিস

অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি যখন রমযান মাসের রোযা রেখে তার সাথে সাথে শাওয়াল মাসেও ছয়টি রোযা রাখল সে এই রোযার কারণে আল্লাহ পাকের দরবারে পূর্ণ একটি বছর রোযা রাখার সমান সওয়াব পেয়ে গেল। একটু ভেবে দেখুন রমযানের পরবর্তী মাস শাওয়ালের মধ্যে ছয়টি রোযা রাখার এই আমলটা কতইনা সহজ কিন্তু তার ফযীলত কতই না মহান। কার পক্ষে সহজেই সম্ভব এক বছর লাগাতার রোযা রাখা। অথচ এই আমলটা এই ফযীলত সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও তা সাধারণ মানুষের পক্ষেও সম্ভব। শুধু মনের সৎ নিয়মই যথেষ্ট। বান্দা যখন প্রকৃতভাবে আল্লাহকেই ভালবাসে তখন তার জন্য একদম কঠিন থেকে কঠিনতম আমল ও সহজ হয়ে দাঁড়ায়। বান্দা যখন আল্লাহ পাকের দিকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে অগ্রসর হয় আল্লাহ পাকের রহমত তার দিকে দৌড়িয়ে অগ্রসর হয়। বান্দা যখন আল্লাহ পাকের প্রেমে বিভোর হয়ে তার সন্তুষ্টির লক্ষ্যে সামান্যতম আমল তার দরবারে পেশ করে আল্লাহ পাক বান্দার এই আমলকে দশ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ পাকের এই দয়া ও অনুগ্রহ বান্দা তখনই লাভ করবে যখন বান্দা আমল করবে। কেননা আল্লাহ পাকের রহমত লাভের জন্য একটি উছিলা আবশ্যক। আর তা হল আমল। তাই তো বান্দা যেন আল্লাহ পাকের রহমতকে হাত ছাড়া না করে। বরং অল্প আমলের বিনিময়েই যেন সে আল্লাহর কল্পনাহীন দয়া ও অনুগ্রহের অধিকারী হয়ে যায়। এমন অনেক রাস্তাই আল্লাহপাক বান্দার জন্য খোলা রেখেছেন এবং রাসুল (সা.) উম্মতের সামনে তা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। আর অল্প আমলের বিনিময়ে আল্লাহপাকের অসীম দয়া ও অনুগ্রহের পাত্র হওয়ার জন্য রাসুল (সা.) কর্তৃক বর্ণিত সহজ পন্থাসমূহ থেকে একটি অতি সহজ পন্থা হল শাওয়াল মাসের ছয়টি রোযা। বান্দা যখন আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টির জন্যে এই ছয়টি রোযা রাখবে তখন আল্লাহ তাকে পূর্ণ একটি বছর রোযা রাখার সওয়াব দিয়ে দিবেন।

অন্য একটি হাদিসে ইরশাদ হচ্ছে রাসুল (সা.)কে সারা বছর রোযা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, নিঃসন্দেহে তোমার উপর তোমার পরিবার-পরিজনের হক বা অধিকার রয়েছে। অতঃপর তিনি বললেন, রমযানের এবং তার পরবর্তী দিনগুলোরও প্রত্যেক বুধবার ও বৃহস্পতিবারে রোযা রাখ। সুতরাং যখন তুমি এই রোযাগুলো রাখবে তখন যেন তুমি সারাটা বছরই রোযা রাখলে।-আল হাদিস এই সমস্ত আরো অনেক হাদিস রয়েছে যার দ্বারা শাওয়ালের ছয়টি রোযা রাখার ফযীলত প্রমাণিত হয়। সুতরাং আসুন আমরা এই মহান ফযীলত ও বরকতময় আমলটি নিজ জীবনে বাস্তবায়িত করি। তাহলেই সফল হবে আমাদের ইহকাল ও পরকাল। আল্লাহপাক আমাদেরকে সেই তৌফিক দান করুন। আমীন।
**মুফীযুর রাহমান কাসেমী**

মাহে রমজান থেকে আমরা কী পেলাম

| comments

মহাপবিত্র মাহে রমজান, বেহেশতী মেহমান। এ মাসেই অবতীর্ণ হয়েছে মহান আল্লাহ তাআলার নির্দেশনায় মহাগ্রন্থ, মহাপবিত্র আল-কুরআন। যাতে রয়েছে মু’মিন মুসলিমদের আত্মশুদ্ধির জন্য তাকওয়া অর্জন ও ধৈর্য ধারণের পাথেয় হিসেবে মহাকল্যাণময় ‘সিয়াম’ সাধনা আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ বিধান।

এ বিধান যারা সুষ্ঠুভাবে পালন করেছে। তাদের দ্বারাই অর্জিত হয়েছে আত্মশুদ্ধির উপায় হিসেবে তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতি এবং ধৈর্যের সোপান। এরাই হচ্ছে মহাভাগ্যবান মহান আল্লাহ তাআলার মুত্তাকী বান্দা। এদের জন্যই মহাপুরস্কার হিসেবে অসীম দয়াময় ও দয়াবান মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেছেন, চিরসুখের, মহা আনন্দের, জান্নাতের অফুরন্ত নিয়ামতের কথা ও তাদের আরামের আসবাবপত্রের ও সুখশয্যার বর্ণনা।

মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই সাফল্যমণ্ডিত সে, যে পবিত্র (যার আত্মাবিশুদ্ধ), সূরা আলা-০৯)। তিনি তার মুত্তাকী বান্দাদের সম্পর্কে আরো বলেন, ‘মুত্তাকীদের জন্য আছে সাফল্য. বাগানসমূহ ও আঙ্গুরসমূহ, সমবয়স্ক উদীপ্ত যৌবনা তরুণী এবং পরিপূর্ণ পানপাত্র।”

(সূরা-নাবা-৩১-৩৪)

আরো ইরশাদ হচ্ছে “তোমরা প্রতিযোগিতা কর, স্বীয় প্রতিপালকের নিকট থেকে ক্ষমা

এবং জান্নাতের জন্য, যার প্রস্থ ‘আসমান ও যমীনের সমান’ যা মুত্তকী বা আল্লাহভীরু বান্দাদের জন্য তৈরি করা হয়েছে।” প্রকৃত রোজাদাররাই মুত্তাকী হিসেবে ভূষিত। কেননা তারা ঈমান ও সওয়াবের আশায় এ কাজ সম্পন্ন করে। তার মহাপ্রভু মহান আল্লাহর ভয়ে রোজা রেখে সকল পাপ ও পাপকার্য ত্যাগ করে। তাই এর প্রতিদান আল্লাহ নিজহাতে দেবেন। সুতরাং রোজার প্রকৃত মূল্য মানুষ ধারণা করতে অক্ষম। রোজার বিনিময়ে এরচেয়ে বড় পাওনা আর হতে পারে না যেখানে প্রিয় নবী (স.) ঘোষণা করেছেন, যে লোক রমজান মাসের রোজা রাখবে ঈমান ও সওয়াবের আশায় তার পূর্ববর্তী গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। (সহীহ বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, আবু দাউদ নাসয়ী, ইবনে মাজাহ)। নবী করীম (স.) আরো বলেছেন, এটা ধৈর্যের মাস এবং ধৈর্যের ফল হচ্ছে জান্নাত। (বায়হাফী)

মাহে রমজানের আগমনের ফলে পৃথিবীতে আল্লাহর রহমত অবারিতভাবে বর্ষিত হতে থাকে। যারাই রোজা রেখেছে, এরা সকলেই আল্লাহর রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত বা মুক্তির নহরে অবগাহন করেছে। এরচেয়ে পাওয়া আর কী হতে পারে।

মজুর যেমন সারাদিন কাজ করার পর আপন মালিকের নিকট হতে মজুরি পেয়ে যায় ঠিক তেমনিভাবে মহান আল্লাহ তাআলা তার খালেছ বান্দা এবং নিখুঁত রোজাদারকে রমজান শেষে নিষ্পাপ করে দেন। এটাই মাহে রমজানের বেহেশতী উপহার। মু’মিনদের পবিত্র আত্মার সান্ত¡না ও প্রশান্তির শুভ সমাচার।
**মাওলানা লুৎফর রহমান ইবনে ইউসুফ**

রোজা মানবদেহকে সুস্থ থাকতে সাহায্য করে

| comments

ইসলাম মহান আল্লাহপাক এবং তার রাসূল (সা.)-এর নির্দেশিত ধর্ম। ইসলামী বিধানের সবকিছুই যে কারণে কল্যাণকর। এক সময় পশ্চিমা চিকিৎসকরা বলতেন, রোজা অসুস্থ মানুষের জন্য ক্ষতিকর। এখন তারা বলেন, রোজা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ইউরোপীয় খ্যাতনামা চিকিৎসক ডা. আর ক্যামফোর্ডের ভাষ্য মতে, আমরা যে খাদ্য গ্রহণ করি তার মধ্যে আমিষ শ্বেতসার ও স্নেহজাতীয় খাদ্য শরীরের মধ্যে পরিপাক হয়ে ক্ষুদ্রান্ত্র থেকে শোষিত হয়। অতঃপর তা গু্লকোজ আকারে যকৃতের মধ্যে প্রবাহিত হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, গ্লুকোজ দেহে তাপ ও শক্তির যোগান দেয়। তারা পরীক্ষা করে দেখেছেন মানবদেহে যে গ্লুকোজ তৈরি হয় তার সবটুকুই খরচ হয় না। যকৃত হতে কিছু গ্লুকোজ রক্তে প্রবাহিত হয়ে মানব শরীরকে কর্মোদ্যোগী রাখে। গ্লুকোজের বাদবাকি অংশ যকৃতের মাংসপেশীতে জমা হয় গ্লাইকোজেন হিসেবে। এই গ্লুকোজের কিছুু অংশ চর্বি জাতীয় পদার্থে পরিণত হয় এবং তা দেহের ত্বকের নিচে এবং অন্যত্র সঞ্চিত হয়। মানুষের শরীরে চর্বির পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া শরীরের ভারসাম্যের জন্য ক্ষতিকর। রোজা রাখলে বা উপবাস করা হলে ওই চর্বি জাতীয় পদার্থ গ্লুকোজ রূপান্তরিত হয়ে রক্তের মধ্যে প্রবাহিত হয়। এই রূপান্তরিত গ্লুকোজ তাপ ও শক্তির দিক থেকে দ্বিগুণ ক্ষমতার অধিকারী। ফলে দেহের সবলতা বৃদ্ধি পায়।
লেখক : আল্লামা সাদেক নূরী, ইসলামী গবেষক

ফিতরায় রোজার অপূর্ণতা দূর হয়

| comments

শেষ দশ দিনের বরকত লাভের জন্য রোজাদাররা ইতিকাফ, শবেকদরের অনুসন্ধানে রাতে রাতে ইবাদত আর তেলাওয়াত ও মোনাজাতে সময় পার করছেন। একইসঙ্গে এ সময়টায় অনেকেই আর্থিক ইবাদত-ফিতরা দান করছেন। ফিতরা মূলত রমজান শেষে ঈদুল ফিতরের সঙ্গে যুক্ত একটি আর্থিক আমল। তবে ঈদের আগেই অভাবি ও গরিব মানুষের হাতে ফিতরার টাকা তুলে দিয়ে তাদের ঈদ-প্রস্তুতিতে সহায়তা করার অবকাশ শরিয়তে রয়েছে। সে হিসেবে রমজানের শেষ দশ দিনে এই আমলটি অনেকেই শুরু করেন। ফিতরা বা সদকাতুল ফিতরের মধ্য দিয়ে ঈদের আনন্দে গরিব, অসহায় মানুষকেও অংশীদার বানানোর ব্যবস্থা বিদ্যমান। এক হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, একদিনের জন্য হলেও গরিব মানুষের অসহায়ত্ব দূর করতে ফিতরা দেয়ার জন্য সচ্ছল মুসলমানদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তাই ফিতরার জন্য বর্ণিত পাঁচ ধরনের খাদ্য খেজুর, পনির, যব, কিশমিশ ও গমের মধ্য থেকে যে কোনো একটির নির্দিষ্ট পরিমাণ উত্তম জিনিস অথবা তার মূল্য ফিতরা হিসেবে দান করতে সচ্ছল মুসলমানদের প্রস্তুত হওয়া কর্তব্য। বর্তমানে গম বা আটার মূল্য ধরেও যে কেউ ফিতরা দিতে পারেন।
সাধারণত বাজারমূল্য ধরে প্রতি বছর ফিতরার সর্বনিম্ন হার প্রচারিত হয়। দেশের অভিজ্ঞ মুফতি এবং দারুল ইফতার পক্ষ থেকে এ হারটির ঘোষণা দেয়া হলেও এটিকে ফিতরার একমাত্র হার মনে করা ঠিক নয়। এটি সর্বনিম্ন হার। যাদের ওপর ফিতরা দেয়া ওয়াজিব, তারা কমপক্ষে এ হারে ফিতরা দেবেন। অপেক্ষাকৃত সচ্ছল ও বিত্তবানরা এর অধিক অঙ্কের হিসাবেও ফিতরা দিতে পারেন। তাদের জন্য সেটাই উত্তম। তবে ফিতরার জন্য হাদিসে বর্ণিত বস্তুগুলো কিংবা সেগুলোর মূল্য বিবেচনা করতে হবে। এক্ষেত্রে মনগড়া কিছু করা ঠিক নয়।
জাকাত ফরজ হয় নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার পর এক বছর পার হলে। ফিতরা ওয়াজিব হয় কেবল ঈদের দিন সকালে নিসাব পরিমাণ সম্পদ হাতে থাকলে। এজন্যই জাকাত ফরজ নয়—এমন অনেকের ওপরও ফিতরা দেয়া ওয়াজিব হয়ে থাকে। ঈদের দিন সকালে যার নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে, তিনি মাহে রমজানের শেষ দিনগুলোতে ফিতরা দিতে পারেন। ঈদের অনুমোদিত আনন্দ-আয়োজনে গরিবদের শরিক করার এই ইসলামী বিধানটিকে গুরুত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করা আমাদের সবার কর্তব্য। হাদিস শরিফের ভাষ্য অনুযায়ী, রমজানের রোজায় মান ও পূর্ণতাগত যেসব বিচ্যুতি সংঘটিত হয়, ফিতরায় তার ক্ষতিপূরণ হয়। ফিতরা তাই যেমন স্বতন্ত্র একটি ইবাদত, তেমনি ঈদের আনন্দে গরিবের পাশে দাঁড়ানো আর রোজার সৌভাগ্য ও পূর্ণতা লাভের এক অনন্য উপায়।

রমজানের মহিমা

| comments

সময়ের সমষ্টিই জীবন; আর জীবনের যাত্রা জš§লগ্ন থেকে শুরু বলে মনে করা হলেও এর সূচনা ‘রুহের জগতে’ সংরক্ষিত রুহুদের সৃষ্টি থেকে। মৃত্যুকে ঘিরে জীবনের সমাপ্তিকাল টানার রীতি প্রচলিত থাকলেও মূলত আত্মার মৃত্যু হয়না কখনও। জীবন চাকা চলছে এবং চলবে অবিরাম। তবে নামের পরিবর্তন ঘটাবে ঘূর্ণায়মান দিনের মত; সকাল, দুপুর, বিকাল, রাত্রি কিংবা আলমে আরওয়াহ, মাতৃগর্ভ, পৃথিবী, কবর, হাশর, জান্নাত বা জাহান্নাম। এ রীতির ভিত্তিতে বলতে হয় ‘মানুষের শেষ নিবাস জান্নাত বা জাহান্নাম’ আর তার নির্ণয়কারী সময় পৃথিবীর স্বল্পকালীন জীবন; তবু বালেগ হওয়া থেকে বৃদ্ধ অবস্থা পর্যন্ত ক্ষণিকের পর্ব। এজন্য মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) দুনিয়ার জীবনকে মুসাফিরের মত পথ চলতে চলতে গাছের ছায়ায় ক্ষণিকের বিশ্রামের সাথে তুলনা করেছেন। এর মাধ্যমেই অসীম চাওয়ার আকাক্সক্ষা। এ সিঁড়ির কোন নির্দিষ্ট মাপ নেই, স্বপ্ন সাগরের কোন নির্দিষ্ট গভীরতা কিংবা ব্যাস-ব্যাসার্ধ নেই; শুধু সামনে চলার ডাকে যেতে হবে, সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হবে, উপরে, আরো উপরে। এর মাধ্যমেই অনন্তকালের পুঁজি সংগ্রহ করতে হবে; আর রোজা তার অন্যতম প্রধান সিঁড়ি। রোজা মুসলমানদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান নিয়ামত। মানুষের কল্যাণের জন্যই রোজার বিধান চালু করা হয়েছে। রোজার মাস কল্যাণ ও সৌভাগ্যে পরিপূর্ণ। তাক্বওয়া ও আর্দশভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের উদ্দেশ্যে রহমত, বরকত ও মাগফেরাতের পয়গাম নিয়ে রমজান এসেছে। মানুষের দেহ ও মনকে সংযমের শাসনে রেখে ইসলামী জীবনের পরিপন্থী যাবতীয় অসামাজিক ও অমানবিক কার্যাবলী বর্জনের মাধ্যমে আল্লাহ তায়লার সন্তুষ্টি লাভ ও তাক্বওয়া অর্জনই রমজানের মূলকথা।

রমজানের ফার্সি প্রতিশব্দ রোজা। এর আরবী প্রতিশব্দ আস্সাওম, এর অর্থ; আত্মসংযম, কঠোর সাধনা, অবিরাম চেষ্টা ও বিরত থাকা।

রমজানের এই মর্যাদা ও গুরুত্ব সর্ম্পকে মহাগ্রন্থ আল কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, রমজান মাস হতে কুরআন নাজিল করা হয়েছে, মানুষের জন্য পথনির্দেশ, সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন এবং হক ও বাতিলের পার্থক্যকারী হিসাবে। (বাকারা:১৮৫) এই আয়াতে দু’টি বিষয় নির্দেশিত হয়েছে। আল-কুরআন নাজিল হয়েছে রমজান মাসে। মানবজাতির পথ নির্দেশিকা হচ্ছে আল-কুরআন। রাসুল (সাঃ) বলেছেন- সকল আসমানী কিতাবসমূহ রমজান মাসে নাজিল হয়েছে। (মুসনাদে আহমাদ) আল-কুরআন রাসুল (সাঃ)-এর উপর নাজিল হয়েছে ক্বদরের রাত্রিতে। পরিপূর্ণ কুরআন নাজিল হতে সময় লাগে দীর্ঘ ২৩ বছর। মূলত: রমজানের গুরুত্ব কুরআনের কারণে।

মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ

ফেতরা সম্পর্কে শরীয়তের বিধান

| comments

রমজানের সিয়ামকে বিভিন্ন প্রকার দোষ থেকে পবিত্র করার জন্য প্রত্যেক সিয়াম পালনকারীকে রমজানের শেষে নির্দিষ্ট হারে কিছু দান করতে হয়। ইসলামী তত্ত্ববিদদের (ফকীহদের) পরিভাষায় ঐ দানের নাম ফেতরা। ফেতরা বলতে আমরা যা বুঝি কুরআন ও হাদীসে ঐ অর্থে ফেতরা শব্দটি কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।ফেতরার বিভিন্ন নাম বিভিন্ন হাদীসে ফেতরাকে সদাকাতুল ফেতর, যাকাতুল ফেতর, যাকাতে রমজান, যাকাতে আবদান (দেহের যাকাত) যাকাতুস সওম ও সদাকাতুর রুউস নামে অভিহিত করা হয়েছে। (আওনুল বারী ৪র্থ খণ্ড-৯৭ পৃঃ) ফেতরার নির্দেশ একটি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সূরায়ে ‘আলা’র আয়াত (কাদ আফলাহা মান তাযাককা) ফেতরার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছিল। (সহীহ ইবনে খুযায়মাহ ৪র্থ খণ্ড ৯০ পৃঃ) এ হাদীস ও অন্যান্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ফেতরা ফরজ। ইমাম নবিবী (রহ.), ইমাম মালেক, ইমাম শাফেঈ ও ইমাম আহমদ (রহ.) এবং সালাফ প্রমুখ (জমহুর) অধিকাংশ ওলামার মতে ফেতরা ফরজ। ইমাম আবু হানীফার (রহ.) মতে ফেতরা ফরজ নয়, ওয়াজিব। (শারহে মুসলিম পৃঃ ঐ মিরআত ৩য় খণ্ড, ৯১ পৃঃ) ফেতরা কাদের উপরে ওয়াজিব? ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) মুসলিম ক্রীতদাস ও স্বাধীন পুরুষ ও নারী, ছোট ও বড় সবার ওপরে রমজানের যাকাতুল ফেতর এক সা’ খেজুর অথবা যব নির্ধারণ করেছেন। (বুখারী, মুসলিম, মেশকাত ১৬০ পৃঃ)

আব্দুল্লাহ ইবনে সা’লাবাহ (রা.) থেকে মরফূ’ভাবে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, তোমরা এক সা’গম আদায় কর প্রত্যেক ব্যক্তির তরফ থেকে সে পুরুষ হোক বা নারী, কিংবা ছোট হোক বা বড় অথবা স্বাধীন হোক বা ক্রীতদাস। ধনী হলে আল্লাহ তাদেরকে পবিত্র করবেন এবং গরীব হলে আল্লাহ তাদেরকে তার চেয়ে বেশি ফেতরা দেবেন যতটা তারা দেবে। (বায়হাকী ৪র্থ খণ্ড ১৬৪-১৬৫ পৃঃ) উক্ত দু’টি রেওয়ায়াত প্রমাণ করে যে, ফেতরা প্রত্যেকের ওপরে ওয়াজিব। ক্রীতদাসের ফেতরা তাকেই দিতে হবে। কারণ রাসুলুল্লাহ (স.) বলেনঃ ক্রীতদাসের ওপর সাদাকাতুল ফেতর ছাড়া আর কোন সাদকা ওয়াজিব নয়। (মুসলিম ১ম খণ্ড ৩১৬ পৃঃ) সে জন্য তার মালিকের কর্তব্য হল ঐ ক্রীতদাসকে তার ফেতরা যোগাড় করার জন্য সুযোগ দেয়া। যদি সে তাকে সুযোগ না দেয় তাহলে মালিককেই তার ফেতরা দিতে হবে। তেমনি দাসীর ফেতরাও তার মালিকের ওপর ওয়াজিব। উক্ত হাদীস দ্বারা বোঝা যায় যে, নারীদের ওপরেও ফেতরা ওয়াজিব। তার স্বামী থাক বা না থাক। ইমাম মালিক, শাফিঈ ও আহমাদ (রহ.) প্রমুখের মতে তার স্বামীর ওপর ফেতরা ওয়াজিব।

ইমাম আবু হানীফার (রহ.) মতে তার স্বামীর উপরে ফেতরা ওয়াজিব নয়। (আওনুল বারী ৪র্থ খণ্ড-১০০ পৃঃ) অবিবাহিতা মেয়ের ফেতরা তার পিতা বা অভিভাবক দেবেন এবং অভিভাবক না থাকলে সে নিজে দেবে। উক্ত হাদীস প্রমাণ করে যে, ছোটদের ওপরেও ফেতরা ওয়াজিব, যদিও সে ইয়াতীম হয়। তার মাল থাকলে তাথেকে তার ওয়ালী (অভিভাবক) ফেতরা দেবে। যদি তার মাল না থাকে তাহলে ওয়ালীকে তার ফেতরা দিতে হবে। নাবালেকের ফেতরা তার পিতার ওপর ওয়াজিব। (মিরআত ৩য় খণ্ড ৯৪ পৃঃ) কারো ফেতরা মাফ আছে কি? সিহাহ সিত্তা এবং বায়হাকী ও তাহাভীর হাদীসে আছে যে, প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর ফেতরা ওয়াজিব। ঐসব হাদীসে বা দুনিয়ার কোন হাদীসে একথার উল্লেখ স্পষ্টভাবে নেই যে, অমুক লোকের ফেতরা মাফ। তাছাড়া ফেতরার কারণ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ওটা হলো সিয়াম পালনকারীদের সিয়াম পবিত্র করার হাতিয়ার ও মিসকিনের খাবার।
হাসান ইলিয়াস

সাহাবীদের রোজা পালন

| comments

সফরের এবং যুদ্ধের মত সংকটময় মুহূর্তেও সাহাবায়ে কিরাম সিয়াম ছাড়তেন না। যেমন আবূ বকর (রা.)-এর যুগে ইমামার যুদ্ধে এক সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাখরামাহ (রা.) সিয়াম অবস্থায় যুদ্ধ করতে করতে খুব আঘাত পেয়ে যমীনে নেতিয়ে পড়েন। তাঁকে দেখে সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) তাঁর কাছে এলেন। তখন যখমে জর্জরিত ও পিপাসায় ব্যাকুলিত ইবনে মাখরামাহ (রা.) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, এমতাবস্থায় সিয়াম ভাঙ্গা যাবে কিনা? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন ইবনে মাখরামাহ (রা.) বললেন তাহলে ভাই! ঢালে করে একটু পানি এনে দাও। ইবনে ওমর (রা.) গেলেন এবং একটি হাওজ থেকে আঁজলভরে চামড়ার ঢালটি ভরলেন। অতঃপর পানি নিয়ে তিনি যখন এলেন তখন ইবনে মাখরামাহ (রা.) যখমে জর্জরিত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। ফলে তিনি রক্তাক্ত দেহে মাটিতে লুটোপুটি খেয়ে শহীদ হয়ে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের কাছে ইফতার করতে গেলেন। (তারীখে বুখারী, ইসা-বাহ- ৩য় খণ্ড ২৬৬ পৃষ্ঠা) আর এক সাহাবী ইবনে আবী হাইয়্যাহ আহমাসী (রা.) একদা সিয়াম অবস্থায় যুদ্ধের মাঠে লড়ছিলেন। ভীষণ যুদ্ধ হচ্ছিল। লড়তে লড়তে তিনি আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পড়লেন। তাঁর সঙ্গীরা তাকে নিজেদের জায়গায় নিয়ে আসলেন। অতঃপর তাঁরা তাঁকে পানি পান করতে দিলেন, কিন্তু সিয়াম ভেঙ্গে যাবে বলে তিনি তা পান করলেন না। কিছুক্ষণ পর তিনি দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন তাঁরই কাছে যাঁর জন্য তিনি সিয়াম রেখেছিলেন। (ইসা-বাহ ফী মা’রি ফাতিস সাহা-বাহ)

সবাই দুনিয়াতে রোজা রাখে এবং দুনিয়াতেই ইফতার করে। কিন্তু এ সাহাবী (রা.) দুনিয়াতে রোজা রেখে আখিরাতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীনের কাছে ইফতার করতে গেলেন। তাই ওমর (রা.) যখন তাঁর শহীদ হবার খবর শুনলেন তখন বললেন, তিনি দুনিয়া দিয়ে আখিরাতকে ক্রয় করে নিয়েছেন।

হায়! আমার সিয়াম ত্যাগকারী ভাইয়েরা এত্থেকে কোন শিক্ষা নেবেন কি? আর তাঁদের সিয়াম রাখার সুমতি হবে কি?

বিশিষ্ট হাদীস বিশারদ হাফেজ ইমাম যাহাবী (রহ.) বলেন, যে ব্যক্তি বিনা অসুখে রমজানের সিয়াম ছেড়ে দেয় বরং তার ইসলাম সম্পর্কে সন্দেহ আছে। লোকেরা তাকে যিনদীক মনে করে। (ফিকহুস সুন্নাহ, ১ম খন্ড-৪৩৪ পৃষ্ঠা)

তিনি (স.) বলেন: আমার উম্মাতকে রমজান মাসে পাঁচটি জিনিস দান করা হয়েছে, যা আমার আগে কোন নাবীকেই দান করা হয়নি। প্রথম এই যে, রমজান মাসের প্রথম রাত যখন আসে তখন আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। আর যার উপর তাঁর দৃষ্টি পড়ে তাকে তিনি কখনো শাস্তি দেবেন না। দ্বিতীয় হল, তাদের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মেশ্কের সুবাসের চেয়ে সুগন্ধ। তৃতীয় হল, ফেরেশতারা তাদের জন্য প্রত্যেক দিন ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে। চতুর্থ হল, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা জান্নাতকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, তুমি আমার বান্দাদের জন্য তৈরী হও এবং সজ্জিত হও। অতি শীঘ্রই তারা দুনিয়ার ক্লান্তি থেকে আমার ঘরে ও আমার সম্মানে স্বস্তি চাইবে। পঞ্চম হল, যখন শেষ রাত আসে তখন তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। একজন সাহাবী জিজ্ঞেস করল, এটা কি ক্বদরের রাত? তিনি বললেন, না। তুমি কি মজদুরদের দেখনি যে, তারা যখন কাজ থেকে অবসর পায় তখন তাদের মজুরি পুরোপুরি প্রদান করা হয়। (বাইহাকীর শুআবুল ঈমান কানযুল উমমা-ল ৩০২ পৃষ্ঠা)

আবূ সাঈদ খুদরীর (রা.) বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (স.) বলেন: নিশ্চয় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে (রমজানের) প্রত্যেক দিনে ও রাতে (জাহান্নাম থেকে) মুক্তি দেয়া অনেক দাস রয়েছে। ওর প্রত্যেক দিন ও রাতে প্রত্যহ মুসলিমের জন্য কবূলযোগ্য একটি দু’আ অবশ্যই রয়েছে। (মুসনাদে বাযযার, সহীহুত তারগীব, ১ম খণ্ড, ৪৯১ পৃষ্ঠা, হাদীস নম্বর-৯৮৮)

বর্জনকারীরাও কাফিরে পরিণত হয়। উক্ত দুই নির্দেশ লঙ্ঘনকারীর হুকুমের বিষয় বিনা ব্যবধানে একই। সালাত দিন ও রাতের কর্তব্য, যা প্রতিদিনে পাঁচবার এবং সিয়াম বাৎসরিক কর্তব্য, যা সারা বছরের মাত্র একবার অপরিহার্য। (বাযলুল মানফাআহ, ৭৮ পৃষ্ঠা)

আবূ ‘উমামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (স.) বলেনঃ একদা আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, একটি সম্প্রদায় উল্টোভাবে ঝুলছে। তাদের গালটি ফাড়া। তা থেকে রক্ত ঝরছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? বলা হয় এরা তারা, রমজান মাসে বিনা ওজরে যারা সিয়াম রাখে না। (সহীহ ইবনে খুযাইমাহ, ৩য় খণ্ড, ২৩৭ পৃষ্ঠা, ইবনে হিব্বান, বাশারাতুল ফোসসাক- ৩৭ পৃষ্ঠা) রাসূলুল্লাহ (স.) বলেনঃ বিনা ওজরে রমজানের সিয়াম ত্যাগকারী অবিশ্বাসীরূপে পরিগণিত। (ফিকহুস সুন্নাহ, ১ম খণ্ড, ৪৩৪ পৃষ্ঠা) যে ব্যক্তি শারীয়তী ওর ছাড়া এ মাসের একটি রোজাও ছেড়ে দিবে সে যদি সারা জীবনও সিয়াম পালন করে তবুও তার পাপের খেসারত হবে না। (বুখারী)।
হোসাইন আল-খালদুন

ই’তিকাফের বিবরণ

| comments

তারাবীহ, সাহারী, ইফতারের পর রমজানের চতুর্থ অবদান ই’তিকাফ। তাই আজ ই’তিকাফ সংক্রান্ত আলোচনা করা হল। আরবী ই’তিকাফ শব্দটি উকূফ ধাতু থেকে নির্গত। উকূফ’ শব্দের শাব্দিক অর্থ কোন জিনিস বা জায়গাকে আঁকড়ে ধরা ও চিমটে থাকা।

(নিহায়াহ ফী গারীবিল হাদীস ৩য় খণ্ড-১৩৬ পৃষ্ঠা) ইসলামী পরিভাষায় ই’তিকাফের অর্থ আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে কোন মসজিদে নিজেকে বন্দী রাখা। (আল মুফরাদা-তু ফী গারীবিল কুরআন-৩য় খণ্ড, ১৩৪ পৃঃ) আল কুরআনের প্রায় আট জায়গায় এ শব্দটি ব্যবহƒত হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেনঃ “আমি ইবরাহীম, ইসমাঈলকে বিশেষ হুকুম দিয়েছি আমার ঘরকে পবিত্র রাখার জন্য তাওয়াফকারী ও ই’তিকাফকারীদের উদ্দেশ্যে।” (সূরা বাকারা ২ ঃ ১২৫ আয়াত) “তোমরা মাসজিদে ই’তিকাফরত অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে মিলিত হবে না।” (সূরা বাকারা ২ ঃ ১৮৭ আয়াত) “তারা তাদের প্রতিমাগুলোকে আঁকড়ে ধরেছিল।” (সূরা আ’রাফ ৭ ঃ ১৩৮ আয়াত) আয়াতগুলো দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, পূর্ববর্তী যুগের বিভিন্ন জাতির নিকট ই’তিকাফ একটি ‘ইবাদাত ছিল। তাই তারা তাদের অলীকে উপাস্যের সামনে ই’তিকাফ করতো। মাক্কার মুশরিকরাও ই’তিকাফ করতো। যেমন ওমর (রা.) একবার নবীকে (স.) বলেন যে, আমি একবার (কাফিরী যুগে) মাসজিদুল হারামে একরাত ই’তিকাফ করবো বলে মানত করেছিলাম। নবী (স.) বললেন: তাহলে তুমি তোমার মানত পূরণ কর। (বুখারী-২৭২ ও ২৭৪ পৃঃ মুসলিম, মিশকাত-১৮৩ পৃঃ) এবং রোযা রাখ। (আবূ দাউদ-১ম খণ্ড, ৩৩৬ পৃ:)

রাসূলুল্লাহ (স.)-এর ই’তিকাফ:রাসূলুল্লাহ (স.) নবী হবার আগে পরপর কয়েকদিন ধরে হেরা পাহাড়ের এক গুহায় ই’তিকাফরত অবস্থায় আল্লাহর ধ্যানে মশগুল থাকতেন। (বুখারী-১ম পৃ:)

নবী হবার পর তিনি (স.) প্রত্যেক রমজানের দশদিন করে ই’তিকাফ করতেন। অতঃপর যে বছরে তিনি ওফাত পান সেই বছরে বিশদিন ই’তিকাফ করেন। (বুখারী-২৭৪ পৃঃ, আবূ দাউদ-১ম খণ্ড-৩৩৪ পৃ:, ইবনে খুযায়মা-৩য় খণ্ড-৩৪৪ পৃ: মিশকাত-১৮৩ পৃ:, বায়হাকী, ৪র্থ খণ্ড, ৩১৪ পৃ:)

কেবল নবী (স.) একা নন, বরং তাঁর ইন্তিকালের পরে তাঁর স্ত্রীরাও ই’তিকাফ করতেন। (বুখারী-২৭১ পৃ:, মুসলিম-১ম খণ্ড-৩৭১ পৃ: আবূ দাউদ-১ম খণ্ড-৩৩৪ পৃ: মিশকাত-১৮৩ পৃ:) এক বছর ই’তিকাফের ব্যাপারে তাঁর সহধর্মিনীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা দেখা দেয়ায় সে বছর তিনি করেননি। কিন্তু ঐ ছাড় যাওয়া ই’তিকাফটি তিনি ঐ বছরেই রমজানের পরের মাসে শাওয়ালের শেষ দশ দিনে কাযা ই’তিকাফ করে দেন। (বুখারী-২৭২, ২৭৩, ও ২৭৪, ইবনে মাজা-১২৮ পৃ:) নবী (স.) প্রত্যেক বছরে রমজানের শেষ দশকে ই’তিকাফ করতেন। অতঃপর এক বছর তিনি ঐ সময়টা সফরে থাকায় ই’তিকাফ করতে পারেননি। তাই পরের বছরে বিশদিন ই’তিকাফ করেন। (সহীহ ইবনে খুযায়মা ৩য় খণ্ড-৩৪৬ পৃ:-ইবনে মাজা-১২৭, মুস্তাদরকে হাকিম, ১ম খণ্ড, ৪৩৯ পৃ: তালখীসুল হাবীর-১৯৩ পৃ: বায়হাকী-৪র্থ খণ্ড-৩১৪ পৃ:) ই’তিকাফের ফজিলত ও মাহাত্ম্য ই’তিকাফকারী সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (স.) বলেনঃ ঐ ব্যক্তি বহু পাপ থেকে বিরত থাকে এবং তাকে এত নেকী দেয়া হয় যত নেকী অন্যান্য সবরকম ভাল কাজের কাজীকে দেয়া হয়। (ইবনে মাজা -১২৮ পৃ:, মিশকাত-১৮৩ পৃ: বায়হাকী, দুররে মনসুর-১ম খণ্ড-২০১ পৃ:) অন্য একটি হাদীসে আছে, রসূলুল্লাহ (স.) বলেন :যে ব্যক্তি রমজানের দশ দিন ই’তিকাফ করলো সে যেন হজ্জ ও দুই ‘উমরা করলো। (বায়হাকী, দুররে মনসুর-১ম খণ্ড,২০২ পৃ:) নবী (স.) বলেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে মাত্র একটি দিন ই’তিকাফ করবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তার এবং জাহান্নামের মাঝে এমন তিনটি গর্ত করে দেবেন যার দূরত্ব আসমান ও যমীনের মধ্যবর্তী ব্যবধানের মত হবে। (তাবারানী আওসাত, হাকিম, বায়হাকী, তারীখে বাগদাদ, তাফসীর দুররে মনসুর-১ম খণ্ড-২০২)

তাবেঈ নেতা হাসান বসরী (রহ.) থেকে বর্ণিত, ই’তিকাফকারীর জন্য প্রত্যেক দিনের বদলে একটি করে হাজ্জের নেকী রয়েছে। (তাবারানী আওসাত, হাকিম, বায়হাকী,তারীখে বাগদাদ, তাফসীর দুররে মনসুর-১ম খণ্ড-২০২)

ই’তিকাফের গুরুত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল প্রিয় নবী (স.)-এর আজীবন ই’তিকাফ করা এবং তাঁর সহধর্মিণীদের প্রতিযোগিতা ও তাঁর সফরের কারণে দুবার তাঁর ই’তিকাফ ছাড় যাওয়ায় ঐ ই’তিকাফ পুনরায় করে দেয়া। সেজন্য সুন্নাতে নববীর প্রত্যেক আশেকের পক্ষে পারতপক্ষে মহানবী (স.)-এর এ সুন্নাত পালন করা উচিত।

ই’তিকাফের জায়গা মাসজিদে হওয়া চাই: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন: তোমরা মাসজিদে ই’তিকাফরত অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে মিলিত হইও না। (সুরা বাকারা ২ঃ ১৮৭ আয়াত) এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, ই’তিকাফ মাসজিদে হবে। (তাফসীর মাযহারী ১ম খণ্ড ২০৮ পৃ:) নাফি’ (রা.) বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) আমাকে মসজিদের (নববীর) সেই বিশেষ জায়গাটি দেখিয়েছেন যেখানে রাসুলুল্লাহ (স.) ই’তিকাফ করতেন। (মুসলিম ১ম খণ্ড ৩৭১ পৃ: আবু দাউদ ১ম খণ্ড ৩৩৪ পৃ:) আয়েশা (রা.) বলেন, সিয়াম ছাড়া ই’তিকাফ নেই। (আবু দাউদ ১ম খন্ড ৩৩৫পৃ:) ইবনে ওমর ও ইবনে আব্বাসও তাই বলেন। (মুসান্নাফ আ: রাযযাক ৪র্থ খন্ড ৩৫৩ পৃ: মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা, ৩য় খণ্ড ৮৭ পৃ: বায়হাকী ৪র্থ খন্ড ৩১৮ পৃ:)

ই’তিকাফ কত প্রকার ও কত সময়: বিভিন্ন হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, ইতিকাফ তিন রকম:

১। ওয়াজিব, ২। সুন্নাত ৩। নফল। কেউ যদি মানত করে যে, সে ই’তিকাফ করবে তাহলে ঐ ইতিকাফ তার উপর ওয়াজিব হয়ে যাবে। যেমন নবী (স.) বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের মানত করে সে যেন তা অবশ্যই পূরণ করে। (বুখারী মিশকাত ২৯৭ পৃ:) এ ওয়াজিব পালন না করলে তাকে কসম ভঙ্গের শরয়ী জরিমানা দিতে হয় যেমন রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, মানতের জরিমানা কসম ভঙ্গেরই জরিমানা। (মুসলিম, মিশকাত ২৯৭) । তাই ওমর (রা.) যখন নবীকে (স.) জিজ্ঞস করেন যে, আমি জাহেলী যুগে একবার মসজিদুল হারামে এক রাত ই’তিকাফ করার মানত করেছিলাম তখন (স.) বললেন: তাহলে তুমি তোমার মানত পূরণ কর। (বুখারী, মুসিলম, মিশকাত ১৮৯ পৃ:)

ফলে তিনি একরাত ই’তিকাফ করলেন। (বুখারী-২৭৪ পৃ:) এ ওয়াজিব ইতিকাফের কোন নির্দিষ্ট সীমা নেই। মানতকারী যতক্ষণের মানত করবে ওর সময়সীমা ততক্ষণ হবে। (ফিকহুস সুন্নাহ ১ম খন্ড-৪৭৬ পৃ:)।

সুন্নাতী ই’তিকাফ: ‘আয়েশা (রা.) বলেন, নবী (স.) রমজানের শেষ দশ দিন ই’তিকাফ করতেন পরিশেষে আল্লাহ তাঁকে ওফাত দেন। তারপর তাঁর সহধর্মিনীগণও ই’তিকাফ করতেন। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত-১৮৩ পৃ:) কেবল তাঁর ওফাতের বছরে তিনি (স.) বিশ দিন ই’তিকাফ করেছিলেন। (বুখারী-২৭৪ পৃ: মিশকাত-১৮৩ পৃ:, আবূ দাউদ ১ম খণ্ড-৩৩৪ পৃ:) এ হাদীসটি প্রমাণ করে যে, সুন্নাতী ই’তিকাফের সময়সীমা কমপক্ষে দশদিন এবং এর বেশি হলে বিশ দিন।

ই’তিকাফের শুরু ও শেষ কখন: মুস্তাহাব ই’তিকাফের জন্য ই’তিকাফের জায়গায় প্রবেশের কোন নির্দিষ্ট সময় নেই। ই’তিকাফকারী যখন আল্লাহর নৈকট্যলাভের উদ্দেশ্যে মাসজিদে ঢুকবে সে তখন থেকেই ই’তিকাফকারীরূপে গণ্য হবে যতক্ষন না সে মাসজিদে থেকে বের হয়। (ফিকহুস সুন্নাহ ১ম খন্ড ৪৭৯ পৃ:) কিন্তু কেউ যদি রমজানের শেষ দশকে ই’তিকাফের ইচ্ছা করে তাহলে সে সূর্য ডোবার একটু আগে ই’তিকাফের খাস জায়গায় প্রবেশ করবে। ই’তিকাফরত অবস্থায় ই’তিকাফকারীর উচিত খুব বেশী নফল ইবাদাত করা। যেমন-সালাত, তেলাওয়াতে কুরআন, বিভিন্ন রকম তাসবীহ, তওবা ও এস্তেগফার, নবীর উপরে দরূদ ও দু’আ প্রভৃতি কাজের মধ্য মগ্ন থাকা। যাতে করে আল্লাহর নৈকট্য পাওয়া যায় এবং স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়ে উঠে! এরই মধ্যে গণ্য হবে ধর্মীয় কিতাব পড়া, কুরআন ও হাদীস চর্চা করা, নবী ও সৎ লোকের জীবনীগ্রন্থ অধ্যয়ন করা প্রভৃতি কাজ। (ফিকহুস সুন্নাহ ১ম খন্ড-৪৮০ পৃ:) আত্মগর্ব নয় বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যদি ই’তিকাফকারী কাউকে কুরআন পড়ায়, দীনী শিক্ষা দেয় ও হাদীস লেখে তাহলে তা চলবে। (আলমুগনী ৪র্থ খণ্ড-২০৪ পৃ:) ই’তিকাফকারীর মাথা আঁচড়ানো, নখ-চুল কাটা, ময়লা থেকে দেহকে পরিচ্ছন্ন রাখা, খুশবু মাখা ও ভাল ভাল কাপড় চোপড় পরাতে কোন আপত্তি নেই। যেমন ‘আয়েশা (রা.) বলেন, রসূলুল্লাহ (সা.) মসজিদে ই’তিকাফরত অবস্থায় আমাকে তাঁর মাথাটা এগিয়ে দিতেন। আমি হুজরার ফাঁক দিয়ে তাঁর মাথাটা ধুয়ে দিতাম। মুসাদ্দাদের বর্ণনায় আছে, আমি তাঁর মাথা আঁচড়ে দিতাম। (বুখারী, মুসলিম, আবূ দাউদ, ফিকহুস সুন্নাহ ১ম খন্ড-৪৮১ পৃ:)

গ্রন্থনা:

০০ মাওলানা জাকির হোসাইন আজাদী

লাইলাতুল ক্বদরের মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য

| comments

মানুষের প্রতি আল্লাহর যত করুণা ও অনুগ্রহ রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত ও অনুগ্রহ হলো বান্দার জন্যে এমন একটি মহান রাতকে নির্দিষ্ট করা, যে একটি রাতেই তিনি বান্দাহকে হাজার মাসে যতটুকু সওয়াব দিবেন তার চেয়ে বেশী সওয়াব দিবেন। সেই রাতটি হলো লাইলাতুল ক্বদর বা শবে ক্বদর।

রমজান নামক যে সম্মানিত মেহমান আমাদের নিকট এসেছে তা শুধু আসেনি বরং নিয়ে এসেছে সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার ক্বদরের রাত্রি। যে রাত্রি অতি পবিত্র ও বরকতময়। এই রাত্রিতেই নাযিল হয়েছে সারা বিশ্ব জাহানের মানবের পথ প্রদর্শক, জীবন বিধান আল কোরআন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনে সূরা ক্বদরে ঘোষণা করেছেন; আমি পবিত্র কোরআন ক্বদর তথা মর্যাদাবান রাতে নাযিল করেছি। আপনি কি জানেন ক্বদর রাত্রি কি? ক্বদর রাত্রি হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এ রাত্রে অবতীর্ণ হয় ফেরেশতাগণ ও রুহ, প্রতিটি কাজই তাদের প্রতিপালকের হুকুম মোতাবেক সম্পাদিত হয়। ফজর পর্যন্ত সব কিছু থাকে শান্তিময়।

ক্বদরের রাতের মর্যাদা ও মর্তবা মানুষের ধারণাতীত। উল্লেখিত সূরায় ক্বদরের রাত্রিকে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলা হয়েছে। অর্থাৎ এই রাত্রিটি ৮৩ বছর ৪ মাসের সমান মর্যাদাবান। এই রাত্রিতে জাগরণ করে ইবাদত করলে ৮৩ বছরের চেয়েও বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে। এমনিভাবে হাজার মাস ৩০ হাজার দিনের সমান। সুতরাং এই দিনে যদি কেউ একটি টাকা দান করে, তাহলে সে ৩০ হাজার টাকার সমান সওয়াব পাবে।

হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, একবার রমজান মাসের আগমনে রাসূল (সা.) বললেন, দেখ! এ মাসটি তোমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে। এতে এমন একটি রাত আছে, যেটি হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যে এর কল্যাণ হতে বঞ্চিত হল সে যাবতীয় কল্যাণ হতেই বঞ্চিত হল। আর চিরবঞ্চিত ব্যক্তিই কেবল এর সুফল হতে বঞ্চিত হয়। (ইবনে মাজাহ) কুরআন হাদীস ও নির্ভরযোগ্য ইতিহাস গ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি যে, অন্যান্য নবী ও তাদের উম্মতদের হায়াৎ ছিল পাঁচশ, হাজার বছর। তারা দীর্ঘ এই জীবনে অনেক ইবাদত বন্দেগী করার সুযোগ পায়। কিন্তু হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর উম্মতদের হায়াৎ ৫০ থেকে ১০০ বছর কিংবা তার কিছু বেশি। ইবাদতের জন্য পূর্ববর্তীদের তুলনায় খুব অল্প সময়। কিন্তু উম্মতে মুহাম্মদীর ইবাদতের সময় অল্প হলেও তাদের জীবনে আল্লাহতায়ালা এমন কতিপয় দিন বা রাত্রি নির্ধারণ করে দিয়েছেন যেসব দিন বা রাত্রিতে ইবাদত বন্দেগী করলে বহুগুণ বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। ইবনে জারীর (র.) অপর একটি ঘটনা এভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বনি ইসরাঈলের জনৈক ইবাদতকারী ব্যক্তি সমস্ত রাত্রি ইবাদতে মশগুল থাকত ও সকাল হতেই জিহাদের জন্য বের হয়ে যেত এবং সারাদিন জিহাদে লিপ্ত থাকত। সে এক হাজার মাস এভাবে কাটিয়ে দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই আল্লাহতায়ালা সূরা কদর নাজিল করে এ উম্মতের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। এ থেকে আরও প্রতীয়মান হয় যে, শবেক্বদর উম্মতে মুহাম্মাদীরই বৈশিষ্ট্য। (মা’আরেফুল কোরআন)

ক্বদরের রাতে ইবাদত বন্দেগী করলে আল্লাহপাক তার জন্য দোজখের আগুন হারাম করে দেন। এ প্রসঙ্গে রাসুলে করীম (সা:) বলেন, যে ব্যক্তি ক্বদরের রাতে ইবাদত বন্দেগী করবে, করুণাময় আল্লাহপাক তার উপর দোজখের আগুন হারাম করে দিবেন। হাদীস শরীফে আরও আছে রাসুল (সা:) বলেছেন, শবে ক্বদরে হযরত জিব্রাইল (আ:) অগণিত ফেরেশতা সঙ্গে নিয়ে পৃথিবীতে তারপর তারা প্রত্যক্ষ করতে থাকে যে,উম্মতে মুহাম্মাদীর মধ্যে কে এই পবিত্র রাতে ইবাদত বন্দেগীর মধ্যে নিমগ্ন রয়েছে। আর এই সকল ইবাদতগুজার বান্দাদের সঙ্গে ফেরেশতাগণ মুসাফাহ করেন এবং রাত্রি প্রভাত হওয়া পর্যন্ত ইবাদতকারীগণ করুণাময় আল্লাহপাকের দরবারে যে সকল মুনাজাত করেন উক্ত ফেরেশতাগণ তাদের সঙ্গে আমীন বলতে থাকেন। অন্য এক হাদীসে এসেছে,হযরত (সা:) বলেন, উক্ত তারিখে যে কেউ (মুসলমান) রাতে (ইবাদতের উদ্দেশ্যে) জাগ্রত থাকবে আমি তাকে বেহেশতে প্রবেশ করাবার জামিন থাকব।
লেখক: ড.মুহাম্মাদ মতিউর রহমান
সহকারী অধ্যাপক, আরবী বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সাহারী ও সেহরী শব্দের বিশ্লেষণ

| comments

আরবী সাহরুণ অর্থ রাতের শেষ ভাগ। যেমন আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন বলেন নাজ্জাইনাহুম বিসাহারিন অর্থাৎ আমি তাদের (লূত নবীর পরিবারবর্গকে) রাতের শেষ ভাগে মুক্তি দিয়েছিলাম। (সূরা কামার ৫৪ঃ ৩৪ আয়াত, তফসীর ইবনে কাসীর ৪র্থ খণ্ড, ২৬৬ পৃষ্ঠা)

একটি হাদীসে প্রিয় নবী (সা:) বলেন, আমাদের এবং আহলে কিতাবদের সিয়ামের মধ্যে পার্থক্য আকলাতুস সাহারী বা শেষ রাতের খাওয়া। (মুসলিম ১ম খণ্ড, ৩৫০ পৃঃ, তিরমিযী, ১ম খণ্ড, ৮৯ পৃঃ, আবূ দাউদ ১ম খণ্ড ৩২০ পৃঃ মিশকাত, ১৭৫ পৃঃ)। উক্ত আয়াত ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সিয়াম রাখার উদ্দেশ্যে ভোর রাতে যে পানাহার করা হয় তাকে সাহারী বলা হয়। ঐ উচ্চারণটা ‘সেহরী’ কিংবা ‘সাহ্রী’ ঠিক নয়। কারণ সেহরুণ শব্দের অর্থ জাদু, ধোঁকা প্রভৃতি। যেমন কুরআনে আছে, ইয়ালামুনা নাসাস সেহ্রা” তারা লোকদেরকে জাদু শেখাত। সূরা বাকারা ২ঃ ১০২ আয়াত)

আর সাহরুণ শব্দের অর্থ ফুসফুস, বুকের উপর ভাগ, কণ্ঠনালীর নি¤œভাগ প্রভৃতি। যেমন একটি হাদীসে আছে ‘আয়িশা (রা:) বলেন, নবী (সা:) আমার বুক ও কণ্ঠনালীর মাঝে মারা গিয়েছিলেন। (আননিহা-য়াহ ফী গালীবিল হাদীস ওয়াল আ-সার, ২য় খণ্ড, ১৬১ পৃঃ)

আল্লাহর রাসূল (সা:) বলেন, তোমরা সাহারী খাও কারণ সাহারীর মধ্যে বরকত রয়েছে। (বুখারী, মুসলিম)

তিনি (সা:) বলেন, আহলে কিতাব অর্থাৎ ইয়াহূদী-খৃষ্টান ও আমাদের সিয়ামের মধ্যে পার্থক্যই হল সাহারী খাওয়া (মুসলিম, মিশাকাত, ১৭৫ পৃঃ) সিয়াম ও রামাযান

এ দু’টি হাদীস প্রমাণ করে, যারা সাহারী না খেয়ে সিয়াম রাখে তাদের সিয়াম এবং ইয়াহূদী ও নাসারাদের সিয়ামের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকে না। আর যারা সাহারী না খায় সেই সিয়াম পালনকারী ব্যক্তি বরকত থেকেও বঞ্চিত হয়। সুতরাং যারা সিয়াম রাখেন তাদেরকে সাহারী অবশ্যই খেতে হবে। যদি কেউ একথা বলেন যে, ইফতারের পর ভাত খেলে বা অন্য কোন কারণে তার পেট ভরে থাকে তার সাহারী খাবার ইচ্ছা মোটেই হয় না। কিংবা সাহারী খেলে বদ হজম হয় বা অন্য কোন অসুবিধা দেখা দেয় তাহলে তিনি ইয়াহূদী ও নাসারা না হবার স্বার্থে ইফতারের পর কিছু খাবেন না, বরং কেবল সাহারীতে খাবেন। কারো যদি কোন কারণে এক আধ দিন সাহারী খাবার রুচি না হয় তাহলে তিনি অন্ততঃপক্ষে একটা খেজুর ও এক ঢোক পানি সাহারীর নিয়্যাত করে খেয়ে নিবেন। যাতে করে ইয়াহূদী ও নাসারার সাথে মিল না হয় এবং তিনি এ বরকত থেকেও বঞ্চিত না হন।
**হোসাইন আল খালদুন**

সিয়াম সাধনা

| comments

মাহে রমজানের রোজা হলো গুনাহ মাফ করার, মাগফেরাত লাভের তথা চির শান্তি, চির মুক্তি লাভের একটি সুনিশ্চিত ব্যবস্থা, একটি নির্ভরযোগ্য সুযোগ। প্রিয় নবী করিম (স.) এরশাদ করেছেন মিথ্যা এবং পরনিন্দা রোজার গুণগত মানকে নষ্ট করে দেয়। অতএব রোজার হেফাজত করতে হবে মিথ্যা, গীবত (পরনিন্দা) অন্যায় অশ্লীলতা প্রভৃতি পাপাচারকে বর্জনের মাধ্যমে।

মাহে রমজানে আল্লাহর হেদায়াত, মাগফেরাত ও রহমত লাভের জন্য আমাদেরকে সর্বদা সচেষ্ট হতে হবে। ফজিলতের দিক থেকে আলেমগণ রমজান মাসকে তিনটি অংশে বিভক্ত করেছেন। রমজানের প্রথম অংশ রহমত অর্থাৎ এই অংশ আল্লাহ নিয়ামত ও পুরস্কার তার সেই সকল বান্দাদের সুরা ইব্রাহিমের ৭ নং আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এরশাদ করেছেন “তোমরা শোকর আদায় করলে অবশ্যই আমি নেয়ামত ও পুরস্কার বাড়িয়ে দিব”। অর্থাৎ হে আল্লাহ আমরা আপনার রহমত বেশী বেশী করে চাই। রমজান মাসের মাঝের দশদিন মাগফেরাতের অর্থাৎ গুনাহমাফের সময়। দয়াময় প্রভু তার বান্দাদের প্রতি সদয় হয়ে রোজার প্রতিদান স্বরূপ ক্ষমা করেন। অতএব আমাদের সেই সুযোগ গ্রহণ করে এস্তেগফার অর্থাৎ তওবা বা কৃত অন্যায়ের জন্য আল্লাহর দরবারে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে বেশী বেশী করে তওবা করতে হবে ও ভবিষ্যতে এমন অন্যায় না করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করতে হবে। বেশী করে পড়বো “আলাহুম্মা ইন্নাকা আ’ফুউন তুহিব্বুল আ’ফওয়া ফা’ফুআন্নি” অর্থঃ হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমাকে অপনি ভালবাসেন। তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন।

তাছাড়া “আসতাগ ফিরুল্লাহ” অর্থাৎ আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আলাহর নিকট বেশী বেশী করে পড়তে হবে এবং অন্তর থেকে এর অর্থের প্রতি ধ্যান রেখে পড়তে হবে।

রমজানের শেষ দশদিন নাজাতের অর্থাৎ দোজখ ও তার আগুন থেকে পরিত্রাণ বা মুক্তি লাভের সুযোগ। আর তাই আমরা দোজখ ও এর বীভৎস আগুন থেকে পানাহ চাইবো ও বেহেশত কামনা করবো। অতএব, রমজানে বেশী বেশী করে জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করা ও কোরআন তেলাওয়াত, এস্তেগফার, দরুদ ও নফল এবাদত করা উচিত। রমজান মাসে আল্লাহর স্মরণকারী ব্যক্তি ক্ষমাপ্রাপ্ত হয় এবং এই মাসে আল্লাহর নিকট দোয়াকারী ব্যক্তি ব্যর্থ হয় না। নবী (স.) এরশাদ করেছেন “রোজাদার ইফতারের সময়ে যে দোয়া করে, আল্লাহ পাক তা কবুল করেন। তাই প্রতিদিন বিশেষ করে ইফতারের সময় অধিক পরিমাণে দোয়া করা রোজাদারের কর্তব্য। আল্লাহ পাক বলেছেন, “রোজা আমার জন্য আর আমি এর প্রতিদান দিব।” অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভই হবে এর সত্যিকার প্রতিদান যা রোজদার লাভ করবে।

দুর্ভাগা সেই ব্যক্তি যে রোজা রেখেও তার ভেতরের কু-প্রবৃত্তিকে দমনে ব্যর্থ হলো ও অন্যায় অবিচারে লিপ্ত থাকলো তার রোজার সাধনা ব্যর্থ হলো এবং উদ্দেশ্য বিনষ্ট হলো। প্রিয় নবী (স.) এরশাদ করেছেন যে রোজাদার রোজা রেখে মিথ্যা কথা ও অন্যায় পাপাচার থেকে বিরত থাকে না তার রোজা আল্লাহ পাকের কোন প্রয়োজন নেই। আর তাই আমাদের সকলের প্রচেষ্টা থাকবে পবিত্র রমজান মাসে আমরা আমাদের ভিতরের কু-প্রবৃত্তিকে দমনে সচেষ্ট হই। আমরা জানি না আগামী রমজান আমাদের ভাগ্যে আসবে কিনা। তাই এই রমজানকে জীবনের শেষ রমজান মনে করে রমজানের পরিপূর্ণ ফায়দা অর্জনে সচেষ্ট হই। যাবতীয় অকল্যাণকর কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করে আল্লাহ পাকের অনন্ত অসীম রহমতের যোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারি এবং এ উদ্দেশ্যেই যেন আমরা আমাদের রোজাব্রত পালন করতে পারি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনে সফল হতে পারি। -আমীন
**এ্যাডভোকেট খালেদা সিদ্দিকা**

সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় রমজান

| comments

ইসলাম অর্থ শান্তি ও আত্ম সমর্পণ। মহান স্রষ্টা, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানব জাতির জন্য ইসলামী জীবন বিধান দান করেছেন তাদের শান্তির জন্য। কিন্তু এই শান্তি কখনই লাভ করা যাবে না যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ উক্ত জীবন বিধানের কাছে নিজেকে সমর্পণ না করে। অর্থাৎ ইসলামের বিধানকে বাস্তব জীবনে অনুসরণ বা বাস্তবায়িত না করে। শান্তির পথ অনুশীলনের এক শ্রেষ্ঠ পন্থা হলো সিয়াম সাধনা। এই অনুশীলনের শিক্ষাকে অনুসরণ করতে হবে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, জাতীয়, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক তথা পার্থিব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। আর তা করলেই শুধু জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে মানব জীবনে শান্তি আসতে পারে। আর এই শান্তি পেতে হলে মানুষ তথা সকল সৃষ্টিকে ভালবাসতে হবে। জানতে ও বুঝতে হবে যে মহান স্রষ্টা এ পৃথিবীর সবকিছু সৃষ্টি করেছেন মানুষের জন্য। বলেছেন: তিনিই (মহান স্রষ্টা) তোমাদের (মানুষের) জন্য সবকিছু সৃষ্টি করেছেন (২:২৯) আর মানুষকে সৃষ্টি করেছেন খলীফা বা স্থলাভিষিক্তরূপে, পৃথিবীর সকল কার্য পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে মানুষকে। তাইতো মানুষ হলো খলীফা। তারা পৃথিবীতে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করবে মানবপ্রেম তথা সৃষ্টি প্রেমের মাধ্যমে। বর্তমান ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ অশান্ত পৃথিবীর দিকে তাকালে কি মনে হয় যে খলীফারূপে মানুষ তার দায়িত্ব পালন করছে? দায়িত্ব পালন করছে না বলেই পৃথিবীতে এতো অশান্তি।

এই অশান্তি প্রশান্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে। যদি মানুষ মহান স্রষ্টা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দেয়া বিধানের শুধু কথা না বলে বাস্তব জীবনে তা রূপায়িত করে।

আর পথ হলো সামাজিক জীবনে মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, শ্রদ্ধাবোধ, স্নেহ, মমতা, সহনশীলতা ও ভালবাসা। আর পারস্পরিক সম্প্রীতি, সংযম ও মানবতাবোধের গুণাবলী অর্জন এবং হিংস্রতা ও পাশবিকতা বর্জন করার জন্যই মহান স্রষ্টা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সিয়াম সাধনা বা রমজানের মাস দিয়েছেন। তাইতো আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) বলেছেন: ‘‘যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া করে না আল্লাহ তার প্রতি দয়া করেন না।” এখানে জাতি, ধর্র্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রতি দয়া ও ভালবাসার কথা বলা হয়েছে। জগতে সবাই কোন না কোন ধর্মালম্বী বলে দাবি করে, সকল ধর্মই ন্যায় নীতি, মানবিক মূল্যবোধ ও মানব প্রেমের কথা বলে। কোন ধর্মই হিংসা বিদ্বেষ, ঝগড়া, বিবাদ, সন্ত্রাস, যুদ্ধ তথা অশান্তির শিক্ষা দেয় না। সকল ধর্মই মানবপ্রেম, সৃষ্টি প্রেম তথা শান্তির পথ নির্দেশনা দেয়, তারপরও পৃথিবীতে সন্ত্রাস ও অশান্তি কেন? বুঝা গেল সবাই ধর্ম তথা মানবতার কথা বলে কিন্তু অতি নগণ্যসংখ্যক ছাড়া বাকী সবাই বাস্তবে মানে না। যদি পৃথিবীর সকল মানুষ নিজ নিজ ধর্ম বাস্তব জীবনে রূপায়িত করত তাহলে এ পৃথিবীটা শান্তির নীড় হতো। তাইতো পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন: তোমরা এমন কথা কেনো বলো যা তোমরা নিজেরাই করো না। আল্লাহর নিকট এটা অত্যন্ত গর্হিত কাজ যে তোমরা যা বলো তা নিজেরাই করো না। বর্তমানে আমাদের দেশে, তথা সমগ্র বিশ্বে মানব সমাজের অধিকাংশই এই জটিল রোগে আক্রান্ত। সবাই বক্তৃতা বা উপদেশ দিতে সিদ্ধহস্ত যদিও বক্তা বা উপদেশদাতার মধ্যে তার বাস্তবায়ন সুদূর পরাহত।

কবি বলেছেনঃ ‘দরদে দিলকে লিয়ে পয়দা কিয়া ইনসানকো ওয়ারনা ইবাদৎ কে লিয়ে কুচ কম না থে কাররামিয়া’ অর্থাৎ মানুষের কষ্ট ও ব্যথা-বেদনা নিরসনের জন্যই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে (এরই মাধ্যমে তারা আল্লাহর ইবাদত করবে) না হয় মহান আল্লাহর ইবাদতের জন্য তো ফেরেশতাগণই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু বাস্তবে কী হচ্ছে? বিশ্বের প্রতি তাকালে যে দৃশ্য পরিলক্ষিত হয় তা বড়ই করুণ, বড়ই হƒদয়বিদারক। দেশে দেশে জাতিতে জাতিতে তথা সমগ্র বিশ্বে কলহ, বিবাদ, দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ, বিগ্রহ চলছে। সামান্যতম স্বার্থের জন্যে মানুষ মানুষকে হত্যা করতে মানব মনে একটুও মমত্ববোধ আসছে না। রং-এর বৈপরীত্য, ধর্মের বৈপরীত্য, ভাষায় ও মানসিকতার বৈপরীত্যের কারণে মানুষ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করছে। একে অপরের সম্পদ ও সম্ভ্রম লুটে নিচ্ছে। অথচ মানব হƒদয়ে একটুও কম্পন বা কষ্ট অনুভব হচ্ছে না। ইরাক, লেবানন, চেচনিয়া ও কাশ্মীরসহ বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যে পৈশাচিকতার হোলি খেলা চলছে তা দেখে যার হƒদয়ে সামান্যতম মানবিক মমত্ববোধ আছে তার হƒদয়ের কম্পন ও অশ্রু নির্গত না হয়ে পারে না।

এমন হলো কেন? মানুষের প্রতি মানুষ এমন নির্দয় নিষ্ঠুর আচরণ করছে কেন? আসলে এসব অমানসিক ও অমানবিক চরিত্রের জন্যে কলংকজনক ঘটনা সংঘটিত হয় এবং হচ্ছে বাস্তবতা সম্পর্কে অজ্ঞতা ও বাস্তবতাকে অবজ্ঞা করার কারণে। অত্যাচারী, নির্দয় ও নিষ্ঠুর ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি একটু ভেবে দেখে যে আজ থেকে শত বছর পূর্বে তার বা তাদের অস্তিত্ব এ পৃথিবীতে ছিল না, আবার এখন থেকে শত বছর পরও তার বা তাদের অস্তিত্ব এ পৃথিবীতে থাকবে না, এই বাস্তব সত্যকে উপলব্ধি করলে মানব মন থেকে তো অন্যায়, অবিচার ও পাপ পংকিলতার ভাব দূর হওয়া উচিত।

[লেখক: প্রফেসর ড. আ.ন.ম. রইছ উদ্দিন
সাবেক চেয়ারম্যান, ইস: স্টাডিজ বিভাগ, ঢা.বি।]

রোজা ফরজ ইবাদত

| comments

মানুষের আত্মশুদ্ধি ও আত্মোন্নয়নের ক্ষেত্রে রোজার সাথে মানবিক প্রশিক্ষণের বিশেষ সম্পর্ক ও সম্পৃক্ততা রয়েছে। আত্মার প্রশিক্ষণ ও আত্মশুদ্ধির কাজ রোজা ব্যতীত পূর্ণ হতে পারে না। সকল প্রকার আরাম-আয়েশ ও মানবীয় দুর্বলতা, সকল প্রকার অপবিত্রতা, কপটতা, মিথ্যা, পরনিন্দা, ব্যভিচার, প্রবঞ্চনা, অত্যাচার, অশ্লীলতা অর্থাৎ সকল প্রকার পাপ কাজ আত্মশুদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রত্যাহার করাই খোদাভিরুর সাথে অন্তর্ভুক্ত। যখন অন্তরে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হয়, তখন বান্দার অন্তরের ভেতর আল্লাহর একত্ববাদের গভীর বিশ্বাস জš§ায়। তখনই সকল প্রকার পাপ কার্য বর্জন করে। আল্লাহর প্রতিটি বিধান মেনে নেয়া সহজ হয়।

হিজরতের দ্বিতীয় বর্ষে রোজা ফরজ করা হয়। ইসলামের পাঁচটি রোকনের মধ্যে তৃতীয় রোকন হল রোজা। রোজা শব্দটি ফার্সি শব্দ থেকে এসেছে। এর প্রতিশব্দ হল সাওম। সাওমের আভিধানিক অর্থ থেমে যাওয়া, বিরত রাখা। শরীয়তের পরিভাষায় মহান আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়ত সহকারে পানাহার, পাপাচার ও কামাচার থেকে বিরত থাকার নামই সিয়াম বা রোজা।

ইসলাম এত বড় গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতকে বিশেষ ব্যক্তিবর্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায়নি। রোজার ব্যাপারে ইসলাম সাম্যের নীতি গ্রহণ করেছে। এখানে নারী-পুরুষ, ধনী-গরীব, বাদশাহ- ফকির সকলের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে।

রোজায় আল্লাহর প্রেমে অন্তর উদ্ভাসিত হয়ে বান্দার দেহ-মনে এক অনাবিল শান্তি অনুভূত হয়। বান্দা বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ সর্বশক্তিমান ও সর্বত্র বিরাজমান। বান্দার অন্তরে যখন এই বিশ্বাস সৃষ্টি হয় তখন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য নিজের সকল ক্ষুধা-তৃষ্ণা, লোভ-লালসা দমন পূর্বক রোজা রাখে। রোজা মানুষের ভেতরের অবস্থাকে পরিবর্তন করে তার স্বভাবকে সুন্দর করে গড়ে তোলার সহায়ক। দুনিয়ার লোভ-লালসা ও অতিরিক্ত সম্পদ অর্জনের আকাক্সক্ষা হতে দূরে সরায়ে রাখে। আত্মার যথেচ্ছার অবস্থাকে পরিপূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়। মুসলিম শরীফের হাদিসে রোজার মাসকে ধৈর্যের মাস বলা হয়েছে। কোরআন ঘোষণা করেছে, “যারা ধৈর্য ধারণ করেছে তাদেরকে পরিপূর্ণ পুণ্য প্রদান করেন।” আল্লাহর প্রতি যার যত বিশ্বাস ঈমানী শক্তিও তত প্রবণ। এই বিশ্বাস নিয়ে বান্দা যখন সিয়াম সাধনা করে তার পুণ্যও তত বেশি হবে। আল্লাহর নির্দেশে পানাহার থেকে বিরত থাকা, সংযমী হওয়া একমাত্র ঈমানদার ব্যক্তির পক্ষেই সম্ভব। গোপনে পানাহার করে বাইরে রোজাদার ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করলেও মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দৃষ্টিকে ফাঁকি দেয়ার কোনো উপায় নেই। আল্লাহর ওপর দৃঢ় বিশ্বাসই বান্দাকে সংযত রাখে একান্ত গোপন স্থানেও। সিয়াম সাধনার মাধ্যমেই এই বিশ্বাস শক্তিশালী রূপ ধারণ করে। মানুষ কামনা বাসনা ত্যাগ করে বিভিন্ন ক্লেশ ও যন্ত্রণা সহ্য করে বান্দা যখন এখলাছের সাথে রোজা রাখে তখন সে অবশ্যই সৌভাগ্যবান।

সিয়াম সাধনার দাহনে বান্দার পাপ পঙ্কিলতা পুড়ে ছাই হয়ে যায়, আত্মার কালিমা দূর হয়ে যায়, মুমিনদের হৃদয় আলোকিত হয়। রোজা আল্লাহর নির্দেশাবলীর মধ্যে আনুগত্যের একটি কঠিন অঙ্গিকার।
**আলী হায়দার**

সাহারী ইফতারের মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য

| comments

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন দয়া ও করুণার আধার। তিনি কখনই চান না তার কোন বান্দাকে শাস্তি দিতে। বরং তিনি সবসময় চান তার বান্দাদেরকে পাপমুক্ত করে জান্নাত লাভের উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে। সেজন্য তিনি ক্ষমা লাভের অবাধ সুযোগ দিয়েছেন প্রতি বছর রমজানুল মোবারকের মাধ্যমে। এর মধ্যে ইফতার ও সাহারী অন্যতম অবদান। নিম্নে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-


ইফতার: রসূল (স.) বলেনঃ কেউ যদি রমজান মাসে কোন রোজাদারকে ইফতার করায় তাহলে ঐ ইফতার করানোটা তার গুনাহ মাফের ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হবে এবং সে একটি রোজার সওয়াব পাবে অথচ রোজা পালনকারীর নেকী মোটেই কমানো হবে না। সাহাবীরা বলেন, হে আল্লাহর রসূল (স.) আমাদের এমন সংস্থান নেই, যা দিয়ে আমরা কাউকে ইফতার করাতে পারি? তিনি (স.) বলেন, আল্লাহ তাকেও এই সওয়াব দেবেন, যে ব্যক্তি কোনো রোজা পালনকারীকে এক ঢোক দুধ অথবা একটা শুকনো খেজুর কিংবা এক চুমুক পানি দিয়েও ইফতার করাবে আর যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে পরিতৃপ্তিসহকারে খাওয়াবে আল্লাহ তাকে আমার “হাউজে কাওছার” থেকে এমনভাবে পানি পান করাবেন যার ফলে সে জান্নাতে না পৌঁছানো পর্যন্ত আর তৃষ্ণার্ত হবে না। (বায়হাকী ওয়াবুল ঈমান, মেশকাত ১৭৪ পৃষ্ঠা)


আল্লাহর রসুল (স.) বলেনঃ লোকেরা ততক্ষণ কল্যাণে থাকবে যতক্ষণ তারা ইফতার জলদি করবে। (বুখারী, মুসলিম ১ খণ্ড-৩২১ পৃঃ মিশকাত ১৭৫ পৃঃ) আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেনঃ আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় সেই বান্দা যে ইফতার সঠিক সময়ে করে। (তিরমিযী ১ম খণ্ড, ৮৮ পৃঃ, মেশকাত ১৭৫ পৃঃ) সমস্ত নবীরও স্বভাব ছিল ইফতারে দেরী না করা। (তাবারানী কাবীর, মাজমাউজ যাওয়ায়িদ ২য় খণ্ড,. ১০৫ পৃঃ) এ হাদীসগুলো প্রমাণ করে যে, ইফতারের নির্দিষ্ট সময় থেকে দেরী করা মোটেই উচিত নয়। যদি কেউ ইচ্ছা করে ইফতারে দেরী করে তাহলে সে রসূলুল্লাহ (স.)-এর নির্দেশ অনুযায়ী কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবে এবং আল্লাহর নিকট অপ্রিয় হবে। সুতরাং এ ব্যাপারে আমাদের সচেতন হওয়া উচিত।


আব্দুল্লাহ ইবনে আবী আওফ (রা.) বলেন, একবার আমরা (রমজানে) আল্লাহর রসূল (স.)-এর সাথে সফরে ছিলাম (তখন তিনি রোজা অবস্থায় ছিলেন)। অতঃপর (সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর) তিনি একজন সাহাবীকে বললেন, নামো এবং আমার জন্য ছাতু গুলে দাও। সাহাবী (সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর) লালিমা দেখে বলল, হে আল্লাহর রসূল (স.) ঐ যে সূর্য (দেখা যায়) তিনি (তাঁর কথায় কান না দিয়ে) আবার বললেন, তুমি নামো এবং আমার জন্য ছাতু গুলো। এভাবে তিনবার বললেন। অতঃপর তিনি (বেলাল রা.) নামলেন এবং রসূলুল্লাহ (স.)-এর জন্য ছাতু গুললেন। তিনি তা পান করলেন। তারপর তিনি পূর্বদিকে ইশারা করে বললেন, যখন তোমরা দেখবে যে, রাত ঐ দিক থেকে আসছে তখন বুঝবে সিয়াম পালনকরীর ইফতারের সময় হয়ে গেছে। (বুখারী ২৬০ পৃঃ মুসলিম ১ম খণ্ড ৩৫১ পৃঃ)


নবী (সঃ) মাগরিবের সালাত কখন পড়তেন সে সম্পর্কে রাফে ইবনে খাদীজ (রা.) বলেন, আমরা রসূলুল্লাহ (স.)-এর সাথে মাগরিবের সালাত পড়তাম। তারপর আমরা কেউ তীর ছুঁড়লে সেই তীর পড়ার জায়গাটা দেখতে পেতাম। (বুখারী, মুসলিম, মেশকাত ৬০ পৃঃ) এ হাদীসটি প্রমাণ করে যে, নবী (স.)-এর মাগরিবের সালাত পড়ার পরও আলো থাকতো। একটু অন্ধকার হোক বলে তিনি মোটেই দেরী করতেন না। আনাস (রা.) বলেন, নবী (স.) মাগরিবের সালাতের আগেই ইফতার করতেন। (তিরমিযী, আবূ দাউদ, মেশকাত ১৭৬ পৃঃ) অন্য বর্ণনায় আছে, তিনি (স.) ইফতার না করা পর্যন্ত মাগরিবের সালাত পড়তেন না। যদিও তার ইফতার এক ঢোক পানি দিয়েও হতো। (সহীহ ইবনে খুযায়মা ৩য় খণ্ড, ২৭৬ পৃঃ) এ হাদীস দুটি প্রমাণ করে যে, মাগরিবের সালাত পড়ার আগে ইফতার করতে হবে। রসূল (স.) বলেন, আমার উম্মত ততক্ষণ আমার সুন্নাত ও নিয়মের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে যতক্ষণ তারা ইফতারের জন্য তারকা উদয়ের অপেক্ষা করবে না। (ইবনে খুযায়মা ৩য় খণ্ড, ২৭৫ পৃঃ)


রসুলুল্লাহ (স.) বলেনঃ রমজানের প্রত্যেক রাতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বহু জাহান্নামীকে মুক্তি দেন (তিরমিযী ১ম খন্ড ৮৬ পৃ, আহমাদ, মেশকাত ১৭৩পৃঃ) । অন্য হাদীস দ্বারা জানা যায় যে, জাহান্নাম থেকে মুক্তি বিশেষ করে ইফতারের সময় হয়। (ইবনে মাজাহ ১২০পৃঃ, মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৪র্থ খণ্ড ১৭৬পৃঃ) রোজাদারের দু’আ সম্পর্কে নবী (স.) বলেনঃ সিয়াম পালনকারীর দু’আ ফেরত দেয়া হয় না। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা ৩য় খন্ড, ৭ম পৃঃ) অন্য হাদীসে বলা হয়েছে যে, বিশেষ করে ইফতারের সময় তা রদ হয় না। যেমন তিনি (স.) বলেন, ইফতারের সময়ে দু’আ খুব তাড়াতাড়ি কবুল হয়। (বায়হাকী) উল্লেখিত হাদীসগুলো আমাদের শিক্ষা দেয় যে, ইফতারের সামগ্রী সাজাতে কিংবা মিসওয়াক করতে অথবা আজেবাজে গল্পগুজবে সময় নষ্ট না করে ইফতারের ১০/১৫ মিনিট আগে ইফতারের খাদ্যদ্রব্য নিয়ে বসা এবং দু’আ তাসবীহ পাঠে রত হওয়া দরকার। এ সময় আল্লাহ তায়ালা যেহেতু প্রতিদিন অসংখ্য জাহান্নামীকে মুক্তি দেন। সে কারণে প্রার্থনারত রোজাদারগণ জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে যেতে পারেন। হাদীসে খেজুর ও পানি দিয়ে ইফতার শুরু করার কথা বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে ইবনে কাইয়্যেম (রহ.) বলেন, খালি পেট মিষ্টি জিনিস পছন্দ করে এবং এর দ্বারা তা শক্তি সঞ্চয় করে। বিশেষ করে দৃষ্টিশক্তি এর দ্বারা সবল হয়। তাই খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করতে বলা হয়েছে। পানির ব্যাপার হলো রোজা রাখার ফলে পেটের মধ্যে শুষ্কতা সৃষ্টি হয়। পানি দ্বারা তা সতেজ হয়। এজন্য একজন ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত ব্যক্তির উচিত খাওয়া শুরু করার আগে সামান্য পানি পান করা, তারপর খাওয়া শুরু করা। আর তা যদি খেজুর ও পানি দিয়ে হয় তাহলে হƒদয়কে সুস্থ করার ব্যাপারে একটা বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। (যাদুল মা’আদ ১ম খণ্ড, ১৬০পৃঃ)


সাহারী:নবী (স.) বলেন, তোমরা দিনে শুয়ে রাতের সালাতের জন্যে এবং সাহারী খেয়ে দিনে রোজা রাখার জন্যে সাহায্য গ্রহণ কর। (ইবনে মাজা, ১২৩ পৃঃ, ইবনে খুযায়মা, ৩য় খণ্ড, ২১৪ পৃঃ মুসান্নাফ আঃ রাযযাক, ৪র্থ খণ্ড, ২২৯পৃঃ) নবী (স.) এও বলেন- তোমরা সাহারী খাও, যদিও তা এক ঢোক পানি হয়। (মুসান্নাফ আঃ রাযযাক, ৪র্থ খণ্ড, ২২৮ পৃঃ ইবনে আবী শায়বা ৩য় খণ্ড. ৮ম পৃঃ) অথবা একটা খেজুর হয় কিংবা কিসমিসের দানা হয়। (তাবারানী, আওনুল বারী ৪র্থ খণ্ড, ৩২১পৃঃ) কারণ, যারা সাহারী খায় তাদের ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয় এবং ফেরেশতারা তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করে। (আহমাদ, নায়লুল আওতার ৪র্থ খণ্ড, ১০৫ পৃঃ, ইবনে হিব্বান, তালখীসুল হাবীর ১৯৩ পৃঃ) রসুল (স.) তার সাহাবীদের বললেন, তোমরা এটাকে মোটেই ছেড়ো না । (মুসনাদে আহমাদ, নাসাঈ ১ম খণ্ড, ২৩৫)


সামুরাহ ইবনে জুনদুব (রা.) বলেন, রসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন ঃ বেলালের আজান তোমাদেরকে সাহারী খেতে কখনই যেন বাধা না দেয় (মুসলিম, তিরমিযী, মেশকাত, ৬৬ পৃঃ) ইবনে ওমর (রা.)-এর বর্ণনায় নবী (স.) বলেন ঃ বেলাল রাতে (সাহারী খাবার) আজান দেয়। তাই তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত খাও এবং পান কর যতক্ষণ ইবনে উম্মে মাখতুমের (ফজরের) আজান শুনতে না পাও। (বুখারী, মুসলিম, মেশকাত ৬৬ পৃষ্ঠা, নাসাঈ ১ম খণ্ড, ৭৫পৃঃ)


যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) বলেন, আমরা রসুলুল্লাহ (স.)-এর সাথে সাহারী খেতাম, তারপরে সালাতে দাঁড়াতাম। কেউ যায়েদকে জিজ্ঞেস করলেন, সাহারী ও ফজরের নামাজের মধ্যে কত সময়ের পার্থক্য থাকতো? তিনি বলেন, ৫০টি আয়াত পড়ার সময় পরিমাণ। (বুখারী ২৫৭ পৃঃ, মুসলিম ১ম খণ্ড ৩৫০ পৃঃ, ইবনে মাজাহ ১২৩পৃঃ) সাধারণতঃ ৫০টি মধ্যম শ্রেণীর আয়াত পড়তে ১৫/২০ মিনিট সময় লাগে। তাই প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহর রসুল (স.) ও সাহাবায়ে কেরাম ফজরের নামাজের মাত্র ১৫/২০ মিনিট আগে সাহারী খাওয়া শেষ করতেন। অতএব আমাদেরও উচিত রসুলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নত পালনার্থে ফজরের সালাতের ১৫/২০ মিনিট আগে সাহারী খাওয়া শেষ করা। দেরী করে সাহারী খাওয়ার ব্যাপারে নবী (স.) বলেন ঃ নবুওতের ৭০ ভাগের এক ভাগ হলো দেরীতে সাহারী খাওয়া এবং ইফতারে জলদি করা। ইফতারের নির্দিষ্ট সময় হলে ইচ্ছা করে বিলম্ব না করা। (মুসান্নাফ আঃ রাযযাক, ৪র্থ খন্ড, ২৩২ পৃঃ) সমস্ত নবীদেরই আদর্শ ছিল ইফতারে তাড়াতাড়ি এবং সাহারীতে দেরী করা। (মুসান্নাফ আঃ রাযযাক, ৪র্থ খণ্ড, ২৩২ পৃঃ ইবনে আবী শায়বা, ৩য় খণ্ড, ১৩ পৃঃ নাসবুর রা-য়াহ ২য় খণ্ড, ৪৭০ পৃঃ)


এজন্যই নবী (স.) সাহারীর খাবারকে বরকতময় প্রভাতী খাবার নামে অভিহিত করেছেন। (আবু দাউদ, নাসাঈ, মেশকাত, ১৭৬ পৃঃ ইবনে খুযাইমা ৩য় খণ্ড, ২১৪পৃঃ ইবনে আবী শায়বা, ৩য় খণ্ড ৯পৃঃ)


গ্রন্থনা


মাওলানা জাকির হোসাইন আজাদী
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. ইসলামী কথা - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Premium Blogger Template