السلام عليكم

যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার (তওবা) করবে আল্লাহ তাকে সব বিপদ থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেবেন। [আবূ দাঊদ: ১৫২০; ইবন মাজা: ৩৮১৯]

দাজ্জাল

| comments

দাজ্জালের আগমণ, ফিতনাসমূহ এবং বাঁচার উপায়

আখেরী যামানায় কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে মিথ্যুক দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে। দাজ্জালের আগমণ কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার সবচেয়ে বড় আলামত। মানব জাতির জন্যে দাজ্জালের চেয়ে অধিক বড় বিপদ আর নেই। বিশেষ করে সে সময় যে সমস্ত মুমিন জীবিত থাকবে তাদের জন্য ঈমান নিয়ে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। সমস্ত নবীই আপন উম্মাতকে দাজ্জালের ভয় দেখিয়েছেন। আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)ও দাজ্জালের ফিতনা থেকে সতর্ক করেছেন এবং তার অনিষ্ট থেকে বাঁচার উপায়ও বলে দিয়েছেন। ইবনে উমার (রাঃ) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণনা করেনঃ “একদা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাড়িয়ে আল্লাহর যথাযোগ্য প্রশংসা করলেন। অতঃপর দাজ্জালের আলোচনা করতে গিয়ে বললেনঃ আমি তোমাদেরকে তার ফিতনা থেকে সাবধান করছি। সকল নবীই তাদের উম্মাতকে দাজ্জালের ভয় দেখিয়েছেন। কিন্তু আমি তোমাদের কাছে দাজ্জালের একটি পরিচয়ের কথা বলব যা কোন নবীই তাঁর উম্মাতকে বলেন নাই। তা হলো দাজ্জাল অন্ধ হবে। আর আমাদের মহান আল্লাহ অন্ধ নন।

নাওয়াস বিন সামআন (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সকাল বেলা আমাদের কাছে দাজ্জালের বর্ণনা করলেন। তিনি তার ফিতনাকে খুব বড় করে তুলে ধরলেন। বর্ণনা শুনে আমরা মনে করলাম নিকটস্থ খেজুরের বাগানের পাশেই সে হয়ত অবস্থান করছে। আমরা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর নিকট থেকে চলে গেলাম। কিছুক্ষণ পর আমরা আবার তাঁর কাছে গেলাম। এবার তিনি আমাদের অবস্থা বুঝে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমাদের কি হলো? আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যেভাবে দাজ্জালের আলোচনা করেছেন তা শুনে আমরা ভাবলাম হতে পারে সে খেজুরের বাগানের ভিতরেই রয়েছে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ দাজ্জাল ছাড়া তোমাদের উপর আমার আরো ভয় রয়েছে। আমি তোমাদের মাঝে জীবিত থাকতেই যদি দাজ্জাল আগমণ করে তাহলে তোমাদেরকে ছাড়া আমি একাই তার বিরুদ্ধে ঝগড়া করবো। আর আমি চলে যাওয়ার পর যদি সে আগমণ করে তাহলে প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজেকে হেফাযত করবে। আর আমি চলে গেলে আল্লাহই প্রতিটি মুসলিমকে হেফাযতকারী হিসেবে যথেষ্ট ।[1]

দাজ্জালের আগমণের সময় মুসলমানদের অবস্থাঃ

দাজ্জালের আগমণের পূর্ব মুহূর্তে মুসলমানদের অবস্থা খুব ভাল থাকবে। তারা পৃথিবীতে শক্তিশালী এবং বিজয়ী থাকবে। সম্ভবতঃ এই শক্তির পতন ঘটানোর জন্যই দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে।

দাজ্জালের পরিচয়ঃ

দাজ্জাল মানব জাতিরই একজন হবে। মুসলমানদের কাছে তার পরিচয় তুলে ধরার জন্যে এবং তার ফিতনা থেকে তাদেরকে সতর্ক করার জন্যে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার পরিচয় বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। মুমিন বান্দাগণ তাকে দেখে সহজেই চিনতে পারবে এবং তার ফিতনা থেকে নিরাপদে থাকবে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার যে সমস্ত পরিচয় উল্লেখ করেছেন মুমিনগণ তা পূর্ণ অবগত থাকবে। দাজ্জাল অন্যান্য মানুষের তুলনায় স্বতন্ত্র বৈশিষ্টের অধিকারী হবে। জাহেল-মূর্খ ও হতভাগ্য ব্যতীত কেউ দাজ্জালের ধোকায় পড়বেনা।

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাজ্জালকে স্বপ্নে দেখে তার শারীরিক গঠনের বর্ণনাও প্রদান করেছেন। তিনি বলেনঃ দাজ্জাল হবে বৃহদাকার একজন যুবক পুরুষ, শরীরের রং হবে লাল, বেঁটে, মাথার চুল হবে কোঁকড়া, কপাল হবে উঁচু, বক্ষ হবে প্রশস্ত, চক্ষু হবে টেরা এবং আঙ্গুর ফলের মত উঁচু।[2] দাজ্জাল নির্বংশ হবে। তার কোন সন্তান থাকবেনা ।[3]

দাজ্জালের কোন্‌ চোখ কানা থাকবে?

বিভিন্ন হাদীছে দাজ্জালের চোখ অন্ধ হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। কোন কোন হাদীছে বলা হয়েছে দাজ্জাল অন্ধ হবে। কোন হাদীছে আছে তার ডান চোখ অন্ধ হবে। আবার কোন হাদীছে আছে তার বাম চোখ হবে অন্ধ। মোটকথা তার একটি চোখ দোষিত হবে। তবে ডান চোখ অন্ধ হওয়ার হাদীছগুলো বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে।[4] মোটকথা দাজ্জালের অন্যান্য লক্ষণগুলো কারো কাছে অস্পষ্ট থেকে গেলেও অন্ধ হওয়ার বিষয়টি কারো কাছে অস্পষ্ট হবেনা।

দাজ্জালের দু’চোখের মাঝখানে কাফের লেখা থাকবেঃ

তাছাড়া দাজ্জালকে চেনার সবচেয়ে বড় আলামত হলো তার কপালে কাফের كافر)) লেখা থাকবে।[5] অপর বর্ণনায় আছে তার কপালে (ك ف ر) এই তিনটি বর্ণ লেখা থাকবে। প্রতিটি মুসলিম ব্যক্তিই তা পড়তে পারবে।[6] অপর বর্ণনায় আছে শিক্ষিত-অশিক্ষত সকল মুসলিম ব্যক্তিই তা পড়তে পারবে।[7] মোটকথা আল্লাহ মু’মিনের জন্যে অন্তদৃষ্টি খোলে দিবেন। ফলে সে দাজ্জালকে দেখে সহজেই চিনতে পারবে। যদিও ইতিপূর্বে সে ছিল অশিক্ষিত। কাফের ও মুনাফেক লোক তা দেখেও পড়তে পারবেনা। যদিও সে ছিল শিক্ষিত ও পড়ালেখা জানা লোক। কারণ কাফের ও মুনাফেক আল্লাহর অসংখ্য সুস্পষ্ট দলীল-প্রমাণ দেখেও ঈমান আনয়ন করেনি।[8]

দাজ্জালের ফিতনাসমূহ ও তার অসারতাঃ

আদম সৃষ্টি থেকে কিয়ামত পর্যন্ত মানব জাতির জন্য দাজ্জালের চেয়ে বড় ফিতনা আর নেই। সে এমন অলৌকিক বিষয় দেখাবে যা দেখে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়বে। দাজ্জাল নিজেকে প্রভু ও আল্লাহ হিসেবে দাবী করবে। তার দাবীর পক্ষে এমন কিছু প্রমাণও উপস্থাপন করবে যে সম্পর্কে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আগেই সতর্ক করেছেন। মুমিন বান্দাগণ এগুলো দেখে মিথ্যুক দাজ্জালকে সহজেই চিনতে পারবে এবং আল্লাহর প্রতি তাদের ঈমান আরো বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু দুর্বল ঈমানদার লোকেরা বিভ্রান্তিতে পড়ে ঈমান হারা হবে।

দাজ্জাল নিজেকে রাব্ব বা প্রভু হিসেবেও দাবী করবে। ঈমানদারের কাছে এ দাবীটি সুস্পষ্ট দিবালোকের মত মিথ্যা বলে প্রকাশিত হবে। দাজ্জাল তার দাবীর পক্ষে যত বড় অলৌকিক ঘটনাই পেশ করুক না কেন মুমিন ব্যক্তির কাছে এটি সুস্পষ্ট হবে যে সে একজন অক্ষম মানুষ, পানাহার করে, নিদ্রা যায়, পেশাব-পায়খান করে। সর্বোপরি সে হবে অন্ধ। যার ভিতরে মানবীয় সব দোষ-গুণ বিদ্যমান সে কিভাবে রব্ব ও আল্লাহ হতে পারে!! একজন সত্যিকার মুমিনের মুমিনের বিশ্বাস হলোঃ মহান আল্লাহ সর্বপ্রকার মানবীয় দোষ-ত্রুটি হতে সম্পূর্ণ মুক্ত। কোন সৃষ্টজীবই তার মত নয়। আল্লাহকে দুনিয়ার জগতে কোন মানুষের পক্ষে দেখাও সম্ভব নয়।

দাজ্জাল বর্তমানে কোথায় আছে?

ফাতেমা বিনতে কায়স (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি মসজিদে গমণ করে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর সাথে নামায আদায় করলাম। আমি ছিলাম মহিলাদের কাতারে। তিনি নামায শেষে হাসতে হাসতে মিম্বারে উঠে বসলেন। প্রথমেই তিনি বললেনঃ প্রত্যেকেই যেন আপন আপন জায়গায় বসে থাকে। অতঃপর তিনি বললেনঃ তোমরা কি জান আমি কেন তোমাদেরকে একত্রিত করেছি? তাঁরা বললেনঃ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ আমি তোমাদেরকে এ সংবাদ দেয়ার জন্যে একত্রিত করেছি যে তামীম দারী ছিল একজন খৃষ্টান লোক। সে আমার কাছে আগমণ করে ইসলাম গ্রহণ করেছে। অতঃপর সে মিথ্যুক দাজ্জাল সম্পর্কে এমন ঘটনা বলেছে যা আমি তোমাদের কাছে বর্ণনা করতাম। লাখ্‌ম ও জুযাম গোত্রের ত্রিশ জন লোকের সাথে সে সাগর পথে ভ্রমণে গিয়েছিল। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার শিকার হয়ে এক মাস পর্যন্ত তারা সাগরেই ছিল। অবশেষে তারা সাগরের মাঝখানে একটি দ্বীপে অবতরণ করলো। দ্বীপের ভিতরে প্রবেশ করে তারা মোটা মোটা এবং প্রচুর চুল বিশিষ্ট একটি অদ্ভুত প্রাণীর সন্ধান পেল। চুল দ্বারা সমস্ত শরীর আবৃত থাকার কারণে প্রাণীটির অগ্রপশ্চাৎ নির্ধারণ করতে সক্ষম হলোনা। তারা বললঃ অকল্যাণ হোক তোমার! কে তুমি? সে বললোঃ আমি সংবাদ সংগ্রহকারী গোয়েন্দা। তারা বললোঃ কিসের সংবাদ সংগ্রহকারী? অতঃপর প্রাণীটি দ্বীপের মধ্যে একটি ঘরের দিকে ইঙ্গিত করে বললোঃ হে লোক সকল! তোমরা এই ঘরের ভিতরে অবস্থানরত লোকটির কাছে যাও। সে তোমাদের কাছ থেকে সংবাদ সংগ্রহ করার জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। তামীম দারী বলেনঃ প্রাণীটি যখন একজন লোকের কথা বললোঃ তখন আমাদের ভয় হলো যে হতে পারে সে একটি শয়তান। তথাপিও আমরা ভীত হয়ে দ্রুত অগ্রসর হয়ে ঘরটির ভিতরে প্রবেশ করলাম। সেখানে প্রবেশ করে আমরা বৃহদাকার একটি মানুষ দেখতে পেলাম। এত বড় আকৃতির মানুষ আমরা ইতিপূর্বে আর কখনও দেখিনি। তার হাত দু’টিকে ঘাড়ের সাথে একত্রিত করে হাঁটু এবং গোড়ালীর মধ্যবর্তী স্থানে লোহার শিকল দ্বারা বেঁধে রাখা হয়েছে। আমরা বললামঃ মরণ হোক তোমার! কে তুমি? সে বললোঃ তোমরা আমার কাছে আসতে সক্ষম হয়েছ। তাই আগে তোমাদের পরিচয় দাও। আমরা বললামঃ আমরা একদল আরব মানুষ নৌকায় আরোহন করলাম। সাগরের প্রচন্ড ঢেউ আমাদেরকে নিয়ে একমাস পর্যন্ত খেলা করলো। অবশেষে তোমার দ্বীপে উঠতে বাধ্য হলাম। দ্বীপে প্রবেশ করেই প্রচুর পশম বিশিষ্ট এমন একটি জন্তুর সাক্ষাৎ পেলাম, প্রচুর পশমের কারণে যার অগ্রপশ্চাৎ চেনা যাচ্ছিলনা। আমরা বললামঃ অকল্যাণ হোক তোমার! কে তুমি? সে বললোঃ আমি সংবাদ সংগ্রহকারী গোয়েন্দা। আমরা বললামঃ কিসের সংবাদ সংগ্রহকারী? অতঃপর প্রাণীটি দ্বীপের মধ্যে এই ঘরের দিকে ইঙ্গিত করে বললোঃ হে লোক সকল! তোমরা এই ঘরের ভিতরে অবস্থানরত লোকটির কাছে যাও। সে তোমাদের নিকট থেকে সংবাদ সংগ্রহ করার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। তাই আমরা তার ভয়ে তোমার কাছে দ্রুত আগমণ করলাম। হতে পার তুমি একজন শয়তান- এভয় থেকেও আমরা নিরাপদ নই। সে বললোঃ আমাকে তোমরা ‘বাইসান’ সম্পর্কে সংবাদ দাও। আমরা তাকে বললামঃ বাইসানের কি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছো? সে বললোঃ আমি তথাকার খেজুরের বাগান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছি। সেখানের গাছগুলো এখনও ফল দেয়? আমরা বললামঃ হ্যাঁ। সে বললোঃ সে দিন বেশী দূরে নয় যে দিন গাছগুলোতে কোন ফল ধরবেনা। অতঃপর সে বললোঃ আমাকে বুহাইরাতুত্‌ তাবারীয়া সম্পর্কে সংবাদ দাও। আমরা তাকে বললামঃ বুহাইরাতুত্‌ তাবারীয়ার কি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছো? সে বললোঃ আমি জানতে চাই সেখানে কি এখনও পানি আছে? আমরা বললামঃ তথায় প্রচুর পানি আছে। সে বললোঃ অচিরেই তথাকার পানি শেষ হয়ে যাবে। সে পুনরায় বললোঃ আমাকে যুগার নামক ঝর্ণা সম্পর্কে সংবাদ দাও। আমরা তাকে বললামঃ সেখানকার কি সম্পর্কে তুমি জানতে চাও? সে বললোঃ আমি জানতে চাই সেখানে কি এখনও পানি আছে? লোকেরা কি এখনও সে পানি দিয়ে চাষাবাদ করছে? আমরা বললামঃ তথায় প্রচুর পানি রয়েছে। লোকেরা সে পানি দিয়ে চাষাবাদ করছে। সে আবার বললোঃ আমাকে উম্মীদের নবী সম্পর্কে জানাও। আমরা বললামঃ সে মক্কায় আগমণ করে বর্তমানে মদীনায় হিজরত করেছে। সে বললোঃ আরবরা কি তার সাথে যুদ্ধ করেছে? বললামঃ হ্যাঁ। সে বললোঃ ফলাফল কি হয়েছে? আমরা তাকে সংবাদ দিলাম যে, পার্শ্ববর্তী আরবদের উপর তিনি জয়লাভ করেছেন। ফলে তারা তাঁর আনুগত্য স্বীকার করে নিয়েছে। সে বললঃ তাই না কি? আমরা বললাম তাই। সে বললোঃ তার আনুগত্য করাই তাদের জন্য ভাল। এখন আমার কথা শুন। আমি হলাম দাজ্জাল। অচিরেই আমাকে বের হওয়ার অনুমতি দেয়া হবে। আমি বের হয়ে চল্লিশ দিনের ভিতরে পৃথিবীর সমস্ত দেশ ভ্রমণ করবো। তবে মক্কা-মদীনায় প্রবেশ করা আমার জন্য নিষিদ্ধ থাকবে। যখনই আমি মক্কা বা মদীনায় প্রবেশ করতে চাইবো তখনই ফেরেশতাগণ কোষমুক্ত তলোয়ার হাতে নিয়ে আমাকে তাড়া করবে। মক্কা-মদীনার প্রতিটি প্রবেশ পথে ফেরেশতাগণ পাহারা দিবে।

হাদীছের বর্ণনাকারী ফাতেমা বিনতে কায়েস বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাতের লাঠি দিয়ে মিম্বারে আঘাত করতে করতে বললেনঃ এটাই মদীনা, এটাই মদীনা, এটাই মদীনা। অর্থাৎ এখানে দাজ্জাল আসতে পারবেনা। অতঃপর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মানুষকে লক্ষ্য করে বললেনঃ তামীম দারীর হাদীছটি আমার কাছে খুবই ভাল লেগেছে। তার বর্ণনা আমার বর্ণনার অনুরূপ হয়েছে। বিশেষ করে মক্কা ও মদীনা সম্পর্কে। শুনে রাখো! সে আছে সাম দেশের সাগরে (ভূমধ্য সাগরে) অথবা আরব সাগরে। তা নয় সে আছে পূর্ব দিকে। সে আছে পূর্ব দিকে। সে আছে পূর্ব দিকে। এই বলে তিনি পূর্ব দিকে ইঙ্গিত করে দেখালেন। ফাতেমা বিনতে কায়েস বলেনঃ “আমি এই হাদীছটি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর নিকট থেকে মুখস্থ করে রেখেছি।[9]

দাজ্জালের যে সমস্ত ক্ষমতা দেখে মানুষ বিভ্রান্তিতে পড়বেঃ

ক) একস্থান হতে অন্য স্থানে দ্রুত পরিভ্রমণঃ নাওয়াস বিন সামআন থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে দাজ্জালের চলার গতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “দ্রুতগামী বাতাস বৃষ্টিকে যেভাবে চালিয়ে নেয় দাজ্জালের চলার গতিও সে রকম হবে।[10] তিনি আরো সংবাদ দিয়েছেন যে মক্কা ও মদীনা ব্যতীত পৃথিবীর সমস্ত অঞ্চল সে পরিভ্রমণ করবে। মক্কা ও মদীনার সমস্ত প্রবেশ পথে ফেরেশতাগণ তলোওয়ার হাতে নিয়ে পাহারা দিবে।

খ) দাজ্জালের সাথে থাকবে জান্নাত-জাহান্নামঃ দাজ্জালের সাথে জান্নাত এবং জাহান্নাম থাকবে। প্রকৃত অবস্থা হবে সম্পূর্ণ বিপরীত। দাজ্জালের জাহান্নামের আগুন প্রকৃতপক্ষে সুমিষ্ট পানি এবং জান্নাত হবে জাহান্নামের আগুন। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ “দাজ্জালের সাথে যা থাকবে তা আমি অবগত আছি। তার সাথে দু’টি নদী প্রবাহিত থাকবে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে একটিতে সুন্দর পরিস্কার পানি দেখা যাবে। অন্যটিতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা যাবে। যার সাথে দাজ্জালের সাক্ষাৎ হবে সে যেন দাজ্জালের আগুনে ঝাপ দিয়ে পড়ে এবং সেখান থেকে পান করে। কারণ উহা সুমিষ্ট পানি। তার চোখের উপরে মোটা আবরণ থাকবে। কপালে কাফের লেখা থাকবে। মূর্খ ও শিক্ষিত সকল ঈমানদার লোকই তা পড়তে সক্ষম হবে ।[11]

গ) দাজ্জাল মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করবেঃ দাজ্জাল তার কর্মকান্ডে শয়তানের সহযোগীতা নিবে। শয়তান কেবল মিথ্যা ও গোমরাহী এবং কুফরী কাজেই সাহায্য করে থাকে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ দাজ্জাল মানুষের কাছে গিয়ে বলবেঃ আমি যদি তোমার মৃত পিতা-মাতাকে জীবিত করে দেখাই তাহলে কি তুমি আমাকে প্রভু হিসেবে মানবে? সে বলবে অবশ্যই মানব। এ সুযোগে শয়তান তার পিতা-মাতার আকৃতি ধরে সন্তানকে বলবেঃ হে সন্তান! তুমি তার অনুসরণ কর। সে তোমার প্রতিপালকমুমিন।[12] হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই।

ঘ) জড় পদার্থ ও পশুরাও দাজ্জালের ডাকে সাড়া দেবেঃ দাজ্জালের ফিতনার মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে পরীক্ষা করবেন। দাজ্জাল আকাশকে আদেশ দিবে বৃষ্টি বর্ষণ করার জন্যে। আকাশ তার আদেশে বৃষ্টি বর্ষণ করবে। যমিনকে ফসল উৎপন্ন করতে বলবে। যমিন ফসল উৎপন্ন করবে। চতুষ্পদ জন্তুকে ডাক দিলে তারা দাজ্জালের ডাকে সাড়া দিবে। ধ্বংস প্রাপ্ত ঘরবাড়িকে তার নিচে লুকায়িত গুপ্তধন বের করতে বলবে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ “দাজ্জাল এক জনসমাজে গিয়ে মানুষকে তার প্রতি ঈমান আনয়নের আহবান জানাবে। এতে তারা ঈমান আনবে। দাজ্জাল তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করার জন্য আকাশকে আদেশ দিবে। আকাশ বৃষ্টি বর্ষণ করবে, যমিন ফসল উৎপন্ন করবে এবং তাদের পশুপাল ও চতুষ্পদ জন্তুগুলো অধিক মোটা-তাজা হবে এবং পূর্বের তুলনায় বেশী দুধ প্রদান করবে। অতঃপর অন্য একটি জনসমাজে গিয়ে মানুষকে তার প্রতি ঈমান আনয়নের আহবান জানাবে। লোকেরা তার কথা প্রত্যাখ্যান করবে। দাজ্জাল তাদের নিকট থেকে ব্যর্থ হয়ে ফেরত আসবে। এতে তারা চরম অভাবে পড়বে। তাদের ক্ষেত-খামারে চরম ফসলহানি দেখা দিবে। দাজ্জাল পরিত্যক্ত ভূমিকে তার নিচে লুকায়িত গুপ্তধন বের করতে বলবে। গুপ্তধনগুলো বের হয়ে মৌমাছির দলের ন্যায় তার পিছে পিছে চলতে থাকবেমুমিন।[13]

ঙ) দাজ্জাল একজন মুমিন যুবককে হত্যা করে পুনরায় জীবিত করবেঃ

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ দাজ্জাল বের হয়ে মদীনার দিকে অগ্রসর হবে। যেহেতু মদীনায় দাজ্জালের প্রবেশ নিষেধ তাই সে মদীনার নিকটবর্র্তী একটি স্থানে অবস্থান করবে। তার কাছে একজন মুমিন লোক গমণ করবেন। তিনি হবেন ঐ যামানার সর্বোত্তম মুমিন। দাজ্জালকে দেখে তিনি বলবেনঃ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি সেই দাজ্জাল যার সম্পর্কে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে সাবধান করেছেন। তখন দাজ্জাল উপস্থিত মানুষকে লক্ষ্য করে বলবেঃ আমি যদি একে হত্যা করে জীবিত করতে পারি তাহলে কি তোমরা আমার ব্যাপারে কোন সন্দেহ পোষণ করবে? লোকেরা বলবেঃ না। অতঃপর সে উক্ত মুমিনকে হত্যা করে পুনরায় জীবিত করবে। এ পর্যায়ে যুবকটি বলবেঃ আল্লাহর শপথ! তুমি যে মিথ্যুক দাজ্জাল- এ সম্পর্কে আমার বিশ্বাস আগের তুলনায় আরো মজবুত হলো। দাজ্জাল তাকে দ্বিতীয়বার হত্যা করার চেষ্টা করবে। কিন্তু তাঁকে হত্যা করতে সক্ষম হবেনা।[14] মুসলিম শরীফের বর্ণনায় এসেছে উক্ত যুবক দাজ্জালকে দেখে বলবেঃ হে লোক সকল! এটি সেই দাজ্জাল যা থেকে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে সাবধান করেছেন। অতঃপর দাজ্জাল তার অনুসারীদেরকে বলবেঃ একে ধর এবং প্রহার কর। তাকে মেরে-পিটে যখম করা হবে। অতঃপর দাজ্জাল তাকে জিজ্ঞেস করবে এখনও কি আমার প্রতি ঈমান আনবেনা? নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ উক্ত যুবক বলবেনঃ তুমি মিথ্যাবাদী দাজ্জাল। তারপর দাজ্জালের আদেশে তার মাথায় করাত লাগিয়ে দ্বিখন্ডিত করে ফেলবে। দাজ্জাল দু’খন্ডের মাঝ দিয়ে হাঁটাহাঁটি করবে। অতঃপর বলবেঃ উঠে দাড়াও। তিনি উঠে দাড়াবেন। দাজ্জাল বলবে এখনও ঈমান আনবেনা? তিনি বলবেনঃ তুমি মিথ্যুক দাজ্জাল হওয়ার ব্যাপারে এখন আমার বিশ্বাস আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। অতঃপর তিনি বলবেনঃ হে লোক সকল! আমার পরে আর কারো সাথে এরূপ করতে পারবেনা। অতঃপর দাজ্জাল তাকে পাকড়াও করে আবার যবেহ করার চেষ্টা করবে। কিন্তু তার গলায় যবেহ করার স্থানটি তামায় পরিণত হয়ে যাবে। কাজেই সে যবেহ করতে ব্যর্থ হবে। অতঃপর তাঁর হাতে-পায়ে ধরে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। লোকেরা মনে করবে তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছে। অথচ সে জান্নাতে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। নবী (সাঃ) বলেনঃ “এই ব্যক্তি হবে পৃথিবীতে সেদিন সবচেয়ে মহা সত্যের সাক্ষ্য দানকারীমুমিন।[15]

দাজ্জাল কোথা থেকে বের হবে?

দাজ্জাল বের হওয়ার স্থান সম্পর্কেও রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বর্ণনা দিয়েছেন। সে পূর্ব দিকের পারস্য দেশ থেকে বের হবে। সে স্থানটির নাম হবে খোরাসান। সেখান থেকে বের হয়ে সমগ্র দুনিয়া ভ্রমণ করবে। তবে মক্কা এবং মদীনায় প্রবেশ করতে পারবেনা। ফেরেশতাগণ সেদিন মক্কা-মদীনার প্রবেশ পথসমূহে তরবারি নিয়ে পাহারা দিবে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ “পূর্বের কোন একটি দেশ থেকে দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে যার বর্তমান নাম খোরাসানমুমিন।[16]

দাজ্জাল মক্কা ও মদীনায় প্রবেশ করতে পারবেনাঃ

সহীহ হাদীছের বিবরণ অনুযায়ী দাজ্জালের জন্যে মক্কা ও মদীনাতে প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে। মক্কা ও মদীনা ব্যতীত পৃথিবীর সকল স্থানেই সে প্রবেশ করবে। ফাতেমা বিনতে কায়েস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত দাজ্জালের হাদীছে এসেছে অতঃপর দাজ্জাল বললোঃ আমি হলাম দাজ্জাল। অচিরেই আমাকে বের হওয়ার অনুমতি দেয়া হবে। আমি বের হয়ে চল্লিশ দিনের ভিতরে পৃথিবীর সমস্ত দেশ ভ্রমণ করবো। তবে মক্কা-মদীনায় প্রবেশ করা আমার জন্য নিষিদ্ধ থাকবে। যখনই আমি মক্কা বা মদীনায় প্রবেশ করতে চাইবো তখনই কোষমুক্ত তলোয়ার হাতে নিয়ে ফেরেশতাগণ আমাকে তাড়া করবে। মক্কা-মদীনার প্রতিটি প্রবেশ পথে ফেরেশতাগণ পাহারা দিবে।[17] সে সময় মদীনা শরীফ তিনবার কেঁপে উঠবে এবং প্রত্যেক মুনাফেক এবং কাফেরকে বের করে দিবে। যারা দাজ্জালের নিকট যাবে এবং তার ফিতনায় পড়বে তাদের অধিকাংশই হবে মহিলা। দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচানোর জন্য পুরুষেরা তাদের স্ত্রী, মা, বোন, কন্যা, ফুফু এবং অন্যান্য স্বজন মহিলাদেরকে রশি দিয়ে বেঁধে রাখবে।

দাজ্জাল পৃথিবীতে কত দিন থাকবে?

সাহাবীগণ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে জিজ্ঞেস করেছেন দাজ্জাল পৃথিবীতে কত দিন অবস্থান করবে? উত্তরে তিনি বলেছেনঃ সে চল্লিশ দিন অবস্থান করবে। প্রথম দিনটি হবে এক বছরের মত লম্বা। দ্বিতীয় দিনটি হবে এক মাসের মত। তৃতীয় দিনটি হবে এক সপ্তাহের মত। আর বাকী দিনগুলো দুনিয়ার স্বাভাবিক দিনের মতই হবে। আমরা বললামঃ যে দিনটি এক বছরের মত দীর্ঘ হবে সে দিন কি এক দিনের নামাযই যথেষ্ট হবে? উত্তরে তিনি বললেনঃ না; বরং তোমরা অনুমান করে সময় নির্ধারণ করে নামায পড়বে।[18]

কারা দাজ্জালের অনুসরণ করবে?

দাজ্জালের অধিকাংশ অনুসারী হবে ইহুদী, তুর্কী এবং অনারব লোক। তাদের অধিকাংশই হবে গ্রাম্য মূর্খ এবং মহিলা। ইহুদীরা মিথ্যুক কানা দাজ্জালের অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী দাজ্জাল হবে তাদের বাদশা। তার নেতৃত্বে তারা বিশ্ব পরিচালনা করবে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ দাজ্জালের অধিকাংশ অনুসারী হবে ইহুদী এবং মহিলা।[19] তিনি আরো বলেনঃ “ইস্পাহানের সত্তর হাজার ইহুদী দাজ্জালের অনুসরণ করবে। তাদের সবার পরনে থাকবে সেলাই বিহীন চাদরমুমিন।[20]

গ্রাম্য অশিক্ষিত লোকেরা মূর্খতার কারণে এবং দাজ্জালের পরিচয় সম্পর্কে তাদের জ্ঞান না থাকার কারণে দাজ্জালের অলৌকিক ক্ষমতা দেখে তারা ফিতনায় পড়বে। মহিলাদের ব্যাপারটিও অনুরূপ। তারা সহজেই যে কোন জিনিষ দেখে প্রভাবিত হয়ে থাকে।

দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার উপায়ঃ

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাজ্জালের ফিতনা হতে রেহাই পাওয়ার উপায়ও বলে দিয়েছেন। তিনি উম্মাতকে একটি সুস্পষ্ট দ্বীনের উপর রেখে গেছেন। সকল প্রকার কল্যাণের পথ প্রদর্শন করেছেন এবং সকল অকল্যাণের পথ হতে সতর্ক করেছেন। উম্মাতের উপরে যেহেতু দাজ্জালের ফিতনা সবচেয়ে বড় তাই তিনি দাজ্জালের ফিতনা থেকে কঠোরভাবে সাবধান করেছেন এবং দাজ্জালের লক্ষণগুলো সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন। যাতে মুমিন বান্দাদের জন্য এই প্রতারক, ধোকাবাজ ও মিথ্যুক দাজ্জালকে চিনতে কোনরূপ অসুবিধা না হয়।

ইমাম সাফারায়েনী (রঃ) বলেনঃ প্রতিটি বিজ্ঞ মুসলিমের উচিৎ তার ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী-পরিবার এবং সকল নারী-পুরুষদের জন্য দাজ্জালের হাদীছগুলো বর্ণনা করা। বিশেষ করে ফিতনায় পরিপূর্ণ আমাদের বর্তমান যামানায়। দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার উপায়গুলো নিম্নরূপঃ-

১) ইসলামকে সঠিকভাবে আঁকড়িয়ে ধরাঃ ইসলামকে সঠিকভাবে আঁকড়িয়ে ধরা এবং ঈমানের উপর অটল থাকাই দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়। যে মুমিন আল্লাহর নাম ও তাঁর অতুলনীয় সুমহান গুণাবলী সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করবে সে অতি সহজেই দাজ্জালকে চিনতে পারবে। সে দেখতে পাবে দাজ্জাল খায় পান করে। মু’মিনের আকীদা এই যে, আল্লাহ তা’আলা পানাহার ও অন্যান্য মানবীয় দোষ-গুণ থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। যে পানাহারের প্রতি মুখাপেক্ষী সে কখনও আল্লাহ বা রব্ব হতে পারেনা। দাজ্জাল হবে অন্ধ। আল্লাহ এরূপ দোষ-ত্রুটির অনেক উর্ধে। আল্লাহর গুণাবলী সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণার অধিকারী মুমিনগণের মনে প্রশ্ন জাগবে যে নিজের দোষ থেকে মুক্ত হতে পারেনা সে কিভাবে প্রভু হতে পারে? মু’মিনের আকীদা এই যে, আল্লাহকে দুনীয়ার জীবনে দেখা সম্ভব নয়। অথচ মিথ্যুক দাজ্জালকে মুমিন-কাফের সবাই দুনিয়াতে দেখতে পাবে।

২) দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করাঃ আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আমি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে নামাযের ভিতরে দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাইতে শুনেছি ।[21] তিনি নামাযের শেষ তাশাহুদে বলতেনঃ

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَمِنْ عَذَابِ النَّارِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ

“হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে কবরের আযাব, জাহান্নামের আযাব, জীবন-মরণের ফিতনা এবং মিথ্যুক দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই ।[22]

৩) দাজ্জাল থেকে দূরে থাকাঃ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাজ্জালের নিকট যেতে নিষেধ করেছেন। কারণ সে এমন একজন লোকের কাছে আসবে, যে নিজেকে ঈমানদার মনে করবে। দাজ্জালের কাজ-কর্ম দেখে সে বিভ্রান্তিতে পড়ে ঈমান হারা হয়ে যাবে। মুমিনের জন্য উত্তম হলো সম্ভব হলে সে সময়ে মদীনা অথবা মক্কায় বসবাস করার চেষ্টা করা। কারণ দাজ্জাল তথায় প্রবেশ করতে পারবেনা। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ যে ব্যক্তি দাজ্জাল বের হওয়ার কথা শুনবে সে যেন তার কাছে না যায়। আল্লাহর শপথ! এমন একজন লোক দাজ্জালের নিকটে যাবে যে নিজেকে ঈমানদার মনে করবে। অতঃপর সে দাজ্জালের সাথে প্রেরিত সন্দেহময় জিনিষগুলো ও তার কাজ-কর্ম দেখে বিভ্রান্তিতে পড়ে ঈমান হারা হয়ে তার অনুসারী হয়ে যাবে। হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই।

৪) সূরা কাহাফ পাঠ করাঃ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাজ্জালের ফিতনার সম্মুখিন হলে মুমিনদেরকে সূরা কাহাফ মুখস্থ করতে এবং তা পাঠ করতে আদেশ করেছেন। তিনি বলেনঃ “যে ব্যক্তি সূরা কাহাফের প্রথম দশটি আয়াত মুখস্থ করবে সে দাজ্জালের ফিতনা হতে হেফাযতে থাকবে ।[23]

সূরা কাহাফ পাঠের নির্দেশ সম্ভবতঃ এজন্য হতে পারে যে, এই সূরায় আল্লাহ তা’আলা বিস্ময়কর বড় বড় কয়েকটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। মুমিন ব্যক্তি এগুলো গভীরভাবে পাঠ করলে দাজ্জালের বিস্ময়কর ঘটনা দেখে কিছুতেই বিচলিত হবেনা। এতে সে হতাশ হয়ে বিভ্রান্তিতেও পড়বেনা।

দাজ্জালের শেষ পরিণতিঃ

সহীহ হাদীছের বিবরণ অনুযায়ী ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)এর হাতে দাজ্জাল নিহত হবে। বিস্তারিত বিবরণ এই যে, মক্কা-মদীনা ব্যতীত পৃথিবীর সকল দেশেই সে প্রবেশ করবে। তার অনুসারীর সংখ্যা হবে প্রচুর। সমগ্র দুনিয়ায় তার ফিতনা ছড়িয়ে পড়বে। সামান্য সংখ্যক মুমিনই তার ফিতনা থেকে রেহাই পাবে। ঠিক সে সময় দামেস্ক শহরের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত এক মসজিদের সাদা মিনারের উপর ঈসা (আঃ) আকাশ থেকে অবতরণ করবেন। মুসলমানগণ তার পার্শ্বে একত্রিত হবে। তাদেরকে সাথে নিয়ে তিনি দাজ্জালের দিকে রওনা দিবেন। দাজ্জাল সে সময় বায়তুল মাকদিসের দিকে অগ্রসর হতে থাকবে। অতঃপর ঈসা (আঃ) ফিলিস্তীনের লুদ্দ শহরের গেইটে দাজ্জালকে পাকড়াও করবেন। ঈসা (আঃ)কে দেখে সে পানিতে লবন গলার ন্যায় গলতে শুরু করবে। ঈসা (আঃ) তাকে লক্ষ্য করে বলবেনঃ “তোমাকে আমি একটি আঘাত করবো যা থেকে তুমি কখনও রেহাই পাবেনা।মুমিন ঈসা (আঃ) তাকে বর্শা দিয়ে আঘাত করবেন। অতঃপর মুসলমানেরা তাঁর নেতৃত্বে ইহুদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। মুসলমানদের হাতে দাজ্জালের বাহিনী ইহুদীর দল পরাজিত হবে। তারা কোথাও পালাবার স্থান পাবেনা। গাছের আড়ালে পালানোর চেষ্টা করলে গাছ বলবেঃ হে মুসলিম! আসো, আমার পিছনে একজন ইহুদী লকিয়ে আছে। আসো এবং তাকে হত্যা কর। পাথর বা দেয়ালের পিছনে পলায়ন করলে পাথর বা দেয়াল বলবেঃ হে মুসলিম! আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে, আসো! তাকে হত্যা কর। তবে গারকাদ নামক গাছ ইহুদীদেরকে গোপন করার চেষ্টা করবে। কেননা সেটি ইহুদীদের বৃক্ষ বলে পরিচিত।[24]

সহীহ মুসলিম শরীফে আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ

(لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يُقَاتِلَ الْمُسْلِمُونَ الْيَهُودَ فَيَقْتُلُهُمُ الْمُسْلِمُونَ حَتَّى يَخْتَبِئَ الْيَهُودِيُّ مِنْ وَرَاءِ الْحَجَرِ وَالشَّجَرِ فَيَقُولُ الْحَجَرُ أَوِ الشَّجَرُ يَا مُسْلِمُ يَا عَبْدَ اللَّهِ هَذَا يَهُودِيٌّ خَلْفِي فَتَعَالَ فَاقْتُلْهُ إِلَّا الْغَرْقَدَ فَإِنَّهُ مِنْ شَجَرِ الْيَهُودِ)

“ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত হবেনা যতক্ষণ না মুসলমানেরা ইহুদীদের সাথে যুদ্ধ করবে। অতঃপর মুসলমানগণ ইহুদীরকে হত্যা করবে। ইহুদীরা গাছ ও পাথরের আড়ালে পালাতে চেষ্টা করবে। কিন্তু কেউ তাদেরকে আশ্রয় দিবেনা। গাছ বা পাথর বলবেঃ হে মুসলমান! হে আল্লাহর বান্দা! আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে। আসো এবং তাকে হত্যা করো। তবে ‘গারকাদ’ নামক গাছের পিছনে লুকালে গারকাদ গাছ কোন কথা বলবেনা। এটি ইহুদীদের গাছ বলে পরিচিত ।[25]


[1] -তিরমিজী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[2] - বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[3] - মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[4] - বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[5] - বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[6] - মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[7] - সহীহ মুসলিম, শরহুন্ নববীর সাথে (১৮/৬১)।

[8] - - ফাতহুল বারী, (১৩/১০০)।

[9] - মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[10]- মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[11]- মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।|

[12] - সহীহুল জামে আস্-সাগীর, হাদীছ নং-৭৭৫২

[13]- মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[14]- বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[15] - মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[16] - তিরমিজী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান, সহীহুল জামে আস্-সাগীর, হাদীছ নং-৩৩৯৮। নিশাপুর, হিরাত, মরো, বালখ এবং পার্শ্ববর্তী কতিপয় অঞ্চলের নাম খোরাসান।

[17] - মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[18] - মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[19] - মুসনাদে ইমাম আহমাদ। আহমাদ শাকের সহীহ বলেছেন।

[20] - মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[21] - বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[22]- বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল জানায়েয।

[23] - মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[24] - নেহায়া, আল-ফিতান ওয়াল মালাহিম, (১/১২৮-১২৯)

[25] - সহীহ মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান

Source: islamicalo

তিন শ্রেণীর মানুষের উপর জান্নাত হারাম

| comments


সহিহ হাদিসের আলোকে একথা স্বীকৃত যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তিন শ্রেণীর মানুষের উপর জান্নাত হারাম অর্থ্যাত এই তিন শ্রেণীর মানুষ কখনোই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।

প্রথম শ্রেণী হলো- যারা কোনো প্রকার নেশাদার দ্রব্য পান বা গ্রহণ করে। মদ, বিড়ি, গাজা, ফেনসিডিল, হিরোইন, আফিম, জদ্দা- যে কোনো প্রকার নেশাই গ্রহণ করেন না কেন; খেলে দেহ অপবিত্র হয়ে যাবে আর এই অপবিত্র দেহ কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না। সুতরাং এইসব নেশাদ্রব্য গ্রহণ করা আজকেই ছাড়া উচিত, আজ এবং এখনই তাওবা করা উচিতি এই পাপ কাজ থেকে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমিন।

দ্বিতীয় শ্রেণী হলো- যে বা যারা পিতা-মাতার অবাদ্ধ, এই শ্রেণীভূক্ত মানুষরাও জান্নাতে যাবে না। জান্নাত তাদের উপর হারাম। মৃত্যু পর্যন্ত পিতা-মাতার দেখভাল করতেই হবে। পিতা-মাতাকে কোনো কারণেই ত্যাগ করা যাবেনা। পিতা-মাতার খেদমত করতেই হবে। রাসুল [সা.] পরিস্কারভাবে বলেছেন, পিতা-মাতার অবাদ্ধ সন্তান জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আল্লাহ আমাদের সবাইকে পিতা-মাতার অবাদ্ধ সন্তান না হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

তৃতীয় শ্রেণী হলো- দাইউস। ঐ দাইউস ব্যক্তি যে তার পরিবারে পর্দা প্রথা চালু রাখেনি। পরিবারের সদ্যসের মাঝে বেপর্দা ছিলো, বেহায়াপনা ছিলো কিন্তু সে তা বাধা প্রদান করেনি। পরিবারের কর্তা হিসেবে বেপর্দা-বেহায়াপনা বন্ধ না করার জন্য এই শাস্তি পাবে সে। আপনি যত বড় ইবাদতকারীই হোন না কেন, মক্কার মাটিতে যতবারই হজ পালনে ঘুরে আসুন না কেন, পাঞ্জাবী আপনার যতই সুন্নতি-শক্তিশালী এ সুন্দর হোক না কেন- পরিবারে যদি পর্দা না থাকে রাসুল [সা.] –এর হাদিস অনুযায়ী আপনি জাহান্নামি। জান্নাত এই শ্রেণীর মানুষের জন্য হারাম।

আত্মহত্যাকারীদের শাস্তি

| comments

রাসূলে করীম (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি পর্বত থেকে পড়ে আত্মহত্যা করবে সে জাহান্নামের আগুনে অবস্থান করবে। সার্বক্ষণিক সে তাতে (পর্বতে) উঠতে এবং নামতে থাকবে।

আর যে ব্যক্তি বিষপানে আত্মহত্যা করবে, তার বিষ তার হাতে থাকবে, যা সে জাহান্নামের আগুনে সারাক্ষণ পান করতে থাকবে। আর যে ব্যক্তি কোন লৌহনির্মিত অস্ত্র দ্বারা আত্মহত্যা করবে তার সেই লৌহনির্মিত বস্তুটি তার হাতে থাকবে, যা সে জাহান্নামের আগুনে নিজের পেটে ঢুকাতে থাকবে। (বুখারী)

দাম্ভিকের শাস্তি

রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ইরাশাদ করেন, অহঙ্কারীদেরকে পিপীলিকার সমান অবয়বে কিয়ামতের দিন উঠানো হবে কিন্তু তাদের আকৃতি হবে মানুষের। অতপর তিনি বলেন, চতুর্দিক থেকে লাঞ্ছনা-গঞ্জনা তাদেরকে ঘিরে ধরবে।

তিনি আরও বলেন, তাদেরকে জাহান্নামের কারাগারের দিকে এভাবে হাঁটিয়ে নেয়া হবে- এ কারাগারের নাম ‘বেলিস’। তাদের উপর আগুন প্রজ্জ্বলনকারী আগুন ছড়িয়ে দেয়া হবে এবং তাদেরকে ‘তীনাতুল খাবাল’ অর্থাৎ জাহান্নামীদের শরীর নিঃসৃত পানীয় পান করানো হবে। (মিশকাত)

তিরমিযী শরীফের একটি বর্ণনায় আছে, নিশ্চয়ই জাহান্নামে একটি বিস্তীর্ণ মাঠ রয়েছে যাকে হাবহাব বলা হয়। এতে সীমালঙ্ঘনকারীরা অবস্থান করবে।

স্বীয় ঘরকে শয়তানের অনুপ্রবেশ থেকে সংরক্ষণের আমল

| comments

শয়তান মানুষের চির শত্রু, যে ঘরে সে প্রবেশ করে ঐ ঘরের পরিবেশকে বিনষ্ট করে দেয়, পরিবারের সদস্যদের মাঝে বিভক্তি সৃষ্টি করে।
এই শত্রু থেকে ঘরকে সংরক্ষণের কতিপয় আমলঃ
১. ঘরে প্রবেশ করার সময় নিুোক্ত দোয়া পাঠ করাঃ

(বিসমিল্লাহি ওলাজনা ওয়া বিসমিল্লাহি খারাজনা, ওয়া আলাল্লাহি রাব্বিনা তাওয়াক্কালনা)। (আবুদাউদ)
২. ঘরে প্রবেশ করে সেখানে অবস্থানরত লোকদেরকে সালাম দেয়া।
আল্লাহর বাণীঃ

فَإِذَا دَخَلْتُمْ بُيُوتاً فَسَلّمُواْ عَلَىَ أَنفُسِكُمْ تَحِيّةً مّنْ عِندِ اللّهِ مُبَارَكَةً طَيّبَةً

অর্থঃ“ তবে যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ করবে তখন তোমরা তোমাদের স্বজনদের প্রতি সালাম করবে অভিবাদন স্বরূপ যা আল্লাহর নিকট হতে কল্যাণময় ও পবিত্র”। (সূরা নূর-৬১)
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

إِذَا دَخَلْتَ عَلَى أَهْلِكَ فَسَلِّمْ ، يَكُنْ بَرَكَةً عَلَيْكَ وَعَلَى أَهْلِ بَيْتِكَ . (رواه الترمـذي )

অর্থঃ“ তুমি যখন তোমার ঘরে প্রবেশ করবে তখন সালাম দিবে তা তোমার জন্য এবং তোমার পরিবারের জন্য বরকত হবে”। (তিরমিযী)
৩. পানাহারের সময় দোয়া পাঠ করাঃ
রাসূলুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

إِذَا دَخَلَ الرَّجُلُ بَيْتَهُ فَذَكَرَ اللَّهَ عِنْدَ دُخُولِهِ وَعِنْدَ طَعَامِهِ , قَالَ الشَّيْطَانُ : لا مَبِيتَ لَكُمْ وَلا
عَشَاءَ (مسلم)

অর্থঃ“ যখন কোন ব্যক্তি তার ঘরে প্রবেশ করার সময় এবং খাবার খাওয়ার সময় দোয়া পাঠ করে তখন শয়তান বলেঃ আজ এখানে তোমাদের রাত্রিযাপন এবং নৈশ ভোজের কোন সুযোগ নেই”। (মুসলিম)
৪. ঘরে সূরা বাকারা তেলওয়াত করা।
রাসূলুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

ان لكل شيئ سنما، وان سنام القرآن سورة البقرة، وان الشيطان اذا سمع سورة البقرة تقرأ خرج من البيت الذى تقرأ فيه سورة البقرة، (رواه الحاكم)

অর্থঃ“সবকিছুরই একটি চুড়া থাকে আর কোরআনের চুড়াহল সূরা বাকারা, শয়তান যখন সূরা বাকারার তেলওয়াত শুনে তখন সে ঐ ঘর থেকে বের হয়ে যায় যেখনে তা তেলওয়াত করা হয়”। (হাকেম)

৫. গান-বাজনা এবং গান-বাজনার সরন্জাম থেকে ঘরকে পরিচ্ছন্ন রাখা। কেননা আল¬াহ্র যিকির যেমন শয়তানকে দূরে রাখে তেমনিভাবে গান এবং বাদ্য যন্ত্রের আওয়াজ রহমতের ফেরেশ্তাগণকে দূরে রাখে। আর ঘর থেকে যখন ফেরেশ্তাগণ বের হয়ে যায় তখন ওখনে শয়তান তার রাজত্ব কায়েম করে।
আল্লাহর বাণীঃ

وَاسْتَفْزِزْ مَنِ اسْتَطَعْتَ مِنْهُمْ بِصَوْتِكَ

অর্থঃ“ তোর আহ্বানে তাদের মধ্যে যাকে পারিস তাকে সত্যচুত কর” । (সূরা বানী ইসরাঈল- ৬৪)
মুজাহিদ এই আয়াতের তাফসীরে বলেছেনঃ গান-বাজনা হল শয়তানের আওয়াজ।
৬. ছবি এবং বিভিন্ন জীব জন্তুর মূর্তি থেকে ঘরকে পরিচ্ছন্ন রাখা।
রাসূলুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

لا تدخل الملائكة بيتا فيه تصاوير او تماثيل ( رواه مسلم)

অর্থঃ“ যে ঘরে মূর্তি বা ছবি থাকে সেখানে ফেরেশ্তা প্রবেশ করে না”। (মুসলিম)

৭. ঘরকে কুকুর থেকে পরিচ্ছন্ন রাখা।

রাসূলুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

لاتدخل الملائكة بيتا فيه كلب ولا صورة( رواه البخاري)

অর্থঃ“ যে ঘরে ছবি এবং কুকুর থাকে সেঘরে ফেরেশ্তা প্রবেশ করে না”। (বোখারী)

ভাষা আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি-নিদর্শন

| comments

আন্তর্জাতিক ভাষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান এথনোলগ -এর তথ্যানুসারে পৃথিবীতে বর্তমানে মোট ভাষার সংখ্যা ৭,১০৫ টি। [১] তন্মধ্যে বাংলাদেশেই আছে ৪৪টি। [২] ভাষাভাষীদের সংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীতে বাংলা ভাষার অবস্থান ৭ম। পৃথিবীর ২০২ মিলিয়ন মানুষ এ ভাষায় কথা বলে, যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৩.০৫ শতাংশ। [৩] সব প্রাণীই একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে থাকে। তবে মানুষ ছাড়া অন্য কোনো প্রাণী শব্দ তৈরি করতে পারে না। পাখি গান গায়, নির্দিষ্ট কিছু ডাক দেয়। অন্যান্য পশু শারীরিক ইঙ্গিত ও কিছু ধ্বনির ব্যবহার করে, যা সীমিত। তবে মানুষই একমাত্র তার আনলিমিটেড ভাব প্রকাশে আনলিমিটেড শব্দ তৈরি করতে পারে। ভাষার অরিজিন বা উৎপত্তি কোথা থেকে, এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের কাছে কোনো সদুত্তর নেই। মূলত মানুষের উৎপত্তি নিয়ে যেমন তাদের কোনো সদুত্তর নেই, ঠিক তেমনি ভাষার উৎপত্তি নিয়েও তাদের কোনো উত্তর নেই।

বিবর্তনবাদীরা বলেন, মানুষও এক সময় পশুর মতো ইঙ্গিত ও ধ্বনি ব্যবহার করত, এরপর হঠাৎ করেই আবিষ্কার করলো যে সে বিভিন্ন শব্দ তৈরি করতে পারছে। এরপর তারপর এরপর... শেষকথা, নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না ভাষা কীভাবে আসল। [৪] অথচ আল-কুরআনে আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে জানাচ্ছেন, "আর তিনি আদমকে শেখালেন সমস্ত বস্তু-সামগ্রীর নাম। তারপর সে সমস্ত বস্তু-সামগ্রীকে ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন। অতঃপর বললেন, আমাকে তোমরা এগুলোর নাম বলো, যদি তোমাদের বক্তব্য সত্য হয়ে থাকে।" [সূরা বাকারা: ৩১] এ আয়াতে এটা সুস্পষ্ট যে, পৃথিবীর প্রথম মানুষ আদম (আ.) -কে সৃষ্টির পর আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সকল বস্তুর নাম শেখান। আমরা জানি, ভাষা হচ্ছে মনের ভাব প্রকাশ। আর ভাব প্রকাশের প্রাথমিক উপাদান হলো শব্দভাণ্ডার বা ভোকাবুলারি, যা আল্লাহ তায়ালা এই আয়াতে আদম (আ.) -কে শিখিয়েছেন বলে জানালেন। ফলে ভাষা যে আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি, তা আর বলার অপেক্ষা থাকে না।

বরং ভাষাকে আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিদর্শন বলেও উল্লেখ করেন। "তাঁর আরো এক নিদর্শন হচ্ছে, নভোমন্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি, এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানীদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।" [সূরা রুম: ২২] এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালাকে ভাষার বৈচিত্র্যকে তাঁর নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেন। কারণ হিসেবে মুফাসসিরগণ বলেন, হাত-পা-মুখমণ্ডলসহ সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একই হওয়া সত্ত্বেও নানা মানুষ নানা ভাষায় কথা বলছে, একে অপরের সাথে যোগাযোগ করছে, এটা তাঁর নিদর্শন বৈ কি! বরং মানুষের ভাষাকে গুরুত্ব দিয়ে আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক নবি-রাসূলকে তাঁদের স্বজাতীয় ভাষায় পাঠিয়েছেন। "আমি সব নবি-রাসূলকেই তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি, যাতে তাদেরকে পরিষ্কার বোঝাতে পারে।" [সূরা ইবরাহীম: ৪]কাজেই এটা স্পষ্ট যে, ভাষা আল্লাহ তায়ালার একটি বিশেষ নিয়ামত। আর নিয়ামতের সর্বোত্তম শুকরিয়া হলো নিয়ামতকে সর্বোত্তম উপায়ে ব্যবহার করা।

ভাষার অপব্যবহার এই নিয়ামতের অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ। কাজেই এর শাস্তিও কঠিন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, "(কল্পনা করো সেদিনের কথা) যেদিন তাদের জিহ্বা (ভাষা), তাদের হাত ও তাদের পা, তারা যা কিছু করত তা প্রকাশ করে দেবে"। [সূরা নূর: ২৪] ভাষার অপব্যবহারের চেয়ে বরং চুপ থাকা উত্তম। রাসূল স. বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ও ক্বিয়ামত দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন উত্তম কথা বলে নতুবা চুপ থাকে। [বুখারি ও মুসলিম]। একজন মুসলিম হিসেবে তাই ভাষার সম্মান হবে ভাষাকে উত্তম কথা ও কাজে ব্যবহার নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে। উত্তম কাজ হতে পারে ঈমানের কথা, নৈতিক ও চারিত্রিক উন্নয়নের কথা, সৎ কাজের আহ্বান, অশ্লীলতা ও নষ্টামি পরিত্যাগের আহ্বান, মানবোন্নয়নের আহ্বান ইত্যাদি।
রাসূল (স.) বলেন, "নিশ্চয়ই কিছু কিছু বক্তব্য জাদুর মতো"। [বুখারি: ৫৪৩৪] অর্থাৎ এসব বক্তব্য ও ভাষার ব্যবহার মানুষ মুগ্ধ হয়ে শুনে ও পাঠ করে। এগুলো মানুষের মাঝে অস্বাভাবিক প্রভাব ফেলে।আমাদের চেষ্টা করতে হবে ভাষার সে যাদুময়ী ব্যবহার আয়ত্ত করে মানুষকে সততার দিকে আহ্বান করা। তাহলেই ভাষা-নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সে তাওফীক দান করুন। আমিন।

সূত্রসমূহ:

[১] http://www.ethnologue.com/statistics
[২] http://www.ethnologue.com/statistics/country
[৩] http://en.wikipedia.org/wiki/List_of_languages_by_number_of_native_speakers
[৪] http://science.howstuffworks.com/life/evolution/language-evolve.htm

মুফতি ইউসুফ সুলতান
নায়েবে মুফতি, ইফতা বিভাগ, জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ

সহীহ আমল প্রতিদিন

| comments

(১) হাদিসঃ- আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর কাছে সবচেয়ে প্রিয় ঐ আমল, যা নিয়মিত করা হয়। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করা হলো, আল্লাহ্‌ তা’আলার কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল কি? তিনি বললেনঃ যে আমল নিয়মিত করা হয়। যদিও তা অল্প হোক। তিনি আরোও বললেন, তোমরা সাধ্যমত আমল করে যাও। [বুখারী, ৬০২১]

(২) হাদিসঃ- আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে আমল আমলকারী নিয়মিত করে সেই আমল রাসূল (সাঃ) এর কাছে সবচেয়ে প্রিয় ছিলো। [বুখারী, ৬০১৮]

(৩) হাদিসঃ- হযরত উমর ইবনে খাত্তাব রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, নিশ্চয়ই সকল আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল। আর প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে যার নিয়ত সে করবে। অতএব যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসূলের উদ্দেশ্যে হিজরত করবে তার হিজরত আল্লাহ ও তার রাসূলের জন্যই হবে। আর যে দুনিয়া লাভের জন্য কিংবা কোনো নারীকে বিয়ের উদ্দেশ্যে হিজরত করবে তার হিজরত উক্ত বিষয়ের জন্যই হবে, যার জন্য সে হিজরত করেছিল। [সহীহ বুখারী হাদীস ১; সহীহ মুসলিম হাদীস ১৯০৭]

(৪) হাদিসঃ- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে একনিষ্ঠ মনে শাহাদাতের প্রার্থনা করবে আল্লাহ তাকে শহীদের মর্যাদা দান করবেন। যদিও সে স্বীয় বিছানায় মৃত্যুবরণ করে। [সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯০৯]

সুতরাং উপরোক্ত হাদিসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে, আমরা যে আমলই করি না কেন তা অবশ্যই হতে হবে সঠিক নিয়তে অর্থাৎ আমরা যা কিছুই করি না কেন তা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করছি এবং ছওয়াবের আশায় করছি এই ধরনের নিয়ত থাকতে হবে। আর যে যত টুকই আমল করি না কেন তা হতে হবে নিয়মিত। আল্লহ আমাদেরকে জেনে বুঝে সঠিক ভাবে আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন…। সহীহ আমল প্রতিদিন নিম্নে বর্ণিত হলঃ-

ফজরের নামাযের পরঃ

(১) হাদিস শরীফের মধ্যে আছে, যে ব্যক্তি ফজরের নামায পড়ার পর ঐ অবস্থায় বসিয়া, আল্লহর ধ্যানে মগ্ন থাকিয়া কাহারো সহিত কথা না বলিয়া নিম্নের দুয়া দশ বার ( ১০ বার ) পাঠ করিবে তাহার আমল নামায় দশটি নেকী হইবে, দশটি গোনাহ মাফ হইবে এবং বেহেস্থের মধ্যে দশটি দরজা বৃদ্ধি পাইবে এবং সমস্ত দিন শয়তান থেকে এবং খারাপ কাজ থেকে হেফাজত থাকিবে। দুয়াটি হলঃ-
‘‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু লাহুল মূলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়া ইয়ুমীতু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কদির।”

(২) যে ব্যক্তি ফজর নামাযের পর সূর্য উঠা পর্যন্ত আল্লাহর ধ্যানে লিপ্ত থেকে এবং সূর্য উঠার পর দুই রাকাত এশরাক নফল নামায পড়ে, সে ব্যক্তি এই রকম ছওয়াব পাইবে যেমন- হজ্ব ও ওমরাহ হজ্বের ছওয়াব মেলে।

(৩) রুযী বৃদ্ধির জন্য প্রত্যহ ফজরের নামাযের পর “ইয়া রাজ্জাকু” তিনশত আট বার পড়িতে হইবে।

(৪) ফজরের পরঃ

•“লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” [ ১০০ বার ]
•“ছোবাহানাল্লাহ” [ ১০০ বার ]
•“আলহামদুলিল্লাহ্‌” [ ১০০ বার ]
•“আল্লাহু আকবর” [ ১০০ বার ]
•“আসতাগ ফিরুল্লাহা রব্বি মিনকুল্লি জামবিও ওয়াতুবু ইলায়হি” [ ১০০ বার]
•“ছুবাহান আল্লহি ওয়া বিহামদিহি ছুবাহান আল্লহিল আজিম” [ ১০০ বার ]
ফজর এবং মাগরিব নামাযের পরঃ

(১) যে ব্যাক্তি সকাল সন্ধায় ( ফজর ও মাগরিবের পর ) তিনবার করে “আউজু বিল্লাহিস সামিউল আলিম মিমিনাস শাইতনির রজীম” পড়ার পর “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” পড়ে “সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত” পড়িবে, তাহার হেফাজতের জন্য ৭০হাজার ফেরেস্তা দিনে এবং ৭০হাজার ফেরেস্তা রাত্রে দুয়া করিবে এবং মৃত্যুর পর সে শহীদের দরজা প্রাপ্ত হইবে।

(২) যে কেহ প্রত্যহ ফজরের ফরজ ও মাগরিবের ফরজ নামাযের পর নিম্নের দুয়া সাত বার করিয়া পড়িবে সে দোযখের আজাব থেকে মুক্তি লাভ করিবে। দুয়াটি হলঃ- “আল্লাহুম্মা আ-জিরনা মিনান নার।”

(৩) ভীষণ বিপদ ও মোকদ্দমা হইতে মুক্তি পাইবার জন্য ফজর ও মাগরিব নামাযের পর হাজার বার অথবা পাঁচশত বার “হাছবি আল্লাহু ওয়া নি’য়মাল ওয়াকীল” পাঠ করিলে সকল প্রকার বিপদ হইতে উদ্ধার পাওয়া যায়। [ইহা পরিক্ষিত]

জোহরের নামাযের পরঃ

(১) জোহরের নামাযের পর “আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মোহাম্মাদিন ওয়া আলা আলি মোহাম্মাদিন ওয়া বারিক ওয়া ছাল্লাম।” এই দরূদ ১০০ বার পড়িলে (১) উক্ত ব্যক্তি দেনাদার হইবে না, যদিও হয় তবে আল্পদিনে পরিশোধ করিতে পারিবে। (২) হালাল রুযী দ্বারা তার রিজিক বরকত হইবে। (৩) সাধারণ বিপদ মুছিবত হইতে আল্লাহ তাহাকে নিরাপদে রাখিবেন। (৪) রাতদিন তাহার দ্বারা কোন গুনাহের কাজ হইবে না।

মাগরিব নামাযের পরঃ

(১) মাগরিবের পর ১০০ বার “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসুল্লুল্লাহ” পড়িলে (১) দুনিয়ার কোন প্রয়োজনীয় কাজে অপরাগ হইবে না। (২) দৈনিক পাঁচবার আল্লাহ পাক রহমতের দৃষ্টি করিবেন। (৩) কেয়ামতের দিন বিপদকালে আল্লাহ তাহার প্রতি রাজী থাকিবেন। (৪) কবরের আজাব হইতে বিরাপদে থাকিবেন। (৫) মনকার নাকিরের সওয়ালের জাবাব আছান হইবে।

এশার নামাযের পরঃ

(১) এশার নামাযের পর ১০০ বার “ছোবহানাল্লাহ ওয়াল হামদুলিল্লাহ ওয়া লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার ওয়া লা-হাওলা ওয়ালা কুয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিইল আজিম।” পড়িলে (১) ৭০ জন নবীর ছাওয়াব তাহার আমল নামায় লেখা হইবে। (২) বেহেস্তে তাহাকে স্বর্ণের ৭০টি মহল দেওয়া হইবে। (৩) নবীজির উম্মতের মধ্যে ৭০ হাজার পাপীকে সুপারিশ করিবে। (৪) কেয়ামতে নবীজির সুপারিশ পাইবে। (৫) আল্লাহর দিদার লাভ হইবে।

অজু করার আগে ও পরেঃ

(১)হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন যে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বানী প্রদান করেছেন যে, যে ব্যক্তি অজু করার সময় একবার “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” পাঠ করবে আল্লাহ তায়ালা তাহার চল্লিশ হাজার বছরের গুনাহ মাফ করবেন এবং সে ঈমানের সাথে পৃথিবী হতে বিদায় নিবে। ["বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম" এর ফজিলত প্রসঙ্গে একটি হাদিসঃ- হযরত আলী মরতুজা (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন যে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বানী প্রদান করেছেন যে, যে ব্যক্তি একশত বার আদবের সাথে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” পাঠ করিবে, আল্লাহ তায়ালা তার এক লক্ষ বছরের গুনাহ মাফ করবেন এবং বিদ্যুৎ এর ন্যায় পুলছুরাত পার করে দিবেন।]

(২) রাসুল (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি অজুর ফরজ, সুন্নত এবং আদব রক্ষা করিয়া ভাল ভাবে অজু করিয়া আজুর শেষে কালেমা শাহাদত পড়িবে তাহার জন্য বেহেস্থের ৮টি দরজা খুলিয়া যাইবে। সে যে দরজা দিয়া বেহেস্থে প্রবেশ করিতে চাইবে তাহাই পারিবে। কালেমা শাহাদতঃ-
“আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু।”

রাত্রি শয়নের আমলঃ

(১) রাসুল (সাঃ) এক সময় হযরত আলী (রাঃ) কে বলিলেন যে, প্রত্যেক রাত্রিতে পাঁচটি কাজ করিয়া শুইয়া থাকিবা । (১) চার হাজার দিনার ছদকা করিবে। (২) এক খতম কোরান শরীফ পড়িবে। (৩) জান্নাতের মূল্য আদায় করিয়া শুইবে। (৪) উভয় পক্ষের ঝগড়া মীমাংসা করিয়া ঘুমাইবে। (৫) এক হজ্ব আদায় করিয়া শুইবে। তখন হযরত আলী (রাঃ) আরজ করিলেন ইয়া রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এ কাজ খুব মুস্কিল জনক, আমার দ্বারা ইহা করা সম্ভব নয়। তখন রাসুল (সাঃ) পুনরায় বলিলেনঃ- (১) ৪বার সূরা ফাতেহা পড়িয়া শুইবে তাহলে ঐ চার হাজার দেনার ছদকা সমতুল্য ছওয়াব পাইবে। (২) তিনবার সূরা এখলাছ পড়িয়া শুইবে তাহলে ঐ এক খতম কুরান শরীফ পড়ার ছওয়াব পাইবে। (৩) তিনবার দরূদ শরীফ পড়িয়া শুইবে তাহলে জান্নাতের মূল্য আদায় হইবে। দরূদ শরীফঃ- “আল্লাহুম্মা ছল্লি আলা মুহাম্মাদিও ওয়া আলা আলে মুহাম্মাদিও ওয়া বারিক ওয়া ছাল্লাম।” (৪) দশ বার এস্তেগফার পড়িয়া শুইবে তাহলে উভয়ের ঝগড়া মীমাংসা করার সমতুল্য ছওয়াব পাইবে। এস্তেগফারঃ- “আস্তাগ ফিরুল্লাহা রব্বি মিন কুল্লি জামবিও ওয়া আতুবু ইলাইহি।” (৫) চারবার তৃতীয় কালেমা পড়িয়া শুইবে তাহাতে এক হজ্ব আদায়ের ছওয়াব পাইবে। তৃতীয় কালেমাঃ- “ছুবাহানাল্লাহি ওয়াল হামদু লিল্লাহি ওয়া লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়াল্লাহু আকবর। ওয়া লা-হাওলা ওয়ালা কুয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়িল আজিম।” তখন আলী (রাঃ) বলিলেন আমি প্রতি রাত্রিতে এই আমল করিতে থাকিব।

আরও কিছু আমলঃ

(১) কোন ব্যাক্তি হযরত নবী করিম (সাঃ) এর নিকট আরজ করিলেন আমার ক্ষতি হয়ে গেছে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলিলেন সকাল সন্ধায় আপনি নিম্নের দুয়া তিনবার করিয়া পাঠ করিবেন আপনার কোন ক্ষতি হইবে না। ঐ বাক্তি এই ভাবে পাঠ করিতেন তাহার কোন ক্ষতি হয় নাই। দুয়াটি হলঃ- “বিসমিল্লাহি আলা নাফছি ওয়া মালি।”

(২) যে ব্যক্তি সকাল ও সন্ধায় নিম্নের দুয়াটি তিনবার পড়িবে কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তাহাকে খুশি (সন্তুষ্ট) করিবার জিম্মদার। [তিরমিজি] দুয়াটি হলঃ- “রাদিতু বিল্লাহি রব-বাও ওয়া বিল ইসলামি দিনাও ওয়াবি মুহাম্মাদিন নাবিয়্যাও ওয়া রাসুলা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লাম”।

(৩) এক সময়ে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ছাহাবাদেরকে উদ্দেশ্য করিয়া এরশাদ করিয়াছিলেন যে, ইহা কি হইতে পারে না যে তোমরা ওহুদ পাহাড়ের সমতুল্য নেক আমল কর। তখন ছাহাবারা আরজ করিলেন ইহা কেমন করে হইতে পারে? ছাহাবাদের প্রশ্নের উত্তরে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলিলেন “ছুবহানাল্লাহ” ওহুদ পাহাড় থেকে বড়। কমপক্ষে দৈনিক সকাল সন্ধায় ১০০বার ছুবহানাল্লাহ, আল-হামদুল্লিহ, আল্লাহু আকবর পড়িবে।

(৪) স্বপ্ন দোষ বন্ধের জন্য এশার নামায পড়িয়া ওজুর সহিত বুকে হাত রাখিয়া “আচ্ছামীউল মুমীতু“ ১৫ বার পড়িয়া কথা না বলিয়া ঘুমাইয়া যাবে। ইনশাআল্লাহ ঐ রাতে আর স্বপ্ন দোষ হবে না। আর এই দুয়া পড়ার পর কথা বলিলে পুনরায় পড়িতে হইবে।

(৫) “আল্লাহুম্মা আনতা রব্বি লা-ইলাহা ইল্লা আনতা খলাকতানি ওয়া আনা আবদুকা ওয়া আনা আলা আহাদিকা ওয়া অয়াদিকা মাছতাতুয়াতু আউজুবিকা মিন শাররি মা সা’নাত ওয়া আবয়ু লাকা বি-নিয়ামাতিকা আলাইয়া ওয়াবুউ বিজামবি ফাগফিরলি ইন্নাহু লা-ইয়াগ ফিরুজজুনুবা ইল্লা আনতা।” হাদিছ শরিফে আছে, যদি কেহ এই দুয়া সকালে পড়ে ঐ দিন তাহার মৃত্যু হইলে সে ব্যক্তি বেহেস্তি হইবে, আর যদি রাত্রে পড়ে ঐ রাত্রে মৃত্যু হইলে সে বেহেস্তি হইবে। [ বোখারী শরীফ ]

(৬) মেধা শক্তি বৃদ্ধির জন্য প্রত্যেক নামাযের পর মাথায় হাত রাখিয়া “ইয়া কাবিউ, ইয়া মতিনু” ১৫ বার পড়তে হবে।

(৭) কাজ সহজ ও সফরে নিরাপদের জন্য “আল-মুমিনু” ৩৬ বার এবং “ইয়া-আজিজু” ৪০ বার পড়ে কাজে রওনা করতে হবে।

(৮) প্রত্যেক ফরজ নামাযের পর আয়াতুল কুরছি পাঠকারীর বেহেস্তে যাইতে মউত ব্যতীত কোন বাধা নাই।

দরূদ শরীফ এর আমলঃ

(১) “মুফাখিরুল ইসলাম” কিতাবের মধ্যে হাদিসে বর্ণিত হইয়াছে যে, যে ব্যক্তি জুম্মার রাত্রে আমার উপরে একশত বার দরূদ পাঠ করিবে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন দরূদ পাঠ কারীর দুনিয়া ও আখেরাতে একশত উদ্দেশ্য পুরা করিবেন। তার মধ্যে ৭০টি দুনিয়ার আর ৩০টি আখেরাতে। দ্বিতীয় হাদিছে বর্ণিত হইয়াছে যে, যে ব্যক্তি জুম্মার দিন এই নিম্নের দরূদ এক হাজার বার পড়িবে, সে ব্যক্তি তাহার নিজের থাকার ও বসার জায়গা জান্নাতুল ফেরদাউসের মধ্যে যতক্ষণ না দেখিবে ততক্ষণ সে দুনিয়া থেকে বিদায় হইবে না অর্থাৎ মরিবে না। দরুদটি হলঃ-
“আল্লাহুম্মা ছল্লি আলা মুহাম্মাদিও ওয়া-আলিহি আলফা আলফা মারহ।”

(২) নিম্নের দরূদ শরীফ একবার পাঠ করিলে এক লক্ষ নেকী লাভ করা যায়। দরুল শরীফটি হলঃ- “আল্লাহুম্মা ছল্লি আলা ছাইয়িদিনা মুহাম্মাদিন আল-ফা আল-ফা মারহ”।

(৩) হযরত খিজির (রাঃ) থেকে বর্ণিত হইয়াছে যে, যে ব্যক্তি নিম্নের দরূদ পড়িবে তাহার দিল নিফাক থেকে এমন পরিস্কার হইবে যেমন পানিও শাবানের দ্বারা কাপড় পরিস্কার করা হয়। দরূদ শরীফটি হলঃ- “ছল্লাল্লাহু আলা মুহাম্মাদ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লিম।“

আমল করা প্রসঙ্গে একটি কুরানের আয়াত ও তার ব্যাখ্যাঃ

“এবং আরও কতগুলো লোক আছে যারা নিজেদের অপরাধ সমূহ স্বীকার করেছে, যারা মিশ্রিত আমল করেছিল, কিছু ভাল আর কিছু মন্দ, আশা রয়েছে যে, আল্লাহ তাদের প্রতি করুনা-দৃষ্টি করবেন, নিঃসন্দেহে আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল পরম করুনাময়।” [সুরা তাওবাঃ১০২]
এই আয়াতের ব্যখ্যায় হাদীসঃ- “সামুরা ইবনে জুন্দুব (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, রাত্রে দু’জন ফেরেশতা এসে আমাকে ঘুম থেকে তুলে এমন এক শহরে (প্রাসাদে) নিয়ে গেল, যা সোনা ও রুপার ইট দ্বারা নির্মিত। সেখানে আমরা এমন কিছু লোকের দেখা পেয়েছি, যাদের দেহের একাংশ খুবই সুশ্রী এবং অপরাংশ অত্যন্ত বিশ্রী। এমনটি তুমি আর কখনও দেখনি। ফেরেশতা দু’জন তাদেরকে বলল। এই ঝরনায় গিয়ে তোমরা ডুব দাও। তারা ওতে গিয়ে লাফিয়ে পড়ল এবং তারপর ফিরে আসলো। তখন তাদের কুৎসিত আকৃতি সম্পূর্ণ দূর হয়ে গেল। এখন তারা সুন্দর আকৃতি লাভ করল। ফেরেশতারা আমাকে বলল, এটি ‘আদন’ বেহেশত। এটাই হল আপনার স্থায়ী ঠিকানা। তারপর ফেরেশতারা বুঝিয়ে বলল, আপনি যে সকল লোকের শরীরের অর্ধেক সুশ্রী আর অর্ধেক কুশ্রী দেখেছেন, তারা হল এমন সব লোক, যারা দুনিয়াতে ভাল মন্দ দু’ধরনের কাজই করেছে এবং নেক ও বদ আমলকে মিশিয়ে ফেলেছে, আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে মাফ করে দিয়েছেন।” [বুখারী হাদীসঃ৪৬৭৪]

মৃতদের জন্য জীবিতদের করণীয়

| comments

সকলকে একদিন মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। মৃত্যু থেকে কেউ রেহাই পাবে না। মানুষ মৃত্যুবরণ করার সাথে সাথে তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায়। তাই পরকালে শান্তিময় জীবন লাভ করতে চাইলে অবশ্যই দুনিয়াতে তাকে ভালো আমল করে যেতে হবে। আমাদের সমাজের লোকেরা তাদের পরলোকগত বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজনের জন্য বিভিন্ন রকমের আমল করে থাকে। কিন্তু তাদের অধিকাংশ সঠিক পদ্ধতি না জানার কারণে এ ক্ষেত্রে ভুল করে থাকে। তাই আমাদের জেনে রাখা উচিত, কোন কোন আমলের দ্বারা আমাদের পরলোকগত পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের উপকার হতে পারে।

মৃত্যুকালীন সময় থেকে মৃত্যুর পরবর্তী সময়ে মৃত ব্যক্তির বিদেহী আত্মার রূহের মাগফিরাতের জন্য জীবিতরা কী কী করতে পারে এবং তাতে মৃত ব্যক্তির কতটুকু উপকার হয় তা আমাদের জানা উচিত।

সহিহ হাদিসের দ্বারা প্রমাণিত যে, মানুষ মৃত্যুর পরও তার আমলনামায় দুই ধরণের আমল অব্যাহত থাকে। 
(ক) মৃতের এমন আমল যা তার জন্য সদকায়ে জারিয়া হতে পারে। 
(খ) এমন আমল, যা মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিতরা করে থাকে। যেমন মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিতরা দোয়া মাগফিরাত করে থাকে। তার মাগফিরাতের জন্য দান-সদকা করে থাকে। কিংবা তার জন্য নফল হজ্জ্ব উমরা করে থাকে।

সদকায়ে জারিয়ার বর্ণনা
মানুষ মৃত্যুর পরও জীবিত অবস্থায় তার কৃত আমলের দ্বারা উপকৃত হতে পারে। হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সমস্ত আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি আমলের দরজা বন্ধ হয় না। (১) সদকায়ে জারিয়া (২) যদি কেউ এমন সন্তান রেখে যায়, যে সন্তান বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করবে, (৩) এমন দীনি শিক্ষা রেখে যায়, যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হতে থাকে। (মুসলিম শরিফ) যেমন মসজিদ মাদরাসা বা কোনো দীনি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে যাওয়া। অথবা জনকল্যাণমূলক কোনো কাজ করে যাওয়া, যার উপকার মানুষ তার মৃত্যুর পরও ভোগ করতে পারে। অথবা এমন সন্তান তৈরি করে যাওয়া, যারা মৃত্যুর পরও তাদের বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজনের জন্য দোয়া করতে থাকে। কিংবা সে নেক আমল করতে থাকে, যার সওয়াব মৃত ব্যক্তি পেতে থাকতে। অথবা এমন ছাত্র তৈরি করে যাওয়া, যারা শিক্ষা বিস্তারে রত থাকে, এতে উস্তাদ তার সওয়াব পেতে থাকে। কিংবা এমন কোনো দীনি কিতাবাদি রচনা করে যাওয়া, যা পড়ে মানুষ উপকৃত হতে থাকে।

মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিতদের কৃত আমলের বর্ণনা
দ্বিতীয় প্রকার এমন আমল, যা মৃত ব্যক্তি নিজে করে যায়নি বা সে উক্ত আমলের জন্য কারণ বা উসিলা ছিল না। কিন্তু তারপরও সে উক্ত আমলের সাওয়াব পেতে থাকে। এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।

(ক) মৃত ব্যক্তির জন্য মুসলমানদের মাগফেরাতের দোয়া করা।
কুরআন ও হাদিসের একাধিক জায়গায় বাবা-মার সাথে সকল মুমিনদের জন্যও দোয়া করার শিক্ষা দেয়া হয়েছে। কুরআনে পাকে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে এবং আমাদের পূর্বে যারা ঈমান এনেছেন, তাদেরকে ক্ষমা কর। আর ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রেখ না’। [সুরা হাশর] অন্য আয়াতে আছে, আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে আমার প্রভু! রোজ কেয়ামতে আমাকে, আমার পিতা-মাতা ও সকল মুমিনকে ক্ষমা করে দিন’। [সুরা ইবরাহিম ৪১] অন্য আয়াতে আরও আছে, ‘হে আমার প্রতিপালক! তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছে’। [সুরা বনী ইসরাইল ২৪]

তাছাড়া রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকেও মৃতদের জন্য দোয়া করার নির্দেশ দিয়েছেন। হাদিস শরিফে আছে, ‘হযরত ওসমান বিন আফ্ফান রা. বলেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর তার কবরের পাশে দাঁড়াতেন এবং বলতেন, তোমরা তোমাদের ভাইদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তার জন্য ঈমানের ওপর অবিচল ও দৃঢ় থাকার দোয়া কামনা কর, কেননা এখনই তাকে প্রশ্ন করা হবে’। মৃত ব্যক্তির জন্য যে জানাজার নামাজ পড়া হয় সেটা তার জন্য দোয়া করার উদ্দেশ্যেই পড়া হয়। তাছাড়া রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিক হাদিসে কবর জিয়ারত করার নির্দেশ দিয়েছেন। এসব কিছু প্রমাণ করে, মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিতদের পাঠানো দোয়া ও ইস্তেগফার তার কাছে পৌঁছে এবং এর মাধ্যমে তিনি উপকৃত হন। অন্যথায় তার জন্য জানাযার নামাজ পড়া তার কবর যিয়ারত করার কোনো অর্থ থাকে না।

(খ) মৃত ব্যক্তির জন্য সাধারণ দান সদকা করা।
হাদিস শরিফে আছে, ‘হযরত আয়েশা রা. বলেন, জনৈক সাহাবি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে জিজ্ঞেস করেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার মা হঠাৎ মারা যান। মৃত্যুকালে তিনি কোনো ওসিয়ত করে যেতে পারেননি। আমার ধারণা তিনি যদি কথা বলার সুযোগ পেতেন, তাহলে দান সদকা করতেন। আমি তার পক্ষ থেকে দান সদকা করলে কি তিনি এর সওয়াব পাবেন? নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হ্যাঁ, অবশ্যই পাবেন। [বুখারি ও মুসলিম] এই হাদিস দ্বারা এ কথাই প্রতীয়মান হয় যে, মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কেউ যদি দান সদকা করে তাহলে সে তার সওয়াব পাবেন এবং এর দ্বারা তিনি উপকৃত হবেন।

(গ) মৃত ব্যক্তির পক্ষে হজ্জ আদায়
মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করা যেতে পারে। যদি মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ্জ অথবা উমরা আদায় করে তাহলে তার সওয়াব অবশ্যই মৃত ব্যক্তির কাছে যাবে। এর দ্বারা সে উপকৃত হবে। হাদিস শরিফে আছে-‘রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে এভাবে তালবিয়া পাঠ করতে শুনলেন, আমার শুবরুমার পক্ষ থেকে এ হজ্জ। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, শুবরুমা কে? লোকটি বলল, সে আমার ভাই, অথবা বলল সে আমার আত্মীয়। হযরত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি তোমার নিজের হজ্জ আদায় করেছ? সে বলল না, করিনি। আগে তোমার নিজের হজ্জ কর। তারপর শুবরুমার হজ্জ কর। [আবু দাউদ ২/৯৭]

অন্য হাদিস শরিফে আছে, ‘হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমার বোন হজ্জের মান্নত করেছিলেন, কিন্তু তিনি হজ্জ সম্পাদন করার আগেই মৃত্যুবরণ করেন। আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করতে পারি? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, তোমার বোনের ওপর যদি ঋণ থাকত তবে কি তুমি আদায় করতে না? সে বলল অবশ্যই আদায় করতাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তাহলে তুমি তোমার বোনের পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় কর। কেননা আল্লাহর দাবী আদায় করার অধিক উপযোগী। [বুখারি শরিফ ৮/১৪২] উল্লেখিত হাদিস দুটি দ্বারা বুঝা যায়, হজ্জ এমন একটি ইবাদত যা একে অন্যের পক্ষ থেকে আদায় করতে পারে এবং এর সাওয়াব তার নিকট পৌঁছে।

(ঘ) মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানি করা
সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানি করা জায়েয এবং এর দ্বারা মৃত ব্যক্তি সাওয়াব পাবে। হাদিস শরিফে আছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি দুম্বা কুরবানি করেন, জবাই করার সময় বললেন, এটা আমার উম্মতের ঐ সকল লোকদের পক্ষ থেকে যারা কুরবানি করতে পারেনি। মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানি করা জায়েয। সুতরাং কেউ যদি নিজের কুরবানির সাওয়াবে তার বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন ও মৃত ব্যক্তির নিয়ত করে নেয়, তাহলে তার সাওয়াব তারা পেয়ে যাবে।

(ঙ) মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে রোজা রাখা
মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে রোজা রাখলে তার সাওয়াব সে অবশ্যই পাবে। হযরত আয়েশা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করল এই অবস্থায় যে, তার ওপর রোজা ফরজ ছিল তবে তার পক্ষ থেকে তার ওয়ারিশগণ রোজা রাখবে। [বুখারি শরিফ ও মুসলিম শরিফ]
উপরূক্ত আমলগুলো ছাড়া মৃত ব্যক্তির নামে চল্লিশা করা, মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা, মীলাদ পাঠ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও বিদআত। বর্তমানে আমাদের দেশে অনেক স্থানে মৃত ব্যক্তির জন্য ভাড়া করা আলেম ও হফেজ দিয়ে কুরআন পড়ানো হয়। অনেক স্থানে আলেম বা হাফেজদের সাথে টাকা নিয়ে দরদাম হয়। এ ধরণের কর্ম সম্পূর্ণ হারাম ও বিদআত। মৃত ব্যক্তির জন্য কোনো আলেম বা হুজুরকে ভাড়া করে এনে কুরআন খতম করানো একটি নিষিদ্ধ ও পরিত্যাজ্য কাজ।

পূর্ববর্তী কোনো আলেম এ ধরণের কাজের অনুমতি দেয়নি। পরবর্তীতে কোনো কোনো পুঁজারী আলেম নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য এর অনুমতি দিয়েছেন। এ ধরণের কাজ স্বাধারণত রসম বা লোক লজ্জার ভয়ে করে থাকে। আবার অনেকে ছোট ছোট ওয়ারিশ থাকা সত্ত্বেও তাদের মাল তাদের অনুমতি ছাড়া এ সব কাজে খরচ করে, যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক মাসআলা জানার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : মুফতি মুহাম্মাদ শোয়াইব, শিক্ষক, জামিয়া রহমানিয়া সওতুল হেরা, টঙ্গী, গাজীপুর।
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. ইসলামী কথা - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Premium Blogger Template