السلام عليكم

যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার (তওবা) করবে আল্লাহ তাকে সব বিপদ থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেবেন। [আবূ দাঊদ: ১৫২০; ইবন মাজা: ৩৮১৯]

হজরত সালেহ (আ.)-এর অলৌকিক উট

| comments

হজরত সালেহ (আ.) ছিলেন হজরত নুহ (আ.)-এর ছেলে সামের বংশধর। তার সম্প্রদায়ের নাম ছিল সামুদ। সামের অধস্তন বংশধরে একজন প্রতাপশালী লোক ছিল সামুদ। সেই বীরপুরুষের নামেই এই গোত্রের নামকরণ হয়। এই গোত্রের বসবাস ছিল সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে হিজর নামক স্থানে; সেই স্থানটি এখন ‘মাদায়েনে সালেহ’ নামে পরিচিত। সামুদ ছিল শক্তিশালী ও বীরের জাতি। প্রস্তর খোদাই ও স্থাপত্যবিদ্যায় তাদের বিশেষ পারদর্শিতা ছিল। পর্বত খোদাই করে তারা বাসস্থান নির্মাণ করত। মাদায়েনে সালেহ অঞ্চলে এখনও সেই আমলের স্থাপত্যের নিদর্শনাবলি ও সামুদি শিলালিপি বিদ্যমান রয়েছে।


সামুদ জাতিও প্রথমে আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে এক সময় আল্লাহ ও পরকালকে ভুলে যায় এবং মূর্তিপূজা শুরু করে এবং শিরকে লিপ্ত হয়। আল্লাহ তায়ালা স্বীয় চিরন্তন বিধান অনুযায়ী তাদের হেদায়েতের জন্য হজরত সালেহ (আ.)-কে নবী হিসেবে প্রেরণ করেন। হজরত সালেহ (আ.) ছিলেন সম্ভ্রান্ত, বিচক্ষণ, প্রজ্ঞাময়, জ্ঞানী ও পণ্ডিত ব্যক্তি। যতদিন তিনি অহিপ্রাপ্ত হননি এবং মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করে আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান করেননি গোত্রের লোকজন ততদিন তাকে সমীহ ও মান্য করত। নবুয়ত লাভের পর তিনি তাদেরকে মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করে এক আল্লাহর ইবাদত করতে আহ্বান করেন। তিনি বললেন, ‘হে আমার জাতি! আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো উপাস্য নেই। তিনিই জমিন হতে তোমাদের সৃষ্টি করেছেন, তার মধ্যে তোমাদের বসতি দান করেছেন। অতএব তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, অতঃপর তাঁরই দিকে ফিরে চলো। আমার পালনকর্তা নিকটেই আছেন। কবুল করে থাকেন, সন্দেহ নেই।’ (সুরা হুদ : ৬১)


সালেহ (আ.) ছিলেন বিশুদ্ধভাষী এবং উচ্চকণ্ঠের বাগ্মী। বড় বড় সমাবেশে তিনি দাওয়াতের কাজ করতেন। যুক্তির নিরিখে দরদি কণ্ঠে আল্লাহর বাণীসমূহ শোনাতেন। মূর্তিপূজার কঠিন পরিণতির কথা বলতেন। আখেরাতের কথা শোনাতেন। জান্নাতের নেয়ামতরাজির কথা বলে তাদের উদ্বুদ্ধ করতেন। জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করতেন। কিন্তু গোত্রের লোকজন যেই মাত্র তার মুখে মূর্তিপূজার অসারতার বাণী শুনল, সঙ্গে সঙ্গে হজরত সালেহের প্রজ্ঞা ও পাণ্ডিত্য অস্বীকার করে বলল, ‘হে সালেহ! ইতঃপূর্বে তোমার কাছে আমাদের বড় আশা ছিল। আমাদের বাপ-দাদা যা পূজা করত তুমি কি আমাদেরকে তার পূজা করতে নিষেধ করো? কিন্তু যার প্রতি তুমি আমাদের আহ্বান করছ আমাদের তাতে এমন সন্দেহ রয়েছে যে, মন মোটেই সায় দিচ্ছে না।’ (সুরা হুদ : ৬২)। হজরত সালেহ (আ.) তাদেরকে বিভিন্নভাবে উপমা ও দৃষ্টান্ত বলে বলে বোঝাতে থাকলেন। বললেন, দুনিয়া চিরস্থায়ী বাসস্থান নয়। এখানকার ভোগবিলাস ক্ষণিকের মাত্র। সুতরাং তোমরা পরকালের চিন্তা করো।


কিন্তু সামুদ জাতির অধিকাংশ লোক হজরত সালেহ (আ.)-কে অস্বীকার করল। তবে যুক্তিতর্কে কোনোভাবেই যখন তারা হজরত সালেহ (আ.)-কে সত্যের দাওয়াত থেকে নিবৃত করতে পারল না তখন সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল- তার কাছে অলৌকিক কোনো দাবি পেশ কববে। এক দিন তারা সবাই একত্রিত হয়ে হজরত সালেহকে বলল, আপনি যদি সত্যি আল্লাহর নবী হন তবে আমাদেরকে কাতেবা পাহাড়ের ভেতর থেকে দশ মাসের গর্ভবতী সবল ও স্বাস্থ্যবতী উষ্ট্রী বের করে দেখান। হজরত সালেহ (আ.) তাদের থেকে প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার নিলেন, যদি আমি তোমাদের দাবি পূরণ করতে পারি তা হলে তোমরা আমার প্রতি ও আমার দাওয়াতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে কি না? সবাই এই প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। আল্লাহ তায়ালা তার দোয়া কবুল করলেন। সেই পাহাড় ফেটে ভেতর থেকে তাদের দাবির অনুরূপ একটি গর্ভবতী উষ্ট্রী বের হয়ে এলো।


এই অলৌকিক উষ্ট্রী দেখে উপস্থিত অনেকেই হজরত সালেহ (আ.)-এর ওপর ঈমান নিয়ে আসে। কিন্তু এমন প্রকাশ্য মুজেজা প্রত্যক্ষ করেও কিছু হতভাগা ঈমান আনল না। হজরত সালেহ (আ.) তাদের সতর্ক করে বললেন, ‘আল্লাহর এই উষ্ট্রীটি তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শন। অতএব তাকে আল্লাহর জমিনে বিচরণ করতে দাও এবং তাকে মন্দভাবে স্পর্শও করো না। নতুবা অতিসত্বর তোমাদেরকে আজাব পাকড়াও করবে।’ (সুরা হুদ : ৬৪)। কিন্তু গোত্রের কিছু দুষ্কৃতকারী লোক এই অলৌকিক প্রাণীটি হত্যা করে ফেলে। হত্যা করেই তারা ক্ষান্ত হলো না, হজরত সালেহ (আ.)-এর কাছে এসে ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে বলল, তুমি সত্যিকারের রাসুল হলে তোমার প্রতিশ্রুত আজাব আনো দেখি! আমরা তো উষ্ট্রীটি হত্যা করেছি। তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের ওপর শাস্তি নেমে আসে।


আল্লাহ তায়ালা সেই অবস্থার বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘অতঃপর তারা উষ্ট্রীকে হত্যা করল এবং স্বীয় প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করল। তারা বলল, হে সালেহ! নিয়ে এসো যা দ্বারা আমাদের ভয় দেখাতে, তুমি যদি রাসুল হয়ে থাকো। অতঃপর পাকড়াও করল তাদেরকে ভূমিকম্প। ফলে সকালবেলায় নিজ নিজ গৃহে উপুড় হয়ে পড়ে রইল।’ (সুরা আরাফ : ৭৭-৭৮)। অন্য আয়াতে আছে, তাদের ওপর প্রচণ্ড ও বিকট শব্দবোমা নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। সামুদ সম্প্রদায়ের ওপর একই সঙ্গে ভূমিকম্প ও বিকট গর্জন এসেছিল এবং তারা এই দুটি শাস্তিতে মৃত্যুমুখে পতিত হয়।


যুগে যুগে আল্লাহ তায়ালা বহু নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন। তাদের মাধ্যমে পৃথিবীর মানুষদের হেদায়েত ও পথপ্রদর্শন করেছেন। যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলগণকে অস্বীকার করেছিল তাদের ভয়াবহ ও রোমহর্ষক পরিণতি হয়েছে। সেসব পরিণতির কিয়দংশ পরবর্তীদের শিক্ষার জন্য দৃষ্টান্তস্বরূপ রেখে দিয়েছেন। যেমন- ডেড সি, ফেরাউনের লাশ এবং হজরত সালেহ (আ.)-এর সম্প্রদায়ের বিধ্বস্ত বাড়িঘর। মানুষ যেন এসব নিদর্শন দেখে দাম্ভিকতা পরিত্যাগ করে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাঁর প্রতি সেজদাবনত হয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের শিক্ষা অর্জনের তৌফিক দান করুন। আমিন।

হযরত ইয়াহিয়া (আঃ)

| comments

একদা হযরত ইয়াহিয়া (আঃ) এর সাথে ইবলিশের দেখা হয় । ইবলিশের হস্তস্হিত একটি বস্তুর প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহর নবী জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কি তোমার হাতে ? ইবলিশ বললো, - এটা শাহওয়াত বা প্রবৃত্তির তাড়না । এটা দিয়ে আমি বনী আদমকে শিকার করে থাকি । হযরত ইয়াহিয়া (আঃ) জিজ্ঞেস করলেন, আমাকে শিকার করার জন্য কি তোমার কাছে কিছু আছে ? ইবলিশ বললো , - না; তবে এক রাত্রিতে আপনি পরিতৃপ্ত হয়ে ভোজন করেছিলেন, সেই সুযোগে আমি আপনাকে অবসাদ গ্রস্ত করে নামায হতে উদাসীন করে দিয়েছিলাম । হযরত ইয়াহিয়া (আঃ) বললেন, 'আজ থেকে আমি আর কোনদিন তৃপ্ত হয়ে আহার করবো না ।' ইবলিশ বললো,- তাহলে আমিও আজ থেকে আর কোনদিন বনী আদমকে নসীহত করবো না ।


হযরত সুলাইমান (আঃ) বলেছেন, 'যে ব্যাক্তি স্বীয় প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে, সে দ্বিগ্বিজয়ী সেনাপতির চাইতেও বড় বাহাদুর ।'


মহানবী (সাঃ) বলেছেন, ' জঠর জ্বালার মাধ্যমে তুমি তোমার অন্তকরণকে জোর্তিময় করে তোল, ক্ষুধা ও তৃষ্ঞার অস্ত্রের মাধ্যমে তুমি তোমার রিপুর বিরুদ্ধে জিহাদে প্রবৃত্ত হও । ক্ষুধার সাহায্যে তুমি সদা বেহেশ্তের দরজায় কষাগাত করতে থাক । কেননা, এতে তোমার আমলনামায় জিহাদের সওয়াব লিপিবদ্ধ হবে । '


হযরত লোকমান হাকীম (রহঃ) স্বীয় পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, -'অধিক মাত্রায় নিদ্রা ও ভোজন থেকে নিজকে বিরত রাখ । কেননা, অধিক নিদ্রাযাপনকারী ও অধিক ভোজনকারী কিয়ামতের দিন আমল ও ইবাদত শূন্য হবে ।'

সুত্রঃ মুকাশাফাতুল ক্বুলুব । হযরত ইমাম গাজ্জ্বালী (রহঃ)

হযরত ইসহাক (আঃ)

| comments

হযরত ইসহাক ছিলেন ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রথমা স্ত্রী সারাহ-এর গর্ভজাত একমাত্র পুত্র। তিনি ছিলেন হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর চৌদ্দ বছরের ছোট। এই সময় সারাহর বয়স ছিল ৯০ এবং ইবরাহীমের বয়স ছিল ১০০। অতি বার্ধ্যক্যের হতাশ বয়সে বন্ধ্যা নারী সারাহ্-কে ইসহাক জন্মের সুসংবাদ নিয়ে ফেরেশতারা আগমন করেছিলেন ইব্রাহীম (আঃ)-এর কাছে । পবিত্র কুরআনে আকর্ষণীয় ভঙ্গীতে এ বিষয়ে আলোচিত হয়েছে সূরা হূদ ৭১-৭৩ আয়াতে, হিজর ৫১-৫৬ আয়াতে এবং যারিয়াত ২৪-৩০ আয়াতে- যা আমরা ইবরাহীমের জীবনীতে বর্ণনা করেছি। আল্লাহ ইসমাঈলকে দিয়ে যেমন মক্কার জনপদকে তাওহীদের আলোকে উদ্ভাসিত করেছিলেন, তেমনি ইসহাক্বকে নবুঅত দান করে তার মাধ্যমে শাম-এর বিস্থির্ণ এলাকা আবাদ করেছিলেন।


হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় জীবদ্দশায় পুত্র ইসহাক্বকে বিয়ে দিয়েছিলেন রাফক্বা বিনতে বাতওয়াঈল (رفقا بنت بتوائيل )-এর সাথে। কিন্তু তিনিও বন্ধ্যা ছিলেন। পরে ইবরাহীমের খাছ দো‘আর বরকতে তিনি সন্তান লাভ করেন এবং তাঁর গর্ভে ঈছ ও ইয়াকূব নামে পরপর দু’টি পুত্র সন্তান জন্ম লাভ করে। তার মধ্যে ইয়াকূব নবী হন। পরে ইয়াকূবের বংশধর হিসাবে বনু ইস্রাঈলের হাযার হাযার নবী পৃথিবীকে তাওহীদের আলোকে আলোকিত করেন। কিন্তু ইহুদী নেতাদের হঠকারিতার কারণে তারা আল্লাহর গযবে পতিত হয় এবং অভিশপ্ত জাতি হিসাবে নিন্দিত হয়। যা ক্বিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।


ইসহাক্ব (আঃ) ১৮০ বছর বয়স পান। তিনি কেন‘আনে মৃত্যুবরণ করেন এবং পুত্র ঈছ ও ইয়াকূবের মাধ্যমে হেবরনে পিতা ইবরাহীমের কবরের পাশে সমাহিত হন। স্থানটি এখন ‘আল-খালীল’ নামে পরিচিত’।


উল্লেখ্য যে, হযরত ইসহাক্ব (আঃ) সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ১৪টি সূরায় ৩৪টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।

হযরত ইলিয়াস (আ.)-এর জীবনী

| comments

পবিত্র কুরআনে মাত্র দু’জায়গায় হযরত ইলিয়াস (আঃ)-এর আলোচনা দেখা যায়।


 সূরা আন‘আম ৮৫ আয়াতে ও সূরা ছাফফাত ১২৩-১৩২ আয়াতে। সূরা আন‘আমে ৮৩-৮৫ আয়াতে ১৮ জন নবীর তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে। সেখানে কোন আলোচনা স্থান পায়নি। তবে সূরা ছাফফাতে সংক্ষেপে হ’লেও তাঁর দাওয়াতের বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। ঐতিহাসিক বর্ণনায় এ বিষয়ে প্রায় সবাই একমত যে, তিনি হযরত হিয্ক্বীল (আঃ)-এর পর এবং হযরত আল-ইয়াসা‘ (আঃ)-এর পূর্বে দামেষ্কের পশ্চিমে বা‘লা বাক্কা (بعلبك) অঞ্চলের বনু ইস্রাঈলগণের প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন। এই সময় হযরত সুলায়মান (আঃ)-এর উত্তরসুরীদের অপকর্মের দরুণ বনু ইস্রাঈলের সাম্রাজ্য দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। এক ভাগকে ‘ইয়াহূদিয়াহ’ বলা হ’ত এবং তাদের রাজধানী ছিল বায়তুল মুক্বাদ্দাসে। অপর ভাগের নাম ছিল ‘ইস্রাঈল’ এবং তাদের রাজধানী ছিল তৎকালীন সামেরাহ এবং বর্তমান নাবলুসে। ইলিয়াসের জন্মস্থান : হযরত ইলিয়াস (আঃ) ফিলিস্তীনের পার্শ্ববর্তী জর্ডানের আল‘আদ নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। আল্লাহ পাক তাঁকে নবী হিসাবে মনোনীত করেন এবং ফিলিস্তীন অঞ্চলে তাওহীদের প্রচার ও প্রসারের নির্দেশ দান করেন। ফিলিস্তীনের ধর্মীয় ও সামাজিক অবস্থা : এই সময় ফিলিস্তীনের বায়তুল মুক্বাদ্দাস ও নাবলুস অঞ্চলে বনু ইস্রাঈলদের দুই গ্রুপের দু’টি রাজধানী ছিল। তারা আপোষে পরস্পরে মারমুখী ছিল। ফেলে আসা নবুঅতী সমাজ ব্যবস্থা থেকে তারা অনেক দূরে একটি পতিত সমাজে পরিণত হয়েছিল। কিতাবধারী ও কিতাবহীন জাহেলী সমাজের মধ্যে পার্থক্য করার কোন উপায় ছিল না। তখনকার ‘ইস্রাঈল’-এর শাসনকর্তার নাম ছিল ‘আখিয়াব’ বা ‘আখীব’। তার স্ত্রী ছিল ‘ইযবীল’। যে বা‘ল (بعل) নামক এক দেবমূর্তির পূজা করত। সে বা‘ল মূর্তির নামে এক বিশাল উপাসনালয় তৈরী করে এবং সেখানে সকল বনু ইস্রাঈলকে মূর্তিপূজায় আহবান করে। দলে দলে লোক সেদিকে আকৃষ্ট হচ্ছিল। মূসা-হারূণ, দাঊদ ও সুলায়মান নবীর উম্মতেরা বিনা দ্বিধায় শিরকের মহাপাতকে আত্মাহুতি দিচ্ছিল। এমন এক মর্মান্তিক অবস্থায় আল্লাহ পাক তাদের নিকটে তাওহীদের বাণী প্রচারের জন্য ইলিয়াসকে নবী হিসাবে প্রেরণ করেন। ইলিয়াসের দাওয়াত : শিরকে আচ্ছন্ন ফিলিস্তীনবাসীকে হযরত ইলিয়াস (আঃ) তাওহীদের দাওয়াত দেন এবং শিরক পরিত্যাগ করার আহবান জানান। কেননা শিরক ও তাওহীদের একত্র সহাবস্থান কখনোই সম্ভব নয়। ইলিয়াস ও তাঁর দাওয়াত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, وَإِنَّ إِلْيَاسَ لَمِنَ الْمُرْسَلِيْنَ- إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ أَلاَ تَتَّقُوْنَ- أَتَدْعُوْنَ بَعْلاً وَتَذَرُوْنَ أَحْسَنَ الْخَالِقِيْنَ- اللهَ رَبَّكُمْ وَرَبَّ آبَائِكُمُ الْأَوَّلِيْنَ- فَكَذَّبُوْهُ فَإِنَّهُمْ لَمُحْضَرُوْنَ- إِلاَّ عِبَادَ اللهِ الْمُخْلَصِيْنَ- وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِيْنَ- سَلاَمٌ عَلَى إِلْ يَاسِيْنَ- إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِيْنَ- إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُؤْمِنِيْنَ- (الصافات ১২৩-১৩২)- ‘নিশ্চয়ই ইলিয়াস ছিল প্রেরিত রাসূলগণের অন্যতম’ (ছাফফাত ১২৩)। ‘যখন সে তার সম্প্রদায়কে বলল, তোমরা কি ভয় কর না’? (১২৪) ‘তোমরা কি বা‘ল দেবতার পূজা করবে আর সর্বোত্তম স্রষ্টাকে পরিত্যাগ করবে’? (১২৫) ‘যিনি আল্লাহ, তোমাদের পালনকর্তা ও তোমাদের পূর্বপুরুষদের পালনকর্তা’ (১২৬)। ‘অতঃপর তারা তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করল। অতএব তারা অবশ্যই গ্রেফতার হয়ে আসবে’ (১২৭)। ‘কিন্তু আল্লাহর খাঁটি বান্দাগণ ব্যতীত’ (১২৮)। আমরা এই নিয়মের উপরে পরবর্তীদেরকেও রেখে দিয়েছি’ (১২৯)। ‘ইলিয়াস-এর উপরে শান্তি বর্ষিত হৌক’ (১৩০)। ‘এভাবেই আমরা সৎকর্মীদের প্রতিদান দিয়ে থাকি’ (১৩১)। ‘নিশ্চয়ই ইলিয়াস ছিল আমাদের বিশ্বাসী বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত’ (ছাফফাত ৩৭/১২৩-১৩২)। দাওয়াতের ফলশ্রুতি : বিগত নবীগণের যে দুরবস্থা হয়েছিল, ইলিয়াস (আঃ)-এর ভাগ্যে তার ব্যতিক্রম হয়নি। তিনি ইস্রাঈলের শাসক আখিয়াব ও তার প্রজাবৃন্দকে বা‘ল দেবমূর্তির পূজা করতে নিষেধ করলেন এবং এক আল্লাহর প্রতি ইবাদতের আহবান জানালেন। কিন্তু দু’একজন হকপন্থী ব্যক্তি ছাড়া কেউ তাঁর কথায় কর্ণপাত করল না। তারা ইলিয়াস (আঃ)-এর বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচারে লিপ্ত হ’ল। তাকে যত্রতত্র অপমান-অপদস্থ করা শুরু করল। এমনকি দৈহিক নির্যাতনও শুরু হয়ে গেল। কিন্তু ইলিয়াস (আঃ) তাঁর দাওয়াত চালিয়ে যেতে থাকেন। অবশেষে রাজা ও রাণী তাঁকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে তিনি রাজধানী ছেড়ে অনেক দূরে এক পাহাড়ের গুহায় আত্মগোপন করলেন এবং দুর্ভিক্ষ নাযিলের জন্য আল্লাহর নিকটে প্রার্থনা করলেন। ফলে সারা দেশে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। ইলিয়াস (আঃ) মনে করলেন দুর্ভিক্ষ দূর করার জন্য তিনি যদি তাদেরকে মো‘জেযা প্রদর্শন করেন, তাহ’লে হয়ত তারা শিরক বর্জন করে তাওহীদ কবুল করবে এবং এক আল্লাহর ইবাদতে ফিরে আসবে। বাদশাহর দরবারে ইলিয়াসের উপস্থিতি : আল্লাহর হুকুমে হযরত ইলিয়াস (আঃ) তাওহীদের দাওয়াত নিয়ে সরাসরি ইস্রাঈলের বাদশাহ আখিয়াবের দরবারে হাযির হ’লেন। তিনি বললেন, দেশব্যাপী এই দুর্ভিক্ষের কারণ হ’ল আল্লাহর নাফরমানী। তোমরা নাফরমানী থেকে বিরত হ’লে এ আযাব দূর হ’তে পারে। তোমরা বলে থাক যে, তোমাদের বা‘ল দেবতার নাকি সাড়ে চারশ’ নবী (!) আছে। তাই যদি হয়, তাহ’লে তুমি তাদের সবাইকে একত্রিত কর। তারা এই দুর্ভিক্ষ দূর করার জন্য বা‘ল দেবতার নামে কুরবানী করুক। আর আমি একই উদ্দেশ্যে আল্লাহর নামে কুরবানী পেশ করি। যার কুরবানী আসমান থেকে আগুন এসে ভস্ম করে দেবে, তার ধর্মই সত্য বলে গণ্য হবে। ইলিয়াস (আঃ)-এর এ প্রস্তাব সবাই সানন্দে মেনে নিল। আল্লাহ ও বা‘ল দেবতার নামে কুরবানীর ঘটনা : পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘কোহে কারমাল’ নামক পাহাড়ী উপত্যকায় সকলে সমবেত হ’ল। বা‘ল দেবতার নামে তার মিথ্যা নবীরা কুরবানী পেশ করল। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বা‘ল দেবতার উদ্দেশ্যে আকুতি-মিনতি ও কান্নাকাটি করে প্রার্থনা করা হ’ল। কিন্তু দেবতার কোন সাড়া পাওয়া গেল না। আসমান থেকে কোন আগুন নাযিল হ’ল না। অতঃপর হযরত ইলিয়াস (আঃ) আল্লাহর নামে কুরবানী করলেন এবং যথাসময়ে আসমান থেকে আগুন এসে তা খেয়ে গেল। বস্ত্ততঃ এটাই ছিল কুরবানী কবুল হওয়ার নিদর্শন। এভাবেই কবুল হয়েছিল আদমপুত্র হাবীলের কুরবানী। তখনকার সময় মুশরিকদের মধ্যেও এ রীতি গ্রহণযোগ্য ছিল, যা ইলিয়াসের বর্তমান ঘটনায় প্রমাণিত হয়। আসমান থেকে আগুন এসে কুরবানী কবুলের এই অভাবনীয় দৃশ্য দেখে অনেকে সাথে সাথে সিজদায় পড়ে গেল এবং ইলিয়াসের দ্বীন কবুল করে নিল। সকলের নিকটে ইলিয়াস (আঃ)-এর সত্যতা স্পষ্ট হয়ে গেল। কিন্তু বা‘ল পূজারী কথিত ধর্মনেতারা তাদের যিদের উপরে অটল রইল। এইসব মিথ্যা নবীরা ও তাদের স্বার্থান্ধ অনুসারীরা ঈমান আনল না। ইলিয়াস (আঃ)-কে পুনরায় হত্যার ষড়যন্ত্র : ওদিকে আখিয়াবের স্ত্রী ইখবীল হযরত ইলিয়াস (আঃ)-কে পুনরায় হত্যার চক্রান্ত শুরু করে দিল। ফলে তিনি রাজধানী সামেরাহ (নাবলুস) ছেড়ে চলে গেলেন এবং কিছুদিন পর বনু ইস্রাঈলের অপর রাজ্য পার্শ্ববর্তী ইয়াহূদিয়াহতে উপস্থিত হ’লেন। ঐসময় বা‘ল পূজার ঢেউ এখানেও লেগেছিল। হযরত ইলিয়াস (আঃ) সেখানে পৌঁছে তাওহীদের দাওয়াত শুরু করলেন। সেখানকার সম্রাট ‘ইহুরাম’-এর কাছেও তিনি দাওয়াত দিলেন। কিন্তু নিরাশ হ’লেন। অবশেষে তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী সে ধ্বংসপ্রাপ্ত হ’ল। কয়েক বছর পর ইলিয়াস (আঃ) পুনরায় ‘ইস্রাঈলে’ ফিরে এলেন এবং ‘আখিয়াব’ ও তার পুত্র ‘আখযিয়া’-কে সত্য পথে আনার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তারা তাদের শিরকী ধ্যান-ধারণায় অটল রইল। অবশেষে তাদের উপরে বৈদেশিক আক্রমণ ও মারাত্মক রোগ-ব্যধির গযব নাযিল হ’ল। অতঃপর আল্লাহ পাক তাঁর নবীকে উঠিয়ে নিলেন। হযরত ইলিয়াস (আঃ) জীবিত আছেন কি? সুয়ূত্বী, ইবনে আসাকির, হাকেম প্রমুখের বিভিন্ন বর্ণনায় প্রতীয়মান হয় যে, চারজন নবী জীবিত আছেন। তন্মধ্যে খিযির ও ইলিয়াস দুনিয়াতে এবং ইদরীস ও ঈসা আসমানে রয়েছেন। কিন্তু হাকেম ও ইবনু কাছীর এসব বর্ণনাকে বিশুদ্ধ বলেননি। সারকথা, হযরত ইলিয়াস (আঃ)-এর জীবিত থাকার বিষয়টি কোন ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত নয়। অতএব এসব বর্ণনার প্রতি কর্ণপাত করার কোন প্রয়োজন নেই। ইলিয়াস (আঃ) স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় মৃত্যুবরণ করেছেন বলেই আমরা বিশ্বাস করব।

হযরত আদম (আ:)

| comments

ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী আল্লাহর সৃষ্ট প্রথম মানব হলেন আদম (আ:)।পবিত্র কুরআনের বর্ণিত রয়েছে আল্লাহ বলেন,”নিশ্চয়ই আমি তাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, তারপর তার দেহে প্রাণ সঞ্চার করেছি”। আদম (আ:) এর পাঁজর থেকে সৃষ্টি করা হয় হাওয়া (আ:) কে। সৃষ্টির পর তাদের আবাস হয় বেহেশত বা জান্নাতে । মানুষ যেহেতু সকল সৃষ্টির সেরা তাই আদমকে সিজদা করার জন্য ফেরেশতাকুল কে আল্লাহ আদেশ দেন। আল্লাহর এই আদেশ সকল ফেরেশতাকুল প্রতিপালন করেন কিন্তু ইবলিশ তা অমান্য করেন। ফলে আল্লাহ ইবলিশকে জান্নাত থেকে বের করে শয়তান বানিয়ে দেন।

আবূ হূরায়রা থেকে বর্ণিত যে, হযরত মুহাম্মদ (সা:) বলেন, যখন আল্লাহ আদমকে সৃষ্টি করেছিলেন তখন তার উচ্চতা ছিল ৬০ কিউবিট বা হাত এবং বেহেশতে প্রবেশকালে আদম (আ:) এর আকার লাভ করবে মানুষ জাতি।


সৃষ্টির পর আদম (আ:) ও হাওয়ার (আ:) অবস্থান ছিল জান্নাতে। তাদের জন্য সেখানে এক ধরনের বিশেষ ফল(গন্দম) খাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। আদম এবং হাওয়া উভয়ই শয়তানের প্রোচনায় এসে গন্দম ফল খেয়ে ফেলেন।


এটি মানুষের আদিপাপ বলে পরিগণিত হয়। মহান আল্লাহ এর শাস্তি স্বরূপ তাদেরকে বেহেশ্ত থেকে বিতাড়িত করেন এবং পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন। আদম (আ:)পৃথিবীতে শত শত বছর আল্লাহর কাছে তওবা করেন তাদের ভুলের জন্য। পবিত্র কুরআনে আছে, আদম আল্লাহর কাছে এই দোয়া করতেন


“রাব্বানা যালামনা আনফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফিরলানা ওয়া তারহামনা লানা কূনান্না মিনাল খাসেরীন”


অর্থাৎ”আল্লাহ ভুল করেছি,গুনা করেছি,অপরাধ করেছি তুমি যদি মাফ না করো মাফ করার কেহ নাই”


এই দোয়া করে তিনি চোখের পানি ফেলে ফেলে আল্লাহর কাছে তওবা করতেন। মহান আল্লাহ তাআলা আদম কে ক্ষমা করে দেন।


আদম (আ:) এবং হাওয়া (আ:) অবতরণ করেন পৃথিবীর ভিন্ন দুটি স্থানে। আদম অবতরণ করেন সিংহলে আর হাওয়া অবতরণ করেন হিজাযে। আরবের আরাফাত নামক প্রান্তরে


দীর্ঘদিন পর পুনর্মিলন হয় তাদের। আল্লাহর তরফ থেকে পৃথিবীতে আগমনের পর আদম (আ:) ও হাওয়া (আ:)কে কাবাগৃহ নির্মাণের আদেশ প্রদান করা হয়। ক্বাবা নির্মিত হয়ে গেলে তাদেরকে তা তাওয়াফ করার আদেশ দেয়া হয়। আদমের নিঃসঙ্গতা দূরীকরণের জন্য হাওয়াকে সৃষ্টি করা হয় তার বাম পাঁজরের হাড় থেকে। হাওয়া ছিলেন তার স্ত্রী। পৃথিবীতে আগমনের পর ১৪০ জোড়া সন্তান হয় তাদের। ইসলামের ইতিহাসে , ইসলামের শিক্ষায় , ইসলামী জীবনীতে আমার হযরত আদম (আ:) সম্পর্কে আরো অনেক কিছুই জানার আছে।

হজরত ইসমাইল (আ.)

| comments

আল্লাহপাক কোরআন মজিদে এই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে- আল্লাহর নবী হজরত ইবরাহিম (আ.) ছেলে ইসমাইলকে বললেন যে, ‘হে আমার প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে জবাই করছি। এ ব্যাপারে তোমার মতামত কী, ভেবে দেখ? ইসমাইল (আ.) সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ইয়া আবাতিফ আল মা তু-মার, সাতাজিদুনি ইনশাআল্লাহু মিনাস সোয়াবেরিন।’ ‘আব্বাজান! যে আদেশ আপনার প্রতি এসেছে, তা আপনি কার্যকর করুন। আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন, ইনশাআল্লাহ।’ যেমন বাবা তেমন ছেলে। কথায় বলে ‘বাপ কা বেটা’। ইনশাআল্লাহ-এর আক্ষরিক তরজমা ‘আল্লাহ যদি চান’। ইসমাইল (আ.) বরকত হাসিলের জন্যই আল্লাহর ইচ্ছার সঙ্গে নিজের মত ও সিদ্ধান্তকে যুক্ত করেছেন। অন্যথায় তার সিদ্ধান্তটি ছিল অবিচল। মনে কোনো সংশয় রেখে বলেননি যে, আল্লাহ যদি চান। এভাবে পিতাণ্ডপুত্র উভয়ে নিজেকে সমর্পণ করলেন।


‘ফালাম্মা আসলমা’- ‘অতঃপর তারা যখন আল্লাহর আদেশের সামনে মাথা নত করে দিলেন।’ ‘ওয়াতাল্লাহু লিল জাবিন’- ‘আর তাকে (ইসমাইলকে) শুইয়ে দিলেন (মাটির ওপরে) কপাল-পার্শ্ব রেখে।’ কপালের এক পার্শ্বকে বলা হয় জাবিন। অর্থাৎ কাত করে শোয়ালেন। এই দৃশ্য বড় হৃদয়বিদারক। তখন ইবরাহিম (আ.) বললেন, হে বৎস! তুমি আল্লাহর হুকুম পালনে আমার বড় সহায় হলে। অতঃপর ছেলে যা যা বললেন, ইবরাহিম আঞ্জাম দিলেন।


কোরআন মজিদ তার বর্ণনা দিয়েছে এভাবে- ‘ওয়া না-দাইনাহু আঁই ইয়া ইবরাহিম, ক্বাদ সাদ্দাকতার রু-য়া ইন্না কাজালিকা নাজজিল মুহসিনিন।’ ‘আমি তাকে ডাক দিয়ে বললাম, হে ইবরাহিম! তোমার স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করেছ। এভাবেই আমি আমার সত্যনিষ্ঠ বান্দাদের প্রতিদান দিয়ে থাকি।’ ইবরাহিম (আ.) মাথা তুলে চোখের বাঁধন খুলে দেখলেন, পাহাড়ের ওপর থেকে একটি দুম্বা নেমে আসছে, দেখতে হৃষ্টপুষ্ট। অন্তত চল্লিশ বসন্ত বেহেশতের চারণভূমিতে বিচরণ করেছে। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, এই দুম্বা ছিল হজরত আদম (আ.) এর ছেলে হাবিলের দেওয়া কোরবানি, যা আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছিল। জান্নাত কাননে তা পালিত হয়েছে। এজন্য আল্লাহপাক একে ‘জিবহিন আজিম’ মহা মর্যাদাবান কোরবানি বলে অভিহিত করেছেন।


জিবরাইল (আ.) বললেন, এই দুম্বা আপনার ছেলের পরিবর্তে উৎসর্গিত। ইসমাইলের পরিবর্তে এটি জবাই করেন। তখন জিবরাইল (আ.) তাকবির ধ্বনি দিলেন, ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার’। ইবরাহিম (আ.) তাকে অনুসরণ করে বললেন, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার’। সঙ্গে সঙ্গে ইসমাইল (আ.) ও বললেন, ‘আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লা হিল হামদ’। এই তাকবির নিয়মে পরিণত হয় ঈদের দিনগুলোতে ও হজের সময়ের জন্য। (তাফসিরে কাশফুল আসরার অষ্টম খণ্ড : পৃ. ২৯৩)।

নবী ইবরাহীম (আ) এর অগ্নি পরীক্ষা

| comments

ইবরাহীম (আ) এর সাথে যখন যুক্তি ও বিতর্কে এঁটে উঠতে পারলো না, তাদের পক্ষে পেশ করার মত কোন দলীল-প্রমাণ থাকল না, তখন তারা বিতর্কের পথ এড়িয়ে শক্তি ও ক্ষমতা প্রয়োগের পথ অবলম্বন করে- যাতে করে নিজেদের নির্বুদ্ধিতা ও হঠকারিতা টিকিয়ে রাখতে পারে। অতঃপর আল্লাহ্ সুবাহানহুয়া তা'আলা তাদের চক্রান্তকে ব্যর্থ করে দেয়ার কৌশল গ্রহণ করেন।


'তারা বলল, একে পুড়িয়ে দাও এবং তোমাদের উপাস্যদের সাহায্য কর, যদি তোমরা কিছু করতে চাও। আমি বললাম, হে অগ্নি! তুমি ইব্রাহীমের উপর শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও। তারা ইব্রাহীমের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করল, অতঃপর আমি তাদেরকেই সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্থ করে দিলাম।' -[ক্বুরআন ২১ : ৬৮-৭০]


তারা বিভিন্ন স্থান থেকে সম্ভাব্য চেষ্টার মাধ্যমে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে থাকে। দীর্ঘদিন পর্যন্ত তারা এ সংগ্রহের কাজে রত থাকে। তাদের মধ্যে কোন মহিলা পীড়িত হলে মানত করত যে, যদি সে আরোগ্য লাভ করে তবে ইবরাহীম (আ) কে পোড়াবার লাকড়ি সংগ্রহ করে দেবে। এরপর তারা বিরাট এক গর্ত তৈরী করে তার মধ্যে লাকড়ি নিক্ষেপ করে অগ্নি সংযোগ করে। ফলে তীব্র দাহনে প্রজ্বলিত অগ্নিশিখা এত উর্ধে উঠতে থাকে, যার কোন তুলনা হয় না। তারপর ইবরাহীম (আ) কে মিনজানীক নামক নিক্ষেপণ যন্ত্রে বসিয়ে দেয়।



এ যন্ত্রটি কুর্দী সম্প্রদায়ের হাযান নামক এক ব্যক্তি তৈরী করে। মিনজানীক যন্ত্র সে-ই প্রথম আবিষ্কার করে। আল্লাহ্ তাকে মাটির মধ্যে ধসিয়ে দেন। কিয়ামত পর্যন্ত সে মাটির মধ্যে তলিয়ে যেতে থাকবে। তারপর তারা ইবরাহীম (আ) কে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যেতে থাকে। তখন তিনি বলতে থাকেন-

'আপনি (আল্লাহ্) ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই, আপনি মহা পবিত্র, বাদশাহীর মালিক কেবল আপনিই, আপনার কোন শরীক নেই।'


অতঃপর তারা ইবরাহীম (আ) কে মিনজানীকের পাল্লায় হাত-পা বাঁধা অবস্থায় রেখে আগুনে নিক্ষেপ করে। তখন তিনি বলেন-

'আমার জন্য আল্লাহ্-ই যথেষ্ট, তিনি উত্তম অভিভাবক।'


আবু ইয়ালা (র)... আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ইবরাহীম (আ) কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হয় তখন তিনি এ দু'আটি পড়েন-

'হে আল্লাহ্! আপনি আকাশ রাজ্যে একা আর এই যমীনে আমি একাই আপনার ইবাদাত করছি।'


পূর্ববর্তী যুগের কোন কোন আলিম বলেন, জিবরাঈল (আ) শূন্য থেকে ইবরাহীম (আ) কে বলেছিলেন- আপনার কোন সাহায্যের প্রয়োজন আছে কি? উত্তরে ইবরাহীম (আ) বলেছিলেন- সাহায্যের প্রয়োজন আছে, তবে আপনার কাছে নয় (আল্লাহর কাছে)।


আর আল্লাহর নির্দেশ বাণী অধিক দ্রুত গতিতেই পৌঁছে যায় -

'(আল্লাহ্ বলেন) আমি বললাম, হে আগুন! তুমি ইবরাহীমের উপর শান্তিদায়ক হয়ে যাও।'


ইবরাহীম (আ) যখন প্রাচীর বেষ্টনীর মধ্যকার উক্ত গহ্বরে অবস্থান করছিলেন, তখন তার চতুষ্পার্শ্বে আগুনের লেলিহান শিখা দাউ দাউ করছিল, অথচ তিনি ছিলেন শান্তি ও নিরাপদে।


আবু হুরায়রা (রা) বলেন, ইবরাহীম (আ) এর পিতা আপন পুত্রের এ অবস্থা দেখে একটি উত্তম কথা বলেছিল, তা হল-

'হে ইবরাহীম! তোমার প্রতিপালক কতই না উত্তম প্রতিপালক।'


তথ্যসূত্র: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১ম খণ্ড

হজরত নুহের (আ.) মহাপ্লাবনের ঘটনা

| comments

হজরত আদমের (আ.) ইন্তেকালের পর অনেকদিন পেরিয়ে গেছে। শয়তানের ধোঁকায় মানুষ ধীরে ধীরে ‎মূর্তিপূজা করতে শুরু করেছে। এমন সময় আল্লাহ তাআলা তাদের মাঝে একজন নবী পাঠান—যিনি এক ‎আল্লাহর দাওয়াত দেন, শিরক না করার নসিহত করেন। তার নাম হজরত নুহ (আ.)।


কুরআনে তার নামে ‎একটি সুরা আছে এবং ২৮টি সুরায় ৮১টি আয়াতে তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।



হজরত নুহ (আ.) সাড়ে নয়শো বছর বেঁচে ছিলেন। ‎ এই দীর্ঘ সময়কালে অক্লান্তভাবে তিনি কেবল ‎দাওয়াতি কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন। কী সকাল, কী বিকাল; কী দিন, কী রাত; প্রকাশ্যে কিংবা চুপিসারে—‎তিনি শুধু এ কথাই বলে গেছেন, ‘হে আমার জাতি, তোমরা আল্লাহর এবাদত করো, তিনি ছাড়া আর ‎কোনো ইলাহ নাই। তবু কি তোমরা সাবধান হবে না?’‎ (সুরা মুমিনুন, আয়াত ২৩)‎


কিন্তু কেউ তার দাওয়াতে সাড়া দেয়নি। বরং ‎তার সম্প্রদায়ের লোকেরা কানে আঙ্গুল দিয়ে কিংবা নিজেকে কাপড় দিয়ে আড়াল করে সটকে পড়েছে, ‎তার প্রতি উদ্ধত আচরণ করেছে। এটাই ছিল নিত্যদিনের গল্প। এরপরেও ধৈর্য ধরে তিনি শুধু দাওয়াত ‎দিয়ে গেছেন। সব অবহেলা সয়ে নিয়ে শুধু আল্লাহর কথা বলেছেন।


হজরত নুহ (আ.) প্রেরিত হয়েছিলেন বর্তমান সময়ের ইরাক ও সিরিয়া অঞ্চলে। এর আগে মানুষ কেবল ‎কৃষিকাজ করত, সমাজে মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ ছিল না। কিন্তু ওই সময় সমাজব্যবস্থা ধীরে ধীরে ‎নগরকেন্দ্রিক হয়ে উঠতে শুরু করে এবং সমাজ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়—এক ভাগে ছিল অভিজাত ‎শ্রেণি, অন্য ভাগে ছিল নিম্নশ্রেণি।


অভিজাত শ্রেণির মানুষ নিম্নশ্রেণির মানুষের প্রতি নানাভাবে জুলুম-নির্যাতন ‎করত, তাদের নিচু চোখে দেখত। অভিজাতরা দেখতেই কেবল মানুষ ছিল, তাদের মাঝে মানুষের কোনো ‎গুণ ছিল না। তাদের আচার-আচরণ ছিল জন্তু-জানোয়ারের মতো। ‎(তাবিলুল আহাদিস, শাহ ওলিউল্লাহ দেহলবি, পৃষ্ঠা ১৮)


তারা ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগুস, ‎ইয়াউক ও নাসর নামে পাঁচটি মূর্তির পূজা করত। হজরত নুহ (আ.) কাউকে ইসলামের দিকে দাওয়াত ‎দিলে তাদের নেতৃবৃন্দ বলত, তোমরা মূর্তিদের ত্যাগ করো না।


তবু নুহ (আ.) আল্লাহর নির্দেশিত কাজ করে যেতেন—মানুষকে এক আল্লাহর এবাদত করতে ‎বলতেন। কোনোদিন দাওয়াতি কাজ ছেড়ে দেননি, কখনো নিরাশ হননি।


তার অঞ্চলের নেতৃবৃন্দ বলল, ‎‎‘হে নুহ, তুমি যদি বিরত না হও, তাহলে পাথর মেরে তোমার মাথা চূর্ণবিচূর্ণ করে দেব।’‎ (সুরা শুআরা, আয়াত ২৬৬) এরপরেও নুহ ‎‎(আ) থেমে যাননি, তিনি উলটো দোয়া করেন, ‘হে খোদা, তুমি তাদের ক্ষমা করো, তারা বোঝে না।’‎


কিন্তু দিনের পর দিন শুধু অত্যাচারের পরিমাণ বাড়তেই থাকে। অভিজাত লোকেরা তাদের সন্তানদেরও ‎শিখিয়ে দিত কীভাবে নবী ও মুসলিমদের প্রতি জুলুম করতে হবে।


নুহ (আ.) আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে ‎বললেন, ‘হে আমার প্রতিপালক, তারা তো আমাকে অমান্য করছে, আর অনুসরণ করছে এমন ব্যক্তির—‎যার সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি দুর্দশা ছাড়া কিছুই বৃদ্ধি করবে না।’‎ ‎(সুরা নুহ, আয়াত ২১)


এক পর্যায়ে আল্লাহ তাআলা ওহি ‎মারফত জানালেন, ‘তোমার কওমের যারা ঈমান এনেছে তারা ছাড়া আর কেউ ঈমান আনবে না।’‎ (সুরা হুদ, আয়াত ৩৬)‎


‎হজরত নুহ (আ.) তখন কাতরকণ্ঠে ফরিয়াদ করলেন, ‘হে খোদা, আমাকে সাহায্য করুন। তারা আমাকে ‎মিথ্যাবাদী বলছে।’‎ ‎(সুরা মুমিনুন, আয়াত ২৬)


তিনি আরও বলেন, ‘আপনি আমার ও তাদের মাঝে চূড়ান্ত ফয়সালা করে দেন, ‎আমাকে ও মুমিনদের (তাদের হাত থেকে) রেহাই দিন।’‎ (সুরা শুআরা, আয়াত ১৮৮)‎


একদম শেষে তিনি বদদোয়া করেন, ‘হে আমার ‎রব! পৃথিবীতে বসবাসকারী কাফিরদের একজনকেও আপনি ছাড় দিবেন না। আপনি যদি তাদেরকে রেহাই ‎দেন, তাহলে তারা আপনার বান্দাদেরকে গুমরাহ করবে আর কেবল পাপাচারী কাফির জন্ম দিতে ‎থাকবে।’‎ (সুরা নুহ, আয়াত ২৬-২৭)


এরপর আল্লাহ তাআলা তাকে একটি বিশাল নৌকা তৈরি করতে বলেন। কীভাবে নৌকা বানাতে হবে ‎আল্লাহ তাআলাই শিখিয়ে দেন।

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘নৌকাটি লম্বায় ছিল ১২০০ হাত, আর ‎পাশ ছিল ৬০০ হাত।’‎ ‎ উচ্চতা ছিল ৩০ হাত, তিনতলা ছিল—নিচতলায় কীট-পতঙ্গ ও জন্তু-জানোয়ার, ‎দোতলায় মানুষ আর তেতলায় থাকবে পাখ-পাখালি। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৫৮, ইফা)


এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখন আমার নির্দেশ ‎আসবে আর চুলা (পানিতে) উথলে উঠবে, তখন প্রত্যেক জীবের এক এক জোড়া আর তোমার পরিবার-‎পরিজনদের নৌকায় তুলে নেবে, তবে তাদের মধ্যে যাদের বিপক্ষে (ডুবে মরার) পূর্বসিদ্ধান্ত হয়ে গেছে ‎তাদেরকে বাদ দিয়ে। আর জালিমদের পক্ষে আমার নিকট আবেদন করো না, তারা (বন্যায়) ডুবে ‎মরবেই।’‎ ‎ ‎(সুরা মুমিনুন, আয়াত ২৭)


যেহেতু ওই অঞ্চলে কখনোই বন্যা হয়নি, বছরের বেশির ভাগ সময় খরা থাকত, তাই কাফেরেরা নৌকা ‎নিয়ে হাসি-মজাক করত। তারা ঠাট্টা করে বলত, নুহ এতদিন ছিলে নবী, নবুওয়তি ছেড়ে এখন হয়েছ ‎কাঠমিস্ত্রি! অবশেষে নির্দিষ্ট দিন আসে।


হজরত নুহ (আ.) নারী ও পুরুষ মিলিয়ে ৮০ জন মুমিন এবং পশু-‎পাখি নিয়ে নৌকায় চড়ে বসেন। তারা নৌকায় ওঠার পরেই আকাশ ভেঙ্গে তুফান শুরু হয়, মাটির নিচ ‎থেকেও পানি উঠতে শুরু করে। দুই দিকের পানি মিলে সবচেয়ে উঁচু পাহাড়েরও ১৫ হাত উপরে পানি ‎উঠে যায়।


দুনিয়ায় থাকা এমন একজন কাফেরও ছিল না যে আল্লাহর এই আজাব থেকে বাঁচতে পেরেছে। ‎বিশাল এই নৌকাটি ১৫০ দিন ভেসে বেড়ায়, তারপর মুহাররমের ১০ তারিখে জুদি পাহাড়ে নোঙর ফেলে।

হজরত ইউসুফ (আ.)

| comments

 হজরত ইয়াকুব (আ.) তাঁর ১২ পুত্রের মধ্যে হজরত ইউসুফ (আ.)-কে বেশি স্নেহ করতেন। মূলত সৌন্দর্যের কারণে শিশুকালে তিনি সবারই প্রিয়পাত্র ছিলেন, যা তাঁর সৎ ভাইয়েরা সহ্য করতে পারতেন না। এই ভাইয়েরা হজরত ইউসুফ (আ.)-কে শিশু অবস্থায় তাদের পিতার কাছ থেকে দূরে সরানোর ঘৃণ্য চক্রান্ত করেন। তারা বাবা ইয়াকুব (আ.)-এর কাছে ইউসুফ (আ.)-কে তাদের সঙ্গে বাইরে খেলতে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি চান। ইয়াকুব (আ.) কখনো পুত্র ইউসুফ (আ.)-কে চোখের আড়াল করতেন না। তাই তাকে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলতে পারে উল্লেখ করে নিষেধ করেন, তবে উপর্যুপরি অনুরোধ এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তার কথা বলে সৎ ভাইয়েরা বাবাকে রাজি করান এবং ইউসুফ (আ.)-কে খেলতে নিয়ে যান। এরপর তাকে প্রথমে হত্যা করার পরিকল্পনা করলেও বড় ভাইয়ের পরামর্শে হত্যার বদলে কূপে ফেলে দেওয়া হয়। আর তার কাপড়ে রক্ত মাখিয়ে তা বাড়িতে বাবাকে দেখান এবং ইউসুফ (আ.)-কে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলেছে বলে উল্লেখ করেন। বাবা হজরত ইয়াকুব (আ.) এ ঘটনায় শোকে মুষড়ে পড়েন এবং পুত্রশোকে কাঁদতে কাঁদতে চোখ সাদা এবং অন্ধ হয়ে যান। পবিত্র কোরআনের সূরা ইউসুফের ৮ থেকে ১৮ নম্বর আয়াতে এ ঘটনার বর্ণনা রয়েছে।



ঘটনাচক্রে তিনি একটি কাফেলার গোলাম সঙ্গী হয়ে মিশর যাত্রা শুরু করেন।


মিসরের দাস-দাসী বিক্রির হাটে সুদর্শন ইউসুফ (আ.)-এর আগমনে সাড়া ফেলে দেয় এবং তার মূল্য ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। সবশেষে ইউসুফ (আ.)-এর ওজনের সমপরিমাণ সোনা, মৃগনাভী এবং রেশমি বস্ত্রের বিনিময়ে তাকে কিনে নেন ‘অজিজে মিসর’ অর্থাৎ মিসরের অর্থ ও খাদ্যমন্ত্রীতুল্য রাজসভার একজন সদস্য। কোনো কোনো বর্ণনায় তাকে মিসরের তৎকালীন আমালেকা জাতীয় সম্রাট বায়য়াদ ইবনে ওয়াসাদের অর্থমন্ত্রী ‘কিতফি’ কিংবা ‘ইতফি’ বলে উল্লেখ করা হয়। তিনি তাকে তার স্ত্রী জুলায়খার হাতে সমর্পণ করেন। সে তার স্ত্রীকে ইউসুফ (আ.)-এর প্রতি বিশেষ যত্নবান হওয়ার নির্দেশ দেন এবং এই ইউসুফ (আ.) তাদের বিশেষ উপকারে আসবেন বলে প্রত্যাশা করেন। এভাবেই ইউসুফ (আ.) এবং জুলেখার পরিচয় হয়।


পবিত্র কোরআনে হজরত ইউসুফ (আ.)-কে নিয়ে সর্বাধিক আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর ঘটনার নেপথ্যে থাকা প্রধান দুই চরিত্রের নাম সরাসরি উল্লিখিত হয়নি। সূরা ইউসুফে হজরত ইউসুফ (আ.)-কে ক্রয়কারীকে ‘আজিজ’ বা মন্ত্রী হিসেবে এবং তার স্ত্রীকে ‘আজিজের স্ত্রী’ বা ‘তার স্ত্রী’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে। তবে তাফসির এবং ঐতিহাসিক বর্ণনা মতে, এই আজিজের স্ত্রীই হলেন ইতিহাস-খ্যাত ‘জুলেখা’। আবার অনেকের মতে, তাঁর প্রকৃত নাম রঙ্গিল আর উপাধি হলো জুলেখা।


জুলেখার ঘরেই কৈশোর পেরিয়ে যুবক হয়ে ওঠেন ইউসুফ (আ.)। জুলেখা ক্রমেই যুবক ইউসুফ (আ.)-এর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন। মূর্তি উপাসক জুলেখা তার ঘরে থাকা মূর্তির সামনে অন্যায় আবদার করতে ভয় পেতেন বলে কাপড় দিয়ে মূর্তির চোখ ঢেকে দিয়ে ইউসুফ (আ.)-কে নানাভাবে প্রলুব্ধ করতে সচেষ্ট ছিলেন। অন্যদিকে আল্লাহর একাত্ববাদে বিশ্বাসী ইউসুফ (আ.) আল্লাহ প্রদত্ত ইমানের শক্তিতে সব ধোঁকা ও প্রলোভনের ঊর্ধ্বে ছিলেন এবং সব সময় জুলেখাকে এ পথ ছাড়ার অনুরোধ জানান। কিন্তু ইউসুফ (আ.)-এর প্রেমে পাগল জুলেখা ছিলেন একরোখা।


সূরা ইউসুফের ২৩ নং আয়াত অনুসারে একদা জুলেখা ইউসুফ (আ.)-কে ঘরে পেয়ে দরজা বন্ধ করে দেন এবং তার প্রতি আহ্বান জানান। কিন্তু ইউসুফ (আ.) মহান আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান, ধৈর্য, ইমান এবং ভীতির কারণে তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাফসির ও আরবি সাহিত্যমতে, এ সময় হজরত ইউসুফ (আ.) আসন্ন বিপদ থেকে বাঁচতে ঘরের ছাদের দিকে দৃষ্টি দিলে অলৌকিকভাবে আরবি লেখা দেখতে পান। এ ছাড়াও ঘরে মূর্তির দিকে তাকিয়ে তিনি ‘আজিজ’-এর প্রতিচ্ছবি দেখতে পান এবং ঘরের দরজায় আজিজের উপস্থিতি অনুভব করেন। এরপর হজরত ইউসুফ (আ.) নিজেকে পবিত্র রাখার জন্য বন্ধ দরজার দিকে দৌড়ে যান।


এ সময় জুলেখা পেছন থেকে ইউসুফ (আ.)-কে জাপটে ধরলে তার পরিধেয় জামা পেছন থেকে ছিঁড়ে যায়। অলৌকিকভাবে এ সময় ঘরের বন্ধ দরজা (কারও মতে বাইরে থেকে বন্ধ দরজা) খুলে যায় এবং ইউসুফ (আ.) ও জুলেখা দরজার বাইরে জুলেখার স্বামী আজিজকে দেখতে পান। ঠিক তখনই চতুর জুলেখা তার ভোল পাল্টে ফেলেন এবং সূরা ইউসুফের ২৫ নং আয়াত অনুসারে এ সময় ইউসুফ (আ.)-এর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানো বা অন্য কোনো কঠিন শাস্তির দাবি করেন। ২৬ নং আয়াতে বর্ণিত, এ সময় ইউসুফ (আ.) প্রকৃত সত্য তুলে ধরেন এবং জুলেখার পরিবারের একজন সঠিক সাক্ষ্য প্রদান করেন। পবিত্র কোরআনে এই সাক্ষ্য প্রদানকারীর বিস্তারিত পরিচয় নেই। তবে তাফসির এবং প্রচলিত বর্ণনা অনুসারে এই সাক্ষী ছিল একটি নিতান্ত কন্যাশিশু, যার মুখে তখনো স্পষ্ট করে কথা ফোটেনি।


যখন জুলায়খার স্বামী বুজতে পারল। তাকে তিরস্কার করল এবং বাইরে বিষয়টা না ছরানো জন্য বলে। কিন্তু বিষয়টা আর গোপন থাকে নি। যখন শহরের মহিলারা তাকে নিয়ে কটূক্তি করতে লাগল। তখন সে সবার জন্য একটি ভোজসভার আয়োজন করল


মহান আল্লাহ ইউসুফ (আ.)-এর প্রতি সদয় হন এবং তাঁকে ঘটনাক্রমে কিছুদিন কারাগারে রাখার ব্যবস্থা করেন।


সূরা ইউসুফের ৩০ নং আয়াত অনুসারে এ ঘটনার পর শহরজুড়ে জুলেখার কুকীর্তি নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। আর আরব সাহিত্য মতে, রাজপ্রাসাদে যারা আজিজ বিরোধী ছিল, তারা এ ঘটনায় বহুমাত্রিক রং ছড়িয়ে প্রচার করতে থাকে। সূরা ইউসুফের পরবর্তী আয়াতগুলোতে এ ঘটনার পরিসমাপ্তি টানা হয়। এতে বলা হয়, আজিজের স্ত্রী (জুলেখা) যখন এই ষড়যন্ত্র বা অপবাদের ব্যাপক প্রচার সম্পর্কে অবগত হন, তখন শহরের গণ্যমান্য মহিলাদের তিনি এক ভোজসভায় আমন্ত্রণ জানান।


এই ভোজে অন্যান্য খাবারের সঙ্গে প্রত্যেকের জন্য ফল এবং তা কাটার জন্য একটি করে ধারালো ছুরি দেওয়া হয়। শহরের নারীরা যখন ছুরি দিয়ে ফল কাটায় ব্যস্ত, ঠিক তখন জুলেখা তাঁর পূর্ব পরিকল্পনা মতো পাশের কক্ষে থাকা ইউসুফ (আ.)-কে মহিলাদের সামনে আসতে হুকুম করেন। অত্যন্ত আকর্ষণীয় চেহারার অধিকারী হজরত ইউসুফ (আ.) যখন সামনে উপস্থিত হন, তখন তাঁর সৌন্দর্যের মোহে নারীরা তাঁর দিকে তাকিয়ে ফলের বদলে ধারালো ছুরি দিয়ে নিজ নিজ আঙ্গুল কেটে ফেলেন। এই সুযোগে জুলেখা সবার উদ্দেশে বলেন যে, এই সেই সুপুরুষ ইউসুফ (আ.), যার জন্য মহিলারা তার নিন্দা করছেন। সূরা ইউসুফের ৩১ নং আয়াত মতে, মহিলাদের মন্তব্য ছিল- ‘এ তো মানুষ নন, এ তো এক মহান ফেরেশতা’। এ সময় জুলেখা আবারও তাঁর কূটচাল প্রয়োগ করেন এবং একদিকে ইউসুফ (আ.)-কে পবিত্র বলে সাক্ষ্য দেন আর অন্যদিকে ভবিষ্যতে ইউসুফ (আ.) তাঁর কথার অবাধ্য হলে অপমানিত হওয়ার এবং কারাগারে নিক্ষেপ করার হুমকি দেন। কিছু মহিলাও এতে সায় দেন ও ইন্ধন জোগান। সূরা ইউসুফের ৩৩ নং আয়াত অনুসারে এ সময় হজরত ইউসুফ (আ.) মহান আল্লাহর কাছে কুচক্রী মহিলাদের কাছ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করেন এবং অপবিত্র ভোগ-বিলাসের পরিবর্তে কারাবাসই উত্তম বলে ফরিয়াদ জানান। তিনি উপলব্ধি করেন যে, কারাগারই হতে পারে তাঁর জন্য নিরাপদ আশ্রয়, অন্যথায় কুচক্রী জুলেখা ও অন্য নারীর প্রলোভন ও ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচা দিনে দিনে কঠিন হয়ে উঠবে। মহান আল্লাহ ইউসুফ (আ.)-এর প্রতি সদয় হন এবং তাঁকে ঘটনাক্রমে কিছুদিন কারাগারে রাখার ব্যবস্থা করেন।


সূরা ইউসুফের পরবর্তী অংশে কারাগার থেকে হজরত ইউসুফ (আ.)-এর মুক্তি, রাজার স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদানের মাধ্যমে রাজ দরবারে আকর্ষণীয় পদ লাভ, মিসরের দুর্ভিক্ষ, সৎ ভাইদের উচিত শিক্ষাদান, আপন ছোটভাই বেনিয়ামিনকে কাছে রাখা, পিতা ইয়াকুব (আ.)-এর চোখের দৃষ্টি ফিরে পাওয়া এবং সবশেষে পিতা-মাতাকে রাজদরবারে বসিয়ে সম্মান প্রদানের বর্ণনা রয়েছে। তবে আজিজের স্ত্রী বা জুলেখা সম্পর্কে পরবর্তীতে আর কোনো বর্ণনা পবিত্র কোরআনে দেওয়া হয়নি, হাদিসেও এ সংক্রান্ত বিশেষ কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।


হাদিস বা পবিত্র কোরআনে উল্লেখ না থাকলেও বিভিন্ন সাহিত্যে ইউসুফ (আ.)-এর সঙ্গে জুলেখার পুনর্মিলনের বর্ণনা পাওয়া যায়। একটি সাহিত্যধারা মতে, সময়ের বিবর্তনে মিসরের আজিজ (জুলেখার স্বামী) মৃত্যুবরণ করার পর তাদের শুভ বিবাহ সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে তাদের কোলজুড়ে দুই পুত্র আফরাইম ইবনে ইউসুফ এবং মায়শা ইবনে ইউসুফের জন্মের বর্ণনাও পাওয়া যায়।

হজরত ইউনুস (আ.)

| comments

 হজরত ইউনুস (আ.) একজন সম্মানিত নবী। পবিত্র কোরআনে স্বতন্ত্র একটি সুরা অবতীর্ণ হয়েছে তার নামে- ‘সুরা ইউনুস’। এ ছাড়াও পবিত্র কোরআনে আরও ছয়টি সুরায় তার সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। পৃথিবীতে দুজন নবী মায়ের নামে পরিচিত হয়েছেন। একজন হজরত ঈসা ইবনে মরিয়ম, অন্যজন হজরত ইউনুস ইবনে মাত্তা। মাত্তা হজরত ইউনুস (আ.)-এর মায়ের নাম। মায়ের নামেই তাকে ইউনুস ইবনে মাত্তা বলা হয়। কোরআন মাজিদে তাকে তিনটি নামে উল্লেখ করা হয়েছে- মূল নাম ইউনুস, জুননূন ও সাহিবুল হুত। ‘জুননূন’ ও ‘সাহিবুল হুত’-এর অর্থ মাছওয়ালা। মাছ সংশ্লিষ্ট ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে তাকে এ নামে উল্লেখ করা হয়েছে।



হজরত ইউনুস (আ.)-কে বর্তমান ইরাকের মসুল নগরীর নিকটবর্তী নিনাওয়া জনপদে নবী হিসেবে পাঠানো হয়েছিল। সুরা সাফফাতের ১৪৭নং আয়াতে এ সংক্রান্ত আলোচনা করা হয়েছে। তিনি মসুলবাসীকে আল্লাহর পথে ডাকলেন। হেদায়েতের পথপ্রদর্শন করলেন। ঈমান ও সৎকর্মের প্রতি আহ্বান করলেন। আখেরাতের বিষয়ে সতর্ক করলেন। জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করলেন। জান্নাতের নাজ-নেয়ামতের কথা শোনালেন; কিন্তু তার সম্প্রদায়ের লোকজন অবাধ্যতা প্রদর্শন করল।


এক দিন-দুদিন করে দীর্ঘদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। ইউনুস (আ.) তাদের ঈমান সম্পর্কে কিছুটা হতাশ হয়ে পড়লেন এবং তিন দিনের মধ্যে আল্লাহর আজাব তাদের ওপর নিপতিত হচ্ছে ঘোষণা দিয়ে নিজ এলাকা পরিত্যাগ করলেন। কিন্তু এলাকা পরিত্যাগ করার ক্ষেত্রে তিনি আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষা করেননি। এভাবে আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষা না করে নিজ উদ্যোগে বের হওয়াটা গুনাহ ছিল না, কিন্তু নবুয়তের শানের পরিপন্থি ছিল, যা আল্লাহর পছন্দ হয়নি। আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের এমন ছোটখাটো বিচ্যুতিতেও বড় ধরপাকড় করেন।


হজরত ইউনুস (আ.) এলাকা পরিত্যাগ করার পর লোকজন উপলব্ধি করল যে, এবার নিশ্চিত আল্লাহর আজাব চলে আসবে। তাই তারা সবাই মিলে আল্লাহর কাছে তওবা করল। লোকালয় ছেড়ে বন-বাদাড়ের দিকে চলে গেল। গবাদিপশু ও শিশুদেরও সঙ্গে নিল। সেখানে সবাই কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে আশ্রয় ও ক্ষমা প্রার্থনা করল। তাদের খাঁটি তওবা ও কাকুতি-মিনতির কারণে আল্লাহ তাদের ওপর থেকে আজাব সরিয়ে নেন।


এলাকা পরিত্যাগের পর হজরত ইউনুস (আ.) ভাবছিলেন, তার সম্প্রদায় হয়তো আল্লাহর আজাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি কল্পনাও করতে পারেননি যে, তারা তওবা করে আল্লাহর প্রতি ঈমান নিয়ে আসবে। ফলে তিনি যখন জানতে পারলেন, তারা সবাই ঈমান নিয়ে এসেছে, একদিকে তিনি বিস্মিত হলেন, অন্যদিকে ভীতসন্ত্রস্তও হলেন। ভীত হওয়ার কারণ ছিল, তিনি তাদের বলেছিলেন, তিন দিনের মধ্যে আল্লাহর আজাব আসবে। কিন্তু তাদের দোয়ার কারণে সেই আজাব সরে গেছে। সুতরাং তারা তাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করে হত্যা করতে পারে। তৎকালে মিথ্যা বলার শাস্তি ছিল হত্যা। এই শঙ্কায় তিনি স্বদেশে না ফিরে দূরদেশে হিজরতের ইচ্ছা করলেন। এ উদ্দেশ্যে মানুষবোঝাই একটি নৌকায় চড়ে বসলেন। নৌকা মাঝনদীতে পৌঁছামাত্র প্রচণ্ড বেগে ঝড়-তুফান শুরু হলো। বিশাল বিশাল ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌকা ডুবে যাওয়ার উপক্রম হলো। অবস্থা বেগতিক দেখে মাঝিরা বলল, এখানে মালিকের অবাধ্যতা করে কেউ নৌকায় আরোহণ করেছে। মাঝিদের বিশ^াস ছিল, কোনো অন্যায় কাজ করে কেউ নৌকায় আরোহণ করলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়। সুতরাং তারা বলল, এমন কেউ থাকলে তাকে নদীতে ফেলে দিতে হবে, তা হলে অন্য যাত্রীরা এই বিপদ থেকে রক্ষা পাবে। তখন যাত্রীদের মধ্যে লটারি দেওয়া হলো। লটারিতে হজরত ইউনুস (আ.)-এর নাম এলো। তিনবার লটারি হলো, প্রতিবার তার নামই বেরিয়ে এলো। হজরত ইউনুস (আ.) নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ইতোমধ্যে একটি বিশালদেহী মাছ এসে হজরত ইউনুসকে গিলে ফেলে। সেই মাছের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ ছিল, হজরত ইউনুস (আ.)-এর অস্থিমজ্জার যেন ক্ষতি না হয়। সে তার খাদ্য নয়, তার উদর কিছু দিনের জন্য তার বন্দিখানা মাত্র।


মাছের উদরে গিয়ে তিনি একটি দোয়া পড়লেন। আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইলেন। ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। তিনি বললেন, ‘লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জোয়ালিমিন।’ অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ! আপনি ছাড়া আমার কোনো ইলাহ নেই। আপনি চিরপবিত্র, নিশ্চয়ই আমি নিজের ওপর জুলুম করে ফেলেছি।’ এই দোয়ার বরকতে মাছের পেট থেকে আল্লাহ তাকে মুক্তি দেন, নতুবা মাছের পেটই তার সমাধি হতো। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যদি ইউনুস আল্লাহর তাসবিহ পাঠ না করতেন, তবে তাকে কেয়ামত দিবস পর্যন্ত মাছের উদরেই থাকতে হতো।’ (সুরা সাফফাত : ১৪৩-১৪৪)


কিছুদিন পর মাছ হজরত ইউনুস (আ.)-কে নদীতীরে উদ্গিরণ করে দিল। আল্লাহ তায়ালা সেখানে তার শারীরিক সুস্থতার জন্য লতাবিশিষ্ট বৃক্ষ উদগত করে দেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অতঃপর আমি তাকে এক বিস্তীর্ণ-বিজন প্রান্তরে নিক্ষেপ করলাম, তখন তিনি ছিলেন রুগ্ণ। আমি তার জন্য এক লতাবিশিষ্ট বৃক্ষ উদগত করলাম।’ (সুরা সাফফাত : ১৪৫-১৪৬)

হজরত ইউনুস (আ.)-এর ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষণীয় বিষয় হলো- যেকোনো বিপদাপদে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করা এবং তাঁর আশ্রয় কামনা করা। হাদিস শরিফে আছে, যেকোনো উদ্দেশ্য হাসিলের নিয়তে যদি কেউ ‘লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জোয়ালিমিন’ দোয়াটি পড়ে তবে আল্লাহ তার উদ্দেশ্য পূরণ করে দেন এবং বিপদ থেকে রক্ষা করেন। (তিরমিজি : ৩৫০৫; রুহুল মায়ানি : ৮/১০৯)। আল্লাহ এসব শিক্ষা আমাদের জীবনেও বাস্তবায়ন করার তাওফিক দিন।

আমিন।

মৃত্যুর পরে আত্মা কি দুনিয়াতে আসতে পারে?

| comments

 প্রত্যেক মানুষকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। সবাইকে একদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু মৃত্যুর পর কি আত্মা পৃথিবীতে কি আসে? আসুন তাহলে জেনে নেয়া যাক-

উত্তর : না, কোনো ব্যক্তির যখন মৃত্যু হয়ে যায়, এর অর্থ হচ্ছে দুনিয়ার সঙ্গে তার যে সম্পর্ক রয়েছে, সেটা আত্মিক সম্পর্ক হোক অথবা শারীরিক সম্পর্ক হোক, কোনো সম্পর্কই সেখানে আর অবশিষ্ট থাকে না। তাঁর আত্মার কোনো ধরণের আগমন, বহির্গমন, সংযোজন, অর্থাৎ যেকোনো ধরণের তৎপরতা অবশিষ্ট থাকে না।

সুতরাং আত্মা স্বাধীনভাবে যে ঘোরাফেরা করবে অথবা আসবে-যাবে, ব্যাপারটা এমন নয়। মৃত্যুর পরে মানুষ চলে যায় আল্লাহর বারজাখি জিন্দেগিতে এবং বারজাখি জিন্দেগি হচ্ছে এমন যে বারজাখের একটা অর্থই হচ্ছে, এখান থেকে আর কোনোভাবেই বের হওয়ার সুযোগ নেই। তাই বারজাখি জিন্দেগিতে যারা চলে গিয়েছে, তারা একটা আড়ালে চলে গিয়েছে। সম্পূর্ণরূপে আড়ালের একটা জিন্দেগিতে চলে গিয়েছে, দুনিয়ার জগতে তাদের আর আগমন হবে না। যেমনিভাবে তারা দুনিয়াতে আগমন করতে পারবে না, ঠিক তেমনিভাবে তারা আখিরাতের যে জিন্দেগি রয়েছে, পরবর্তী জীবন সে জীবনেও যেতে পারবে না। এখানেই তাঁদের অপেক্ষা করতে হবে।

কোরআনে কারিমের মধ্যে আল্লাহ সুবানাহুতায়ালা এরশাদ করেন, ‘এই বারজাখে তাদের অবস্থান করতে হবে, ওই পরবর্তী পুনরুত্থান পর্যন্ত, ওই দিবস পর্যন্ত তাকে অপেক্ষা করতে হবে।’ পুনরুত্থান পর্যন্ত সেখান থেকে তাদের কোনো ধরনের আগমন, বহির্গমন অথবা কোনো ধরনের তৎপরতা করার অধিকার তাদের থাকবে না। তাই এ ধারণা করার সুযোগ নেই বা আমাদের আকিদার মধ্যে, আমাদের যে চিন্তাধারার রয়েছে, যে বিশ্বাস আকিদার মধ্যে রয়েছে, এই আকিদার বিশ্বাসের মধ্যে কোনোভাবেই এ কথা শুদ্ধ নয় যে, মানুষের আত্মা পৃথিবীর মধ্যে আবার আগমন করে থাকে এবং আগমন করে বিভিন্ন মানুষকে সতর্ক করে থাকে। এটা ভিন্ন দর্শনের বা ভিন্ন চিন্তাধারায় রয়েছে। সুতরাং ইসলাম মূলত যেটা আমাদের শিক্ষা দিয়েছে যে মৃত্যুর পর মানুষগুলোর সব তৎপরতা সীমাবদ্ধ হয়ে যায় এবং তারা বারজাখি জিন্দেগিতে চলে যায়। এই বারজাখি জিন্দেগি কোন ধরনের, তার কোনো সুস্পষ্ট সংজ্ঞা বা পরিচিতি রাসূল (সা.)-এর কোনো হাদিসের মাধ্যমে আমাদের কাছে স্পষ্ট করা হয়নি।

উজ্জ্বল হোসাইন

 

রাসূল (সাঃ) এর পোষা প্রাণীগুলো

| comments

রাসুল সা. এর আনুমানিক ১০০ টি সাধারণ ছাগল ছিলো এবং ৭ টি পাহাড়িয়া ছাগল এবং ৯ টি দুদ্ধপোষ্য বকরী ছিলো। এই ৯টি ছাগলের দুধ প্রতিদিন সন্ধ্যায় আল্লাহর রাসুলের ঘরে পৌঁছে দেওয়া হতো। সেই ছাগলগুলোর নাম – আজওয়াহ, সাকিয়্যাহ, যমযম, বারাকাহ, ওয়ারাছাহ, ইতলাল, আতরাফ, গিফাহ ও ইমিরাহ।

ইউমন নামের একটি প্রিয় খাসি ছিলো রাসুল(সঃ) এর। তার কামার নামে একটি প্রসিদ্ধ ছাগল ছিলো।

মাওলানা তারিক জামিল বলেন, কী বিস্ময়কর বিষয়! আল্লাহ তায়ালা কেবলমাত্র রাসুল সা. এর জীবন ও সীরাতকেই সংরক্ষণ করেননি; তার ছাগলগুলোর নাম পর্যন্ত সংরক্ষণ করেছেন।

তিনি বলেন, এমনিভাবে রাসুলের উঠ, খচ্চর, গাধা এবং ঘোড়ার নামও সংরক্ষণ করেছেন তিনি। 

হযরত রাসুল সা. এর আনুমানিক ৪৫ টি উট ছিলো।

কাসওয়া নামে একটি উটনী ছিলো। এতে চড়েই তিনি হিযরত করেন। এছাড়াও আদবা, শাহবা, জাদআ ও ককাসওয়া নামের উঠে তিনি সওয়ার হয়েছেন।  


দুলদুল ও আফীর নামে রাসুলের দুটি খচ্চর ছিল। 

মুহাম্মাদ(সঃ) বিভিন্ন সময়ে তার বিভিন্ন ঘোড়া ব্যবহার করেছেন। তার আনুমানিক ১১টি ঘোড়া ছিলো। 


  • তিনি সাকার নামের একটি ধূসর বর্ণের ঘোড়া ব্যবহার করতেন। এতে দাজ নামে একটি গদী ছিলো।
  • নাহিফা নামের একটি ঘোড়া ব্যবহার করতেন অনেক সময়।
  • দুলদুল নামের সাদা ঘোড়া ছিলো। এটা মিসর রাষ্ট্রনায়ক মুকাওকাশের উপঢৌকন।
  • মুহাম্মাদ(সঃ) সাকাবম, সাবহা, লাহিফ তাররায প্রভৃতি ঘোড়ার উপর আরোহণ করেছেন।
  • এছাড়াও মুর্তাযিজ, লুযায, যরব, সাজা ওয়ার্দ নামের ঘোড়া ছিলো।

যাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব

| comments

প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, যে ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে, তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রুপা, অলংকার, বসবাস ও খাবারের প্রয়োজন আসে না—এমন জমি, প্রয়োজনের অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যাবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সব আসবাব কোরবানির নিসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।

আর নিসাব হলো সোনার ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রুপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি। টাকা-পয়সা ও অন্য বস্তুর ক্ষেত্রে নিসাব হলো সেগুলো সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রুপা কিংবা টাকা-পয়সার মধ্যে কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নিসাব পরিমাণ না থাকে; কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায়, তাহলেও তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। (আল-মুহিতুল বুরহানি : ৮/৪৫৫, ফাতাওয়া তাতারখানিয়া : ১৭/৪০৫)

উল্লেখ্য, কোরবানির নিসাব পুরো বছর থাকা জরুরি নয়, বরং কোরবানির তিন দিনের মধ্যে যেকোনো দিন থাকলেই কোরবানি ওয়াজিব হবে। (বাদায়েউস সানায়ে : ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার : ৬/৩১২)

দরিদ্র ব্যক্তি কোরবানি করলে কি আদায় হবে?
দরিদ্র ব্যক্তির (যারা নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক নয়) ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব নয়; কিন্তু সে যদি কোরবানির নিয়তে কোনো পশু কেনে, তাহলে তা কোরবানি করা ওয়াজিব হয়ে যায়। (বাদায়েউস সানায়ে : ৪/১৯২)

‘মৃত সাগর’ আল্লাহর ক্রোধের নিদর্শন

| comments

ইতিহাসখ্যাত ‘মৃত সাগর’। ইংরেজিতে বলা হয় ‘ডেড সি’ (Dead Sea) এবং আরবদের কাছে তা ‘বাহরুল মায়্যিত’ নামে পরিচিত। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ২০ লাখ বছর আগে এ সাগরের উৎপত্তি। জর্দান নদীর সঙ্গে সংযুক্ত হলেও এটি মূলত একটি হ্রদ। ডেড সি বা মৃত সাগরের দৈর্ঘ্য ৬৭ কিলোমিটার, প্রস্থ ১৮ কিলোমিটার আর গভীরতা ১.২৪০ ফুট। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪২২ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এ সাগরের পশ্চিমে রয়েছে ইসরায়েল ও পূর্বে জর্দান। এখান থেকে পবিত্র জেরুজালেম নগরীর দূরত্ব মাত্র ১৫ মাইল।

মৃত সাগর নানা বিচিত্র খনিজ পদার্থে ভরপুর। এতে প্রচুর পরিমাণে পটাসিয়াম, সালফার, ব্রোমাইন ও কলগেন রয়েছে। মৃত সাগরের পানিতে ম্যাগনেশিয়াম ক্লোরাইড (MgCl2) ও সোডিয়াম ক্লোরাইডের (NaCl) পরিমাণ যথাক্রমে ৫০.৮ ও ৩০.৪ শতাংশ। এ সাগরের পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ ৩৩.৭ শতাংশ। পৃথিবীর অন্যান্য সাগর ও মহাসাগরের তুলনায় লবণাক্ততা বেশি হওয়ায় মৃত সাগরে কোনো মাছ জন্মায় না। জর্দান নদী থেকে মাছ এই নদীতে আসার সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। তবে আশ্চর্যজনকভাবে রয়েছে বিপুল ব্যাকটেরিয়া (Microbe) এবং ক্ষুদ্রকায় ছত্রাক (Encyclopadia Encarta, Chapter-Dead Sea)।

পবিত্র কোরআন ও হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী সমকামিতার মতো জঘন্য পাপ ও অপরাধে লিপ্ত হওয়ার কারণে সডম ও গোমাররাহ নামের লোকালয় মহান আল্লাহর হুকুমে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। ঘটনাটি আজ থেকে প্রায় ছয় হাজার বছর আগের। ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থানটি বর্তমানে মৃত সাগর নামে পরিচিত। আল্লাহর নবী হজরত লুত (আ.)-এর বারবার সাবধান বাণী সত্ত্বেও সে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী অবৈধ যৌন সম্পর্ক ও সমকামিতার অভ্যাস পরিত্যাগ করেনি। পৃথিবীর বুকে একমাত্র তারাই যৌন ক্ষুধা চরিতার্থের উদ্দেশ্যে মহিলাদের বাদ দিয়ে পুরুষদের ওপর উপগত হতো। কোরআনুল কারিমে অত্যন্ত চমৎকারভাবে এই ঘটনা বিধৃত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি লুতকে পাঠিয়েছিলাম। তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, তোমরা এমন কুকর্ম করছ, যা তোমাদের আগে বিশ্বে কেউ করেনি। তোমরা তো কামতৃপ্তির জন্য নারী ছেড়ে পুরুষের কাছে গমন করো, তোমরা সীমা লঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৮০-৮১)

ফলে শাস্তি হিসেবে আল্লাহ তাআলা এ জনপদের চার লাখ মানুষকে বাস্তুভিটাসহ বিধ্বস্ত করে দেন। বর্তমান বিশ্বের খ্যাতনামা ইসলামী স্কলার মুফতি তাকি উসমানি মৃত সাগর পরিদর্শনের পর লেখেন, ‘আমেরিকার বিজ্ঞানীরা সমুদ্রের তলদেশে খননকার্য চালিয়ে মানুষের ব্যবহার্য পাথরের ঘটি, বাটি, চামচ উদ্ধার করেন। বিভিন্ন দেশ থেকে শত শত পর্যটক প্রতিদিন মৃত সাগর দেখার জন্য আসে এবং শিক্ষা গ্রহণ না করে বিনোদন ও ফুর্তিতে মেতে ওঠে।’ (মুফতি তাকি উসমানি, জাহানে দিদাহ, মৃত সাগর অধ্যায়)

অবৈধ যৌনমিলন, অনৈতিক যৌন সম্পর্ক ও সমকামিতার মতো অমানবিক কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকার জন্য আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে হুঁশিয়ার করেছেন। মানবগোষ্ঠীকে অশ্লীলতা, ব্যভিচার ও সমকামিতা থেকে বিরত থাকার জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কঠোর নির্দেশ প্রদান করেছেন। মহানবী (সা.) কিশোর-বালকদের চেহারার দিকে কুদৃষ্টিতে না দেখার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ তাদের চেহারায় বেহেশতের হুরের দীপ্তি আছে। তিনি বলেন, ‘আমার উম্মতের ব্যাপারে যেটা সবচেয়ে বেশি ভয় করি, তা হলো লুত সম্প্রদায়ের অনুরূপ পাপাচার। আমার উম্মতের কিছু লোক লুত জাতির অপকর্মে লিপ্ত হবে। যখন এরূপ হতে দেখবে তখন তাদের ওপরও অনুরূপ আজাব অবতরণের অপেক্ষা কোরো।’

লুত সম্প্রদায়ের মতো যারা সমকামিতায় লিপ্ত হবে, তাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, জিনা, ব্যভিচার, সমকামিতা ও মাদক গ্রহণের মতো ঘৃণিত ও অশ্লীল কাজের ধারেকাছেও না যাওয়ার জন্য ইসলামের রয়েছে কঠোর হুঁশিয়ারি। পাপাচার শুধু নিষিদ্ধ করা হয়নি, বরং যেসব বিষয় ব্যভিচারের দিকে প্রলুব্ধ করে, তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় ইসলাম ধর্মে এগুলো গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। অপরাধ যেমন ঘৃণ্য, শাস্তিও তদ্রূপ কঠিন ও কঠোর। (তাফসিরে মা’আরেফুল কোরআন, খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা ৮০৬; মাওলানা হাকিম আখতার (রহ.), রুহ কি বিমারিয়াঁ, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা ১৯)

অনৈতিক যৌন সম্পর্ক ও সমকামিতার শাস্তিস্বরূপ সাম্প্রতিককালে দেখা দিয়েছে এইডস বা এইচআইভি। ‘এইডস’ মানে নিশ্চিত মৃত্যু। আজ পর্যন্ত এর কোনো কার্যকর ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। ২০১৭ সাল পর্যন্ত এইডসে আক্রান্ত হয়ে তিন কোটি ৫০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছে তিন কোটি ৭০ লাখ মানুষ। বাংলাদেশে এইডস রোগী শনাক্ত হয়েছে সর্বপ্রথম ১৯৮৯ সালে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে এইডসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ১১ হাজার ৭০০। এর মধ্যে মারা গেছে এক হাজার ২২ জন। প্রায় ছয় হাজার ৪৫৫ ব্যক্তি এইচআইভির জীবাণু বহন করছে। এইচআইভি সংক্রমণের প্রধান কারণ হচ্ছে অবৈধ যৌনমিলন ও সমকামিতা।

আল্লাহর এই শাস্তির হাত থেকে বাঁচার পথ হলো একনিষ্ঠ মনে তাওবা করা, তাকওয়া অর্জন, নফল রোজা পালন ও আল্লাহর ওলিদের সান্নিধ্য লাভ করা। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বলেন, কোনো জাতির মধ্যে যদি অবৈধ ও বিকৃত যৌনাচারের প্রকোপ বৃদ্ধি পায় তখন আল্লাহ তাআলা লুত সম্প্রদায়ের মতো বা এর চেয়ে আরো ভয়াবহ শাস্তি প্রদান করেন। ১৯৮৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ড. হিরোশি নাকাজিমার মন্তব্য এই ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য : The spread of AIDS among the general population could mean the extermination of some community or even the disappearance of mankind.

‘সাধারণ জনগণের মধ্যে এইডসের বিস্তারের ফলে কিছু জাতিগোষ্ঠী ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এমনকি সমগ্র মানবজাতিও বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।’ (The New Straits Times, Kuala Lampur, Malaysia, June 23, 1988)

লেখক : ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন; অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ওমর গণি এমইএস কলেজ, চট্টগ্রাম

দাজ্জাল

| comments

দাজ্জালের আগমণ, ফিতনাসমূহ এবং বাঁচার উপায়

আখেরী যামানায় কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে মিথ্যুক দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে। দাজ্জালের আগমণ কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার সবচেয়ে বড় আলামত। মানব জাতির জন্যে দাজ্জালের চেয়ে অধিক বড় বিপদ আর নেই। বিশেষ করে সে সময় যে সমস্ত মুমিন জীবিত থাকবে তাদের জন্য ঈমান নিয়ে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। সমস্ত নবীই আপন উম্মাতকে দাজ্জালের ভয় দেখিয়েছেন। আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)ও দাজ্জালের ফিতনা থেকে সতর্ক করেছেন এবং তার অনিষ্ট থেকে বাঁচার উপায়ও বলে দিয়েছেন। ইবনে উমার (রাঃ) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণনা করেনঃ “একদা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাড়িয়ে আল্লাহর যথাযোগ্য প্রশংসা করলেন। অতঃপর দাজ্জালের আলোচনা করতে গিয়ে বললেনঃ আমি তোমাদেরকে তার ফিতনা থেকে সাবধান করছি। সকল নবীই তাদের উম্মাতকে দাজ্জালের ভয় দেখিয়েছেন। কিন্তু আমি তোমাদের কাছে দাজ্জালের একটি পরিচয়ের কথা বলব যা কোন নবীই তাঁর উম্মাতকে বলেন নাই। তা হলো দাজ্জাল অন্ধ হবে। আর আমাদের মহান আল্লাহ অন্ধ নন।

নাওয়াস বিন সামআন (রাঃ) বলেনঃ “একদা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সকাল বেলা আমাদের কাছে দাজ্জালের বর্ণনা করলেন। তিনি তার ফিতনাকে খুব বড় করে তুলে ধরলেন। বর্ণনা শুনে আমরা মনে করলাম নিকটস্থ খেজুরের বাগানের পাশেই সে হয়ত অবস্থান করছে। আমরা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর নিকট থেকে চলে গেলাম। কিছুক্ষণ পর আমরা আবার তাঁর কাছে গেলাম। এবার তিনি আমাদের অবস্থা বুঝে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমাদের কি হলো? আমরা বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যেভাবে দাজ্জালের আলোচনা করেছেন তা শুনে আমরা ভাবলাম হতে পারে সে খেজুরের বাগানের ভিতরেই রয়েছে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ দাজ্জাল ছাড়া তোমাদের উপর আমার আরো ভয় রয়েছে। আমি তোমাদের মাঝে জীবিত থাকতেই যদি দাজ্জাল আগমণ করে তাহলে তোমাদেরকে ছাড়া আমি একাই তার বিরুদ্ধে ঝগড়া করবো। আর আমি চলে যাওয়ার পর যদি সে আগমণ করে তাহলে প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজেকে হেফাযত করবে। আর আমি চলে গেলে আল্লাহই প্রতিটি মুসলিমকে হেফাযতকারী হিসেবে যথেষ্ট ।[1]

দাজ্জালের আগমণের সময় মুসলমানদের অবস্থাঃ

দাজ্জালের আগমণের পূর্ব মুহূর্তে মুসলমানদের অবস্থা খুব ভাল থাকবে। তারা পৃথিবীতে শক্তিশালী এবং বিজয়ী থাকবে। সম্ভবতঃ এই শক্তির পতন ঘটানোর জন্যই দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে।

দাজ্জালের পরিচয়ঃ

দাজ্জাল মানব জাতিরই একজন হবে। মুসলমানদের কাছে তার পরিচয় তুলে ধরার জন্যে এবং তার ফিতনা থেকে তাদেরকে সতর্ক করার জন্যে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার পরিচয় বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। মুমিন বান্দাগণ তাকে দেখে সহজেই চিনতে পারবে এবং তার ফিতনা থেকে নিরাপদে থাকবে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার যে সমস্ত পরিচয় উল্লেখ করেছেন মুমিনগণ তা পূর্ণ অবগত থাকবে। দাজ্জাল অন্যান্য মানুষের তুলনায় স্বতন্ত্র বৈশিষ্টের অধিকারী হবে। জাহেল-মূর্খ ও হতভাগ্য ব্যতীত কেউ দাজ্জালের ধোকায় পড়বেনা।

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাজ্জালকে স্বপ্নে দেখে তার শারীরিক গঠনের বর্ণনাও প্রদান করেছেন। তিনি বলেনঃ দাজ্জাল হবে বৃহদাকার একজন যুবক পুরুষ, শরীরের রং হবে লাল, বেঁটে, মাথার চুল হবে কোঁকড়া, কপাল হবে উঁচু, বক্ষ হবে প্রশস্ত, চক্ষু হবে টেরা এবং আঙ্গুর ফলের মত উঁচু।[2] দাজ্জাল নির্বংশ হবে। তার কোন সন্তান থাকবেনা ।[3]

দাজ্জালের কোন্‌ চোখ কানা থাকবে?

বিভিন্ন হাদীছে দাজ্জালের চোখ অন্ধ হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। কোন কোন হাদীছে বলা হয়েছে দাজ্জাল অন্ধ হবে। কোন হাদীছে আছে তার ডান চোখ অন্ধ হবে। আবার কোন হাদীছে আছে তার বাম চোখ হবে অন্ধ। মোটকথা তার একটি চোখ দোষিত হবে। তবে ডান চোখ অন্ধ হওয়ার হাদীছগুলো বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে।[4] মোটকথা দাজ্জালের অন্যান্য লক্ষণগুলো কারো কাছে অস্পষ্ট থেকে গেলেও অন্ধ হওয়ার বিষয়টি কারো কাছে অস্পষ্ট হবেনা।

দাজ্জালের দু’চোখের মাঝখানে কাফের লেখা থাকবেঃ

তাছাড়া দাজ্জালকে চেনার সবচেয়ে বড় আলামত হলো তার কপালে কাফের كافر)) লেখা থাকবে।[5] অপর বর্ণনায় আছে তার কপালে (ك ف ر) এই তিনটি বর্ণ লেখা থাকবে। প্রতিটি মুসলিম ব্যক্তিই তা পড়তে পারবে।[6] অপর বর্ণনায় আছে শিক্ষিত-অশিক্ষত সকল মুসলিম ব্যক্তিই তা পড়তে পারবে।[7] মোটকথা আল্লাহ মু’মিনের জন্যে অন্তদৃষ্টি খোলে দিবেন। ফলে সে দাজ্জালকে দেখে সহজেই চিনতে পারবে। যদিও ইতিপূর্বে সে ছিল অশিক্ষিত। কাফের ও মুনাফেক লোক তা দেখেও পড়তে পারবেনা। যদিও সে ছিল শিক্ষিত ও পড়ালেখা জানা লোক। কারণ কাফের ও মুনাফেক আল্লাহর অসংখ্য সুস্পষ্ট দলীল-প্রমাণ দেখেও ঈমান আনয়ন করেনি।[8]

দাজ্জালের ফিতনাসমূহ ও তার অসারতাঃ

আদম সৃষ্টি থেকে কিয়ামত পর্যন্ত মানব জাতির জন্য দাজ্জালের চেয়ে বড় ফিতনা আর নেই। সে এমন অলৌকিক বিষয় দেখাবে যা দেখে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়বে। দাজ্জাল নিজেকে প্রভু ও আল্লাহ হিসেবে দাবী করবে। তার দাবীর পক্ষে এমন কিছু প্রমাণও উপস্থাপন করবে যে সম্পর্কে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আগেই সতর্ক করেছেন। মুমিন বান্দাগণ এগুলো দেখে মিথ্যুক দাজ্জালকে সহজেই চিনতে পারবে এবং আল্লাহর প্রতি তাদের ঈমান আরো বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু দুর্বল ঈমানদার লোকেরা বিভ্রান্তিতে পড়ে ঈমান হারা হবে।

দাজ্জাল নিজেকে রাব্ব বা প্রভু হিসেবেও দাবী করবে। ঈমানদারের কাছে এ দাবীটি সুস্পষ্ট দিবালোকের মত মিথ্যা বলে প্রকাশিত হবে। দাজ্জাল তার দাবীর পক্ষে যত বড় অলৌকিক ঘটনাই পেশ করুক না কেন মুমিন ব্যক্তির কাছে এটি সুস্পষ্ট হবে যে সে একজন অক্ষম মানুষ, পানাহার করে, নিদ্রা যায়, পেশাব-পায়খান করে। সর্বোপরি সে হবে অন্ধ। যার ভিতরে মানবীয় সব দোষ-গুণ বিদ্যমান সে কিভাবে রব্ব ও আল্লাহ হতে পারে!! একজন সত্যিকার মুমিনের মুমিনের বিশ্বাস হলোঃ মহান আল্লাহ সর্বপ্রকার মানবীয় দোষ-ত্রুটি হতে সম্পূর্ণ মুক্ত। কোন সৃষ্টজীবই তার মত নয়। আল্লাহকে দুনিয়ার জগতে কোন মানুষের পক্ষে দেখাও সম্ভব নয়।

দাজ্জাল বর্তমানে কোথায় আছে?

ফাতেমা বিনতে কায়স (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি মসজিদে গমণ করে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর সাথে নামায আদায় করলাম। আমি ছিলাম মহিলাদের কাতারে। তিনি নামায শেষে হাসতে হাসতে মিম্বারে উঠে বসলেন। প্রথমেই তিনি বললেনঃ প্রত্যেকেই যেন আপন আপন জায়গায় বসে থাকে। অতঃপর তিনি বললেনঃ তোমরা কি জান আমি কেন তোমাদেরকে একত্রিত করেছি? তাঁরা বললেনঃ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ আমি তোমাদেরকে এ সংবাদ দেয়ার জন্যে একত্রিত করেছি যে তামীম দারী ছিল একজন খৃষ্টান লোক। সে আমার কাছে আগমণ করে ইসলাম গ্রহণ করেছে। অতঃপর সে মিথ্যুক দাজ্জাল সম্পর্কে এমন ঘটনা বলেছে যা আমি তোমাদের কাছে বর্ণনা করতাম। লাখ্‌ম ও জুযাম গোত্রের ত্রিশ জন লোকের সাথে সে সাগর পথে ভ্রমণে গিয়েছিল। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার শিকার হয়ে এক মাস পর্যন্ত তারা সাগরেই ছিল। অবশেষে তারা সাগরের মাঝখানে একটি দ্বীপে অবতরণ করলো। দ্বীপের ভিতরে প্রবেশ করে তারা মোটা মোটা এবং প্রচুর চুল বিশিষ্ট একটি অদ্ভুত প্রাণীর সন্ধান পেল। চুল দ্বারা সমস্ত শরীর আবৃত থাকার কারণে প্রাণীটির অগ্রপশ্চাৎ নির্ধারণ করতে সক্ষম হলোনা। তারা বললঃ অকল্যাণ হোক তোমার! কে তুমি? সে বললোঃ আমি সংবাদ সংগ্রহকারী গোয়েন্দা। তারা বললোঃ কিসের সংবাদ সংগ্রহকারী? অতঃপর প্রাণীটি দ্বীপের মধ্যে একটি ঘরের দিকে ইঙ্গিত করে বললোঃ হে লোক সকল! তোমরা এই ঘরের ভিতরে অবস্থানরত লোকটির কাছে যাও। সে তোমাদের কাছ থেকে সংবাদ সংগ্রহ করার জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। তামীম দারী বলেনঃ প্রাণীটি যখন একজন লোকের কথা বললোঃ তখন আমাদের ভয় হলো যে হতে পারে সে একটি শয়তান। তথাপিও আমরা ভীত হয়ে দ্রুত অগ্রসর হয়ে ঘরটির ভিতরে প্রবেশ করলাম। সেখানে প্রবেশ করে আমরা বৃহদাকার একটি মানুষ দেখতে পেলাম। এত বড় আকৃতির মানুষ আমরা ইতিপূর্বে আর কখনও দেখিনি। তার হাত দু’টিকে ঘাড়ের সাথে একত্রিত করে হাঁটু এবং গোড়ালীর মধ্যবর্তী স্থানে লোহার শিকল দ্বারা বেঁধে রাখা হয়েছে। আমরা বললামঃ মরণ হোক তোমার! কে তুমি? সে বললোঃ তোমরা আমার কাছে আসতে সক্ষম হয়েছ। তাই আগে তোমাদের পরিচয় দাও। আমরা বললামঃ আমরা একদল আরব মানুষ নৌকায় আরোহন করলাম। সাগরের প্রচন্ড ঢেউ আমাদেরকে নিয়ে একমাস পর্যন্ত খেলা করলো। অবশেষে তোমার দ্বীপে উঠতে বাধ্য হলাম। দ্বীপে প্রবেশ করেই প্রচুর পশম বিশিষ্ট এমন একটি জন্তুর সাক্ষাৎ পেলাম, প্রচুর পশমের কারণে যার অগ্রপশ্চাৎ চেনা যাচ্ছিলনা। আমরা বললামঃ অকল্যাণ হোক তোমার! কে তুমি? সে বললোঃ আমি সংবাদ সংগ্রহকারী গোয়েন্দা। আমরা বললামঃ কিসের সংবাদ সংগ্রহকারী? অতঃপর প্রাণীটি দ্বীপের মধ্যে এই ঘরের দিকে ইঙ্গিত করে বললোঃ হে লোক সকল! তোমরা এই ঘরের ভিতরে অবস্থানরত লোকটির কাছে যাও। সে তোমাদের নিকট থেকে সংবাদ সংগ্রহ করার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। তাই আমরা তার ভয়ে তোমার কাছে দ্রুত আগমণ করলাম। হতে পার তুমি একজন শয়তান- এভয় থেকেও আমরা নিরাপদ নই। সে বললোঃ আমাকে তোমরা ‘বাইসান’ সম্পর্কে সংবাদ দাও। আমরা তাকে বললামঃ বাইসানের কি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছো? সে বললোঃ আমি তথাকার খেজুরের বাগান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছি। সেখানের গাছগুলো এখনও ফল দেয়? আমরা বললামঃ হ্যাঁ। সে বললোঃ সে দিন বেশী দূরে নয় যে দিন গাছগুলোতে কোন ফল ধরবেনা। অতঃপর সে বললোঃ আমাকে বুহাইরাতুত্‌ তাবারীয়া সম্পর্কে সংবাদ দাও। আমরা তাকে বললামঃ বুহাইরাতুত্‌ তাবারীয়ার কি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছো? সে বললোঃ আমি জানতে চাই সেখানে কি এখনও পানি আছে? আমরা বললামঃ তথায় প্রচুর পানি আছে। সে বললোঃ অচিরেই তথাকার পানি শেষ হয়ে যাবে। সে পুনরায় বললোঃ আমাকে যুগার নামক ঝর্ণা সম্পর্কে সংবাদ দাও। আমরা তাকে বললামঃ সেখানকার কি সম্পর্কে তুমি জানতে চাও? সে বললোঃ আমি জানতে চাই সেখানে কি এখনও পানি আছে? লোকেরা কি এখনও সে পানি দিয়ে চাষাবাদ করছে? আমরা বললামঃ তথায় প্রচুর পানি রয়েছে। লোকেরা সে পানি দিয়ে চাষাবাদ করছে। সে আবার বললোঃ আমাকে উম্মীদের নবী সম্পর্কে জানাও। আমরা বললামঃ সে মক্কায় আগমণ করে বর্তমানে মদীনায় হিজরত করেছে। সে বললোঃ আরবরা কি তার সাথে যুদ্ধ করেছে? বললামঃ হ্যাঁ। সে বললোঃ ফলাফল কি হয়েছে? আমরা তাকে সংবাদ দিলাম যে, পার্শ্ববর্তী আরবদের উপর তিনি জয়লাভ করেছেন। ফলে তারা তাঁর আনুগত্য স্বীকার করে নিয়েছে। সে বললঃ তাই না কি? আমরা বললাম তাই। সে বললোঃ তার আনুগত্য করাই তাদের জন্য ভাল। এখন আমার কথা শুন। আমি হলাম দাজ্জাল। অচিরেই আমাকে বের হওয়ার অনুমতি দেয়া হবে। আমি বের হয়ে চল্লিশ দিনের ভিতরে পৃথিবীর সমস্ত দেশ ভ্রমণ করবো। তবে মক্কা-মদীনায় প্রবেশ করা আমার জন্য নিষিদ্ধ থাকবে। যখনই আমি মক্কা বা মদীনায় প্রবেশ করতে চাইবো তখনই ফেরেশতাগণ কোষমুক্ত তলোয়ার হাতে নিয়ে আমাকে তাড়া করবে। মক্কা-মদীনার প্রতিটি প্রবেশ পথে ফেরেশতাগণ পাহারা দিবে।

হাদীছের বর্ণনাকারী ফাতেমা বিনতে কায়েস বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাতের লাঠি দিয়ে মিম্বারে আঘাত করতে করতে বললেনঃ এটাই মদীনা, এটাই মদীনা, এটাই মদীনা। অর্থাৎ এখানে দাজ্জাল আসতে পারবেনা। অতঃপর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মানুষকে লক্ষ্য করে বললেনঃ তামীম দারীর হাদীছটি আমার কাছে খুবই ভাল লেগেছে। তার বর্ণনা আমার বর্ণনার অনুরূপ হয়েছে। বিশেষ করে মক্কা ও মদীনা সম্পর্কে। শুনে রাখো! সে আছে সাম দেশের সাগরে (ভূমধ্য সাগরে) অথবা আরব সাগরে। তা নয় সে আছে পূর্ব দিকে। সে আছে পূর্ব দিকে। সে আছে পূর্ব দিকে। এই বলে তিনি পূর্ব দিকে ইঙ্গিত করে দেখালেন। ফাতেমা বিনতে কায়েস বলেনঃ “আমি এই হাদীছটি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর নিকট থেকে মুখস্থ করে রেখেছি।[9]

দাজ্জালের যে সমস্ত ক্ষমতা দেখে মানুষ বিভ্রান্তিতে পড়বেঃ

ক) একস্থান হতে অন্য স্থানে দ্রুত পরিভ্রমণঃ নাওয়াস বিন সামআন থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে দাজ্জালের চলার গতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেনঃ “দ্রুতগামী বাতাস বৃষ্টিকে যেভাবে চালিয়ে নেয় দাজ্জালের চলার গতিও সে রকম হবে।[10] তিনি আরো সংবাদ দিয়েছেন যে মক্কা ও মদীনা ব্যতীত পৃথিবীর সমস্ত অঞ্চল সে পরিভ্রমণ করবে। মক্কা ও মদীনার সমস্ত প্রবেশ পথে ফেরেশতাগণ তলোওয়ার হাতে নিয়ে পাহারা দিবে।

খ) দাজ্জালের সাথে থাকবে জান্নাত-জাহান্নামঃ দাজ্জালের সাথে জান্নাত এবং জাহান্নাম থাকবে। প্রকৃত অবস্থা হবে সম্পূর্ণ বিপরীত। দাজ্জালের জাহান্নামের আগুন প্রকৃতপক্ষে সুমিষ্ট পানি এবং জান্নাত হবে জাহান্নামের আগুন। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ “দাজ্জালের সাথে যা থাকবে তা আমি অবগত আছি। তার সাথে দু’টি নদী প্রবাহিত থাকবে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে একটিতে সুন্দর পরিস্কার পানি দেখা যাবে। অন্যটিতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা যাবে। যার সাথে দাজ্জালের সাক্ষাৎ হবে সে যেন দাজ্জালের আগুনে ঝাপ দিয়ে পড়ে এবং সেখান থেকে পান করে। কারণ উহা সুমিষ্ট পানি। তার চোখের উপরে মোটা আবরণ থাকবে। কপালে কাফের লেখা থাকবে। মূর্খ ও শিক্ষিত সকল ঈমানদার লোকই তা পড়তে সক্ষম হবে ।[11]

গ) দাজ্জাল মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করবেঃ দাজ্জাল তার কর্মকান্ডে শয়তানের সহযোগীতা নিবে। শয়তান কেবল মিথ্যা ও গোমরাহী এবং কুফরী কাজেই সাহায্য করে থাকে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ দাজ্জাল মানুষের কাছে গিয়ে বলবেঃ আমি যদি তোমার মৃত পিতা-মাতাকে জীবিত করে দেখাই তাহলে কি তুমি আমাকে প্রভু হিসেবে মানবে? সে বলবে অবশ্যই মানব। এ সুযোগে শয়তান তার পিতা-মাতার আকৃতি ধরে সন্তানকে বলবেঃ হে সন্তান! তুমি তার অনুসরণ কর। সে তোমার প্রতিপালকমুমিন।[12] হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই।

ঘ) জড় পদার্থ ও পশুরাও দাজ্জালের ডাকে সাড়া দেবেঃ দাজ্জালের ফিতনার মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে পরীক্ষা করবেন। দাজ্জাল আকাশকে আদেশ দিবে বৃষ্টি বর্ষণ করার জন্যে। আকাশ তার আদেশে বৃষ্টি বর্ষণ করবে। যমিনকে ফসল উৎপন্ন করতে বলবে। যমিন ফসল উৎপন্ন করবে। চতুষ্পদ জন্তুকে ডাক দিলে তারা দাজ্জালের ডাকে সাড়া দিবে। ধ্বংস প্রাপ্ত ঘরবাড়িকে তার নিচে লুকায়িত গুপ্তধন বের করতে বলবে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ “দাজ্জাল এক জনসমাজে গিয়ে মানুষকে তার প্রতি ঈমান আনয়নের আহবান জানাবে। এতে তারা ঈমান আনবে। দাজ্জাল তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করার জন্য আকাশকে আদেশ দিবে। আকাশ বৃষ্টি বর্ষণ করবে, যমিন ফসল উৎপন্ন করবে এবং তাদের পশুপাল ও চতুষ্পদ জন্তুগুলো অধিক মোটা-তাজা হবে এবং পূর্বের তুলনায় বেশী দুধ প্রদান করবে। অতঃপর অন্য একটি জনসমাজে গিয়ে মানুষকে তার প্রতি ঈমান আনয়নের আহবান জানাবে। লোকেরা তার কথা প্রত্যাখ্যান করবে। দাজ্জাল তাদের নিকট থেকে ব্যর্থ হয়ে ফেরত আসবে। এতে তারা চরম অভাবে পড়বে। তাদের ক্ষেত-খামারে চরম ফসলহানি দেখা দিবে। দাজ্জাল পরিত্যক্ত ভূমিকে তার নিচে লুকায়িত গুপ্তধন বের করতে বলবে। গুপ্তধনগুলো বের হয়ে মৌমাছির দলের ন্যায় তার পিছে পিছে চলতে থাকবেমুমিন।[13]

ঙ) দাজ্জাল একজন মুমিন যুবককে হত্যা করে পুনরায় জীবিত করবেঃ

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ দাজ্জাল বের হয়ে মদীনার দিকে অগ্রসর হবে। যেহেতু মদীনায় দাজ্জালের প্রবেশ নিষেধ তাই সে মদীনার নিকটবর্র্তী একটি স্থানে অবস্থান করবে। তার কাছে একজন মুমিন লোক গমণ করবেন। তিনি হবেন ঐ যামানার সর্বোত্তম মুমিন। দাজ্জালকে দেখে তিনি বলবেনঃ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি সেই দাজ্জাল যার সম্পর্কে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে সাবধান করেছেন। তখন দাজ্জাল উপস্থিত মানুষকে লক্ষ্য করে বলবেঃ আমি যদি একে হত্যা করে জীবিত করতে পারি তাহলে কি তোমরা আমার ব্যাপারে কোন সন্দেহ পোষণ করবে? লোকেরা বলবেঃ না। অতঃপর সে উক্ত মুমিনকে হত্যা করে পুনরায় জীবিত করবে। এ পর্যায়ে যুবকটি বলবেঃ আল্লাহর শপথ! তুমি যে মিথ্যুক দাজ্জাল- এ সম্পর্কে আমার বিশ্বাস আগের তুলনায় আরো মজবুত হলো। দাজ্জাল তাকে দ্বিতীয়বার হত্যা করার চেষ্টা করবে। কিন্তু তাঁকে হত্যা করতে সক্ষম হবেনা।[14] মুসলিম শরীফের বর্ণনায় এসেছে উক্ত যুবক দাজ্জালকে দেখে বলবেঃ হে লোক সকল! এটি সেই দাজ্জাল যা থেকে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে সাবধান করেছেন। অতঃপর দাজ্জাল তার অনুসারীদেরকে বলবেঃ একে ধর এবং প্রহার কর। তাকে মেরে-পিটে যখম করা হবে। অতঃপর দাজ্জাল তাকে জিজ্ঞেস করবে এখনও কি আমার প্রতি ঈমান আনবেনা? নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ উক্ত যুবক বলবেনঃ তুমি মিথ্যাবাদী দাজ্জাল। তারপর দাজ্জালের আদেশে তার মাথায় করাত লাগিয়ে দ্বিখন্ডিত করে ফেলবে। দাজ্জাল দু’খন্ডের মাঝ দিয়ে হাঁটাহাঁটি করবে। অতঃপর বলবেঃ উঠে দাড়াও। তিনি উঠে দাড়াবেন। দাজ্জাল বলবে এখনও ঈমান আনবেনা? তিনি বলবেনঃ তুমি মিথ্যুক দাজ্জাল হওয়ার ব্যাপারে এখন আমার বিশ্বাস আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। অতঃপর তিনি বলবেনঃ হে লোক সকল! আমার পরে আর কারো সাথে এরূপ করতে পারবেনা। অতঃপর দাজ্জাল তাকে পাকড়াও করে আবার যবেহ করার চেষ্টা করবে। কিন্তু তার গলায় যবেহ করার স্থানটি তামায় পরিণত হয়ে যাবে। কাজেই সে যবেহ করতে ব্যর্থ হবে। অতঃপর তাঁর হাতে-পায়ে ধরে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। লোকেরা মনে করবে তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছে। অথচ সে জান্নাতে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। নবী (সাঃ) বলেনঃ “এই ব্যক্তি হবে পৃথিবীতে সেদিন সবচেয়ে মহা সত্যের সাক্ষ্য দানকারীমুমিন।[15]

দাজ্জাল কোথা থেকে বের হবে?

দাজ্জাল বের হওয়ার স্থান সম্পর্কেও রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বর্ণনা দিয়েছেন। সে পূর্ব দিকের পারস্য দেশ থেকে বের হবে। সে স্থানটির নাম হবে খোরাসান। সেখান থেকে বের হয়ে সমগ্র দুনিয়া ভ্রমণ করবে। তবে মক্কা এবং মদীনায় প্রবেশ করতে পারবেনা। ফেরেশতাগণ সেদিন মক্কা-মদীনার প্রবেশ পথসমূহে তরবারি নিয়ে পাহারা দিবে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ “পূর্বের কোন একটি দেশ থেকে দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে যার বর্তমান নাম খোরাসানমুমিন।[16]

দাজ্জাল মক্কা ও মদীনায় প্রবেশ করতে পারবেনাঃ

সহীহ হাদীছের বিবরণ অনুযায়ী দাজ্জালের জন্যে মক্কা ও মদীনাতে প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে। মক্কা ও মদীনা ব্যতীত পৃথিবীর সকল স্থানেই সে প্রবেশ করবে। ফাতেমা বিনতে কায়েস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত দাজ্জালের হাদীছে এসেছে অতঃপর দাজ্জাল বললোঃ আমি হলাম দাজ্জাল। অচিরেই আমাকে বের হওয়ার অনুমতি দেয়া হবে। আমি বের হয়ে চল্লিশ দিনের ভিতরে পৃথিবীর সমস্ত দেশ ভ্রমণ করবো। তবে মক্কা-মদীনায় প্রবেশ করা আমার জন্য নিষিদ্ধ থাকবে। যখনই আমি মক্কা বা মদীনায় প্রবেশ করতে চাইবো তখনই কোষমুক্ত তলোয়ার হাতে নিয়ে ফেরেশতাগণ আমাকে তাড়া করবে। মক্কা-মদীনার প্রতিটি প্রবেশ পথে ফেরেশতাগণ পাহারা দিবে।[17] সে সময় মদীনা শরীফ তিনবার কেঁপে উঠবে এবং প্রত্যেক মুনাফেক এবং কাফেরকে বের করে দিবে। যারা দাজ্জালের নিকট যাবে এবং তার ফিতনায় পড়বে তাদের অধিকাংশই হবে মহিলা। দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচানোর জন্য পুরুষেরা তাদের স্ত্রী, মা, বোন, কন্যা, ফুফু এবং অন্যান্য স্বজন মহিলাদেরকে রশি দিয়ে বেঁধে রাখবে।

দাজ্জাল পৃথিবীতে কত দিন থাকবে?

সাহাবীগণ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে জিজ্ঞেস করেছেন দাজ্জাল পৃথিবীতে কত দিন অবস্থান করবে? উত্তরে তিনি বলেছেনঃ সে চল্লিশ দিন অবস্থান করবে। প্রথম দিনটি হবে এক বছরের মত লম্বা। দ্বিতীয় দিনটি হবে এক মাসের মত। তৃতীয় দিনটি হবে এক সপ্তাহের মত। আর বাকী দিনগুলো দুনিয়ার স্বাভাবিক দিনের মতই হবে। আমরা বললামঃ যে দিনটি এক বছরের মত দীর্ঘ হবে সে দিন কি এক দিনের নামাযই যথেষ্ট হবে? উত্তরে তিনি বললেনঃ না; বরং তোমরা অনুমান করে সময় নির্ধারণ করে নামায পড়বে।[18]

কারা দাজ্জালের অনুসরণ করবে?

দাজ্জালের অধিকাংশ অনুসারী হবে ইহুদী, তুর্কী এবং অনারব লোক। তাদের অধিকাংশই হবে গ্রাম্য মূর্খ এবং মহিলা। ইহুদীরা মিথ্যুক কানা দাজ্জালের অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী দাজ্জাল হবে তাদের বাদশা। তার নেতৃত্বে তারা বিশ্ব পরিচালনা করবে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ দাজ্জালের অধিকাংশ অনুসারী হবে ইহুদী এবং মহিলা।[19] তিনি আরো বলেনঃ “ইস্পাহানের সত্তর হাজার ইহুদী দাজ্জালের অনুসরণ করবে। তাদের সবার পরনে থাকবে সেলাই বিহীন চাদরমুমিন।[20]

গ্রাম্য অশিক্ষিত লোকেরা মূর্খতার কারণে এবং দাজ্জালের পরিচয় সম্পর্কে তাদের জ্ঞান না থাকার কারণে দাজ্জালের অলৌকিক ক্ষমতা দেখে তারা ফিতনায় পড়বে। মহিলাদের ব্যাপারটিও অনুরূপ। তারা সহজেই যে কোন জিনিষ দেখে প্রভাবিত হয়ে থাকে।

দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার উপায়ঃ

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাজ্জালের ফিতনা হতে রেহাই পাওয়ার উপায়ও বলে দিয়েছেন। তিনি উম্মাতকে একটি সুস্পষ্ট দ্বীনের উপর রেখে গেছেন। সকল প্রকার কল্যাণের পথ প্রদর্শন করেছেন এবং সকল অকল্যাণের পথ হতে সতর্ক করেছেন। উম্মাতের উপরে যেহেতু দাজ্জালের ফিতনা সবচেয়ে বড় তাই তিনি দাজ্জালের ফিতনা থেকে কঠোরভাবে সাবধান করেছেন এবং দাজ্জালের লক্ষণগুলো সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন। যাতে মুমিন বান্দাদের জন্য এই প্রতারক, ধোকাবাজ ও মিথ্যুক দাজ্জালকে চিনতে কোনরূপ অসুবিধা না হয়।

ইমাম সাফারায়েনী (রঃ) বলেনঃ প্রতিটি বিজ্ঞ মুসলিমের উচিৎ তার ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী-পরিবার এবং সকল নারী-পুরুষদের জন্য দাজ্জালের হাদীছগুলো বর্ণনা করা। বিশেষ করে ফিতনায় পরিপূর্ণ আমাদের বর্তমান যামানায়। দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার উপায়গুলো নিম্নরূপঃ-

১) ইসলামকে সঠিকভাবে আঁকড়িয়ে ধরাঃ ইসলামকে সঠিকভাবে আঁকড়িয়ে ধরা এবং ঈমানের উপর অটল থাকাই দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়। যে মুমিন আল্লাহর নাম ও তাঁর অতুলনীয় সুমহান গুণাবলী সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করবে সে অতি সহজেই দাজ্জালকে চিনতে পারবে। সে দেখতে পাবে দাজ্জাল খায় পান করে। মু’মিনের আকীদা এই যে, আল্লাহ তা’আলা পানাহার ও অন্যান্য মানবীয় দোষ-গুণ থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। যে পানাহারের প্রতি মুখাপেক্ষী সে কখনও আল্লাহ বা রব্ব হতে পারেনা। দাজ্জাল হবে অন্ধ। আল্লাহ এরূপ দোষ-ত্রুটির অনেক উর্ধে। আল্লাহর গুণাবলী সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণার অধিকারী মুমিনগণের মনে প্রশ্ন জাগবে যে নিজের দোষ থেকে মুক্ত হতে পারেনা সে কিভাবে প্রভু হতে পারে? মু’মিনের আকীদা এই যে, আল্লাহকে দুনীয়ার জীবনে দেখা সম্ভব নয়। অথচ মিথ্যুক দাজ্জালকে মুমিন-কাফের সবাই দুনিয়াতে দেখতে পাবে।

২) দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করাঃ আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ “আমি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে নামাযের ভিতরে দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাইতে শুনেছি ।[21] তিনি নামাযের শেষ তাশাহুদে বলতেনঃ

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَمِنْ عَذَابِ النَّارِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ

“হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে কবরের আযাব, জাহান্নামের আযাব, জীবন-মরণের ফিতনা এবং মিথ্যুক দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই ।[22]

৩) দাজ্জাল থেকে দূরে থাকাঃ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাজ্জালের নিকট যেতে নিষেধ করেছেন। কারণ সে এমন একজন লোকের কাছে আসবে, যে নিজেকে ঈমানদার মনে করবে। দাজ্জালের কাজ-কর্ম দেখে সে বিভ্রান্তিতে পড়ে ঈমান হারা হয়ে যাবে। মুমিনের জন্য উত্তম হলো সম্ভব হলে সে সময়ে মদীনা অথবা মক্কায় বসবাস করার চেষ্টা করা। কারণ দাজ্জাল তথায় প্রবেশ করতে পারবেনা। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ যে ব্যক্তি দাজ্জাল বের হওয়ার কথা শুনবে সে যেন তার কাছে না যায়। আল্লাহর শপথ! এমন একজন লোক দাজ্জালের নিকটে যাবে যে নিজেকে ঈমানদার মনে করবে। অতঃপর সে দাজ্জালের সাথে প্রেরিত সন্দেহময় জিনিষগুলো ও তার কাজ-কর্ম দেখে বিভ্রান্তিতে পড়ে ঈমান হারা হয়ে তার অনুসারী হয়ে যাবে। হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই।

৪) সূরা কাহাফ পাঠ করাঃ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাজ্জালের ফিতনার সম্মুখিন হলে মুমিনদেরকে সূরা কাহাফ মুখস্থ করতে এবং তা পাঠ করতে আদেশ করেছেন। তিনি বলেনঃ “যে ব্যক্তি সূরা কাহাফের প্রথম দশটি আয়াত মুখস্থ করবে সে দাজ্জালের ফিতনা হতে হেফাযতে থাকবে ।[23]

সূরা কাহাফ পাঠের নির্দেশ সম্ভবতঃ এজন্য হতে পারে যে, এই সূরায় আল্লাহ তা’আলা বিস্ময়কর বড় বড় কয়েকটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। মুমিন ব্যক্তি এগুলো গভীরভাবে পাঠ করলে দাজ্জালের বিস্ময়কর ঘটনা দেখে কিছুতেই বিচলিত হবেনা। এতে সে হতাশ হয়ে বিভ্রান্তিতেও পড়বেনা।

দাজ্জালের শেষ পরিণতিঃ

সহীহ হাদীছের বিবরণ অনুযায়ী ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)এর হাতে দাজ্জাল নিহত হবে। বিস্তারিত বিবরণ এই যে, মক্কা-মদীনা ব্যতীত পৃথিবীর সকল দেশেই সে প্রবেশ করবে। তার অনুসারীর সংখ্যা হবে প্রচুর। সমগ্র দুনিয়ায় তার ফিতনা ছড়িয়ে পড়বে। সামান্য সংখ্যক মুমিনই তার ফিতনা থেকে রেহাই পাবে। ঠিক সে সময় দামেস্ক শহরের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত এক মসজিদের সাদা মিনারের উপর ঈসা (আঃ) আকাশ থেকে অবতরণ করবেন। মুসলমানগণ তার পার্শ্বে একত্রিত হবে। তাদেরকে সাথে নিয়ে তিনি দাজ্জালের দিকে রওনা দিবেন। দাজ্জাল সে সময় বায়তুল মাকদিসের দিকে অগ্রসর হতে থাকবে। অতঃপর ঈসা (আঃ) ফিলিস্তীনের লুদ্দ শহরের গেইটে দাজ্জালকে পাকড়াও করবেন। ঈসা (আঃ)কে দেখে সে পানিতে লবন গলার ন্যায় গলতে শুরু করবে। ঈসা (আঃ) তাকে লক্ষ্য করে বলবেনঃ “তোমাকে আমি একটি আঘাত করবো যা থেকে তুমি কখনও রেহাই পাবেনা।মুমিন ঈসা (আঃ) তাকে বর্শা দিয়ে আঘাত করবেন। অতঃপর মুসলমানেরা তাঁর নেতৃত্বে ইহুদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। মুসলমানদের হাতে দাজ্জালের বাহিনী ইহুদীর দল পরাজিত হবে। তারা কোথাও পালাবার স্থান পাবেনা। গাছের আড়ালে পালানোর চেষ্টা করলে গাছ বলবেঃ হে মুসলিম! আসো, আমার পিছনে একজন ইহুদী লকিয়ে আছে। আসো এবং তাকে হত্যা কর। পাথর বা দেয়ালের পিছনে পলায়ন করলে পাথর বা দেয়াল বলবেঃ হে মুসলিম! আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে, আসো! তাকে হত্যা কর। তবে গারকাদ নামক গাছ ইহুদীদেরকে গোপন করার চেষ্টা করবে। কেননা সেটি ইহুদীদের বৃক্ষ বলে পরিচিত।[24]

সহীহ মুসলিম শরীফে আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ

(لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يُقَاتِلَ الْمُسْلِمُونَ الْيَهُودَ فَيَقْتُلُهُمُ الْمُسْلِمُونَ حَتَّى يَخْتَبِئَ الْيَهُودِيُّ مِنْ وَرَاءِ الْحَجَرِ وَالشَّجَرِ فَيَقُولُ الْحَجَرُ أَوِ الشَّجَرُ يَا مُسْلِمُ يَا عَبْدَ اللَّهِ هَذَا يَهُودِيٌّ خَلْفِي فَتَعَالَ فَاقْتُلْهُ إِلَّا الْغَرْقَدَ فَإِنَّهُ مِنْ شَجَرِ الْيَهُودِ)

“ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত হবেনা যতক্ষণ না মুসলমানেরা ইহুদীদের সাথে যুদ্ধ করবে। অতঃপর মুসলমানগণ ইহুদীরকে হত্যা করবে। ইহুদীরা গাছ ও পাথরের আড়ালে পালাতে চেষ্টা করবে। কিন্তু কেউ তাদেরকে আশ্রয় দিবেনা। গাছ বা পাথর বলবেঃ হে মুসলমান! হে আল্লাহর বান্দা! আমার পিছনে একজন ইহুদী লুকিয়ে আছে। আসো এবং তাকে হত্যা করো। তবে ‘গারকাদ’ নামক গাছের পিছনে লুকালে গারকাদ গাছ কোন কথা বলবেনা। এটি ইহুদীদের গাছ বলে পরিচিত ।[25]


[1] -তিরমিজী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[2] - বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[3] - মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[4] - বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[5] - বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[6] - মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[7] - সহীহ মুসলিম, শরহুন্ নববীর সাথে (১৮/৬১)।

[8] - - ফাতহুল বারী, (১৩/১০০)।

[9] - মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[10]- মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[11]- মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।|

[12] - সহীহুল জামে আস্-সাগীর, হাদীছ নং-৭৭৫২

[13]- মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[14]- বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[15] - মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[16] - তিরমিজী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান, সহীহুল জামে আস্-সাগীর, হাদীছ নং-৩৩৯৮। নিশাপুর, হিরাত, মরো, বালখ এবং পার্শ্ববর্তী কতিপয় অঞ্চলের নাম খোরাসান।

[17] - মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[18] - মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[19] - মুসনাদে ইমাম আহমাদ। আহমাদ শাকের সহীহ বলেছেন।

[20] - মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[21] - বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[22]- বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুল জানায়েয।

[23] - মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান।

[24] - নেহায়া, আল-ফিতান ওয়াল মালাহিম, (১/১২৮-১২৯)

[25] - সহীহ মুসলিম, অধ্যায়ঃ কিতাবুল ফিতান

Source: islamicalo

তিন শ্রেণীর মানুষের উপর জান্নাত হারাম

| comments


সহিহ হাদিসের আলোকে একথা স্বীকৃত যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তিন শ্রেণীর মানুষের উপর জান্নাত হারাম অর্থ্যাত এই তিন শ্রেণীর মানুষ কখনোই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।

প্রথম শ্রেণী হলো- যারা কোনো প্রকার নেশাদার দ্রব্য পান বা গ্রহণ করে। মদ, বিড়ি, গাজা, ফেনসিডিল, হিরোইন, আফিম, জদ্দা- যে কোনো প্রকার নেশাই গ্রহণ করেন না কেন; খেলে দেহ অপবিত্র হয়ে যাবে আর এই অপবিত্র দেহ কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না। সুতরাং এইসব নেশাদ্রব্য গ্রহণ করা আজকেই ছাড়া উচিত, আজ এবং এখনই তাওবা করা উচিতি এই পাপ কাজ থেকে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমিন।

দ্বিতীয় শ্রেণী হলো- যে বা যারা পিতা-মাতার অবাদ্ধ, এই শ্রেণীভূক্ত মানুষরাও জান্নাতে যাবে না। জান্নাত তাদের উপর হারাম। মৃত্যু পর্যন্ত পিতা-মাতার দেখভাল করতেই হবে। পিতা-মাতাকে কোনো কারণেই ত্যাগ করা যাবেনা। পিতা-মাতার খেদমত করতেই হবে। রাসুল [সা.] পরিস্কারভাবে বলেছেন, পিতা-মাতার অবাদ্ধ সন্তান জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আল্লাহ আমাদের সবাইকে পিতা-মাতার অবাদ্ধ সন্তান না হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

তৃতীয় শ্রেণী হলো- দাইউস। ঐ দাইউস ব্যক্তি যে তার পরিবারে পর্দা প্রথা চালু রাখেনি। পরিবারের সদ্যসের মাঝে বেপর্দা ছিলো, বেহায়াপনা ছিলো কিন্তু সে তা বাধা প্রদান করেনি। পরিবারের কর্তা হিসেবে বেপর্দা-বেহায়াপনা বন্ধ না করার জন্য এই শাস্তি পাবে সে। আপনি যত বড় ইবাদতকারীই হোন না কেন, মক্কার মাটিতে যতবারই হজ পালনে ঘুরে আসুন না কেন, পাঞ্জাবী আপনার যতই সুন্নতি-শক্তিশালী এ সুন্দর হোক না কেন- পরিবারে যদি পর্দা না থাকে রাসুল [সা.] –এর হাদিস অনুযায়ী আপনি জাহান্নামি। জান্নাত এই শ্রেণীর মানুষের জন্য হারাম।

আত্মহত্যাকারীদের শাস্তি

| comments

রাসূলে করীম (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি পর্বত থেকে পড়ে আত্মহত্যা করবে সে জাহান্নামের আগুনে অবস্থান করবে। সার্বক্ষণিক সে তাতে (পর্বতে) উঠতে এবং নামতে থাকবে।

আর যে ব্যক্তি বিষপানে আত্মহত্যা করবে, তার বিষ তার হাতে থাকবে, যা সে জাহান্নামের আগুনে সারাক্ষণ পান করতে থাকবে। আর যে ব্যক্তি কোন লৌহনির্মিত অস্ত্র দ্বারা আত্মহত্যা করবে তার সেই লৌহনির্মিত বস্তুটি তার হাতে থাকবে, যা সে জাহান্নামের আগুনে নিজের পেটে ঢুকাতে থাকবে। (বুখারী)

দাম্ভিকের শাস্তি

রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ইরাশাদ করেন, অহঙ্কারীদেরকে পিপীলিকার সমান অবয়বে কিয়ামতের দিন উঠানো হবে কিন্তু তাদের আকৃতি হবে মানুষের। অতপর তিনি বলেন, চতুর্দিক থেকে লাঞ্ছনা-গঞ্জনা তাদেরকে ঘিরে ধরবে।

তিনি আরও বলেন, তাদেরকে জাহান্নামের কারাগারের দিকে এভাবে হাঁটিয়ে নেয়া হবে- এ কারাগারের নাম ‘বেলিস’। তাদের উপর আগুন প্রজ্জ্বলনকারী আগুন ছড়িয়ে দেয়া হবে এবং তাদেরকে ‘তীনাতুল খাবাল’ অর্থাৎ জাহান্নামীদের শরীর নিঃসৃত পানীয় পান করানো হবে। (মিশকাত)

তিরমিযী শরীফের একটি বর্ণনায় আছে, নিশ্চয়ই জাহান্নামে একটি বিস্তীর্ণ মাঠ রয়েছে যাকে হাবহাব বলা হয়। এতে সীমালঙ্ঘনকারীরা অবস্থান করবে।

স্বীয় ঘরকে শয়তানের অনুপ্রবেশ থেকে সংরক্ষণের আমল

| comments

শয়তান মানুষের চির শত্রু, যে ঘরে সে প্রবেশ করে ঐ ঘরের পরিবেশকে বিনষ্ট করে দেয়, পরিবারের সদস্যদের মাঝে বিভক্তি সৃষ্টি করে।
এই শত্রু থেকে ঘরকে সংরক্ষণের কতিপয় আমলঃ
১. ঘরে প্রবেশ করার সময় নিুোক্ত দোয়া পাঠ করাঃ

(বিসমিল্লাহি ওলাজনা ওয়া বিসমিল্লাহি খারাজনা, ওয়া আলাল্লাহি রাব্বিনা তাওয়াক্কালনা)। (আবুদাউদ)
২. ঘরে প্রবেশ করে সেখানে অবস্থানরত লোকদেরকে সালাম দেয়া।
আল্লাহর বাণীঃ

فَإِذَا دَخَلْتُمْ بُيُوتاً فَسَلّمُواْ عَلَىَ أَنفُسِكُمْ تَحِيّةً مّنْ عِندِ اللّهِ مُبَارَكَةً طَيّبَةً

অর্থঃ“ তবে যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ করবে তখন তোমরা তোমাদের স্বজনদের প্রতি সালাম করবে অভিবাদন স্বরূপ যা আল্লাহর নিকট হতে কল্যাণময় ও পবিত্র”। (সূরা নূর-৬১)
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

إِذَا دَخَلْتَ عَلَى أَهْلِكَ فَسَلِّمْ ، يَكُنْ بَرَكَةً عَلَيْكَ وَعَلَى أَهْلِ بَيْتِكَ . (رواه الترمـذي )

অর্থঃ“ তুমি যখন তোমার ঘরে প্রবেশ করবে তখন সালাম দিবে তা তোমার জন্য এবং তোমার পরিবারের জন্য বরকত হবে”। (তিরমিযী)
৩. পানাহারের সময় দোয়া পাঠ করাঃ
রাসূলুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

إِذَا دَخَلَ الرَّجُلُ بَيْتَهُ فَذَكَرَ اللَّهَ عِنْدَ دُخُولِهِ وَعِنْدَ طَعَامِهِ , قَالَ الشَّيْطَانُ : لا مَبِيتَ لَكُمْ وَلا
عَشَاءَ (مسلم)

অর্থঃ“ যখন কোন ব্যক্তি তার ঘরে প্রবেশ করার সময় এবং খাবার খাওয়ার সময় দোয়া পাঠ করে তখন শয়তান বলেঃ আজ এখানে তোমাদের রাত্রিযাপন এবং নৈশ ভোজের কোন সুযোগ নেই”। (মুসলিম)
৪. ঘরে সূরা বাকারা তেলওয়াত করা।
রাসূলুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

ان لكل شيئ سنما، وان سنام القرآن سورة البقرة، وان الشيطان اذا سمع سورة البقرة تقرأ خرج من البيت الذى تقرأ فيه سورة البقرة، (رواه الحاكم)

অর্থঃ“সবকিছুরই একটি চুড়া থাকে আর কোরআনের চুড়াহল সূরা বাকারা, শয়তান যখন সূরা বাকারার তেলওয়াত শুনে তখন সে ঐ ঘর থেকে বের হয়ে যায় যেখনে তা তেলওয়াত করা হয়”। (হাকেম)

৫. গান-বাজনা এবং গান-বাজনার সরন্জাম থেকে ঘরকে পরিচ্ছন্ন রাখা। কেননা আল¬াহ্র যিকির যেমন শয়তানকে দূরে রাখে তেমনিভাবে গান এবং বাদ্য যন্ত্রের আওয়াজ রহমতের ফেরেশ্তাগণকে দূরে রাখে। আর ঘর থেকে যখন ফেরেশ্তাগণ বের হয়ে যায় তখন ওখনে শয়তান তার রাজত্ব কায়েম করে।
আল্লাহর বাণীঃ

وَاسْتَفْزِزْ مَنِ اسْتَطَعْتَ مِنْهُمْ بِصَوْتِكَ

অর্থঃ“ তোর আহ্বানে তাদের মধ্যে যাকে পারিস তাকে সত্যচুত কর” । (সূরা বানী ইসরাঈল- ৬৪)
মুজাহিদ এই আয়াতের তাফসীরে বলেছেনঃ গান-বাজনা হল শয়তানের আওয়াজ।
৬. ছবি এবং বিভিন্ন জীব জন্তুর মূর্তি থেকে ঘরকে পরিচ্ছন্ন রাখা।
রাসূলুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

لا تدخل الملائكة بيتا فيه تصاوير او تماثيل ( رواه مسلم)

অর্থঃ“ যে ঘরে মূর্তি বা ছবি থাকে সেখানে ফেরেশ্তা প্রবেশ করে না”। (মুসলিম)

৭. ঘরকে কুকুর থেকে পরিচ্ছন্ন রাখা।

রাসূলুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

لاتدخل الملائكة بيتا فيه كلب ولا صورة( رواه البخاري)

অর্থঃ“ যে ঘরে ছবি এবং কুকুর থাকে সেঘরে ফেরেশ্তা প্রবেশ করে না”। (বোখারী)
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. ইসলামী কথা - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Premium Blogger Template