السلام عليكم

যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার (তওবা) করবে আল্লাহ তাকে সব বিপদ থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেবেন। [আবূ দাঊদ: ১৫২০; ইবন মাজা: ৩৮১৯]
Showing posts with label মসজিদ. Show all posts
Showing posts with label মসজিদ. Show all posts

ভাসমান মসজিদ, মরক্কো

| comments

প্রাচীন পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের একটি ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানের কথা শুনলে মনে হয় বিশাল এক বাগান যেন শূন্যে ঝুলে আছে আর বাতাসে দোল খাচ্ছে। আসলে ব্যাপারটা কিন্তু তা নয়। তেমনি দূর থেকে দেখলে মনে হবে ভেসে আছে কিন্তু আসলে ভেসে নেই, এমন একটি মসজিদ আছে মরক্কোয়। বাদশাহ দ্বিতীয় হাসান এ মসজিদটি তৈরি করেছেন কাসাব্লাঙ্কা শহরে। মসজিদটির নির্মাণ কাজ করেছেন ফরাসি কোম্পানি বয়গিসের প্রকৌশলীরা। আর এর নকশা তৈরি করেছিলেন বাদশা হাসানের ফরাসি স্থপতি মিশেল পিনচিউ। মসজিদটিকে যে কারণে ভাসমান মসজিদ বলা হয় সেটি হলো মসজিদটির তিনভাগের একভাগ আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর অবস্থিত। দূরের কোনো জাহাজ থেকে দেখলে মনে হয়, ঢেউয়ের বুকে যেন মসজিদটি দুলছে আর মুসল্লিরা যেন নামাজ পড়ছেন পানির ওপর। মসজিদটি কিন্তু ছোটখাটো নয়। এখানে প্রায় ১ লাখ মানুষ একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারেন। এর মিনারের উচ্চতা ২০০ মিটার! আর মেঝে থেকে ছাদের উচ্চতা ৬৫ মিটার। মসজিদের ছাদটি প্রতি ৩ মিনিট পরপর যান্ত্রিকভাবে খুলে যায়। ফলে মসজিদের ভেতরে প্রাকৃতিক আলো ও মুক্ত বাতাস প্রবেশ করতে পারে। তবে বৃষ্টির সময় ছাদটি খোলা হয় না।
মসজিদটি এতই বড় যে, এর মূল কাঠামোর ভেতরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গির্জা সেন্ট পিটার্সকেও অনায়াসে বসিয়ে দেওয়া যাবে। ২২.২৪ একর জায়গার ওপর অবস্থিত এ মসজিদের মূল ভবনের সঙ্গেই আছে লাইব্রেরি, কোরআন শিক্ষালয়, ওজুখানা এবং কনফারেন্স রুম। ২৫০০ পিলারের ওপর স্থাপিত এ মসজিদের ভেতরের পুরোটাই টাইলস বসানো। শুধু তাই নয়, কোথাও কোথাও আবার সোনার পাত দিয়ে মোড়া। মসজিদ এলাকার আশপাশে সাজানো আছে ১২৪টি ঝরনা এবং ৫০টি ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি। এর নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৮৭ সালের আগস্টে। প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক ও কারুশিল্পীর দিনে দুই শিফট শ্রমের ফলে প্রায় সাত বছরে নির্মিত হয় এ মসজিদ। মসজিদটির উদ্বোধন করা হয় ১৯৯৩ সালের ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর দিনে। বিলাসবহুল এ মসজিদটি নির্মাণ করতে ব্যয় হয়েছে তত্কালীন ৮০ কোটি ডলার। বর্তমানে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা!

খেরুয়া মসজিদ, শেরপুর, বগুড়া

| comments

অনেক ঝড়-বৃষ্টি, রৌদ্র-দহন সয়ে টিকে আছে ৪৩০ বছর ধরে। মহাকাল তার গতিপ্রবাহের চিহ্ন রেখে গেছে দেয়ালে-খিলানে-গম্বুজে। ক্ষয়ে গেছে ইটে খোদাই করা নকশা, ঝরে গেছে চুন-সুরকির প্রলেপ। হয়তো হুমড়ি খেয়ে পড়েই যেত এত দিনে। কিন্তু তা হয়নি সম্ভবত চার কোণের প্রকাণ্ড আকারের মিনার আর চওড়া দেয়ালের শক্তির জন্যই। চুন-সুরকি দিয়ে গাঁথা পাতলা লাল ইটের দেয়ালগুলো ১.৮১ মিটার চওড়া। তার ওপর ভর করেই ছাদের ওপর টিকে আছে খেরুয়া মসজিদের তিনটি গম্বুজ। দেশের পুরাকীর্তিগুলোর যে গড়পড়তা বিধ্বস্ত চেহারা, সে তুলনায় খেরুয়া মসজিদের অবস্থা যথেষ্ট ভালো বলেই মনে হলো। সামনে সবুজ ঘাসে ঢাকা আয়তাকার মাঠ। কিনার দিয়ে তাল, নারকেল, আম, কদমগাছের সারি। মৌসুমি ফুলের গাছও আছে এক পাশে। ইটের প্রাচীরের ওপর লোহার রেলিং দিয়ে পুরো চত্বর ঘেরা। মোট ৫৯ শতাংশ জায়গা। নামাজের সময় মুসল্লিরা ছাড়া সাধারণত কেউ ভেতরে প্রবেশ করে না। ফলে প্রাঙ্গণটি নিরিবিলি এবং খুবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। গাছগাছালিঘেরা সবুজ পরিবেশে তিন গম্বুজওয়ালা প্রাচীন স্থাপত্যটিকে মনোরম দেখায়। চার শতাধিক বছরের পুরানো বগুড়া শেরপুরের খেরুয়া মসজিদ খেরুয়া মসজিদ প্রত্ননিদর্শন হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোগল-পূর্ব সুলতানি আমলের স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে মোগল স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয়ে এই মসজিদটি নির্মিত। বগুড়া শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে শেরপুর উপজেলা সদরের খোন্দকার টোলা মহল্লায় এর অবস্থান। মসজিদের সামনের দেয়ালে উৎকীর্ণ শিলালিপি থেকে জানা যায়, ১৫৮২ সালে জওহর আলী কাকশালের পুত্র মির্জা মুরাদ খান কাকশাল এটি নির্মাণ করেছিলেন। ‘কাকশাল’ উপাধি ছিল তুর্কিদের। ঘোড়াঘাট অঞ্চল ছিল তুর্কি জায়গিরদারদের অধীন। মির্জা মুরাদ খান কাকশালের বিশদ পরিচয় পাওয়া যায় না। সে সময় শেরপুর ঘোড়াঘাটের অধীনে একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল। মির্জা মুরাদ খান কাকশাল শেরপুরের জায়গিরদার বা ফৌজদার ছিলেন বলে ঐতিহাসিকদের অনুমান। খেরুয়া মসজিদের নামকরণও স্পষ্ট নয়। আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া তাঁর বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ বইতে উল্লেখ করেছেন ‘এ মসজিদের “খেরুয়া” নামের কোনো ইতিবৃত্ত পাওয়া যায়নি। আরবি বা ফার্সি ভাষায় খেরুয়া বলে কোনো শব্দ পাওয়া যায় না।’ তবে ফার্সিতে ‘খায়ের গাহ্’ বলে একটি শব্দ আছে। এর অর্থ ‘কোনো স্থানের ভেতরে’। রাজা মানসিংহ যখন বাংলার সুবাদার, তখন তিনি শেরপুরে একটি দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। এই দুর্গের কোনো অস্তিত্ব এখন নেই। তবে মসজিদটি যদি শেরপুর দুর্গের ভেতরে নির্মিত হয়ে থাকে, তবে ‘খায়ের গাহ্’ থেকে খেরুয়া নাম হতে পারে বলে যাকারিয়া অনুমান করেছেন। খেরুয়া মসজিদ বাইরের দিক থেকে উত্তর-দক্ষিণে লম্বা ১৭.২৭ মিটার, প্রস্থ ৭.৪২ মিটার। পূর্ব দেয়ালে তিনটি খিলান দরজা। মাঝেরটি আকারে বড়। উত্তর-দক্ষিণে একটি করে খিলান দরজা। কোনোটিতেই চৌকাঠ নেই। ফলে দরজার পাল্লা ছিল না। পূর্বের বড় দরজাটির নিচে কালো পাথরের পাটাতন। পূর্বের দরজা বরাবর পশ্চিমের দেয়ালের ভেতরের অংশে তিনটি মেহরাব। মেহরাবগুলোর ওপরের অংশ চমৎকার কারুকাজখচিত। মসজিদটির নিচের অংশে ভূমি পরিকল্পনা মোগল স্থাপত্যরীতির। ওপরের অংশ মোগল-পূর্ব সুলতানিরীতিতে। চার কোণে দেয়াল থেকে খানিকটা সামনে চারটি বিশাল মিনার। ছাদের ওপর তিনটি ৩.৭১ মিটার ব্যাসের অর্ধ গোলাকৃতির গম্বুজ। কার্নিশ ধনুকের মতো বাঁকা। তার তলায় সারিবদ্ধ খিলান আকৃতির প্যানেলের অলংকরণ। অত্যন্ত সুন্দর এর দেয়ালের গাঁথুনি। নান্দনিক বৈচিত্র্য আনা হয়েছে ইটের বিন্যাস ও খাড়া প্যানেল তৈরি করে। সামনের অংশের ইটে আছে ফুল-লতা-পাতা খোদাই করা নকশা। মিনার, গম্বুজ, নকশা ও ইটের বৈচিত্র্যময় গাঁথুনিতে পুরো স্থাপত্যটি অত্যন্ত নান্দনিক হয়ে উঠেছে।
এবার ঈদুল আজহার ছুটিতে বাড়ি গিয়ে এক ফাঁকে খেরুয়া মসজিদে ঘুরে আসা গেল। স্থানীয় বাসিন্দারা জানালেন, গত বছর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটির সীমানাপ্রাচীর তৈরি করে দেওয়ায় পরিবেশটি ভালো আছে। এখনো নিয়মিত নামাজ আদায় হয়। তা ছাড়া দেশের প্রাচীন ঐতিহ্য, ইতিহাস বিষয়ে আগ্রহী অনেকেই আসেন মসজিদটি দেখতে। ছবি তোলার চেষ্টা করা গেল। তবে প্রাচীন এই স্থাপত্যের অনন্য সৌন্দর্য তুলে ধরার মতো দক্ষতা তো নেই, উপরন্তু তেমন ক্যামেরাও ছিল না সঙ্গে। অগত্যা দায় ঠেকানোর যন্ত্রটিতে যে ছবি উঠল, তাতে খেরুয়া মসজিদের কাঠামোরই একাংশ ধরা পড়ল শুধু, স্বরূপে পাওয়া গেল না তাকে। (সৌজন্যে- প্রথম আলো)

খাজা শাহবাজ মসজিদ

| comments

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে তিন নেতার মাজারের পেছনে খয়েরি রঙের বেশ পুরনো একটি মসজিদ ও সমাধিসৌধ রয়েছে। মোগল স্থাপত্যরীতি অনুসরণ করে হাজি খাজা শাহবাজ (র.)-এর নামে এক ব্যবসায়ী ৩০০ বছর আগে এ মসজিদটি নির্মাণ করেন। সুবেদার শাহ আজমের সময় (১৬৭৭-৭৮) খাজা শাহবাজ কাশ্মীর থেকে ঢাকায় এসে ব্যবসা শুরু করেন। অচিরেই তিনি বিপুল ধনসম্পত্তির মালিক হন। মিতব্যয়ী এ ব্যক্তি থাকতেন টঙ্গী। প্রতিদিন হেঁটে যাওয়া-আসা করতেন। তিনি রমনা এলাকায় একটি চিত্তাকর্ষক মসজিদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। ১৬৭৯ সালে তিনি রমনায় তিন গম্বুজবিশিষ্ট এ মসজিদটি নির্মাণ করেন। রমনার পূর্ব দিকে ছিল খাজা শরফুদ্দিন চিশতি (র.)-এর মাজার এবং মাঠের মাঝখানে ছিল ৫০০ বছরের পুরনো কালীমন্দির। এমন স্থানে মসজিদটি নির্মিত হওয়ার পরে এ এলাকার সৌন্দর্য আরো বেড়ে যায়। প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে লোকজন আসত নামাজ পড়তে। খাজা শাহবাজও টঙ্গী যাওয়া-আসার পথে নামাজ পড়তেন এ মসজিদে। ভূমি থেকে তিন ফুট উঁচুতে নির্মিত এ মসজিদটি প্রায় এক বিঘা জমির ওপর অবস্থিত। এর দক্ষিণ ও পূর্ব দিক নিচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা এবং পশ্চিম ও উত্তর প্রান্তটি লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা। মসজিদে প্রবেশের জন্য পাঁচটি আকর্ষণীয় দরজা রয়েছে। এর প্রতি কোণে একটি বড় মিনার ও দুটি ছোট মিনার রয়েছে। মসজিদের ২০ গজ দূরে এক গম্বুজবিশিষ্ট সমাধিসৌধে শায়িত আছেন খাজা শাহবাজ (র.)। মৃত্যুর আগেই তিনি এটি নির্মাণ করেন।

গ্রন্থনা : মাহমুদুল হাসান

বিনত বিবির মসজিদ

| comments

ঢাকা শহর বিশ্বের দরবারে 'মসজিদের শহর' হিসেবে পরিচিত; কিন্তু এ ঐতিহ্য একদিনে গড়ে ওঠেনি। আমরা যদি একটু পেছনে ফিরে তাকাই তাহলেই দেখা যাবে ১৮৩২ সালে ঢাকার তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট জর্জ হেনরী ওয়াল্টার এক রিপোর্টে উল্লেখ করেন যে, তৎকালীন ঢাকায় মসজিদের সংখ্যা ছিল ১৫৩টি। যার সংখ্যা ধীরে ধীরে আরো বাড়তে থাকে এবং ক্রমেই ঢাকা পরিণত হতে থাকে অসংখ্য মসজিদের শহররূপে। বর্তমানে যার সংখ্যা আনুমানিক প্রায় ১০,০০০ ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারণা করা হয়। আর ঢাকার এসব মসজিদের বেশিরভাগই পুরান ঢাকায় অবস্থিত। ঢাকার সবচেয়ে পুরনো মসজিদ যা পুরান ঢাকার ৬নং নারিন্দা রোডে অবস্থিত। এটি পুরান ঢাকা তথা ঢাকার সবচেয়ে পুরনো স্থাপত্য নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি; যা আজ থেকে প্রায় ৬০০ বছর আগের। ১৪৫৬ খ্রিস্টাব্দে অর্থাৎ ইসলাম খাঁর আগমনের প্রায় দেড়শ বছর আগে বাংলার সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদের আমলে এ মসজিদটি নির্মিত হয়। তখন পারস্য উপসাগরের আশপাশের অধিবাসীরা প্রায়ই জলপথে এখানে বাণিজ্য করতে আসতেন। তখন পুরান ঢাকার এ অঞ্চলটির (নারিন্দা-ধোলাই খাল) ওপর দিয়ে বয়ে যেতো বুড়িগঙ্গার একটি শাখা যা বুড়িগঙ্গা হয়ে শীতলক্ষ্যায় গিয়ে মিশত। আরাকান আলী নামক এক সওদাগর তৎকালীন বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এ এলাকায় আসেন এবং বসবাস শুরু করেন। সওদাগরদের এ সময় নামাজ পড়তে অসুবিধা হতো বিধায় আরাকান আলী এখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন।

এখানে বসবাসকালীন আরাকান আলীর মেয়ে বিনত বিবির আকস্মিক মৃত্যু ঘটে। তাকে মসজিদের পাশেই সমাধিস্থ করা হয়। এর ঠিক ছয় মাস পরই আরাকান আলী মৃত্যুবরণ করেন এবং তার শেষ ইচ্ছা অনুসারে তাকে বিনত বিবির কবরের পাশে সমাধিস্থ করা হয়। পরবর্তীতে বিনত বিবির নামে এ মসজিদটির নামকরণ করা হয়। মসজিদটির দেয়ালে একটি কালো পাথরে এখনো ফার্সি ভাষায় পুরো ইতিহাসটির বর্ণনা করা আছে। হিজরি ৮৬১-তে নারিন্দা রোডস্থ এ মসজিদটির প্রথম সংস্করণ করা হয়। পরবর্তীতে ৮৬৬ হিজরিতে বিনত বিবি ও আরাকান আলীর সমাধিস্থলে বিনত বিবির মাজারটি স্থাপন করা হয়। বাংলা ১৩৩৭ সালে মসজিদটির দ্বিতীয় সংস্করণ করা হয় এবং দ্বিতীয় গুম্বুজটি স্থাপন করা হয়। প্রায় ২০০ বছর ধরে এলাকাবাসী একটি কমিটি গঠন করে এ মসজিদটির দেখাশোনা করে আসছেন। এছাড়াও এলাকাবাসী মসজিদটি বড় করে নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন যার জন্য এক/দেড় বছর আগে মিউনিসিপ্যালিটি প্রায় আড়াই কাঠা জায়গা প্রদান করে। বর্তমানে মসজিদটির মোট জায়গার পরিমাণ ৬-৭ কাঠা প্রায়। এছাড়াও এলাকাবাসীর উদ্যোগে এখানে একটি মেসও পরিচালিত হচ্ছে যার উপার্জিত অর্থ মসজিদ তহবিলে জমা করা হয়। বিনত বিবির মসজিদ এরকম একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শন যেখানে ইউরোপ, আমেরিকা থেকে বিভিন্ন পর্যটক এসে ভিড় জমায়; কিন্তু সেখানে আমরা ক'জনই বা জানি এর কথা।

মসজিদে নববী, মদিনা

| comments

পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর এবং শান্তিময় শহর মদিনা যা 'মদিনা আল মনোয়ারা' নামে সুপরিচিত। মনোয়ারা শব্দটির শাব্দিক অর্থ সুখী, সমৃদ্ধ, উজ্জ্বল, জ্যোর্তিময়, রৌদ্রোজ্জ্বল ইত্যাদি। বাস্তাবিক অর্থে মদিনা এক সমৃদ্ধনগরী, যা ধারণ করে আছে ইসলাম ধর্মের প্রাচীনতম তিনটি মসজিদ। মসজিদ আল নববী, কুবা মসজিদ এবং মসজিদ আল কিবলাতইন। অন্যদিকে এ শহর ধন্য হয়েছে মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র সমাধিকে বুকে ধারণ করে। মূলত এ সমাধিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে 'মসজিদ আল নববী' বা 'নবীর মসজিদ'।
মসজিদ আল নববীর যাত্রা শুরু হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র হাত ধরে। ৬২২ সালে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পর নিজ বাসস্থানের পাশেই মহানবী (সা.) তাঁর পবিত্র হাতে এই মসজিদ গড়ার কাজে অংশ নেন। খেজুর গাছের কাণ্ড আর মাটির দেয়াল ঘেরা এ মসজিদের তিনটি দরজা ছিল। যা যথাক্রমে রহমতের দরজা, জিবরাইল (আ.)-এর দরজা এবং মহিলাদের দরজা নামে পরিচিত ছিল। গবেষণায় জানা যায়, পরবর্তীকালে পৃথিবীতে যত মসজিদ গড়ে উঠেছে, তা মূলত 'মসজিদ আল নববীকে অনুসরণ করেছে।

মসজিদ আল নববীর বর্তমান অবয়বের পেছনে রয়েছে বহু ঘটনা, দুর্ঘটনা, যুদ্ধ, অবরোধ, ত্যাগ, তিতিক্ষা প্রভৃতি। প্রতিষ্ঠাকালীন আয়তন থেকে মসজিদের বর্তমান আয়তন প্রায় ১০০ গুণ বেশি। যেখানে একসঙ্গে প্রায় ৬ লাখ মুসলি্ল নামাজ আদায় করতে পারে। তবে হজ মৌসুমে মসজিদ ও পারিপাশ্বর্িক এলাকায় ১০ লাখ মুসলমান একত্রে নামাজ আদায় করতে পারে। এ মসজিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো একটি সবুজ গম্বুজ। এ গম্বুজটির নিচেই হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয়তমা স্ত্রী হজরত আয়েশা (রা.)-এর ঘর ছিল বলে অনেক ঐতিহাসিক ধারণা করেন। কালের পরিক্রমায় এ মসজিদের আয়তন বাড়তে থাকে। যার উল্লেখযোগ্য দিক ছিল কারুকার্যময় সুদৃশ্য গম্বুজ। এসব গম্বুজের কোথাও কোথাও অলংকারও লাগানো হতো। পরবর্তীতে ওহাবি আন্দোলনের সময় এসব গম্বুজ ধ্বংস করা হয়। বর্তমানে মসজিদ আল নববীতে বিভিন্ন ধরনের ২৭টি গম্বুজ রয়েছে। মসজিদের একটি অংশ দ্বিতল বিশিষ্ট। ৩৪৪ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট ১০টি মিনার মসজিদের সৌন্দর্যকে বাড়তি মাত্রা দিয়েছে। বর্তমানে মসজিদের একটি অংশে রয়েছে হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর রওজা শরিফ। এই রওজা শরিফে আরও রয়েছে তাঁর প্রিয় দুই সাহাবি হজরত আবু বকর (রা.) এবং হজরত উমর (রা.)-এর পবিত্র কবর। রওজা মোবারকের পাশেই রয়েছে 'রিয়াল আল জান্নাহ্' বা 'বেহেশতের বাগান' নামে পরিচিত একটি অংশ। এই অংশের রং এবং সাজসজ্জা মসজিদের অন্য এলাকা থেকে পৃথক। এই অংশে ছোট ছোট কিছু পিলারও দৃশ্যমান। মসজিদের বাইরে বিরাট অংশ ছাতা ও তাঁবু দিয়ে আবৃত করার ব্যবস্থা রয়েছে। শান্তিময় ও স্নিগ্ধ পরিবেশের কারণে মসজিদ আল নববীর আবেদন চির অম্লান।

*মেজর নাসির উদ্দিন আহমেদ (অব:)

মসজিদ আল কিবলাতাইন, মদিনা

| comments

'কিবলা' আরবি শব্দ। যার দ্বারা যে দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করা হয় বা প্রার্থনা করা হয়, সেই দিক নির্দেশ করা হয়ে থাকে। 'কিবলাতাইন' শব্দটি দ্বারা দুটি কিবলা বোঝানো হয়। একই মসজিদে একই নামাজে প্রথমে জেরুজালেম এবং পরে মক্কার দিকে কিবলা পরিবর্তন করার কারণে মদিনা নগরের মসজিদ আল কিবলাতাইন বা দুই কিবলার মসজিদ ঐতিহাসিক গুরুত্ব লাভ করেছে। হজরত মোহাম্মদ (সা.) ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ২৩ সেপ্টেম্বর মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করেন। হিজরতের দ্বিতীয় বছরে আরবি রজব মাসের মাঝামাঝি সময়ে কিবলা পরিবর্তনের এ ঘটনা ঘটে। গবেষকদের মতে, ওই দিন হজরত মোহাম্মদ (সা.) এই মসজিদে জোহর (মতান্তরে আসর) নামাজ আদায় করছিলেন। দুই রাকাত নামাজ আদায়ের পর হজরত জিব্রাইল (আ.) জেরুজালেম নগরীর পরিবর্তে মক্কা নগরী অর্থাৎ পবিত্র কাবামুখী হয়ে নামাজ আদায়ের জন্য আল্লাহর নির্দেশ পেঁৗছে দেন। হজরত মোহাম্মদ (সা.) মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশপ্রাপ্ত হয়ে সঙ্গে সঙ্গে কিবলা পরিবর্তন করে কাবামুখী হয়ে অবশিষ্ট দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। মসজিদে উপস্থিত সাহাবাগণও একইভাবে হজরত মোহাম্মদ (সা.)-কে অনুসরণ করে জেরুজালেম ছেড়ে কাবামুখী হয়ে নামাজ আদায় করেন। ফলে এই দিনে একই মসজিদে একই নামাজে দুটি কিবলামুখী হয়ে নামাজ আদায় করা হয়। এ ঘটনার পর থেকেই এ মসজিদটি 'মসজিদ আল কিবলাতাইন' বা দুই কিবলার মসজিদ নামে পরিচিতি লাভ করে; যার বর্ণনা পবিত্র কোরআনের দ্বিতীয় পারার ১৪৪ নম্বর আয়াতে উল্লেখ আছে। মসজিদ আল কিবলাতাইন পৃথিবীর প্রাচীনতম মসজিদগুলোর অন্যতম। দীর্ঘদিন এই মসজিদে দুটি মিহরাব বা ইমাম দাঁড়ানোর স্থান ছিল। যার একটি জেরুজালেমমুখী, অন্যটি ছিল কাবাঘরমুখী। পরবর্তীতে মসজিদটি ব্যাপক সংস্কার করা হয় এবং কেবল কাবামুখী মিহরাবটি রাখা হয়। মসজিদ আল কিবলাতাইন বছরজুড়ে দেশ-বিদেশের মুসলমানদের আগমনে মুখরিত থাকে। হজের সময় এই ভিড় আরও বেড়ে যায়। ইহুদিরা সাধারণত কিবলা হিসেবে জেরুজালেমের দিকে মুখ করে প্রার্থনা করে। মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কাবার দিকে কিবলা পরিবর্তন করে মুসলমানদের স্বাতন্ত্র্য দান করেছেন। এ ছাড়াও নামাজরত অবস্থায় মহান আল্লাহর আদেশে কিবলা পরিবর্তন করে হজরত মোহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর সাহাবাগণ আনুগত্যের এক অনন্য নজির স্থাপন করেন। তাই ইসলামের ইতিহাসে মসজিদ আল কিবলাতাইনের আবেদন চির ভাস্বর। মদিনায় আগমনকারী দেশ-বিদেশের সব মুসলমান হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর স্মৃতিবিজড়িত এই মসজিদটি দর্শন করে এক অনন্য প্রশান্তি অনুভব করে থাকেন।  

বায়তুল মুকাদ্দাস, মক্কা, সৌদি আরব

| comments

অলৌকিক ঘটনা, নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ, যুদ্ধ, শান্তিচুক্তি, দখল, পাল্টা দখল, অগি্নসংযোগ এবং ভূমিকম্পের মতো ঘটন-অঘটনের নীরব সাক্ষী হয়ে পৃথিবীর বুকে এক বিস্ময় সৃষ্টি করেছে 'মসজিদ আল আকসা'। 'আকসা' শব্দটি দিয়ে দূরবর্তী কিছুকে বুঝানো হয়। ধারণা করা হয়, ইসলামের তীর্থভূমি মক্কা থেকে পশ্চিম দিকে জান্নাত সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানে এই মসজিদ নির্মিত হয় বলে মসজিদের নামকরণ করা হয় 'মসজিদ আল আকসা'। মসজিদটির অপর নাম 'বায়তুল মুকাদ্দাস।' মসজিদটি প্রকৃতপক্ষে আল কুদস্ নামক স্থানে অবস্থিত, যা বর্তমানে জেরুজালেম নামে অধিক পরিচিত। এ মসজিদের নির্মাণ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। একদল ইতিহাসবিদ মনে করেন আল আকসা মসজিদ মূলত হজরত আদম (আ.)-এর মাধ্যমেই তৈরি হয়, যা পরবর্তী নবীগণ পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার করেন। মক্কা নগরীতে মসজিদ আল হারাম নির্মাণের ৪০ বছর পর আল আকসা মসজিদ নির্মিত হয় বলে বোখারী (৩৩ ও ৬৬) এবং মুসলিম (৫২০) শরিফে উল্লেখ রয়েছে। তবে অধিকাংশের মতে, হজরত ইব্রাহিম (আ.) এই মসজিদ বর্তমান অবস্থানে নির্মাণ করেন। তার কনিষ্ঠ পুত্র হজরত ইসহাক (আ.) এই মসজিদেই ইবাদত করতেন এবং পরবর্তীতে হজের উদ্দেশে মক্কা গমন করেন। হজরত ইসহাক (আ.)-এর দ্বিতীয় পুত্র হজরত জাকারিয়া এই মসজিদ সম্প্রসারণ করেন। তবে আল আকসা মসজিদের গুরুত্ব ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায় শবেমেরাজের পর। পবিত্র কোরআন শরিফের বর্ণনা মতে, শবেমেরাজের রাতে হজরত মোহাম্মদ (সা.) মক্কা থেকে প্রথমে আল আকসা মসজিদে আসেন। এ মসজিদে তখন সব নবী-রাসূলগণ সমবেত ছিলেন। (হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর ইমামতিতে সমবেত সব পয়গম্বর আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেন। এরপর পাথর নির্মিত গম্বুজে দাঁড়িয়ে বোরাক নামক বিশেষ বাহনে চড়ে হজরত জিব্রাইল (আ.)কে সঙ্গে নিয়ে হজরত মোহাম্মদ (সা.) মহান আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে ঊধর্্বমুখে উড্ডয়ন করেন। আল আকসা মসজিদের গুরুত্বের আরও একটি বড় কারণ হলো প্রথম থেকে হিজরত পরবর্তী ১৭ মাস পর্যন্ত মুসলমানরা আল আকসা মসজিদের দিকে মুখ করে প্রার্থনা করতেন বা নামাজ আদায় করতেন। পরবর্তীতে মহান আল্লাহর নির্দেশে মুসলমানদের কেবলা মক্কার দিকে পরিবর্তিত হয়। মুসলমানদের দ্বারা মক্কা বিজয়ের পর আল আকসা মসজিদের উন্নয়নে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ৭৪৬ সাল এবং ১০৩৩ সালে ভূমিকম্পের কারণে মসজিদটি দুইবার ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ১০৯৯ সাল থেকে পরবর্তী প্রায় ১০০ বছর মুসলমান, ইহুদি এবং খ্রিস্টানদের মাঝে ধর্মযুদ্ধের করণে মসজিদটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ইহুদি ধর্ম মতে, তাদের ধর্মীয় পয়গম্বর ডেভিদ; যিনি ইসলাম ধর্মে হজরত দাউদ (আ.) নামে পরিচিত। এ মসজিদ প্রাঙ্গণে ইহুদিদের গুরুত্বপূর্ণ উপাসনালয় স্থাপন করেছিলেন। এ উপাসনালয়ের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারের নামে মসজিদ প্রাঙ্গণে খননের ফলে মূল আল আকসা মসজিদটি হুমকির সম্মুখীন হয়। এ ছাড়া ১৯৬৯ সালের ২১ আগস্ট এক রহস্যজনক অগি্নকাণ্ডের ফলে আল আকসা মসজিদের দক্ষিণাংশ পুড়ে যায়। বর্তমানে মসজিদ প্রাঙ্গণটি ১৫,৫০,০০০ স্কয়ার ফুট এলাকার উপর অবস্থিত। শুধু মসজিদের আয়তন ৩,৮০,০০০ স্কয়ার ফুট। মসজিদটিতে ২টি বড় এবং ১০টি ছোট গম্বুজ রয়েছে। এ মসজিদ নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ে স্বর্ণ, সিসা বা লিড এবং মার্বেলসহ বিভিন্ন প্রকার পাথর ব্যবহৃত হয়। জেরুজালেম এলাকাটি বর্তমানে ইহুদিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তবে মসজিদ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছেন নির্বাচিত একদল নিবেদিতপ্রাণ এবং অকুতোভয় মুসলমান।




--মেজর (অব.) নাসির উদ্দিন আহমেদ

মসজিদ আল-হারাম, মক্কা, সৌদি আরব

| comments


মহান আল্লাহর উদ্দেশে ইবাদত করার জন্য পৃথিবীর প্রথম উপাসনালয় হলো 'কাবা শরিফ' যা নির্মাণ করেছিলেন পৃথিবীর প্রথম মানব হজরত আদম (আ.) এই কাবা ঘরকে ঘিরেই গড়ে ওঠেছে মসজিদ আল-হারাম পরবর্তী সময়ে ধ্বংস এবং বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব ২১৩০ সালে হজরত ইব্রাহিম (আ.) কর্তৃক কাবাঘর পুনর্নির্মিত হয় বলে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত আছে। তবে হজরত ইব্রাহিম (আ.) নির্মিত কাবাঘরের অংশ হিসেবে এখন কেবল হজরে আসোয়াদ বা 'কালো পাথর'-এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। এ পাথরটি বেহেস্ত থেকে একজন ফেরেস্তা নিকটবর্তী আবু কুইবা পাহাড়ে নিয়ে আসেন। প্রথমে এ পাথর ছিল দুধের মতো সাদা। পরবর্তীতে আদম সন্তানের পাপ শুষে নিতে নিতে তা কালো বর্ণ ধারণ করে। এ কালো পাথর ছাড়া মসজিদ আল-হারামের বাকি সবকিছু পরবর্তীকালে নির্মিত। হজরত মোহাম্মদ (সা.) মক্কা বিজয়ের পর কাবাগৃহ তথা মসজিদ আল-হারাম পুনর্নির্মাণের ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ৬৯২ সাল, ১৫৭০ সাল, ১৬২১ সাল এবং ১৬২৯ সালেও এই মসজিদের ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়। তবে মসজিদ আল-হারামের বর্তমান আধুনিক রূপান্তর ঘটতে শুরু করে ১৯৫৫ সাল থেকে যা আজও অব্যাহত রয়েছে। ধারাবাহিক উন্নয়ন এ কাজের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রতিদিন ২০ লাখ মুসলি্লর নামাজ আদায় ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত মসজিদ আল-হারামকে ২০১০ সালের মুসলমানের ব্যবহার উপযোগী করে তোলা হয়। বর্তমানে প্রতিদিন ৯ লাখ মুসলমান এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন। তবে পবিত্র হজ পালনকালে মসজিদ আল-হারাম এবং এর পারিপাশ্বির্ক এলাকায় ৪০ লাখ মুসলি্ল নামাজ আদায় করতে পারেন। এ মসজিদে মোট ৯টি মিনার রয়েছে। মিনারগুলো প্রায় ২৯২ ফুট উঁচু। মসজিদ আল-হারামের মধ্যস্থলে রয়েছে কাবাঘর। কাবাঘরের উচ্চতা ৪৩ ফুট এবং দুই দিকে এই ঘর যথাক্রমে ৩৬.২ ফুট এবং ৪২.২ ফুট বিস্তৃত। এ পবিত্র ঘরটি নিকটতম পাহাড়ের কালো গ্রানাইড পাথর দিয়ে নির্মিত। রমজান মাস শুরুর ৩০ দিন আগে কাবাঘর খোলা হয় এবং ধৌত করা হয়। পৃথিবীর মানুষ এই কাবাঘরের দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করে। পবিত্র হজের সময় এই কাবাঘরকে সাতবার প্রদক্ষিণ করতে হয়। ৬০৫ সালে হজরত মোহাম্মদ (সা.) এ কাবাঘরের কোণায় হজরে আসোয়াদ স্থাপন করেন। এক সময় কিছুটা দূরে থাকলেও বর্তমানে মকাম-ই-ইব্রাহিম, জমজম কূপ এবং সাফা-মারওয়া মসজিদ আল-হারাম চত্বরেই অংশ হয়ে রয়েছে। আয়তন, জনসমাবেশ ব্যবস্থাপনা, স্থাপত্য নিদর্শন সর্বোপরি ধর্মীয় বিবেচনায় মসজিদ আল-হারাম পৃথিবীতে মহান আল্লাহ তায়ালার কুদরতি নিদর্শন।
**মেজর (অব.) নাসির উদ্দিন আহমেদ

উমাইয়া মসজিদ, দামেস্ক

| comments

সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের প্রাচীন অংশ কারবালা পরবর্তী করুণ উপাখ্যানের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে উমাইয়া মসজিদ। দামেস্কের কেন্দ্রীয় মসজিদ বা বড় মসজিদ নামেও এ মসজিদের সুখ্যাতি রয়েছে। শিয়া সম্প্রদায়ের কাছে এ মসজিদ পৃথিবীর চতুর্থ পবিত্রতম মসজিদ। কারণ কারবালা যুদ্ধের পর হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর পরিবারের সদস্য এবং তার প্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসেন (রা.)কে এ মসজিদের গেটে এবং পরবর্তীতে মসজিদের একটি অংশে বন্দী করে রাখা হয়। এ মসজিদেই তৎকালীন শাসক ইয়াজিদ বিচারের নামে প্রহসন পরিচালনা করে। হজরত হোসেন (রা.)কে হত্যার পর এ মসজিদের দেয়ালে একটি অংশ তার পবিত্র মস্তক মোবারক আর বর্তমানে ধাতব গ্রিল দেওয়া অংশে রাখা হয়েছিল অন্যদের মস্তক। তাই মুসলমান সম্প্রদায় বিশেষত শিয়াদের কাছে এ মসজিদের সম্পর্ক অত্যন্ত আবেগময়। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের কাছেও এ মসজিদের আবেদন ভিন্ন মাত্রার। খ্রিস্টান ধর্মমতে তাদের বাপিস্ট ধর্মযাজক যিনি ইসলাম ধর্মে হযরত ইয়াহিয়া (আ.) নামে পরিচিত; এ স্থানে একটি উপাসনালয় স্থাপন করেছিলেন। খ্রিস্টান সম্প্রদায় আরও মনে করে এ মসজিদেই রয়েছে অতি পবিত্র একটি অংশ, যেখানে কেয়ামতের আগে তাদের ধর্মপিতা যিশু (ইসলাম ধর্ম মতে হজরত ঈসা (আ.) স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে পুনরায় আবির্ভূত হবেন)। আলাদাভাবে চিহ্নিত মসজিদের একটি অংশকে এ আবির্ভাব বা অবতরণের স্থান বলে অনেকেই ধারণা করে থাকেন। ৬৩৪ সালে ষষ্ঠ উমাইয়া শাসক খালেদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে আরবরা দামেস্ক জয় করে। মূলত এরপর থেকেই এ মসজিদকে মুসলিম বিশ্বের প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার প্রয়াস চলতে থাকে। একই সঙ্গে চলতে থাকে মসজিদের সংস্কার এবং পরিবর্ধন। মূলত ৭১৫ সালে একটি পূর্ণাঙ্গ মসজিদ হিসেবে উমাইয়া মসজিদ ব্যাপক খ্যাতি লাভ করে। এ সময় মসজিদের নির্মাণ বাবদ মতান্তরে ছয় থেকে দশ লাখ সিরীয় দিনার ব্যয় হয়। তৎকালীন পারস্য, ভারতবর্ষ, গ্রিক এবং মক্কার প্রায় ১২ হাজার শ্রমিক দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর পরিশ্রম করে ৭১৫ সালে মসজিদের মূল নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে। অপরদিকে মসজিদ ধ্বংসের জন্য ১০৬৯ সাল থেকে ১৮৯৩ সালের মধ্যে মোট ছয় বার মসজিদে অগি্নসংযোগ করা হয়। এ ছাড়াও ১৭৫৯ সালের ভূমিকম্পে মসজিদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এক সময় অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি লাইব্রেরি জন্য মসজিদটির ব্যাপক সুনাম ছিল। তবে পরবর্তীতে উপনিবেশ শাসনকালে লাইব্রেরির স্থানান্তর করা হয়, যার বিরাট অংশ বর্তমানে জার্মানিতে রয়েছে বলে জানা যায়। তবে দামেস্কের ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে এসব মূল্যবান বইয়ের কিছু অংশ আজও সংরক্ষিত আছে। বর্তমানে মসজিদ এলাকার দৈর্ঘ্য ৪৪৬ ফুট এবং প্রস্থ ১২১ ফুট। মূল মসজিদটি (৩৯৮৯৭) প্রায় ৩১,০০০ বর্গফুট এলাকার ওপর অবস্থিত। মসজিদের কেন্দ্রে রয়েছে প্রায় ১৮৮ ফুট উঁচু একটি গম্বুজ। মূলত এ গম্বুজটি ছিল কাঠের তৈরি। ১৮৯৩ সালে এক অগি্নকাণ্ডে কাঠের গম্বুজটি পুড়ে গেলে পরবর্তীতে পাথর দিয়ে বর্তমান গম্বুজ নির্মাণ করা হয়। যার সর্বোচ্চ অংশ প্রায় ১১৮ ফুট উঁচু। এ ছাড়াও মসজিদের রয়েছে ৩টি সুউচ্চ মিনার যা সর্বোচ্চটির উচ্চতা ২৫৩ ফুট উঁচু। এই মিনার বেয়েই খ্রিস্টানদের পিতা যিশু (ইসলাম ধর্ম মতে হজরত ঈসা (আ.) কেয়ামতের আগে পৃথিবীতে অবতরণ করবেন বলে অনেকের ধারণা)। ইতিহাসের অনন্য এক সাক্ষী হয়ে আছে সিরিয়ার দামেস্কে অবস্থিত উমাইয়া মসজিদ। এ মসজিদকে ঘিরে বহু সংঘাত ঘটেছে। অতি সাম্প্রতিক সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদের বিরুদ্ধে যে বিপ্লব অনুষ্ঠিত হচ্ছে, আরও সূত্রপাত এ মসজিদ প্রাঙ্গণে ২০১১ সালে ১৫ মার্চ তারিখ। কেয়ামতের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত এ মসজিদের প্রতি মুসলমান এবং খ্রিস্টানদের তীব্র আকর্ষণ থাকবে।

--মেজর (অব.) নাসির উদ্দিন আহমেদ

কুবা মসজিদ

| comments

৬২২ সালে পবিত্র মদিনা নগরে হিজরতের পর প্রথম যে মসজিদ নির্মিত হয়, তার নাম কুবা মসজিদ। মক্কা থেকে হজরত মোহাম্মদ (সা.) ৩২০ কিলোমিটার উত্তরে মদিনা নগরীতে হিজরত করেন। মক্কা থেকে ইসলামের শত্রুদের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালানোর সময় তার সঙ্গে ছিলেন হজরত আবু বকর (রা.)। পরবর্তীতে হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর পূর্ব ঘোষিত নির্দেশ মোতাবেক তার নিকটাত্দীয় এবং সাহাবারা পর্যায়ক্রমে মদিনা গমন করেন। সাধারণভাবে হিজরতকারীদের মজাহেরি বা মুজাহিদ বলা হতো। এই মুজাহিদদের হাতেই গড়ে ওঠে কুবা মসজিদ। হজরত মোহাম্মদ (সা.) নিজ হাতে মসজিদটির নির্মাণকাজ শুরু করেন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। মূলত তারই তত্ত্বাবধানে মসজিদের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। হজরত মোহাম্মদ (সা.) প্রায় ২০ রাত এই মসজিদে অবস্থান করেন এবং কসর নামাজ আদায় করেন। হজরত মোহাম্মদ (সা.) কর্তৃক ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু হওয়ার পর পৃথিবীর বুকে নির্মিত প্রথম মসজিদ হলো এই কুবা মসজিদ।
বিংশ শতকে আবদুল ওয়াহেদ আল ওয়াকিলের নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিশন সৌদি আরবের পুরনো সব মসজিদ পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ শুরু করে। এ সময় মূল কুবা মসজিদ এতই দুর্বল হয়ে পড়ে, তা ভেঙে পুনর্নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে কুবা মসজিদ চত্বরে মূল মসজিদ ছাড়াও আবাসিক এলাকা, অফিস, অজুখানা, দোকান ও লাইব্রেরি রয়েছে।

তবে মসজিদের মূল আকর্ষণ ছয়টি। বিশাল গম্বুজ এবং চার কোণায় চারটি সুউচ্চ মিনার। মসজিদে মহিলাদের নামাজের জন্য পৃথক ব্যবস্থা রয়েছে। মদিনাবাসীর সরলতা এবং মদিনার পবিত্রতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে ১৯৮৬ সালে মসজিদটির পুনর্নির্মাণকালে ব্যাপকভাবে সাদা ব্যাসল্ট পাথর ব্যবহার করা হয়। চতুর্দিকের সুবজ পাম গাছের বলয় মসজিদটিকে বাড়তি সৌন্দর্য প্রদান করেছে।

পবিত্র কোরআনের সুরা আল তওবার ১০৮ নং আয়াতে এই মসজিদের কথা উলি্লখিত আছে। একাধিক সূত্র এবং হাদিস থেকে জানা যায়, হজরত মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন, "নিজ আবাস্থল বা বাসা থেকে অজু করে কেউ যদি এই মসজিদে আসে এবং দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করে তবে সে একটি ওমরাহ আদায়ের সওয়াব লাভ করবে।" উল্লেখ্য, মদিনায় অবস্থানকালে হজরত মোহাম্মদ (সা.) প্রায়ই বিশেষত শনিবারে উটে চড়ে বা হেঁটে এই মসজিদে আসতেন এবং দুই রাকাত নামাজ আদায় করতেন।

পবিত্র হজ ও ওমরাহ পালনকালে এই মসজিদে নফল নামাজ আদায়ে সচেষ্ট থাকেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা।

আওকরা মসজিদ, দিনাজপুর

| comments

খানসামার মির্জার মাঠে অবস্থিত আড়াইশ বছরের পুরনো স্থাপত্য 'আওকরা মসজিদ'। তৎকালীন মির্জা সাহেব মসজিদটি প্রতিষ্ঠার সময় কি নাম রেখেছেন তাও কেউ বলতে পারে না। কোনো মানুষ মসজিদটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এটির মধ্যবর্তী অংশে দাঁড়িয়ে কথা বললে এক সময় জোরে প্রতিধ্বনির সৃষ্টি হতো। তাই শুনে তারা ভাবত মসজিদটি তাদের কথার উত্তর দিচ্ছে। এ থেকে মসজিদটির নাম হয়ে যায় আওকরা মসজিদ অর্থাৎ কথা বলা মসজিদ।
এখনো মানুষ পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শব্দ করে কথা বলে প্রতিধ্বনি শোনার আশায়। কিন্তু মসজিদের দেয়াল ফেটে গিয়ে নষ্ট হওয়ায় এবং এর গায়ে আগাছা পরিপূর্ণ হওয়ায় আগের মতো আর আওয়াজ হয় না।

মসজিদটি অযত্ন-অবহেলায় দীর্ঘকাল সংস্কারের অভাবে ধীরে ধীরে বিলীনের পথে। অথচ এটিকে সংস্কার করলে এটাও পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারে। উপজেলা পরিসংখ্যানের তথ্যে পাওয়া গেছে, ওই মসজিদটি প্রায় আড়াইশ বছর আগে বাংলা ১১৭২ সালে মির্জা লাল বেগ মুসলিম সম্প্রদায়ের নামাজ আদায়ের লক্ষ্যে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। চিকন ইটে নির্মিত দেয়ালে নকশা করা মসজিদটি উপজেলার মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া বেলান নদীর পূর্ব ধারে মির্জার মাঠ নামক স্থানে অবস্থিত। ওই এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিরা ধারণা করেন এক সময় মসজিদটির আশপাশে মুসলিম জনবসতি ছিল। যে কারণে এখানে ঐতিহাসিক মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল এবং ব্রিটিশ সরকারের আমলে অথবা অন্য কোনো কারণে তারা মসজিদটির আশপাশ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। ফলে এটি অযত্ন-অবহেলায় পরিত্যক্ত অবস্থায় দীর্ঘকাল পড়ে থাকে। পরবর্তীতে সংস্কারের অভাবে ধীরে ধীরে ধ্বংস হতে থাকে মসজিদটি।

তবে মির্জা লাল বেগের ওই মসজিদকে ঘিরে মির্জার মাঠে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। যা পরে সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এ ছাড়াও একই স্থানে এলাকাবাসীর উদ্যোগে মির্জার মাঠ আওকরা মসজিদ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় নামে আরও একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়। ওই এলাকার একাধিক প্রবীণের সঙ্গে আলোচনা করেও মসজিদটিতে সর্বশেষ কত সালে নামাজ আদায় হয়েছে, তা তারা জানেন না। এলাকাবাসী দাবি করেন, এ অবস্থায়ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কিংবা সরকারি কোনো পদক্ষেপ নিয়ে মসজিদটির সংস্কার করা হলে, এটি পর্যর্টনকেন্দ্র হিসেবে হতে পারে দেশের অন্যতম দর্শনীয় স্থান।

*রিয়াজুল ইসলাম, দিনাজপুর

স্বস্তিপুর মসজিদ, ঝিনাইদহ

| comments

কুষ্টিয়া জেলা শহর থেকে ঝিনাইদহগামী সড়ক ধরে প্রায় ১১ কিলোমিটার এগিয়ে স্বস্তিপুর গ্রামে পৌঁছলাম। সামান্য হাঁটতেই স্বস্তিপুর শাহী মসজিদ। তিন গম্বুজবিশিষ্ট এ মসজিদটি যে মোগল যুগের, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এটি যে একটি পুরনো মসজিদ, তারও অনেক প্রমাণ রয়েছে। এর দেয়ালের পুরুত্ব ০.৯১ মিটার এবং পিলারসহ তা ১.০১ মিটার। এটি একটি ছোট মসজিদ এবং তাতে মাত্র এক সারি মানুষ দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে পারেন। এখন অবশ্য মসজিদের পূর্ব দেয়াল সংলগ্ন বড় একটি বারান্দা যুক্ত করে আয়তন বাড়ানো হয়েছে। মসজিদটিতে যথেষ্ট সংস্কার কাজ হয়েছে। একজন মুসলি্লর কাছে জানা গেল, মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে বর্তমানে যে তিনটি মেহরাব দেখা যাচ্ছে তার মধ্যে কেন্দ্রীয়টি শুধু আদি মেহরাব, অন্য দুটি পরে নির্মিত হয়েছে। তবে এ কথার সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। কারণ মোগল আমলের ৩ গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদগুলোর সাধারণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে পূর্ব দেয়ালে ৩টি প্রবেশপথ ও পশ্চিম দেয়ালে ৩টি মেহরাব দেখা যায়। কিন্তু এমন মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে একটি মাত্র মেহরাব থাকার ব্যাপারটা খুব স্বাভাবিক নয়।
মসজিদের দেয়ালের গায়ে উত্তর ও দক্ষিণ দিকে ২টি করে মোট ৪টি জানালা এবং প্রতি পাশে দুটি জানালার মাঝখানে এটি করে কুলুঙ্গি আছে। মুসলি্লদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এ জানালা ও কুলুঙ্গি সবই দেয়াল কেটে হাল আমলে বানানো হয়েছে। মসজিদের ৪ কোণে ৪টি মিনার ছিল, যা এখন ধ্বংস হয়ে গেছে। আর পূর্ব দেয়ালের প্রবেশপথগুলোও সংস্কারের সময় দেয়াল কেটে বড় করা হয়েছে। আগেকার প্রবেশপথগুলো এতই ছোট ছিল যে, তা দিয়ে কুঁজো না হয়ে ঢোকা যেত না। তবে মসজিদটির পূর্ব দেয়ালে যে ৩টি প্রবেশপথ রয়েছে, তা পত্রাকার খিলান আকৃতির এবং আধুনিক প্রবেশপথের চেয়ে পুরোপুরি আলাদা। কাজেই দেয়াল কেটে প্রবেশপথ বড় করার ব্যাপারটা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া কঠিন বলে মনে হলো।
'কুষ্টিয়ার ইতিহাস' প্রণেতা শ ম শওকত আলীর মতে, মূল মসজিদে একটি বড় মসজিদের পাশে ৪টি ছোট গম্বুজ ছিল। বাংলাদেশ জেলা গেজেটিয়ার কুষ্টিয়া (১৯৯১, পৃ. ৩৯৪) থেকে জানা যায়, কুষ্টিয়ার আলামপুর ইউনিয়নের স্বস্তিপুর গ্রামে নবাব শায়েস্তা খানের আমলে এ মসজিদটি নির্মাণ সম্পর্কে জনপ্রবাদ আছে। আদি মসজিদটি আকারে ছোট ছিল। সেটি ধ্বংস হয়ে গেলে নতুন করে মসজিদটি নির্মিত হয়েছে। এসব বক্তব্যের সর্বাংশে সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়েও বলা যায়, বর্তমান মসজিদটিও মোগল আদলকে কিছুটা হলেও ধরে রেখেছে।

শোলাকিয়া ঈদগা, কিশোরগঞ্জ

| comments

কিশোরগঞ্জ শহরের পূর্বপাশে নরসুন্দা নদের তীরে ছয় একর জায়গাজুড়ে শোলাকিয়া ময়দান। মাঠটিকে ঘিরে আছে বেশ কিছু বয়স্ক জলকড়ই। প্রায় দেড় লাখ মুসলি্ল এখানে স্বচ্ছন্দে নামাজ পড়তে পারেন। শোনা যায়, সোয়া লাখ থেকে শোলাকিয়া শব্দটি এসেছে। কিশোরগঞ্জের হয়বতনগর জমিদার বাড়ির লোকজন ময়দানটি প্রতিষ্ঠা করেন। জানা গেছে, ১৯২৮ সালে এখানে প্রথম ঈদের জামাত হয়। বর্তমানে মাঠের পশ্চিম দিকে দ্বিতল মিম্বরটি সংস্কার করা হয়েছে, সাউন্ড সিস্টেম উন্নত করা হয়েছে, অজুখানাও নতুনভাবে নির্মিত হয়েছে। ঢাকার মহাখালী থেকে অনন্যা ক্লাসিক ও সায়েদাবাদ থেকে হাওড় বিলাস, যাতায়াতসহ অনেক পরিবহনের বাস কিশোরগঞ্জ যায়। সময় লাগে সাড়ে ৩ ঘণ্টা। ভাড়া ১২০-১৩০ টাকা।
লেখা: শফিক আদনান

বড় মসজিদ, সুনামগঞ্জ

| comments

প্রায় ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৩৩১ বাংলা সনে মসজিদটি নির্মাণ করেন মহাজন ইয়াসীন মির্জা। বলা হয়, ১০ বছর ধরে এর নির্মাণকাজ চলে। প্রধান মিস্ত্রিকে কলকাতা থেকে নিয়ে এসেছিলেন ইয়াসীন মীর্জা। মসজিদের অভ্যন্তর সাজানো হয়েছে ইতালি থেকে আনা মার্বেল পাথরে। সুনামগঞ্জবাসীর কাছে তিন গম্বুজবিশিষ্ট এ মসজিদটির নাম পাগলার বড় মসজিদ। ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে সুনামগঞ্জগামী শ্যামলী, মামুনসহ আরো কিছু পরিবহনের বাসে ছয় ঘণ্টায় পাগলা পেঁৗছানো যায়। ভাড়া ৩৫০ টাকা।
লেখা ও ছবি: শামস শামীম

ছোট সোনামসজিদ চাঁপাইনবাবগঞ্জ

| comments

সুলতানি আমলের অনন্য স্থাপনা ছোট সোনামসজিদ। ১৪৯৩ থেকে ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে এটি নির্মিত হয়। এ মসজিদে চৌচালা ঘরের চালের মতো তিনটি গম্বুজ এবং চার সারিতে তিনটি করে আরো ১২টি গোলাকৃতি গম্বুজ। গম্বুজের তলদেশ ফুল, ফল ও লতাপাতার নকশা। মসজিদের উত্তর-পশ্চিম কোণে মহিলাদের নামাজ পড়ার আলাদা জায়গা। কারুকার্যখচিত মিহরাব আছে একটি। মসজিদের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা যথাক্রমে ৮২, ৫২ ও ২০ ফুট। ইটের ইমারত হলেও এর বহির্গাত্র পাথর দিয়ে ঘেরা। মসজিদগাত্রের লতাপাতার কারুকাজও পাথরে খোদাই করা। একে গৌড়ের বড় সোনামসজিদের সঙ্গে তুলনা করে ছোট সোনামসজিদ বলা হয়। ঢাকার কল্যাণপুর থেকে হানিফ, মডার্নসহ আরো কিছু পরিবহনের বাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও শিবগঞ্জ যাওয়া যায়। সময় লাগে সাত ঘণ্টা, ভাড়া ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা। তারপর লোকাল বাসে ছোট সোনামসজিদ যেতে আরো এক ঘণ্টা লাগবে।
লেখা : শহীদুল হুদা অলক

আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ চট্টগ্রাম

| comments (1)

চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা নামটির সঙ্গে মোগলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের কাহিনী জড়িত আছে। এই কিল্লায় ছিল মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের আস্তানা। ১৬৬৬ সালের ২৭ জানুয়ারি শায়েস্তা খাঁর ছেলে উমেদ খাঁ অন্দরে প্রবেশ করেন। তখন থেকে চাটগছার কিল্লাটি আন্দরকিল্লা নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। চট্টগ্রাম বিজয়ের স্মৃতি ধরে রাখতে সম্রাট আওরঙ্গজেবের নির্দেশে শায়েস্তা খাঁ ১৬৬৭ সালে এখানে আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ নির্মাণ করেন। ১৭২৩ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামের অন্য শাসনকর্তা নবাব ইয়াসিন খাঁ জামে মসজিদের কাছাকাছি পাহাড়ের দক্ষিণ-পূর্ব দিকের একটি টিলার ওপর আরেকটি পাকা মসজিদ নির্মাণ করে ভেতরের একটি কক্ষে মহানবী (সা.)-এর পাথরে খোদিত পদচিহ্ন 'কদমমোবারক' স্থাপন করেন। মুসলি্লরা তখন এই মসজিদে ভিড় করতে থাকে। একপর্যায়ে জামে মসজিদ জনশূন্য হয়ে যায়। ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দ থেকে মসজিদটিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি গোলাবারুদ রাখার গুদাম হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে। ১৮৫৫ সালে ঐতিহাসিক হামিদুল্লাহ খাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মুসলমানরা মসজিদটি ফেরত পান। চট্টগ্রাম নিউমার্কেট থেকে রিকশায় আন্দরকিল্লা যেতে ভাড়া লাগে ১০-১৫ টাকা।
লেখা ও ছবি : প্রবীর বড়ুয়া

কুসুম্বা মসজিদ নওগাঁ

| comments

কুসুম্বা দীঘির পশ্চিম পাড়ে পাথরের ধূসর বর্ণের এই মসজিদ। কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের শিলালিপি থেকে জানা যায়, সুলতান গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহের শাসনামলে (১৫৫৪-৬০) সালে সুলায়মান মসজিদটি নির্মাণ করেন। গৌড়ীয় স্থাপত্যরীতিতে মসজিদটি নির্মিত। দৈর্র্ঘ্যে ৫৮ ফুট, প্রস্থে ৪২ ফুট। দুই সারিতে ছয়টি গোলাকার গম্বুজ। মসজিদের গায়ে লতাপাতার নকশা। অভ্যন্তরে কালো পাথরের তিনটি মিহরাব। মিহরাবে আঙুরগুচ্ছ ও লতার নকশা খোদিত। মসজিদের ছাদ চালা ঘরের মতো ঈষৎ ঢালু। নওগাঁর বালুডাংগা বাসস্ট্যান্ড থেকে কুসুম্বা মসজিদ ৩৮ কিলোমিটার। বাস ভাড়া ২৫ টাকা। সময় লাগে দেড় ঘণ্টা।
লেখা : ফরিদুল করিম ছবি : ফিরোজ চৌধুরী

ছুটি খাঁ জামে মসজিদ, চট্টগ্রাম

| comments

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের সবচেয়ে প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন ঐতিহাসিক ছুটি খাঁ জামে মসজিদ। ঢাকা-চট্টগ্রাম পুরনো মহাসড়কের পশ্চিম পাশে উপজেলার জোরারগঞ্জ বাজারের আধাকিলোমিটার উত্তরে ছুটি খাঁ দীঘির পূর্ব পাড়ে এ মসজিদের অবস্থান।

এ মসজিদের ইতিহাস সম্বন্ধে জানা যায়, গৌড়ের সুলতান হোসেন শাহের আমলে পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে উত্তর চট্টগ্রামের শাসনকর্তা ছিলেন লস্কর পরাগল খাঁ ও পরবর্তীতে তার ছেলে ছুটি খাঁ। পরাগল খাঁর পিতা রাস্তি খাঁ ও গৌড়ের শাসনকর্তা রুকুনুদ্দীন বারবাক শাহের শাসনামলে চট্টগ্রামের শাসনকর্তা ছিলেন। পরাগল খাঁ ও ছুটি খাঁ'র শাসনামলে চট্টগ্রামের শাসন কেন্দ্র ছিল পরাগলপুর। এ সময় এখানে বেশ কিছু দিঘি ও কয়েকটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ছুটি খাঁ মসজিদের মূল মসজিদটি বহুদিন আগে ভেঙে পড়েছে। পরবর্তীতে একটি মসজিদ নতুনভাবে নির্মিত হয়েছে। যেখানে মূল মসজিদের বেশকিছু ছোট-বড় পাথর ও শিলালিপি দেখতে পাওয়া যায়। পুরনো মসজিদের কিছু ধ্বংসাবশেষ প্রত্নতাত্তি্বক নিদর্শন হিসাবে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করেছে বলে জানা যায়। পাথরগুলো ভারতের রাজস্থান বা অন্যান্য প্রদেশ থেকে আনা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। কৃষ্ণবর্ণের নানা ডিজাইন ও সাইজের পাথরগুলো মসজিদ প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এখনো। স্থানীয়রা জানান, ছুটি খাঁ দিঘির অভ্যন্তরে ও মসজিদের ভেতরে একাধিক শিলালিপি রয়েছে। তার মধ্যে একটি শিলালিপিতে পবিত্র কোরআন শরিফের আয়াতুল কুরসি লিখা আছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ছুটি খাঁ মসজিদ লিপি খোদিত পাথরের ব্লক দিয়ে নির্মিত ছিল। সেগুলো ইতস্তত পড়ে আছে বর্তমান মসজিদের আঙিনায়। কিন্তু সবগুলোতেই দেখা গেছে তোগরা হরফে কোরআনের নানা আয়াত ও আরবি দোয়া। তবে ঐতিহাসিক মূল্যবিশিষ্ট কোনো লিপি পাওয়া যায়নি। ছুটি খাঁ কর্তৃক এ মসজিদ স্থাপন করা হয় ১৫১৫ খ্রিস্টাব্দে।

তবে মসজিদটির নির্মাতা পরাগল খাঁ নাকি ছুটি খাঁ, তার কোনো লিখিত সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই। নির্মাতা যেই হোন, এ মসজিদটি অদ্যাবধি পাঁচশ বছর ধরে এ অঞ্চলের কীর্তিমান শাসক, পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরা ও আরাকানী অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াকু সৈনিক ছুটি খাঁ'র স্মৃতি হিসেবে টিকে আছে। প্রতি শুক্রবার ও ঈদের নামাজে এ মসজিদে নামাজ পড়তে হাজার হাজার মুসলি্লর সমাগম ঘটে। আশপাশ এলাকা ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ছুটে আসেন এ মসজিদে ইবাদত বন্দেগীর জন্য। বর্তমানে এ মসজিদে জুমা ও ঈদের নামাজ পরিচালনা করেন করেরহাট আলিয়া মাদ্রাসার সিনিয়র শিক্ষক মাওলানা নূরুল আলম তৌহিদী। জুমা ও ঈদের নামাজ ছাড়া প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ইমামতি ও মসজিদের খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মাওলানা রুহুল আমিন। মসজিদের পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করছেন যথাক্রমে সিরাজ-উদ-দৌলা চৌধুরী নয়ন ও আলহাজ নজরুল ইসলাম চৌধুরী।

মসজিদ কমিটির সম্পাদক নজরুল ইসলাম চৌধুরী জানান, ঐতিহাসিক এ মসজিদের প্রাচীন নিদর্শনগুলো সংরক্ষণের জন্য সরকারিভাবে কখনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আগামী প্রজন্মের জন্য যতটুকু সম্ভব স্থানীয় মসজিদ কমিটি তা সংরক্ষণের চেষ্টা করছে। তাই প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ হিসাবে এ মসজিদটির ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন এলাকার বিজ্ঞ মহল।

রিগান উদ্দিন

কৃষ্ণ মেননের মসজিদ

| comments

এমনই এক দৃষ্টান্ত, যেখানে অমুসলিম আর মুসলিমের মধ্যে দাঙ্গা-হাঙ্গামা বেঁধেই আছে সেখানে এ দৃষ্টান্তের প্রতি সবারই সেল্যুট দেওয়া দরকার। তিনি উপমহাদেশের চিরবৈরী দুই সম্প্রদায়ের ঐক্যের জন্য নিজে হিন্দু হয়েও মুসলমানদের জন্য নির্মাণ করেন মসজিদ। এর আগে এমন দৃষ্টান্ত তার এলাকায়ই স্থাপিত হয়েছিল প্রায় ১২শ বছর আগে। খ্যাতিমান এ ব্যক্তির নাম চেরিল কৃষ্ণ মেনন, যিনি ২০০৬ সালে 'প্রবাসী ভারতীয় সম্মান' এবং ২০০৯ সালে 'পদ্মশ্রী' খেতাব পেয়েছিলেন। তিনি এটি তৈরি করছেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপনের জন্য। এর আগে অষ্টম শতাব্দীতে চেরা শাসক রাম বর্মা কুলাশাখরা কেরালাতে 'চেরামন মসজিদ' নামে প্রথম ও একমাত্র মসজিদ তৈরি করেছিলেন। প্রস্তাবিত মসজিদটি স্থাপিত হবে ভারতের কেরালার কালকুট নামক স্থানে। আগামী দুই তিন মাসের মধ্যেই এটি তৈরি হয়ে যাবে। এখানে একসঙ্গে ৪০০ মুসলি্ল নামাজ আদায় করতে পারবেন। কৃষ্ণ মেনন বলেন, তিনি এই মসজিদ তৈরি করার জন্য বিভিন্ন বিখ্যাত ও ধর্মীয় ব্যক্তিদের সমর্থন পেয়েছেন। তিনি আরও বলেন, 'ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়। তাই আমাদের সবার উচিত প্রতিটি ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধা রাখা এবং প্রতিটি ধর্ম বিস্তারে সহযোগিতা করা।' এছাড়া তিনি ভগবৎ গীতা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে একটি গবেষণা কেন্দ্র তৈরিতে জড়িত রয়েছেন। কেরালায় একটি গির্জা নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে তার। এসব কাজের জন্য ১০০ কোটি রুপি ব্যয় করবেন বলে তিনি জানান। যুগে যুগে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দূর করার জন্য ও মানুষে মানুষে বিভেদ ভেঙে ফেলার জন্য নানা গুণীজন নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। চেরিল কৃষ্ণ মেননও এর ব্যতিক্রম নন। তিনি একজন হিন্দু হয়েও মুসলমানদের জন্য মসজিদ নির্মাণ করে হিন্দু-মুসলিমের মধ্যকার বিভেদ ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা দূর করতে চান।

-রকমারি

দেশের অন্যতম ক্ষুদ্রতম মসজিদ

| comments

এতো ছোট মসজিদ পৃথিবীতে আছে নাকি তা জানা নেই। ছোট হলেও একটা মাপ থাকে কিন্তু এ কেমন মাপ? দৈর্ঘ্যে প্রস্থে এতোই ছোট যে, মাত্র তিনজন মানুষ এক সাথে নামাজ পড়তে পারবে এই মসজিদে। অবিশ্বাস্য হলেও এটিই সত্যি।
আজ থেকে প্রায় তিনশ সাড়ে তিনশ বছর আগের ঘটনার। এমন একটি মসজিদ তৈরি হবে যার আকৃতি হবে অনেক ছোট। মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ সেখানে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে পারবে এমন ভাবেই নির্মান করা হবে একটি মসজিদ। জানালা থাকবে না, দরজা থাকবে তবে ছোট আকৃতির। এক গুম্বুজ বিশিষ্ট হবে, ভিতরে একটি মিনার থাকবে হয়তো এমনই নির্দেশনায় তৈরি এই ক্ষুদ্রাকৃতির মসজিদটি।

বগুড়ার সান্তাহার এক আজব জায়গায় পরিনত হয়েছে। এখান থেকে উঠে আসলো অন্ধগাছী, ক্ষুদ্রতম মানুষ আব্দুল হাকিম, অদ্ভূত বাগান গড়ার মানুষ এস এম জুয়েল, লাইটার সংগ্রহক সোহেল রানা সহ আরো অনেকে অনেক কিছু নিয়ে। এবার আবার সেই বগুড়ার জেলার প্রাচীনতম শহর সান্তাহার। সেই সান্তাহার থেকে ৩ কিলো ভেতরে একটি গ্রাম; গ্রামের নাম তারাপুর। তারাসুন্দরী নামের একটি মহিলার নামানুসারেই এই গ্রামের নাম করন করা হয়। তবে তারা সুন্দরী কে বা তিনি কিভাবে এই গ্রামে আসলো তা জানা যায়নি। তারাপুর গ্রামের দক্ষিন পাড়ায় এখনো কালের সাক্ষী হয়ে আছে সেই মসজিদ যেই মসজিদটি হয়তো বাংলাদেশের অন্যতম ছোট মসজিদ।

সকাল সকাল আমরা বের হলাম তারাপুর গ্রামের উদ্দ্যেগে। আঁকাবাঁকা রাস্তা, রাস্তার দুই ধারে প্রচুর গাছ। গ্রামে ঢুকতেই কেমন জানি মনটা ভরে গেলো। মাটির বাড়ি সাড়ি সাড়ি একতলা, দুইতলা বাড়ি। বেশ কয়েকটা বাড়ি পেরিয়ে পৌছে গেলাম একটা প্রাইমেরী স্কুলে। সেখানে সবাইকে এই মসজিদের কথা বলতে আমাদের এর ঠিকানা বলে দিলো। শুরু হলো মাটির রাস্তার। গ্রামের যে এতো সৌন্দর্য তা তারাপুর গ্রাম দেখলেই বোঝা যাবে না। আমরা কয়েক মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেলাম আমাদের লক্ষ্য স্থান সেই ক্ষুদ্র মসজিদের কাছে।

শুনসান জায়গা। আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর আগে এখানে নামাজ পড়া হতো। দেড়শ বছরের অধিক সময় ধরে এই মসজিদে নামাজ পড়া বন্ধ হয়ে আছে। কে বা কারা, কেন এই মসজিদ নির্মান করেছে এ নিয়ে বর্তমান গ্রামবাসীর মধ্যে অনেক মত বিরোধ আছে। আমরা সবারই কথার গুরুত্ব দেই সেখানে যেহেতু এই মসজিদের কোন ইতিহাস নেই সেহেতু এই মসজিদটির যে দুই চারটে কথিত ইতিহাস আছে হয়তো এর মাঝেই একটি ইতিহাস আছে যেটি সত্য। তাই আমরা আশে পাশে থাকা বয়স্ক, যুবক, তরুন সব ধরনের লোকজনদের কাছে থেকেই মসজিদ সম্পর্কে জানতে চাই।

মসজিদটি সম্পর্কে ওই গ্রামের যুবক আজমুল হুদা রিপন জানায়, তারা ছোট বেলা থেকে দেখে এসেছে এই মসজিদ এই ভাবে, এই অবস্থায় থাকে। কেউ কেউ এখানে মান্নতও করে। তবে তার দাদা তাদের কাছে গল্প করেছে। দাদার, দাদার আমলে এখানে নামাজ পড়া হতো আর এখানে নামাজ পড়তো একজন মুসলামান। সম্ভবত তার নাম শিতন। গ্রামবাসী তাকে ও তার পরিবারকে একঘরে করে দেবার কারনে সেখানে তিনি নিজে নিজে মসজিদ স্থাপন করে এবং একা একা নামাজ পড়া শুরু করেন। এই শিতনেরই নামাজ পড়ার জন্য এই মসজিদ নির্মান করা।

গ্রামবাসীর মধ্যে আরো একজন বয়স্ক মানুষ আব্দুর রাজ্জাক আমাদের জানালেন, ঘটনা ঠিকই আছে তবে একটু প্যাচ আছে এর মধ্যে। আমার দাদারা গল্প করতে তারাপুরে আজ থেকে তিনশ সাড়ে তিনশ বছর আগে তেমন কোন মসজিদ ছিলো না। জমিদার অধ্যষিত এলাকা হবার কারনে এখানে জমিদারে কয়েকজন মুসলমান পেয়াদা কাজ করার জন্য বেশ কিছু দিনে জন্য স্থায়ী হন। আর তারা তাদের নামাজ পড়ার জন্য স্বল্প পরিসরে একটি মসজিদ স্থাপন করে যেখানে হাতে গোনা এক সাথে দুই তিন জন নামাজ পড়তে পারবে। জমিদারে পেয়াদাদের নামাজ পড়ার ব্যাপারে এই মসজিদ নির্মিত বলে এটি জমিদারের বিশেষ ব্যবস্থায় নির্মান করা হয়। আর তার জন্য এইটি দেখতে রাজকীয় একটি পুরানর্কীতির মতো।

গ্রামের আরো একজন তরুন আরিফুল ইসলাম জনি বললেন, সান্তাহারের ছাতিয়ান গ্রাম ইউনিয়নের রানী ভবানীর বাবার বাড়ি। আর সান্তাহারের আশপাশসহ আমাদের তারাপুরও রানী ভবানীর বাবার রাজ্যত্ব ছিলো। তারই অংশ হিসাবে রানী ভবানীর আসা যাওয়া ছিলো এই গ্রামে। একজন মুসলমান মহিলা এই গ্রামে ছিলো গ্রামে যিনি পরহেজগারী। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা হবার কারনে ওই মহিলার নামাজপাড়ার অনেক অসুবিধা হতো। রানী ভবানী এমন কথা জানতে পেরে তিনি নিজেই এই গ্রামে চলে আসে আর সেই মহিলাকে যেন কেউ তার নামাজ পড়াতে অসুবিধা না করতে পারে তারই জন্য তার পেয়াদাদের হুমুক দেয় তার জন্য রাজকীয় নকশায় একটি মসজিদ তৈরি করে দেওয়া হোক। এই ভাবেই এই মসজিদটি নির্মান করা হয়। তবে এটাও তার দাদার মুখ থেকে শোনা। তার দাদা আবার শুনেছে তার দাদার কাছে।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের মধ্যে এই মসজিদ সম্পর্কে একটি ভ্রান্ত ধারনা আছে। আমরা যখন এই মসজিদের ইতিহাস সংগ্রহ নিয়ে কাজ করছিলাম তখন রাসেল নামের একটি ছোট ছেলে আমাদের জানালেন এখানে কয়েকটি জ্বীনকে বোতলে তুলে এই ছোট মসজিদে আটকে রেখেছে হুজুর তাই তারা এই মসজিদের আশে পাশে আসে না। এটা তাদের বাবা-মা তাদের বলেছে আরো বলেছে এই মসজিদের কাছে আসলে সেই জ্বীনগুলো তাদেরও ধরবে।

ইতিহাস যেটাই হোক না কেন? আমাদের জানতে হবে মসজিদটির সম্পর্কে। ওটি যে একটি মসজিদ আর ওখানে যে নামাজ পড়া হতো তা নিয়ে কারো মনে সন্দেহ নেই। শুধু প্রয়োজন এর সত্যিকার ইতিহাস।

এক পর্যায়ে আমরা এই মসজিদটি মেপে দেখি। লম্বায় এই মসজিদের উচ্চতা ১৫ ফুট আর প্রস্থ ৮ ফুট, দৈর্ঘ্য ৮ ফুট। মসজিদের দরজার উচ্চতা ৪ ফুট আর চওড়া দেড় ফুট। একটি মানুষ অনায়াসে সেখানে ঢুকতে বা বের হতে পারবে। একটি গুম্বুজ আছে যেটা অনেকটাই উচুতে। আর দেওয়ালের পুরুত্ব দেড় ফুট। এছাড়া দেওয়ালটি ইটের তৈরি। তবে যে ইটগুলো মসজিদের দেওয়ালে ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলোর সবটার অর্ধেক ভাঙ্গা (এই ইটকে গ্রামে অধলা ইট বলে)। মসজিদের দরজায় দুইটি রাজকীয় নিদের্শনার আদলে নির্মিত খিলান আছে। মুসলিম স্থাপত্যের নিদর্শন সম্বলিত মিনার, দরজার খিলান এবং মেহরাবই মসজিদটির প্রাচীন ঐতিহ্যের স্বাক্ষী হয়ে আছে।

আসলে এটি এতো পুরানো আর সংস্করনের অভাবে এটির যে অবস্থা এতে এই মসজিদের ব্যাপারে মসজিদটি দেখার পরও তেমন ভাবে বিশেষ চি‎‎হ্ন বা নিদের্শনা চোখে পড়ে না। এমন একটি আজব নিদর্শন আমাদের সংরক্ষন করা এখনই দরকার কারন এই ধরনের রেকর্ড গড়ার মতো একটি নিদর্শন আমাদের দেশকে এনে দিতে পারে সম্মান আর সেই সাথে রেকর্ডের পাল্লাও ভারী হতে পারে এই ক্ষুদ্রাকৃতির মসজিদটির কারনে।

সাজেদুর সজিব
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. ইসলামী কথা - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Premium Blogger Template