السلام عليكم

যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার (তওবা) করবে আল্লাহ তাকে সব বিপদ থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেবেন। [আবূ দাঊদ: ১৫২০; ইবন মাজা: ৩৮১৯]
Showing posts with label শিয়া. Show all posts
Showing posts with label শিয়া. Show all posts

কারবালার কাহিনী

| comments

১০ই মুহাররম বা আশুরার দিন বিভিন্ন কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন। কিন্তু সেই বিভিন্ন কারণ বাদ দিয়ে যে উপলক্ষ্যে আমরা ছুটি কাটাই তা হল কারবালার ঘটনা। শেষ নবী ও রসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাতি ইমাম হুসাইন ইবনে আলী (রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু) এদিন কারবালাতে মুসলিম নামধারী কিছু মুনাফিকের হাতে শহীদ হন। তিনি অত্যন্ত সৎ, সজ্জন এবং সাহসী সাহাবা ছিলেন। রসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মত তিনিও আমাদের খুব প্রিয় একজন নেতা। কিন্তু ইসলামের অন্যান্য অনেক বিষয়ের মত তার মৃত্যু সম্পর্কে সত্য ইতিহাসটা আমরা জানি না, জানার চেষ্টাও করি না।

আসলে কি হয়েছিল


৬০ হিজরির ঘটনা। ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়াকে খলিফা নিযুক্ত করেন তার বাবা মু’আবিয়া (রা:) কিন্তু এটা ইসলামের মর্মের চেয়ে রাজতান্ত্রিক ধারায় বেশী প্রভাবিত ছিল। তাই তার হাতে বায়াত করেননি হুসাইন (রা:) ইরাকের লোকেরা এ খবর পেয়ে তার কাছে চিঠি/দূত পাঠিয়ে জানাল তারা তাকে খলিফা হিসেবে চায়, ইয়াজিদকে নয়। সমর্থকদের চিঠি পেয়ে হুসাইন (রা:) তাঁর চাচাতো ভাই মুসলিম বিন আকীলকে কুফায় পাঠালেন অবস্থা দেখার জন্য। মুসলিম দেখলেন যে আসলেই অনেক মানুষ হুসাইনকে (রা:) কে খলিফা হিসেবে চাচ্ছে। তিনি হুসাইন (রা:) কে সেটা জানিয়েও দিলেন। ইতমধ্যে কিছু অত্যুৎসাহী লোকেরা হানী বিন উরওয়ার ঘরে মুসলিমের হাতে হুসাইনের পক্ষে বায়াত নেওয়া শুরু করল। সিরিয়াতে ইয়াজিদের কাছে এ খবর পৌছালে সে বসরার গভর্নর উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদকে পাঠাল কুফাবাসীর বিদ্রোহ দমন করতে।

উবাইদুল্লাহ কুফায় গিয়ে দেখে ঘটনা সত্যি। মুসলিম বিন আকীল চার হাজার সমর্থক নিয়ে উবাইদুল্লাহ বিন জিয়াদের প্রাসাদ ঘেরাও করলেন। এ সময় উবাইদুল্লাহ দাঁড়িয়ে এক ভাষণ দিয়ে মানুষকে ইয়াজিদের সেনা বাহিনীর ভয় দেখাল। কুফাবাসীরা ইয়াজিদের শাস্তির ভয়ে আস্তে আস্তে সরে পড়তে লাগল। সূর্য অস্ত যাওয়ার পর মুসলিম বিন আকীল দেখলেন, তথাকথিত হুসাইন সমর্থকদের কেউই অবশিষ্ট নেই। তাকে গ্রেপ্তার করে হত্যার আদেশ দিল উবাইদুল্লাহ। মুসলিম মৃত্যুর আগে হুসাইনের কাছে একটি চিঠি পাঠান –

“হুসাইন! পরিবার-পরিজন নিয়ে ফেরত যাও। কুফা বাসীদের ধোঁকায় পড়ো না। কেননা তারা তোমার সাথে মিথ্যা বলেছে। আমার সাথেও তারা সত্য বলেনি।”

এদিকে মুসলিম বিন আকীলের মৃত্যু হলেও তার প্রথম চিঠির উপর ভিত্তি করে যুলহিজ্জা মাসের ৮ তারিখে হুসাইন (রা:) মক্কা থেকে কুফার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। অনেক সাহাবী তাকে বের হতে নিষেধ করেছিলেন। তাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর,আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর, আব্দুল্লাহ বিন আমর এবং তাঁর ভাই মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফীয়ার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

সুফীয়ান আস সাওরী ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে সহীহ সূত্রে বর্ণনা করেন যে, ইবনে আব্বাস (রা:) হুসাইনকে বলেছিলেন: মানুষের দোষারোপের ভয় না থাকলে আমি তোমার ঘাড়ে ধরে বিরত রাখতাম। আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা:) হুসাইনকে বলেন: হুসাইন! কোথায় যাও? এমন লোকদের কাছে,যারা তোমার পিতাকে হত্যা করেছে এবং তোমার ভাইকে আঘাত করেছে?

যাত্রা পথে হুসাইনের কাছে মুসলিমের সেই চিঠি এসে পৌঁছল। চিঠি পড়ে তিনি কুফার পথ পরিহার করে ইয়াজিদের কাছে যাওয়ার জন্য সিরিয়ার পথে অগ্রসর হতে থাকলেন। পথিমধ্যে ইয়াজিদের সৈন্যরা আমর বিন সাদ, সীমার বিন যুল জাওশান এবং হুসাইন বিন তামীমের নেতৃত্বে কারবালার প্রান্তরে হুসাইনের (রা:) গতিরোধ করল। তিনি আগত সৈন্যদলকে আল্লাহর দোহাই এবং নিজের মর্যাদার কথা উল্লেখ করে তিনটি প্রস্তাব দেন –

১. তাকে ইয়াজিদের দরবারে যেতে দেয়া হোক। তিনি সেখানে গিয়ে ইয়াজিদের হাতে বায়াত গ্রহণ করবেন। কেননা তিনি জানতেন যে, ইয়াজিদ তাঁকে হত্যা করতে চান না।

২. অথবা তাঁকে মদিনায় ফেরত যেতে দেয়া হোক।

৩. অথবা তাঁকে কোন ইসলামী অঞ্চলের সীমান্তের দিকে চলে যেতে দেয়া হোক। সেখানে তিনি জিহাদ করবেন এবং ইসলামী রাজ্যের সীমানা পাহারা দেবেন।

ইয়াজিদের সৈন্যরা উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদের ফয়সালা ছাড়া কোন প্রস্তাবই মানতে রাজী হল না। এ কথা শুনে উবাইদুল্লাহর এক সেনাপতি হুর বিন ইয়াজিদ বললেন: এরা তোমাদের কাছে যেই প্রস্তাব পেশ করছে তা কি তোমরা মানবে না? আল্লাহর কসম! তুর্কী এবং দায়লামের লোকেরাও যদি তোমাদের কাছে এই প্রার্থনাটি করত, তাহলে তা ফেরত দেয়া তোমাদের জন্য বৈধ হত না। এরপরও তারা খুব যৌক্তিক এই প্রস্তাবগুলো মেনে নেয়নি। সেই সেনাপতি ঘোড়া নিয়ে সেখান থেকে চলে আসলেন হুসাইন (রা:) ও তাঁর সাথীদের সালাম দিয়ে উবাইদুল্লাহ এর সৈনিকদের সাথে হুসাইনের পক্ষে যুদ্ধ করে নিহত হলেন।

সৈন্য সংখ্যার দিক থেকে হুসাইনের সাথী ও ইয়াজিদের সৈনিকদের মধ্যে বিশাল পার্থক্য ছিল। হুসাইনের (রা:) এর সাথে ছিলেন –

১. আলী ইবনে আবু তালিবের (রা:) এর ছেলেরা - আবু বকর, মুহাম্মাদ, উসমান, জাফর এবং আব্বাস।

২. হুসাইনের (রা:) নিজের সন্তানেরা - আবু বকর, উমর, উসমান, আলী আকবার এবং আব্দুল্লাহ।

৩. হাসানের (রা:) এর ছেলেদের মধ্যে থেকে আবু বকর, উমর, আব্দুল্লাহ এবং কাসেম।

৪. আকীলের সন্তানদের মধ্যে হতে জাফর, আব্দুর রাহমান এবং আব্দুল্লাহ বিন মুসলিম বিন আকীল।

৫. আব্দুল্লাহ বিন জাফরের সন্তানদের মধ্যে হতে আউন এবং আব্দুল্লাহ।

সাহাবা এবং তাবেঈদের এই ছোট্ট দলটির সবাই বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে নিহত হন। অবশেষে হুসাইন (রা:) ছাড়া আর কেউ জীবিত রইলেন না। সীমার বিন যুল জাওশান নামের এক নরপশু বর্শা দিয়ে হুসাইনের (রা:) শরীরে আঘাত করে ধরাশায়ী করে ফেলল। শেষে ইয়াজিদ বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণে নির্ভীক এই বীর আল্লাহর লিখে রাখা ভাগ্যানুযায়ী শহীদ হলেন। হুসাইন (রা:) অন্যায় কিছু বলেন নি, অন্যায় কিছু করেন নি। তার হত্যাকারী ও হত্যায় সাহায্যকারীদের আল্লাহর ক্রোধ ঘেরাও করুক, এরা ধ্বংস হোক! আল্লাহ্‌ তায়ালা শহীদ হুসাইন (রা:) এবং তাঁর সাথীদেরকে আল্লাহ তায়ালা স্বীয় রহমত ও সন্তুষ্টি দ্বারা আচ্ছাদিত করুন।

এ ঘটনা মুসলিম জাতির ইতিহাসের একটি লজ্জাজনক অধ্যায় যা বিশ্বাসঘাতক কুফাবাসী আমাদের উপহার দিয়েছে। এরপরে তারা এতে রঙ মাখিয়ে গল্প বানিয়েছে - পাথর উল্টালে রক্ত বের হওয়া, সূর্যগ্রহণ, আকাশের দিগন্ত লাল হওয়া, আকাশ থেকে পাথর পড়া ইত্যাদি। আল্লাহ যদি চাইতেন তিনি এইসব আজগুবি ঘটনা না ঘটিয়েই হুসাইন (রা:) ও তার সঙ্গীদের রক্ষা করতে পারতেন।

হুসাইন (রা:) এর হত্যাকারী কে?


শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইম্যিয়া (র:) বলেন: সকল মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকের ঐকমতে ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়া হুসাইনকে (রা:) হত্যার আদেশ দেয়নি। বরং উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদকে ইরাকে হুসাইনকে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে বাঁধা দিতে বলেছিল। এতটুকুই ছিল তার ভূমিকা। বিশুদ্ধ মতে তার কাছে যখন হুসাইন (রা:) নিহত হওয়ার খবর পৌঁছলে সে আফসোস করেছিল। সে হুসাইন (রা:) পরিবারের কোন মহিলাকে বন্দী বা দাসীতে পরিণত করেনি; বরং পরিবারের জীবিত সকল সদস্যকে সসম্মানে মদিনায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিল।

ইবনে আবী নু’ম হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন: আমি একদা আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের নিকট উপস্থিত ছিলাম। তখন একজন লোক তাঁকে মশা মারার বিধান জানতে চাইল। তিনি তখন লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন: তুমি কোন দেশের লোক? সে বলল: ইরাকের। ইবনে উমর (রা:) তখন উপস্থিত লোকদেরকে লক্ষ্য করে বললেন: তোমরা এই লোকটির প্রতি লক্ষ্য কর। সে আমাকে মশা মারার হুকুম জিজ্ঞেস করছে, অথচ তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাতিকে হত্যা করেছে। আর আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, এরা দুজন (হাসান ও হুসাইন) আমার দুনিয়ার দুটি ফুল। (বুখারী, হাদীছ নং- ৫৯৯৪)

হুসাইন (রা:) নিহত হওয়ার পূর্বে ইরাকবাসীদের বলেন:

তোমরা কি চিঠির মাধ্যমে আমাকে এখানে আসতে আহবান করো নি? আমাকে সাহায্য করার ওয়াদা করো নি? অকল্যাণ হোক তোমাদের! যেই অস্ত্র দিয়ে আমরা ও তোমরা মিলে ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি এখন সেই অস্ত্র তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে চালাতে যাচ্ছ? মাছি যেমন উড়ে যায় তেমনি তোমরা আমার পক্ষে কৃত বায়াত থেকে সড়ে যাচ্ছ, সকল ওয়াদা-অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছ। ধ্বংস হোক এই উম্মতের তাগুতের দলেরা!


তিনি তাঁর পূর্বের সমর্থকদের বিরুদ্ধে একটি বদদু’আও করেন:

হে আল্লাহ! আপনি যদি তাদের হায়াত দীর্ঘ করেন, তাহলে তাদের দলের মাঝে বিভক্তি সৃষ্টি করে দিন। তাদেরকে দলে দলে বিচ্ছিন্ন করে দিন। তাদের শাসকদেরকে তাদের উপর কখনই সন্তুষ্ট করবেন না। তারা আমাদেরকে সাহায্য করবে বলে ডেকে এনেছে। অতঃপর আমাদেরকে হত্যা করার জন্য উদ্যত হয়েছে।

হুসাইনের (রা:) এই দু’আ প্রমাণ করে যে, ইয়াজিদ প্রত্যক্ষভাবে হুসাইনের (রা:) হত্যায় জড়িত ছিল না। কেননা তিনি দু’আয় বলেছেন: হে আল্লাহ! আপনি তাদের শাসকদেরকে তাদের উপর কখনই সন্তুষ্ট করবেন না। এ থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, ইরাকবাসী শিয়ারা উমাইয়া শাসকদের সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় হুসাইনের (রা:) সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। তবে আল্লাহ সুবহানাহু হুসাইনের (রা:) দু’আ কবুল করে নেন। পরবর্তীতে উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদকেও ইয়াজিদের আদেশে হত্যা করা হয়।
আমাদের করণীয়:
সালফে সালেহীনের কেউ ইয়াজিদের নামের শেষে রাহিমাহুল্লাহ বা লাআনা হুল্লাহ - এ দু’টি বাক্যের কোনটিই উল্লেখ করেন নি। সুতরাং সে যেহেতু তার আমল নিয়ে চলে গেছে, তাই তার ব্যাপারে আমাদের চুপ থাকাই ভাল। তার ভাল মন্দ আমলের হিসাব সে দেবে, আমাদেরটা আমরা। আমরা তাকে গালি দেব না তবে ভালবাসার প্রশ্ন তো ওঠেই না। তার চেয়ে হুসাইন (রা:) ইমামাতের অনেক বেশি যোগ্য ছিলেন, বহু গুণে শ্রেষ্ঠ মানুষ ছিলেন, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু আল্লাহ যাকে খুশি তাকে রাজত্ব দেন, এটাই আল্লাহর রুবুবিয়াত।

কোন ধরণের জন্ম-মৃত্যু বার্ষিকী পালনের প্রথা ইসলামে নেই। মুসলিম হিসেবে আমাদের রসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন, মৃত বা শহীদ ব্যক্তির জন্য বিলাপ না করা, আনুষ্ঠানিকভাবে তিন দিনের বেশি শোক প্রকাশ না করা। তিনি বলেছেন:

মৃত ব্যক্তির উপর বিলাপকারী যদি তওবা না করে মারা যায়, তাকে কিয়ামতের দিন লোহার কাঁটাযুক্ত জামা পড়ানো হবে এবং আলকাতরার প্রলেপ লাগানো পায়জামা পড়ানো হবে। (সহীহ মুসলিম)

যে কোন বিপদে আমাদের কর্তব্য কুরআনের সেই বাণী স্মরণ করা -

“যখন তাঁরা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয়ই আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তারই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো।” (সূরা বাকারাঃ ১৫৬)

রসুলের সুন্নাত ভালবাসলে আমাদের উচিত এই দিনে সিয়াম পালন করা। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় কিছু ইহুদীদের আশুরার দিন রোজা রাখতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন: এটি কোন রোজা? তারা উত্তর দিল, এটি একটি পবিত্র দিন। এদিনে আল্লাহ বনী ইসরাইলকে তাদের শত্রুদের কবল থেকে পরিত্রাণ দিয়েছেন। তাই মুসা (আঃ) এ দিন রোজা রেখেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন: তাদের চেয়ে মুসা (আঃ) এর সাথে আমার সম্পর্ক অধিক। সুতরাং তিনি সিয়াম থাকলেন এবং সাহাবীদেরকে সিয়াম রাখার আদেশ দিয়েছেন।” (সহীহ বুখারী) অপর বর্ণনায় তিনি আগামী বছর নয় তারিখেও সিয়াম থাকার নিয়ত করেছিলেন।

কারবালার শিক্ষা

| comments

কারবালার যুদ্ধের প্রেক্ষাপট এতই বিস্তৃত যে, তা স্থান ও কালকে অতিক্রম করে বর্তমান সময়ে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়েছে। হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) বলেছেন, 'আমি সৎকাজের আদেশ দান ও অসৎ কাজে বাধা প্রদানের উদ্দেশ্যে সংগ্রামে নেমেছি।' সে হিসেবে বলা যায়, হোসাইন (রা.) নৈতিক ও মানবীয় মূল্যবোধ সমুন্নত রাখার লক্ষ্যেই এই আন্দোলন ও যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
কারবালার যুদ্ধে হোসাইন (রা.) ও তার সঙ্গীরা ধৈর্যের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন। কারবালায় শাহাদতের কয়েক দিন আগে থেকেই তিনি সঙ্গীদের ধৈর্য ধারণের শিক্ষা দিয়ে আসছিলেন। আল্লাহর ওপর নির্ভরতা ও তার প্রতিশ্রুত পুরস্কারপ্রাপ্তির আশায় তার সঙ্গীরাও এ ব্যাপারে ছিলেন দৃঢ়চিত্ত।
হোসাইনের (রা.) সঙ্গীরা কারবালার ময়দানে আনুগত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। যুদ্ধের আগের রাতে তিনি সঙ্গীদের লক্ষ্য করে বলেন, যার ইচ্ছা সে চলে যেতে পারে। কারণ, তার সঙ্গে থাকার অর্থ হচ্ছে নির্ঘাত মৃত্যু। কিন্তু সঙ্গীরা আনুগত্যের শপথ করে তাকে ত্যাগ করবেন না বলে ঘোষণা দেন। মুসলিম ইবনে উজ্জাহ নামে এক সঙ্গী বলেন, 'আমাকে যদি একবার হত্যা করে পুনরায় জীবিত করা হয় এবং ৭০ বার এ প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি ঘটানো হয়, তবুও আমি আপনাকে ছেড়ে যাব না। আমি নিজের জীবন দিয়ে আপনাকে রক্ষার চেষ্টা করব, যাতে কিয়ামতের ময়দানে বিশ্বনবীকে (সা.) বলতে পারি, নিজের অস্তিত্ব দিয়ে আমি আপনার বংশধরকে রক্ষার চেষ্টা করেছি!'
কারবালার ময়দানের এসব ঘটনা প্রমাণ করে_ হোসাইন (রা.) ও তার সঙ্গীরা পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর আরও কাছে পেঁৗছতে সচেষ্ট ছিলেন। শত্রু শিবিরকে উপদেশ দান অথবা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সময় হোসাইন (রা.) ও তার সঙ্গীরা বিন্দুমাত্র মানবীয় ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ বিসর্জন দেননি। তার শিবিরে যখন পানি ছিল, তখন তিনি পিপাসার্ত শত্রুসেনাদের তৃষ্ণা মেটাতে কার্পণ্য করেননি। আবার যুদ্ধের ময়দানে চরম সাহসিকতার সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। হোসাইনের (রা.) এ নমনীয়তা ও দৃঢ়তা প্রমাণ করে_ তিনি অতি উচ্চ লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। মানবতার মুক্তি এবং মানবীয় ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ জাগ্রত করাই ছিল হোসাইনের (রা.) উদ্দেশ্য। এই মহান লক্ষ্য অর্জনের প্রয়োজনীয়তা কিয়ামত পর্যন্ত শেষ হবে না বলে ইমামের শিক্ষা মানব জাতির পাথেয় হয়ে থাকবে চিরকাল। 

শাহীন হাসনাত

মহররম ও আশুরার তাৎপর্য

| comments

আরবি মাসের মধ্যে মহররম এমনই একটি মাস, কোরআনের ভাষায় যাকে 'হারাম মাস' হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজাই ছিল মুসলমানদের ওপর ফরজ। অনেকেই মনে করে থাকেন, রাসূলের নাতি হোসাইন (রা.) শহিদ হওয়ার কারণেই এদিনের মর্যাদা। অথচ এটা সঠিক নয়। রাসূল (সা.) এদিনের তাৎপর্যের কথা বলেছেন। কোরআনেও এর কথা উল্লেখ হয়েছে। আর হোসাইনের (রা.) শহিদ হওয়ার ঘটনা রাসূলের ইন্তেকালের অনেক পরের। তবে এই ঘটনা এদিনের তাৎপর্যকে আরও বাড়িয়েছে নিঃসন্দেহে। আশুরার দিনটিকে অন্য দিনের ওপর কেন প্রাধান্য দিয়েছেন_ এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য আল্লাহই ভালো জানেন। তবে লোকমুখে প্রসিদ্ধ যে, এদিনে বিভিন্ন নবীর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো ঘটেছে। কিয়ামতও এদিনে হবে। কিন্তু এসবের পক্ষে শক্তিশালী কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই। শুধু ফেরাউনের কবল থেকে মুসার (আ.) সম্প্রদায়ের মুক্তি পাওয়ার বিষয়টি এদিনে হয়েছে বলে শক্তিশালী বর্ণনায় পাওয়া যায়। মূলত, আল্লাহতায়ালা ইচ্ছা করলে যে কোনো দিনকে অন্য দিনের ওপর মর্যাদাবান ও প্রাধান্য দিতে পারেন। আমাদের উচিত সেদিনের মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য বুঝে এর ওপর আমল করা। যেহেতু আল্লাহ এদিনটিকে তার রহমত ও বরকতের জন্য নাজিল করেছেন, এজন্য এদিনের পবিত্রতা হলো, দিনটি এমনভাবে কাটাবে, যেভাবে কাটানোর কথা রাসূলের হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। সুন্নত হিসেবে এদিনে শুধু রোজা রাখার কথা বলা হয়েছে। এক হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন, এদিন রোজা রাখলে সারা বছরের গোনাহর প্রতিদান হয়ে যায়। তবে রাসূলের নির্দেশ হলো, ইহুদিদের সামঞ্জস্যতা থেকে বাঁচার জন্য ১০ মহররমের সঙ্গে আগে-পরে মিলিয়ে আরও একদিনের রোজা রাখা। তবে কেউ শুধু আশুরার রোজা রাখলে গোনাহগার হবেন না। রাসূলের এ নির্দেশ দ্বারা আমাদের একটি শিক্ষা লাভ হয় যে, অমুসলিমদের সঙ্গে সামান্য বিষয়ে সামঞ্জস্যতাও আল্লাহর রাসূল পছন্দ করতেন না। সুতরাং একজন মুসলমানের বাহির এবং ভেতর অমুসলিমদের থেকে স্বতন্ত্র হওয়া চাই। তার চালচলন, লেনদেন, আমল-আখলাক_ সবই অমুসলিমদের চেয়ে সেরা হওয়া চাই। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, আজকের মুসলমান রাসূলের এই শিক্ষা থেকে দূরে সরে পড়ার কারণে চারদিক থেকে নানা দুর্দশা নেমে এসেছে তাদের ওপর। আশুরার দিন রোজা ছাড়া অন্য কোনো আমলের কথা জোরালোভাবে প্রমাণিত নয়। যেমন অনেকেই মনে করেন, আশুরার দিন শিরনি পাকিয়ে বিতরণ করতে হবে। এসবের কোনোই ভিত্তি নেই। এগুলো দীনে সংযোজিত বিদআত হিসেবেই গণ্য। তবে একটি দুর্বল হাদিসের সূত্রে উল্লেখ আছে, যিনি এদিন পরিবার-পরিজন ও অধীনদের জন্য ভালো খাবারের ব্যবস্থা করবেন, আল্লাহ তার উপার্জনে বরকত দেবেন। হাদিসটি সূত্রের দিক থেকে ততটা শক্তিশালী না হলেও এতে আমলে কোনো বাধা নেই। বরং এটা করলে আল্লাহর রহমত লাভের আশা করা যায়। শিয়ারা এদিনে তাজিয়া মিছিলসহ যেসব আনুষ্ঠানিকতা পালন করে, এর সঙ্গে ইসলামের কোনো যোগসূত্র নেই। প্রকৃত মুসলমান কারও জন্য এ ধরনের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া সমীচীন নয়।

জহির উদ্দিন বাবর

পবিত্র আশুরা ও ইমাম হোসাইনের ভাষণ

| comments

ইমাম হোসাইন (আ:) কারবালার প্রান্তরে কুফাবাসীদের উদ্দেশে বিশেষ করে ইয়াজিদের দল-বলের উদ্দেশে কয়েকটি ভাষণ বা খুতবা দেন। ইমাম পাক তার একটি ভাষণে বলেন- হে কুফাবাসী! আপনারা জানেন, ইয়াজিদ ও তার লোকজন আল্লাহর রাস্তা ত্যাগ করে শয়তানের রাস্তা ধরেছে। তারা পৃথিবীতে ফিতনা-ফাসাদ ছড়াচ্ছে। তারা আল্লাহর সীমা লংঘন করে বায়তুল মালকে ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করেছে। তারা হালাল-হারামের ধার ধারে না। বন্ধুগণ! আপনারা এটা ভালোভাবেই জানেন, অন্যের চেয়ে খিলাফতের ওপর আমার হকই সর্বাধিক। আপনারা আমার কাছে কুফায় আসার জন্য বারবার চিঠি পাঠিয়েছেন এবং আমার প্রতি আনুগত্য শপথ (বাইয়াত) গ্রহণ করবেন বলে দূত পাঠিয়ে আমাকে অনুরোধ করেছেন। জানিয়েছেন, আপনারা আমার সঙ্গ ত্যাগ করবেন না এবং আমার জীবনকে আপনাদের জীবনের চেয়েও মূল্যবান মনে করবেন।
হে কুফার বাসিন্দারা, আপনারা যদি আপনাদের ওয়াদার ওপর অটল থাকেন তবে হিদায়েত লাভ করবেন। আর যদি আপনারা তা মেনে না নেন এবং বাইয়াত ভঙ্গ করেন তাতেও আমি বিস্মিত হব না, কারণ আপনারা আমার পিতা মওলা আলীর সঙ্গে, আমার ভাই ইমাম হাসানের সঙ্গে এবং আমার চাচাতো ভাই হজরত মুসলিম বিন আকীলের সঙ্গে এর আগে এরকম ব্যবহার করেছেন। আপনারা তো আপনাদের আখিরাত নষ্ট করেছেন, সেই সঙ্গে অন্যকে ধোঁকা দিয়ে নিজেদেরই সর্বনাশ ডেকে এনেছেন। যারা ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে তারা আসলে নিজেদেরই ক্ষতি করে।

কারবালার মাঠে একে একে যখন সবাই শাহাদতবরণ করছে আর ইমাম হোসাইন সবার ছিন্ন লাশ মোবারক তুলে এনে তাঁবুতে রাখছেন। অবশেষে ইমাম পাক তাঁবু থেকে যুদ্ধের ময়দানে গিয়ে সর্বশেষ যে মর্মস্পর্শী ভাষণ দেনÑ হে লোক সকল! আপনারা তাড়াহুড়া ও গোলমাল করবেন না, শান্ত হন। আগে আমার কথাগুলো মন দিয়ে শুনুন। ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহ ও তার রাসূলের পক্ষ থেকে আমার ওপর যে দায়িত্বভার দেয়া হয়েছে তা আমাকে পালন করতে দিন। এখানে আমি কেন এসেছি? কি জন্য এসেছি? তা আপনাদের জানা দরকার। আমার কথাগুলো যদি আপনাদের যুক্তিসঙ্গত মনে হয় তবে তা গ্রহণ করবেন এবং আপনারা যদি আমার প্রতি সুবিচার করতে পারেন তবে সেটাই হবে আপনাদের জন্য চরম সৌভাগ্যের কারণ। আর যদি আমার কথাগুলো মনঃপূত না হয় এবং আপনারা যদি ন্যায়বিচার করা থেকে বিরত থাকেন তাহলে আমার কিছু বলার থাকবে না। আপনারা তখন যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন। হে কুফার বাসিন্দারা, আপনারা আমার বংশীয় মর্যাদা সম্পর্কে চিন্তা করুন।

আপনারা ভাবুন আমি কে? মনের কাছে জিজ্ঞাসা করুন। আমার মর্যাদাকে মাটিতে লুটিয়ে দেয়া কিংবা আমাকে হত্যা করা কি উচিত হবে? আমি কি প্রিয়নবী রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নাতি নই? আমি কি সাকিয়ে কাউসার মওলা আলীর পুত্র নই, যিনি বেহেশতে মুমিনদের কাউসারের পানি পান করাবেন? আমি কি জান্নাতের নেত্রী মা ফাতিমার সন্তান নই, যিনি সমগ্র নারী জাতিকে বেহেশতে প্রবেশ করাবেন? আপনাদের কি মনে নেই, নানা মোহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সেই পবিত্র বাণী : আমি ও আমার ভাই ইমাম হাসান বেহেশতি যুবকদের সর্দার ও ইমাম। আর বেহেশতে সব নর-নারীই হবেন যুবক-যুবতী। আমার এ কথাগুলো নিঃসন্দেহে সত্য। আমার কথাগুলো যদি বিশ্বাস না হয় তাহলে আবু সাঈদ খুদরী (রা.), জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.), আনাস ইবনে মালিক (রা.), জায়েদ ইবনে আকরাম (রা.), শোহায়েল ইবনে সাদ সাঈদী (রা.) প্রমুখ সাহাবায়ে কেরাম যারা এখনও বেঁচে আছেন, যারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে তা শুনেছেন তাদেরই না হয় জিজ্ঞাসা করুন। আমাকে হত্যা করা থেকে বিরত থাকার জন্য এ প্রমাণ কি যথেষ্ট নয়? আপনারাই বলুন, খোলা তরবারি নিয়ে আমার সঙ্গে যুদ্ধ করা আপনাদের কি উচিত হবে? ইমাম হোসাইনের কথাগুলো শুনে ইয়াজিদের সৈন্যবাহিনী মাথা নিচু করে বোবার মতো দাঁড়িয়ে রইল। ইমাম পাক ইয়াজিদ বাহিনীর থেকে প্রতি উত্তর না পেয়ে অতঃপর বলেনÑ আল্লাহর কসম! আমি এখন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর একমাত্র জীবিত নাতি, আমি ছাড়া পৃথিবীতে নবীকন্যার কোন পুত্র বেঁচে নেই। তোমরা আমাকে হত্যা করতে জোট বেঁধেছ? আমি কি কাউকে হত্যা করেছি? আমি কি কারও প্রতি অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম করেছি? বিনা অপরাধে কেন আমাকে হত্যা করতে এসেছ? আমাকে হত্যা করলে আল্লাহর কাছে কি জবাব দেবে? কি জবাব দেবে বিচার দিবসে নানা মোহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে? আমাকে সাহায্য করার মতো কি তোমাদের মধ্যে একজনও নেই? তোমরা কি আমর কথা শুনতে পাও না?

তোমাদের মাঝে কি একজন মুসলমানও নেই? ইতিহাস সাক্ষ্য ইয়াজিদের বাইশ হাজার সৈন্যবাহিনীতে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান অথবা অন্য কোন ধর্মাবলম্বী কেউ ছিল না, সবাই ছিল কোরআন-সুন্নাহ মোতাবেক লেবাসধারী মুসলমান। তাই ইমাম পাক তার শেষ বাক্যে বুঝিয়ে দিলেন ইয়াজিদ বাহিনীতে আসল মুসলমান কেউ ছিল না সবাই ছিল নকল মুসলমান। এ ধরনের মুসলমানের নাজাতের কোন ব্যবস্থা নেই। খাজা গরিবে নেওয়াজ মঈনুদ্দীন চিশ্তী (রহ.) বলেনÑ ‘বোকারা বুঝতে পারেনি, ইমাম হোসাইন পানির পিপাসায় অসহায়ের মতো মারা যায়নি বরং তিনি আসল ও নকলের ভাগটি পরিষ্কার করে দেখিয়ে গেলেন। আসুন আমরা আসল হোসাইনী মুসলমান হই। হোসাইনী মুসলমান থেকেই জš§ নেবেন ইমাম মাহদী আলাইহিস সালাম।

আশুরা ও শিয়া

| comments

প্রতি বছরের ন্যায় এবারো ঐতিহাসিক কারবালা যুদ্ধের হূদয়বিদারক মর্মন্তদ ঘটনা বিজড়িত আশুরা দিবস আমাদের মাঝে 'ত্যাগ চাই মর্সিয়া ক্রন্দন চাই না' এর বারতা নিয়ে যথারীতি হাজির হয়েছে। এই দিনে হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) এবং হযরত আলী (রাঃ) এর পরিবারের সতের জন শিশু-কিশোর যুবকসহ মোট ৭৭ জন মর্দে মুজাহিদ কারবালার প্রান্তরে ফোয়াতের দুই কূল ছাপা নদীর কিনারায় এক বিন্দু পানি হতে বঞ্চিত হয়ে শাহাদাতের পেয়ালা পান করেছিলেন। হযরত রাসুল (সঃ)-এর দৌহিত্র হুসাইন (রাঃ)-এর পবিত্র মস্তক নিষ্ঠুর নরাধম শিমার ছিন্ন করে কুফার দুরাচার ওবায়দুলস্নাহ বিন জিয়াদের দরবারে প্রেরণ করেছিল। কেন এ মহান ত্যাগ ও শাহাদাত? এটা কি ছিল এজিদের হাত থেকে খেলাফত কেড়ে নেয়ার জন্যে? তা নয়। হযরত হুসাইন (রাঃ)-এর শিবিরে মাত্র ৪০ জন লোক ছিল তরবারী চালানোর মত। পক্ষান্তরে এজিদের নির্দেশে কুফার গভর্নর চার হাজার রণ নিপুণ সৈন্য পাঠিয়েছিল। এ অসম যুদ্ধে পরাজয় ও মৃতু্য ছিল নিশ্চিত। তারপরও কেন স্বেচ্ছায় আত্মত্যাগ? কারণ, শর্ত ছিল, 'হয় এজিদের আনুগত্য স্বীকার কর, না হয় যুদ্ধ কর'। রাসুল (সঃ)-এর কলিজার টুকরাসম হুসাইন (রাঃ) একটি মুহূর্তের জন্য ও এজিদের আনুগত্য স্বীকার করে ইসলামী খেলাফতের মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করতে চাননি। এমতাবস্থায় উম্মাহর মধ্যে শান্তি-শৃংখলা স্থাপনের জন্য একটি লিখিত চুক্তি হয়। যেখানে বলা হয়, হযরত মুয়াবিয়ার পর হযরত হুসাইন (রাঃ) খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। কিন্তু মুয়াবিয়া তাঁর খেলাফত পরিচালনার শেষ সময়ে স্বীয় পুত্র এজিদকে খেলাফতের দায়িত্ব অর্পণের প্রস্তাব দেন। তখন সমস্যা সৃষ্টি হন। এজিদ জনমতের কোন তোয়াক্কা না করে নিজেই খেলাফতের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হয়। তখন সর্বত্র বিশৃংখলা দেখা দেয়।

ইসলামী খেলাফতের মর্যাদাকে ধ্বংস করে রাজতন্ত্রের সূত্রপাতকে বেশিরভাগ মুসলমানেরা সে সময় মানতে পারেননি। যার কারণে বিদ্রোহ দানা বাঁধতে শুরু করে এজিদের বিরুদ্ধে। এজিদ তখন তার বিষদাঁত প্রক্ষালন করল। সে ভাবল, চারদিকের বিদ্রোহ দমন করার চেয়ে বরং হুসাইনকে (রাঃ) যদি দুনিয়া হতে সরিয়ে দেয়া যায় তাহলে সব মামলা চুকে যায়। সাথে সাথে নিজের নেতৃত্ব কর্তৃত্ব অনায়াসে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। ইসলামী খেলাফতে কলঙ্ক সৃষ্টিকারী এজিদ সেই হুসাইনকে (রাঃ) হত্যা করার পরিকল্পনা করল যিনি বেহেশতের সব যুবকদের সরদার হবেন। এই কথা রসুল (সাঃ) বলেছিলেন, 'হাসান-হুসাইন হবে বেহেশতের সব যুবকদের সরদার' তখন থেকে রাসুলের সাহাবীরা তাদেরকে আরো বেশি বেশি মহব্বত করার, খুশি করার চেষ্টা করতেন। তাঁরা কষ্ট পান এমন কোন কাজ কেউ করতেন না। একটি দৃষ্টান্ত দিলে সহজেই বিষয়টি অাঁচ করতে পারবেন। হযরত রাসূল (সাঃ)-এর একজন সাহাবী ছিলেন তার নাম দাহিয়া কলবী (রাঃ)। তিনি হযরত হাসান হোসাইনকে (রাঃ) খুব ভালবাসতেন। তাদেরকে খুশি করার জন্য অনেক দূর-দুরান্ত থেকে ফলফলারী নিয়ে আসতেন পকেট ভর্তি করে। যখন হযরত হাসান-হুসাইন (রাঃ) দেখতেন যে, দাহিয়া কলবী (রাঃ)-এর আসছেন তখন তারা দৌড় দিতেন। এক দৌড়ে দাহিয়া কলবী (রাঃ) কাছে পেঁৗছাতেন। তাকে জড়িয়ে ধরতেন। পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিতেন। আর ফল বের করে খেতেন। একদিন এই দৃশ্য আসমান থেকে হযরত জিব্রাইল (আঃ) দেখে বিস্ময়ে বিমূঢ় হলেন। তিনি ভাবলেন, যদি জিব্রাইল না হয়ে তিনি দাহিয়া হতেন। আর হযরত হাসান-হুসাইন (রাঃ)-এর কাছে আসতেন। তাঁরা তাঁকে জড়িয়ে ধরে আদর করতেন তাহলে তাঁর জীবনটা ধন্য হয়ে যেত। সত্যিই একদিন চলে এলেন দুনিয়ায় হাসান-হুসাইনের কাছে দাহিয়া কলবী সাহাবীর রূপ ধারণ করে। যখন হাসান হুসাইন (রাঃ) দেখলো যে দূর হতে দাহিয়া কলবী সাহাবী আসছেন। তথন তাঁরা এক দেঁৗড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে অন্যান্য দিনের মত পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তোমাকে তো দাহিয়া কলবীর মত দেখা যায়? কিন্তু তুমি বোধহয় দাহিয়া কলবী নও, কারণ তুমি যদি সত্যিই দাহিয়া কলবী হতে তাহলে তোমার পকেট কোনদিনও ফলশূন্য হতো না। জিব্রাইল (আঃ) লজ্জায় পড়লেন। বললেন, ওগো হাসান-হুসাইন! সত্যিই আমি দাহিয়া কলবী নই। আমি জিব্রাইল (আঃ)। তোমাদের নিকট থেকে একটু আদর নেয়ার জন্য আমি দাহিয়া কলবীর রূপ ধারণ করে এসেছি। কিন্তু দাহিয়া কলবীর রূপ ধারণ করে আসতে হলে যে ফল নিয়ে আসতে হয় এটা আমি বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম। সুতরাং সবাই চাইতো হাসান-হুসাইনকে খুশি করতে। তারা দুঃখ, কষ্ট পাবেন এমন কোন কাজ কেউ করতেন না। আমরা জানি হযরত বেলাল (রাঃ) যে জীবনের শেষ আজান দিতে গিয়ে শহীদ হয়েছিলেন সেটাও ছিল হযরত হাসান হুসাইনের অনুরোধের কারণে। ঘটনা ছিল এমন, রসুল (সঃ)-এর ইন্তেকালের পর হযরত বেলাল (রাঃ) মদীনার পথে-প্রান্তরে হাঁটতেন আর হা-হুতাশ ও আক্ষেপ করতেন। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে মদীনায় রসুল নেই সেখানে আমি বেলাল থাকতে পারব না। চলে গিয়েছিলেন সিরিয়ার দামেস্কে। দ্বিতীয় খলিফা আমিরুল মোমেনীন হযরত ওমর (রাঃ) এর খেলাফতকালে সমসাময়িক সাহাবিরা ও মুসলমানেরা হযরত ওমরকে অনুরোধ করেন বেলালকে মদীনায় নিয়ে আসার জন্য। হযরত ওমর (রাঃ) তখন বেলালের কাছে একটি চিঠি লিখেছিলেন, 'বেলাল! তোমাকে একনজর দেখার জন্য মদীনার আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। একটিবারের জন্য হলেও তুমি মদীনায় এসে দেখা দিয়ে যাও।

হযরত বেলাল (রাঃ) আমীরুল মোমেনীনের চিঠির অবমাননা হবে ভেবে মদীনায় এসেছিলেন। তখন মদীনার সকল মানুষেরা তাঁকে একনজর দেখার জন্য পঙ্গপালের মত দূর-দূরান্ত হতে ছুটে এসেছিলেন। আর দাবি করেছিলেন, একটিবার বেলালের সেই সমুধুর আযান শোনার জন্য। কিন্তু হযরত বেলাল (রাঃ) তখন বলেছিলেন, ওগো সাহাবীরা যেখানে রাসূল নাই সেখানে আমি কিভাবে আজান দিব? রসুলবিহীন বেলাল কোনদিনও আজান দিতে পারে না। সব সাহাবীর অনুরাধ রেখে দিয়েছিলেন। কিন্তু সবশেষে যখন হযরত হাসান ও হযরত হুসাইন (রাঃ) অনুরোধ করেছিলেন, তখন বেলাল ভাবলেন, তাদের অনুরোধ না রাখলে তারা কষ্ট পাবেন। এটা বেলালের কাছে আরো বেদনাদায়ক। তাই তিনি মিনারে উঠে যখন আজান দিচ্ছিলেন। যখন আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসুলুলস্নাহ (সঃ) বললেন, তখন পূর্বের মত শাহাদাত আঙ্গুল দিয়ে রাসুলের রিসালাতের সাক্ষ্য দেয়ার সময় দেখেন রসুল (সঃ) মেম্বারে নাই। শূন্য মেম্বার নিরব নিস্তব্ধ পড়ে আছে। এই শূন্যতা হযরত বেলালকে তোলপাড় করে ফেললো। বুকের ভিতরে বিকট জোরে একটি ঝাঁকুনি দিল। তিনি মিনার হতে পড়ে গেলেন। আর আলস্নাহ তাকে শাহাদাতের মৃতু্য দিয়ে তার দরবারে উঠিয়ে নিলেন। কেবল দাহিয়া কলবী ও বেলাল (রাঃ) নন, স্বয়ং রাসুল (সঃ)ও হাসান-হুসাইনকে খুশি করতেন। তাঁরা কষ্ট পান এমন কাজ কখনোই করতেন না। একদা জামায়াতে নামাজ পড়ানোর সময় একটি সিজদা অস্বাভাবিক লম্বা হলো। নামাজ শেষে একজন সাহাবী এর রহস্য জানতে চাইলেন। মহানবী (সঃ) বললেন, হাসান-হুসাইন আমার পীঠে চড়েছিল। আমি তাদের নামিয়ে দেয়াকে পছন্দ করেনি। অন্য বর্ণনায় আছে, মেম্বারে দাঁড়িয়ে খুৎবা দেয়ার সময়ও হাসান-হুসাইন আসলে তাদের দুই ভাইকে দুই কোলে নিতেন এবং খুৎবা চালিয়ে যেতেন। যে হাসান-হুসাইনকে সবাই সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করতেন। তাদের একজন অর্থাৎ হুসাইনকে (রাঃ) কেবলমাত্র কষ্ট নয় তাকে শহীদ করে দেয়ার জন্য এজিদের নির্দেশে কুফার গভর্নর ওবায়দুলস্নাহ বিন জিয়াদের সৈন্যরা সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করলো। সেদিন ছিল ১০ই মহররম ৬১ হিজরী।

প্রবল বীরবিক্রমে মুসলিম সৈনিকেরা শাহাদাতের পেয়ালা হাতে নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রায় দুই হাজার শত্রু সৈন্য খতম করে দিলেন। কিন্তু মুসলিম বাহিনী হতেও ঝরে পড়ল অনেকগুলো তরতাজা প্রাণ। ওবায়দুলস্নাহ বিন জিয়াদের বা এজিদের বাহিনী পানির দখল নিয়ে নিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই হুসাইন শিবিরে পানির জন্য হাহাকার পড়ে গেল। কাসেমকে কোলে নিয়ে শত্রুদের কাছে এক কাতরা পানি প্রার্থনা করলেন। কিন্তু পুত্র আলী আকবর ও কাসেমের মৃতু্য হযরত হুসাইনকে আবারো যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করলো। তিনি অনেক শত্রু নিধন করলেন। অবশেষে একটি তীর এসে তার গণ্ড মোবারক অবধি বিদ্ধ হলো। সাথে সাথে ঘোড়ার পৃষ্ঠ হতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। একটানে তীরটি বের করে ফেললেন ও শত্রুদের উপর আক্রমণ চালাতে থাকলেন। কিন্তু গণ্ডদেশ হতে রক্তক্ষরণ তাঁকে দুর্বল করে ফেলল। এমতাবাস্থায় পর পর কয়েকটি তীরবিদ্ধ হলেন হুসাইন (রাঃ)। অবশেষে জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। কাফেররা তাঁর মস্তক কাটার জন্য ইতস্তত করতেছিল। কিন্তু নিষ্ঠুর পাষণ্ড নরখাদক শিমার হযরত হুসাইন (রাঃ)এর মস্তক কর্তন করে তা নিয়ে এজিদের দরবারে পেঁৗছালো। এই যুদ্ধে হযরত হুসাইন (রাঃ)-এর পুত্র জয়নাল আবেদীন ছাড়া সবাই শাহাদাতবরণ করেন। এই দিনে রক্ত প্রবাহিত না করে ইবাদত বন্দেহী ও আশুরার ২টি রোজা অর্থাৎ মহররমের (৯, ১০/১০, ১১ তারিখের) রোজা আদায়ের মাধ্যমে আলস্নাহর সন্তুষ্টি ও আদর্শ অনুসরণ করার চেষ্টা করা উচিত।

মাওলানা জাকির হোসাইন আজাদী

শিয়া-সুনি্ন মতাদর্শ: শিয়া মতাদর্শের বিস্তৃতি

| comments

মাহমুদ আহমদ
শিয়া মত ইসলাম থেকে ভিন্ন কোনো দ্বীন নয়। এর ভিত্তি কোরআন, হাদিস ও আহলে বায়তের শিক্ষাদীক্ষার ওপর প্রতিষ্ঠিত। শিয়া মতের বিস্তৃতি ও গৌরবকালে উমাইয়া শাসকদের জুলুম-নিপীড়ন, বিশেষ করে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। বিশেষ করে এজিদ বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রোশ, ক্ষোভ ও আহলে বায়তের প্রতি জনগণের সমবেদনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে এই মতাদর্শের মাধ্যমে। এই সমবেদনাকে পুঁজি করে বনু আব্বাস উমাইয়াদের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করে। তারা রাসুল পরিবারের ঘোষণা দিয়ে তাদের অভ্যুত্থানকে সফল করে তোলে। এসব যদিও হয়েছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য, কিন্তু এর দ্বারা হজরত রাসুলে করিম (সা.)-এর পরিবারের প্রতি সাধারণের ভালোবাসার পরিমাণও বেড়েছে বলে ধারণা করা যায়।
হিজরি ১৩৩ সালে উমাইয়া শাসনের পতন হয় এবং আবুল আব্বাস আস্ সাফ্ফাহ খিলাফতের আসনে অধিষ্ঠিত হন। উমাইয়া ও আব্বাসীয়দের দুই শাসনের মধ্যবর্তী সময়ে ইমাম জাফর আস-সাদিক স্বাধীনভাবে ইল্ম ও মারিফাত ও মাজহাবের বিস্তৃতির সুযোগ পেয়ে যান। তাঁর পশ্চাতে ধনদৌলত তথা বস্তুগত শক্তি কিংবা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা কোনোটাই ছিল না, কিন্তু এটা ছিল ইমামের ইলমি ও আমলি শক্তি এবং আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের প্রভাব। ফলে লোকজন বিভিন্ন স্থান থেকে আকৃষ্ট হয়ে আসতে থাকে ইমামের সানি্নধ্য লাভে ধন্য হতে। কিছু দিনের মধ্যেই তাঁর পাঠচক্রে চার হাজার ছাত্র জড়ো হয়ে যায়। তাঁদের মধ্যে ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.), সুফয়ান ইবনে উয়ায়না (রহ.), সুফয়ান ছাওরি (রহ.), শুবা ইবনে হাজ্জাজ (রহ.) ও ফুদায়ল ইবনে আয়াদের মতো ফকিহ ও মুহাদ্দিসরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ফলে গ্রন্থ প্রণয়ন ও সংকলনের কাজ বিস্তৃতি লাভ করে। প্রসিদ্ধ ৪০০ গ্রন্থ, যাকে শিয়া পরিভাষায় উসুলে আরবাআ মিয়া বলা হয়, এর অধিকাংশই এ সময়ে লিপিবদ্ধ হয়। শিয়া মুহাদ্দিসরা এই ৪০০ গ্রন্থকে উৎস ধরে হাদিসের এক বিশাল সংকলন তৈরি করে সর্বকালের জন্য সংরক্ষণ করে রাখেন। আব্বাসি শাসকদের রাজধানী ছিল ইরাকের বাগদাদে। হজরত আলী (রা.)-এর রাজধানীও ছিল এই ইরাকের কুফায় (নজফ)। ফলে আগে থেকেই এখানে শিয়াদেরও ছিল শক্ত ঘাঁটি। আব্বাসিদের শত্রুতামূলক আচরণ সত্ত্বেও শিয়াদের প্রভাব ক্রমে বাড়তে থাকে, এমনকি রাজধানী বাগদাদেও শিয়া মত সর্বদা বিদ্যমান থাকে। 'কোখ' নামক বাগদাদের একটি মহল্লায় শুধু শিয়াদের বসতি ছিল। এখানে বহুসংখ্যক আলিম ও ফকিহ ছিলেন। তাঁরা গ্রন্থ রচনা ও সংকলন করা ছাড়াও শিক্ষাদানের কাজ চালাতেন। তাঁদের মধ্যে আবু আবদিল্লাহ শায়খ মুফিদ, শায়খ আবু জাফর তুসি, সায়্যিদ মুরতাদা উলুমুল হুদা, সায়্যিদ রাদি (নাহজুল বালাগার লেখক) এবং আরো বড় বড় আলেম তখন বাগদাদেই বসবাস করতেন। পরে অবশ্য স্থানীয় গোলযোগ ও ফিতনার কারণে বাগদাদের শান্তি ও নিরাপত্তা তিরোহিত হলে শায়খ আবু জাফর তুসি ৪৪৮ হিজরিতে বাগদাদ ত্যাগ করে নাজাফ চলে আসেন। তাঁরই শিক্ষাদীক্ষায় নাজাফও শিক্ষাদীক্ষার প্রশিক্ষণকেন্দ্রে পরিণত হয়ে যায়। বর্তমানেও নাজাফ বিশ্বের শিয়া সমপ্রদায়ের সর্বাপেক্ষা বড় শিক্ষাকেন্দ্র।
ইরানে শিয়া মতের প্রসার প্রথম দিকে অত্যন্ত ধীর গতিতে চলে। কেবল কুম্ম নগরীতেই কিছু শিয়া ছিল। মূলে তারা ছিল আরব। হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তারা কুফা থেকে কুম্মে চলে আসে এবং শিয়া মত ধারণ করেই আসে। তাদের প্রচারণায় কুম্মবাসী শিয়া মতাদর্শ গ্রহণ করে। মামুনুর রশীদের খিলাফতকালে ইমাম আলি রিদা (রহ.) খুরাসানে গেলে সেখানে শিয়া মত দ্রুত প্রসারিত হয়। হিজরি ৩২০ সালে দায়লামিরা ইরানের কয়েকটি শহর জয় করেন। ফলে তাঁরা নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় খিলাফতের প্রধানমন্ত্রীর পদ পর্যন্ত অর্জন করেন। দায়লামিরা শিয়া মতে প্রভাবিত ছিলেন। তাঁরা শিয়া উলামাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং শিয়া আকিদার প্রসারকাজে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। এরপর শাহ ইসমাইল সাফাবির হাতে সাফাবি শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে শিয়া মতের আরো প্রসার ঘটে।
সাফাবি শাসনের অবসান হলে জানদিয়া ও কাচারিয়া সুলতানরা শিয়া মতের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তাঁদের সহযোগিতায় শিয়া মত আরো বিস্তার লাভ করে। বর্তমান বিশ্বে ইরান শিয়াদের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। কুম্ম, মাশহাদ, তেহরান, নিশাপুর, নিহাওয়ানদসহ বিভিন্ন শহরে শিয়াদের বড় বড় শিক্ষাকেন্দ্র ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান আছে।
পাকিস্তান ও হিন্দুস্তানে শিয়া মতবাদ ওইসব আলেম ও মুবালি্লগের সাহায্যে প্রসার লাভ করেছে, যাঁরা বিভিন্ন সময়ে উপমহাদেশে আগমন করেন এবং এখানেই থেকে যান। ৬১৭ হিজরি যখন চেঙ্গিস খান ইরানের ওপর আক্রমণ চালান, তখন শিয়াদের একটা অংশ ভারতবর্ষে চলে আসে। হাসান গাংগু বাহমানি হিজরি ৭৪৮ সালে দাক্ষিণাত্যের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন এবং বাহমানি রাজত্বের ভিত্তি স্থাপন করেন। এদিকে ইয়ুসুফ আদিল শাহ ৮৯৫ হিজরি সালে বীজাপুরে নিজের শাসন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করেন।
সেই সময়েই শিয়াদের কিতাব প্রকাশের জন্য সরকারিভাবে প্রেস প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বহু দ্বীনি মাদ্রাসা গড়ে ওঠে। শিয়া আলেমদের মধ্যে সায়্যিদ দিলদার আলী গুফরান মাআব ও তাঁর ছাত্র শাগরিদ বিশেষ আন্তরিকতার সঙ্গে সামাজিক কুপ্রথার সংস্কার, শিক্ষার সমপ্রসারণ ও ধর্ম প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
সৌদি আরব, লেবানন, বৈরুত ও বালাবাকে যথেষ্ট শিয়া রয়েছে। জাবাল আমিলের শহর সায়দা ও সুরে শিয়াদেরশিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে এবং প্রায় সব অধিবাসীই শিয়া। ইয়েমেনে জায়দি সমপ্রদায় ও শাফিয়ি মতাবলম্বী ছাড়াও বিপুলসংখ্যক শিয়া বসবাস করে। রাশিয়ার অধিকৃত শহর ইরওয়ানের সব অধিবাসী শিয়া। মায়ানমার, মালয় ও সিংগাপুরে বিপুলসংখ্যক শিয়া বসবাস করে। মোটকথা বিশ্বের যে যে ভূ-খণ্ডে মুসলমানরা বাস করছে, সেসব ভূ-খণ্ডে কম-বেশি শিয়ারাও ইসলামের একটি সমপ্রদায় হিসেবে রয়েছে।

শিয়া-সুনি্ন মতাদর্শ : শিয়া-সুন্নি উদ্ভবের ইতিহাস

| comments

শিয়া শব্দটির অর্থ গোষ্ঠী এবং এটা 'শিয়াত-ই-আলী'_অর্থাৎ আলীর গোষ্ঠী হতে গ্রহণ করা হয়েছে। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইসলামে সর্বপ্রথম কোন্দল শুরু হয়। হজরত আবু বকর (রা.)-এর নির্বাচনের সময় কিছু ব্যক্তি হজরত আলী (রা.)-কে সমর্থন করেন। কারণ তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহর জামাতা এবং চাচাতো ভাই (আবু তালেবের পুত্র)।
সৈয়দ আমির আলীর 'দ্য স্পিরিট অব ইসলাম' পুস্তকে দেখা যায়, ৬০৫ খ্রিস্টাব্দে হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর চাচা আব্বাস আবু তালেবের দুই পুত্রকে লালন-পালনের ভার গ্রহণ করেন। হজরত মুহাম্মদ (সা.) নেন আলীকে এবং আব্বাস নেন জাফরকে। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কোনো পুত্র জীবিত না থাকায় শিশু আলীর ওপর হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অপত্য স্নেহ ঝরে পড়ে। এর এক বছর পরই (৬০৬ খ্রি.) ফাতেমা (রা.)-এর জন্ম হয়। হজর আলী (রা.) ফাতেমার সঙ্গে একই সংসারে বেড়ে ওঠেন এবং বদর যুদ্ধের কিছু দিন আগেই বাগদান হয়। এর তিন মাস পর তাঁদের বিবাহ হয়। এ সময় আলী (রা.)-এর বয়স ছিল ২১ আর ফাতেমা (রা.)-এর বয়স ১৫ বছর। (দ্য স্পিরিট অব ইসলাম, পৃষ্ঠা ১৪ ও ৬৯)। এ জন্যই আলী (রা.)-কে একশ্রেণীর মানুষ রাসুলুল্লাহর পুত্রস্থানীয় মর্যাদা দিতেন।
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মৃত্যুর পর খলিফা নির্বাচনকালে তাই একদল লোক হজরত আলী (রা.)-এর পক্ষ সমর্থন করেন। বিদ্যা-বুদ্ধি, শৌর্য-বীর্য এবং রাসুলের সঙ্গে আত্দিক সম্পর্কের জন্য তাঁরা হজরত আলী (রা.)-এর পক্ষাবলম্বন করেন। কিন্তু হজরত আবু বকর (রা.) খলিফা নির্বাচিত হলে হজরত আলী (রা.)-এর সমর্থকরা এটাকে অবৈধ ঘোষণা করেন। এরপর হজরত ওমর (রা.) ও হজরত ওসমান (রা.)-এর খলিফা নির্বাচনেও এই দলের কোনো সমর্থন ছিল না।
তৃতীয় খলিফা হজরত ওসমান (রা.) নিহত হওয়ার পর হজরত আলী (রা.) চতুর্থ খলিফা নির্বাচিত হন। কিন্তু সিরিয়ার শাসনকর্তা মাবিয়া হজরত আলী (রা.)-এর বিরোধিতা করায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং সিফ্ফিনের যুদ্ধে হজরত আলী (রা.)-এর বিপর্যয় ও পরে একজন খারেজি কর্তৃক তিনি নিহত হওয়ায় শিয়া আন্দোলন জোরদার হয়। এর কয়েক বছর পর ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালা প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনী কর্তৃক ইমাম হোসেনের নৃশংসভাবে মৃত্যু শিয়া আন্দোলনকে সুদূরপ্রসারী করে। এ সময় থেকেই শিয়া মতবাদের উদ্ভব হয় এবং রাজনৈতিকভাবে এই সম্প্রদায় আত্দপ্রকাশ করে।
উমাইয়া খিলাফতের আমলে (৬৬১-৭৫০ খ্রি.) শিয়া সম্প্রদায় কারবালার নৃশংসতার প্রতিবাদে আল-মুখতার নেতৃত্বে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ইরাক ও পারস্যে তাদের আধিপত্য দৃঢ় হয়। যাবের যুদ্ধে আবদুল্লাহ ইবনে জিয়াদ, সীমার প্রভৃতি ইমাম হোসেনের হত্যাকারীদের হত্যা করে প্রতিশোধ গ্রহণ করা হয়। পারস্য শিয়া মতাবলম্বীদের প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত হয়। উমাইয়া শাসকদের নির্যাতনের ফলে পারস্যবাসী শিয়াগোষ্ঠীর প্রতি আকৃষ্ট হয়। উমাইয়া বংশের পতনের জন্য শিয়াগোষ্ঠী আব্বাসীয়দের সঙ্গে মিলে বিদ্রোহ করে। আবু মুসলিমের ভূমিকা এতে প্রধান ছিল। কিন্তু আব্বাসীয় খলিফারা শিয়াদের প্রতি মিত্রভাব বজায় রাখেননি। আল-মনসুর ইমাম হাসান ও হোসেনের বংশধরদের ওপর কঠোর উৎপীড়ন করেন। এ সময় ইদ্রিস নামে ইমাম হাসানের একজন বংশধর পালিয়ে যান এবং তানজিয়রে একটি রাজ্য কায়েম করেন। খলিফা আল-মামুন মুতাজিলা মতবাদ প্রসারের জন্য ইমাম আলী আর রেজার সঙ্গে সখ্য শুরু করেন এবং নিজ বোনের সঙ্গে ইমামের বিয়ে দেন। কিন্তু খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল মুতাজিলা মতবাদ রোধ করেন এবং অসংখ্য শিয়া নেতাকে হত্যা করেন। কিন্তু এতে শিয়ারা দমেনি। তানজিয়রে ইদ্রিসীয় বংশ ব্যতীত শিয়া সম্প্রদায় যেসব রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইয়েমেনের জায়েদি এবং আফ্রিকার ফাতেমি বংশ।
শিয়া মতবাদের তিন প্রধান রূপ দেখা যায় : (১) জায়দি, (২) মধ্যমপন্থী ও (৩) চরমপন্থী। জায়দিরা সুনি্নদের প্রায় নিকটবর্তী। তাঁরা ইমামের মধ্যে 'আল্লাহর অভিব্যক্তি'মূলক মতবাদের যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা দেন এবং বলেন, এর অর্থ_আল্লাহ থেকে সত্যপথের নির্দেশ লাভ করা। তাঁরা আলী-বংশীয় ব্যক্তিবিশেষের মধ্যে ঐশ্বরিক সত্তায় বিশ্বাস করেন না। শাহাদত লাভ সম্বন্ধে কোনো ধর্মীয় রূপ দেন না, এটা রাজনীতির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে। তাঁরা মনে করেন, মানুষের তরবারির বলে ও আল্লাহর সাহায্যে আলী বংশীয়দের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। ইমাম মেহেদির আবির্ভাব সম্বন্ধে যে নানা ধরনের মতবাদ, তার নির্ধারণ যুক্তির সঙ্গে করেন। আর চরমপন্থীরা ইমামের মধ্যে ঐশ্বরিক সত্তাকে সম্পূর্ণরূপে স্বীকার করে। এ অবস্থাকে 'হুলুল' বলা হয়। ইমামের লৌকিক সত্তা যখন বিলীন হয়, তখন তার কাছে আল্লাহরও কোনো স্থান থাকে না।
মধ্যমপন্থী অর্থাৎ দ্বাদশবাদী শিয়ারা চরমপন্থীদের উপরিউক্ত মতবাদে বিশ্বাস করেন না; বরং বিরোধিতা করেন। তাঁদের মতে, এই চরমপন্থীরা ও তাদের মতবাদ মূল শিয়া মতবাদকে হেয়প্রতিপন্ন করেছে এবং তারা ইসলাম থেকে দূরে সরে গেছে। মধ্যমপন্থী (্্ইমামী)-দের মতে, ইমাম মরণশীল; কিন্তু একটি অলৌকিক জ্যোতি আংশিক হুলুলক্রমে ইমামের মধ্যে অবস্থান করে। চরমপন্থী দ্রুজদের মতে, এটা একটি ধর্মীয় শক্তি, যা মৃত্যুকে ইমামরা আনন্দের বিষয় বলে গণ্য করে। ইমামের মৃত্যু তাঁর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে_এই তাদের বিশ্বাস। কারবালার যুদ্ধে হোসেন (তৃতীয় ইমাম) ইচ্ছা করে মৃত্যুবরণ করেন, যদিও আল্লাহ ওই যুদ্ধে বিজয়ের ফেরেশতাকে পাঠিয়েছিলেন।
ইতিহাসের বিবর্তনে শিয়াদের উপরিউক্ত তিন সম্প্রদায় আরো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে যায়। জায়দি আন্দোলনের ফলে তাবারিস্তান ও দায়লামে ৮৬৪ খ্রিস্টাব্দ এবং ইয়েমেনে ৮৯৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ছোট ছোট রাজ্য গড়ে ওঠে। পরস্পরের মধ্যে দূরত্বের জন্য এই রাজ্যগুলো ঐক্য স্থাপন করতে পারেনি। কারণ ধর্মীয় মতবাদে অনৈক্য ছিল। ইরাকের জায়দিরা কখনো স্বতন্ত্র রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি_তবে খলিফার সাম্রাজ্যে প্রভূত প্রভাব বিস্তার করে এই অক্ষমতার ক্ষতিপূরণ করে নিত।
ইমাম সম্পর্কে শিয়া-সুনি্নর বিশ্বাস : সুনি্ন মুসলমানদের মধ্যে ইমাম হচ্ছেন সুনি্ন সম্প্রদায়ের নেতা। সুনি্নদের মতে, খলিফা আইনের দাস, কিন্তু শিয়া সম্প্রদায়ের মতে, ইমাম হচ্ছেন প্রধান আইন প্রবর্তক। সুনি্নদের খলিফা নির্বাচিত; কিন্তু শিয়াদের খলিফা পূর্ববর্তী ইমাম দ্বারা মনোনীত। শিয়াদের মতে, ইমাম ঐশী ইচ্ছায় সরাসরি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশোদ্ভূত। তারা মনে করে, হজরত আলীই ঐশীভাবে মনোনীত প্রথম ইমাম এবং খলিফা। শিয়াদের কাছে ইমামের 'আলা দরজা'। এর মাহাত্দ্য বিশাল। শিয়াদের মধ্যে একজন ইমাম নিযুক্তির পর তিনি অপসারিত হন না। কারণ এটা ঐশী নির্দেশিত। সুনি্নদের তা নয়।
(সহায়ক গ্রন্থ : শিয়া মতবাদ, আল্লামা মনযুর নৌমানী, ইসলামে ভিন্নমত ও ক্ষমতার লড়াই এবং আল্লামা মুহাম্মদ রেজা আল মুজাফ্ফর রচিত 'শিয়াদের মৌলিক বিশ্বাস)
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. ইসলামী কথা - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Premium Blogger Template