السلام عليكم

যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার (তওবা) করবে আল্লাহ তাকে সব বিপদ থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেবেন। [আবূ দাঊদ: ১৫২০; ইবন মাজা: ৩৮১৯]
Showing posts with label মাসায়েল. Show all posts
Showing posts with label মাসায়েল. Show all posts

তালাকের ধরন ও মুসলিম আইন

| comments

জাহিলিয়াতের যুগে তালাক ছিল পুরুষের জন্য ফ্যাশন। ইচ্ছে হলো পরলাম, না হয় ছুড়ে ফেললাম। কিন্তু ইসলামে তালাক হচ্ছে নিরুপায়ের উপায়। তালাক আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ বন্ধন খুলে দেওয়া, পরিত্যাগ করা বা বিচ্ছিন্ন হওয়া। শরিয়তের পরিভাষায় 'তালাক' মানে বিয়ের বন্ধন খুলে দেওয়া বা ছিন্ন করা। এই শব্দটি ইসলামপূর্ব যুগ থেকে এই অর্থে অর্থাৎ ছিন্ন হওয়া মর্মে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ইসলামের দৃষ্টিতে তালাক যে আদৌ কোনো পছন্দনীয় কাজ নয়, এ কথা বিভিন্ন হাদিসে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। আবু দাউদ, প্রথম খণ্ড, ৩১২ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ আছে, 'রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা তালাকের চেয়ে অধিক ঘৃণ্য কোনো জিনিস হালাল করেননি।'
তালাক আইনের উদ্দেশ্যে : এতদসত্ত্বেও এবং দুঃখজনক হলেও সত্য যে তালাক হয়ে আসছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক যখন এতই খারাপ হয় যে ভালো করার আর কোনো সম্ভাবনা লক্ষ করা যায় না। দাম্পত্য জীবন অটুট রাখার সব চেষ্টা যখন ব্যর্থ হয় তখন উভয়ের স্বতন্ত্র ও ব্যক্তিগত সত্তাকে বাঁচিয়ে রেখে আসন্ন ধ্বংসের হাত থেকে উভয়কে উদ্ধার করাই হচ্ছে তালাক আইনের মূল এবং একমাত্র উদ্দেশ্য।
প্রকারভেদ
পদ্ধতিগত দিক থেকে তালাক দুই প্রকার : ১. সুন্নত তালাক ও
২. বিদঈ তালাক।
ফলাফলের দিক থেকে এটি দুই প্রকার : ১. রাজঈ তালাক ও
২. বাইন তালাক
সুন্নত তালাক আবার দুই প্রকার : ১. আহসান তালাক ও
২. হাসান তালাক
একইভাবে বাইন তালাক দুই প্রকার : ১. বাইন তালাক সুগরা ও ২. বাইন তালাক কুবরা।
সবার বোঝার সুবিধার্থে এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ যে হিন্দু আইনের মূল উৎস স্বর্গ, অর্থাৎ এটি স্বর্গ থেকে প্রাপ্ত (Divine origin), তাতে হাত দেওয়ার বা এর ভুলত্রুটি বিবেচনা করার কোনো ক্ষমতা কোনো মর্ত্যের মানুষের নেই। হিন্দু আইনে রাজা শুধু দেখবেন ওই স্বর্গীয়প্রাপ্ত আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, তার কাজ শুধু তা বলবৎ করা। তিনি হিন্দু আইনের অধীন একজন সেবক মাত্র। তেমনি মুসলিম আইনের মূল উৎস হলো_
১. পবিত্র কোরআন। এটা হজরত জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে প্রাপ্ত এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক উচ্চারিত আল্লাহর বাণীর সংকলন।
২. সুন্নাহ বা হাদিস অর্থাৎ হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উপদেশাবলি ও ক্রিয়াকলাপ। এককথায় রাসুলুল্লাহর শিক্ষা।
৩. ইজমা অর্থাৎ আইনবেত্তাদের মতৈক্য।
৪. কিয়াস অর্থাৎ সাদৃশ্যপূর্ণ অবরোহী পদ্ধতি। যখন প্রথমোক্ত উৎস তিনটি কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে না, তখন ওইগুলো তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে প্রাপ্ত যে সমানুপাতিক বিয়োগ ব্যবস্থার আশ্রয় গ্রহণ করা হয়। মোটকথা, কিয়াস হলো সমানুপাতিক যুক্তি।
যিনি মুসলিম তার এর বাইরে যাওয়ার বা ভাবার বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই।
সুতরাং 'মুসলিম আইনে তালাক', এ সম্পর্কে সঠিকভাবে জানতে হলে বা অস্পষ্ট ধারণা স্পষ্ট করতে হলে জানা দরকার যে তালাক সম্পর্কে প্রকৃত ধর্মীয় বিধানাবলি কী। সে জন্য ওপরে বর্ণিত তালাকগুলোর ধর্মীয় অবস্থান যৎকিঞ্চিৎ নিম্নে আলোকপাত করা হলো।
১. সুন্নাত তালাক : রাসুলুল্লাহ (সা.) ঠিক যে সময় এবং পদ্ধতিতে তালাক দিতে শিক্ষা দিয়েছেন তদনুরূপ তালাককে সুন্নাত তালাক বলে।
২. বিদঈ তালাক : স্বামী তার স্ত্রীকে একই তুহুরে অর্থাৎ মাসিক রজঃস্রাবের মধ্যবর্তী সময়ে এক বা একাধিক শব্দে একাধিক তালাক দিলে তাকে বিদঈ তালাক বলে।
৩. রাজঈ তালাক : তালাক শব্দ উচ্চারণপূর্বক স্বামী স্ত্রীকে এক বা দুই তালাক দিলে এবং তার সঙ্গে বাইন শব্দ যোগ না করলে তাকে রাজঈ তালাক বলে। যার মধ্যে স্ত্রীর ওপর স্বামীর অধিকার থেকে যায়। স্বামী ইচ্ছা করলে ইদ্দতকাল শেষ হওয়ার আগে স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে পারে।
৪. বাইন তালাক : তালাক শব্দের সঙ্গে 'বাইন' শব্দ যোগ করে স্ত্রীকে এক বা দুই তালাক দিলে তাকে বাইন তালাক বলে। এ ক্ষেত্রে তৎক্ষণাৎ বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়।
৫. আহসান তালাক : যে তুহুরে সহবাস হয়নি এবং এর পরবর্তী তুহুরেও তালাক দেওয়া হয়নি, সে অবস্থায় স্ত্রীকে একটি রাজঈ তালাক প্রদানের পর ইদ্দত পূর্ণ হতে অথবা গর্ভ খালাস হতে দিলে তাকে তালাকে আহসান বলা হয়।
৬. হাসান তালাক : সহবাসবর্জিত তুহুরে স্ত্রীকে একটি রাজঈ তালাক দেওয়ার পর দ্বিতীয় ও তৃতীয় তুহুরে পর্যায়ক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় তালাক প্রদানকে হাসান তালাক বলে।
৭. খোলা তালাক : অর্থের বিনিময়ে স্ত্রী স্বামীর কাছে বিবাহবন্ধন হতে মুক্তি চাইলে স্বামী তা মঞ্জুর করামাত্র এই খোলা তালাক সংঘটিত হয়। এই তালাক উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে হয়ে থাকে।
তালাক প্রদানকারীর যোগ্যতা এবং কিভাবে প্রদান করা যায় :
একমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থির মস্তিষ্কসম্পন্ন মুসলিম তালাক প্রদান করতে পারেন। অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও বিকৃত মস্তিষ্ক ব্যক্তির তালাক আইনে সিদ্ধ নয়। যেমন_নিদ্রিত অবস্থায় বা মাতাল অবস্থায় তালাকের শব্দ উচারণ করলে তালাক হয় না।
তালাক মৌখিক অথবা তালাকনামার মাধ্যমে প্রদান করা যেতে পারে। এটা কাজির উপস্থিতিতে কিংবা স্ত্রীর মা-বাবার অথবা সাক্ষীর উপস্থিতিতে দেওয়া যেতে পারে। একইভাবে মৌখিকভাবে উচ্চারণ বা ঘোষণা করতে অক্ষম না হলে লিখিত তালাক বৈধ হবে। সুনি্ন আইনে সাক্ষীর সংখ্যা উল্লেখ নেই। তবে শিয়া আইনে দুজন উপযুক্ত সাক্ষীর কথা বলা হয়েছে (বেঈলী, ২য় ১১৭)।
তালাকের ইদ্দত : তালাকের প্রসঙ্গ আলোচনা করতে গেলে বারবার একটি বিষয় সামনে উপস্থিত হয়, তা হলো ইদ্দত। তালাকপ্রাপ্ত ও বিধবা নারীকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কোথাও গমন না করে কিংবা অন্য কোনো স্বামী গ্রহণ না করে নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করতে হয়। এই নির্দিষ্ট সময়কে ইদ্দত বলা হয়ে থাকে। মুসলিম আইন তথা পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ২২৭ ও ২৩৪ নম্বর আয়াত অনুযায়ী ইদ্দতকাল ক্ষেত্রভেদে ভিন্ন এবং তা হলো নিম্নরূপ :
ক. সঙ্গম বা নির্জনবাসের আগে স্ত্রী তালাকপ্রাপ্ত হলে স্ত্রী ইদ্দত পালন করতে হবে না।
খ. ঋতুবতী স্ত্রীর ইদ্দত, তালাকের পরবর্তী_তিন ঋতু
গ. অল্প বয়স বা বার্ধক্যবশত ঋতু না হলে_ইদ্দত তিন মাস।
ঘ. গর্ভবতীর ইদ্দত_গর্ভ খালাস না হওয়া পর্যন্ত।
ঙ. বিধবা অর্থাৎ স্বামীর মৃত্যু হলে এবং তিনি গর্ভবতী না হলে ইদ্দতকাল_চার মাস ১০ দিন।
বিবাহবিচ্ছেদের উপরিউক্ত বিধানাবলি আলোচনা করতে গিয়ে এ পর্যন্ত যতটুকু বর্ণনা পাওয়া গেছে, তা যদি গভীর দৃষ্টিকোণ থেকে পরীক্ষা করে দেখি, তাহলে লক্ষ করা যাবে কখন, কী অবস্থায় বা কোন পরিপ্রেক্ষিতে তালাক ঘোষণা করলে মুসলিম আইনে বৈধ বলে গণ্য হবে, শুধু তারই উল্লেখ আছে। সবই মূলত মৌখিক বা ঘোষণামূলক। বস্তুত কোনো documentation বা দালিলিক বিধান লক্ষ করা যায়নি।
একাধিক বিষয় যেমন_বহুবিবাহ, উত্তরাধিকার, তালাক ইত্যাদি দ্ব্যর্থবোধকতা এবং বিদ্যমান বহুধাবিভক্ত মতের ফলে সৃষ্ট ও উদ্ভূত জটিলতা নিরসনে জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক সরকার The Commission on Marriage & Family Laws নামে একটি কমিশন গঠন করে। এই কমিশন মুসলিম আইনের মূল উৎসগুলোর বিধান অক্ষুণ্ন রেখে যে প্রতিবেদন পেশ করে তার ওপর ভিত্তি করে ১৯৬১ সালের ২ মার্চ The Muslim Family Laws Ordinance (No. VIII of 1961) জারি এবং তা ১৯৬১ সালের ১৫ জুলাই থেকে কার্যকর হয়। এই আইনের ৭ নম্বর ধারায় মোট ছয়টি উপধারা আছে। ৭ নম্বর ধারার মূল প্রতিপাদ্য বক্তব্য হলো, নিম্নোক্ত বিধানাবলি প্রতিপালিত না হলে যেভাবেই হোক তাকে আইনত তালাক বলা যাবে না।
ক. উপরিউক্ত যেকোনো তালাক প্রদানের ক্ষেত্রে তা ঘোষণার পর যথাশিগগির সম্ভব স্বামী স্থানীয় চেয়ারম্যানকে লিখিতভাবে তালাকের নোটিশ দেবেন এবং এর কপি স্ত্রীকে প্রদান করবেন।
খ. ওই নোটিশ প্রদানের তারিখ থেকে ৯০ দিন অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তালাক কার্যকর হবে না।
গ. ওই নোটিশ প্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে চেয়ারম্যান সংশ্লিষ্ট স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পুনর্মিলনের উদ্দেশ্যে সালিস পরিষদ গঠন করবেন।
বর্ণিত মতে, তালাকের নোটিশ প্রদান না করলে এক বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা পাঁচ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং ৬ উপধারা অনুযায়ী এভাবে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটলে সেই স্ত্রী এ-জাতীয় তালাক তৃতীয়বার এভাবে কার্যকরী না হলে তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকে বিবাহ না করে আবার একই স্বামীকে বিবাহ করতে পারবে।
প্রাসঙ্গিক বিধায় উল্লেখ করা আবশ্যক যে মুসলিম পারিবারিক আইন, ১৯৬১-এর ৮ ধারা অনুযায়ী ৭ ধারায় যা কিছু বলা হোক না কেন The Dissolution of Muslim Marriages Act, 1939-এর ০২ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে স্ত্রী কর্তৃক তালাকের জন্য সিভিল কোর্টে যাওয়ার অধিকার ক্ষুণ্ন (ouster) করা হয়নি। ফলে অতিসংক্ষেপে হলেও উল্লেখ করতে হচ্ছে যে মুসলিম আইনের ৩২৪ থেকে ৩৩২ ধারানুযায়ী যদি কোনো স্বামী_১. চার বছর ধরে নিরুদ্দেশ থাকে; ২. দুই বছর ধরে খোরপোশ দিতে ব্যর্থ হয়; ৩. সাত বা তদূর্ধ্ব কালের জন্য কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়; ৪. কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া ক্রমাগত তিন বছর দাম্পত্য দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়; ৫. পুরুষত্বহীন হয়; ৬. দুই বছর ধরে পাগল বা কুষ্ঠরোগে অথবা ভয়ানক ধরনের ব্যাধিতে আক্রান্ত থাকে; ৭. স্ত্রীর সঙ্গে নিষ্ঠুর ব্যবহার করে; ৮. ব্যভিচারে লিপ্ত হয়।
তাহলে স্ত্রী সিভিল কোর্টে বর্তমানে পারিবারিক আদালতে বিবাহবিচ্ছেদের ডিক্রির প্রার্থনা করতে পারেন, অর্থাৎ ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনের ৮ ধারানুযায়ী উপরিউক্ত বৈধ কারণের জন্য ডিক্রির প্রার্থনা করার অধিকার থেকে কোনো স্ত্রীকে বঞ্চিত করা হয়নি।
উপরিউক্ত অবস্থা এবং বিধানাবলি ছাড়াও আদব-কায়দা, আচরণ বা কথাবার্তার দ্বারাও তালাক সংঘটিত হতে পারে, তা হলো 'ঈলা' ও 'জিহার'।
মুসলিম আইনের ৩১৭ ধারানুযায়ী ঈলা দ্বারা বিবাহবিচ্ছেদটি একধরনের আনুমানিক তালাক, যা কোনো প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী অন্তত চার মাস পর্যন্ত যৌন মিলন থেকে নিবৃত্ত থাকলে আদালতের মাধ্যমে স্ত্রী তালাক গ্রহণের অধিকারী হয় (বেঈলী, ২৯৬-৩০৪; হেদায়া ১০৯। কোরআন শরিফের ৩৩ নম্বর সুরা ও ৫৮ নম্বর সুরার প্রথমাংশে)।
'জিহার' হলো একধরনের অসমাপ্ত তালাক। স্বামী যদি স্ত্রীকে তার (স্বামীর) মায়ের সঙ্গে অথবা নিষিদ্ধ ধাপের অন্য কোনো মহিলার সঙ্গে তুলনা করে, তাহলে তওবা (প্রায়শ্চিত্ত) না করা পর্যন্ত স্ত্রী তার সঙ্গে সহবাসে অস্বীকৃতি জানাতে পারে এবং মুসলিম আইনের ৩১৮ ধারার আলোকে স্ত্রী তালাক গ্রহণের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন।
পরিশেষে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করছি, তালাক দ্বীন ইসলামে বৈধ কর্মগুলোর মধ্যে নিকৃষ্টতম অনুমোদিত একটি কাজ। দাম্পত্য জীবনের মধুর সম্পর্কের মধ্যেও একদিন ভাঙনের সুর রণিত হয়, যা অনেক চেষ্টা করেও রোধ করা বা থামানো সম্ভব হয় না। আর তখনই প্রয়োজন হয়ে পড়ে বিচ্ছেদ বা তালাকের।
তালাক একটি স্পর্শকাতর বিষয়। এর বিধানও বর্ণনাসাপেক্ষ। তা ছাড়া স্থানকালপাত্রভেদে বক্তব্যের মধ্যে সামান্য হেরফের হলেই এর বিধানগত হুকুমেও আকাশ-পাতাল ব্যবধান নির্ণীত বা প্রযোজ্য হয়। যেহেতু প্রতিটি তালাকের প্রেক্ষাপট, ধরন-প্রকৃতি সম্পূর্ণই ভিন্ন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, সেহেতু এর বিধান ও প্রায়োগিক হুকুমও ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্ন। সুতরাং বাস্তব ঘটনা, প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ ও দালিলিক সাক্ষী এবং পারিপাশ্বর্িক অবস্থা অবলোকন ও অবগত হয়েই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেওয়া নিরাপদ, যুক্তিযুক্ত এবং সমীচীন হবে।
লেখক : মোহাম্মদ নূরল হক, অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ

হালাল-হারামের গুরুত্ব

| comments

হজরত নুমান ইবনে বাশীর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'হালাল বা বৈধ সুস্পষ্ট এবং হারাম বা অবৈধও স্পষ্ট। আর এ দু'য়ের মধ্যবর্তী বিষয়গুলো হলো সন্দেহজনক। আর বেশিরভাগ লোকই সেগুলো (এসবের পরিচয়) জানে না। অতএব যে ব্যক্তি ওই সন্দেহজনক জিনিসগুলো পরিহার করল সে তার দীন ও মান-সম্মানকে পবিত্র রাখল। আর যে ব্যক্তি সন্দেহজনক জিনিসে জড়িয়ে পড়ল সে হারামের মধ্যে পড়ে গেল। যেমন, কোনো রাখাল (কোনো নিষিদ্ধ) মাঠের আশপাশে গরু চরায়, আর এতে সম্ভাবনা আছে যে, সে তাতে (নিষিদ্ধ মাঠে) তার পশু ঢুকিয়ে দেবে। সাবধান! নিশ্চয়ই প্রত্যেক বাদশাহর একটি নিষিদ্ধ মাঠ থাকে। মনে রেখ, আল্লাহর নিষিদ্ধ মাঠ হলো তাঁর হারাম জিনিসগুলো। আর সাবধান! মানুষের দেহের মধ্যে এক টুকরো গোশত আছে, যখন সেই গোশতের টুকরোটি সুস্থ থাকে, তখন গোটা দেহ সুস্থ থাকে, আর যখন তা দূষিত হয়ে যায় তখন গোটা দেহটাই অসুস্থ হয়ে পড়ে। জেনে রেখ, এটাই হলো কলব বা অন্তর। _বুখারি ও মুসলিম
আলোচ্য হাদিসের প্রথমেই হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, শরিয়তে যেসব জিনিস হালাল করা হয়েছে তা কোরআন এবং হাদিস দ্বারা স্পষ্ট উলেল্গখ করা হয়েছে। অনুরূপভাবে শরিয়তের হারাম জিনিসগুলোও স্পষ্ট উলেল্গখ করা হয়েছে। এগুলো গ্রহণ বা বর্জন করতে মানুষকে বেগ পেতে হয় না। কিন্তু যেসব জিনিস শরিয়তে স্পষ্টভাবে উলেল্গখ করা হয়নি, সে সম্পর্কে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'আর এ দু'য়ের মধ্যবর্তী বিষয়গুলো হলো সন্দেহজনক। আর বেশিরভাগ লোকই সেগুলো জানে না।' অর্থাৎ দুনিয়ায় অনেক জিনিস আছে যেগুলো সম্পর্কে শরিয়তে স্পষ্টভাবে হালাল বা হারাম তা উলেল্গখ করা হয়নি, যা বিশেষজ্ঞ আলেম ছাড়া সাধারণ লোকদের জানা সম্ভব নয়। সুতরাং সমাজের অধিকাংশ লোকেরই সেসব বিষয় সম্পর্কে (হালাল-হারাম) বাছবিচার করা সম্ভব নয়। অতএব এ ধরনের সন্দেহজনক জিনিস সম্পর্কে লোকদের করণীয় কী হবে তার নীতিমালা উলেল্গখ করে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) হাদিসের পরবর্তী অংশে বলেন, 'অতএব যে ব্যক্তি ওই সন্দেহজনক জিনিসগুলোকে পরিহার করল সে তার দীন ও মান-সম্মানকে পবিত্র রাখল। আর যে ব্যক্তি সন্দেহজনক জিনিসে জড়িয়ে পড়ল সে হারামের মধ্যে পড়ে গেল।' হাদিসের এ অংশে সন্দেহজনক জিনিস ত্যাগ করার কথা বলা হয়েছে। একজন পরহেজগার লোকের কাজ হবে যখন সে কোনো সন্দেহজনক জিনিসের সম্মুখীন হবে তখন সঙ্গে সঙ্গে তা পরিহার করা। কেননা এতে তার দীন সংরক্ষিত হয় অর্থাৎ হারাম থেকে বাঁচতে পারে এবং হারাম থেকে বাঁচার কারণে তার দেহ-মন পবিত্র থাকে এবং মান-সম্মানও রক্ষা পায়। অপরপক্ষে যে ব্যক্তি এসব সন্দেহজনক জিনিসে জড়িয়ে পড়ে অথচ তার জানা নেই যে এটা হালাল না হারাম; সুতরাং এসব সন্দেহজনক জিনিস গ্রহণ করার কারণে হারামের মধ্যে নিপতিত হয়ে নিজের দীনকে ধ্বংস করে এবং হারাম ভক্ষণের কারণে দুনিয়া এবং আখিরাতে সে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়। কিন্তু আমাদের সমাজের বেশিরভাগ লোককেই দেখা যায় কোনো সন্দেহযুক্ত অথবা বিতর্কিত জিনিসকে হালাল করার উদ্দেশ্যে ফতোয়ার জন্য ছোটাছুটি করে বেড়ায় এবং বিভিন্ন কায়দা-কানুনের মাধ্যমে তা গ্রহণ করার চেষ্টা করে।
সুতরাং কলব এবং দেহকে সুস্থ, পবিত্র ও কলুষমুক্ত রাখতে হলে হালাল পথে অর্থ উপার্জন করতে হবে; হালাল গ্রহণ করতে হবে। হারাম ও সন্দেহজনক জিনিস পরিহার করতে হবে। সৎ ও কলুষমুক্ত জীবনযাপন করতে হবে। আর যত প্রকারের অন্যায়, অসৎ ও পাপের পথ রয়েছে, তা বর্জন করতে হবে। কেননা মানুষ যখন কোনো অন্যায় ও পাপকাজ করে তখন তার অন্তঃকরণের ওপর প্রভাব পড়ে। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) এ সম্পর্কে বলেন, 'আর যখন তা দূষিত বা খারাপ হয়ে যায় তখন গোটা দেহটাই অসুস্থ হয়ে পড়ে।' সুতরাং কল্বকে পূত-পবিত্র রাখার জন্য সকল প্রকার হারাম এবং সন্দেহজনক জিনিসকে বর্জন করে শরিয়তে যা স্পষ্ট হালাল তা গ্রহণ করতে হবে এবং সকল প্রকার গুনাহর কাজ থেকে দূরে থেকে সৎ ও নেকির কাজ করতে হবে। তাহলেই মানুষের গোটা দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সৎ, কল্যাণকর ও নেকির কাজে জড়িত হবে।
উপরোলিল্গখিত হাদিসের আলোকে আমাদের জন্য যেসব শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে তা হলো_ শরিয়তে যেসব জিনিসকে স্পষ্টভাবে হালাল ঘোষণা করা হয়েছে তা গ্রহণ করতে হবে এবং যেসব জিনিসকে স্পষ্টভাবে হারাম করেছে, তা থেকে দূরে থাকতে হবে।
স্পষ্ট হারাম বর্জন করার পর যেসব জিনিস সন্দেহজনক তাও বর্জন করতে হবে। কেননা সন্দেহজনক জিনিস গ্রহণ করলে হারামে জড়িয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। সন্দেহজনক জিনিস বর্জন করা মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য।
হারামে জড়িয়ে পড়ার ভয়ে প্রয়োজন হলে হালাল জিনিসও বর্জন করতে হবে।
মনকে পবিত্র এবং কলুষমুক্ত রাখার জন্য হালাল, বৈধ উপায়ে উপার্জিত রুজি খেতে হবে এবং খারাপ, অন্যায় ও গুনাহর কাজ থেকে দূরে থাকতে হবে। কেননা মনের ভালো-মন্দের ওপর নির্ভর করে দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ভালো-মন্দ কাজের তৎপরতা। জান্নাতে যেতে হলে বৈধ উপায়ে অর্জিত রুজি দ্বারা দেহ গঠন করতে হবে। কেননা এর ওপর নির্ভর করছে ইবাদত কবুল হওয়া-না-হওয়া। এক হাদিসে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'হারাম মাল দ্বারা রক্ত-মাংস গঠিত দেহে আল্লাহর ইবাদত কবুল হয় না।' অন্য হাদিসে বলা হয়েছে, 'হারাম মাল দ্বারা গঠিত দেহ জান্নাতে যাওয়ার জন্য অনুপযোগী। বরং তার জন্য জাহান্নামই উপযোগী।'

-মুফতি এনায়েতুল্লাহ

তওবা মনের কালিমা দূর করে

| comments

মুমিন বান্দার প্রতি যাবতীয় গুনাহের কাজ থেকে তওবা করা ফরজ, সে পুরুষ হোক বা মহিলা। আর এ তওবার জন্য পরিকল্পনা না করে বরং সঙ্গে সঙ্গে তওবা করা অত্যাবশ্যক, বিলম্ব করা জায়েজ হবে না। তওবা পরিপূর্ণ হওয়ার জন্য শর্ত হলো_ অতীতের কৃত গুনাহগুলোর জন্য আল্লাহপাকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং বান্দার হক নষ্ট করলে এর ক্ষতি পূরণ করা। আল্লাহপাক এরশাদ করেন হে মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহপাকের নিকট তওবা কর। নিশ্চয় তোমরা তাতে সফলকাম হবে। আল্লাহপাক আরও বলেন, হে মুমিন বান্দাগণ, তোমরা আল্লাহপাকের নিকট তওবা কর বিশুদ্ধ ও খাঁটিভাবে। শীঘ্রই মহান আল্লাহ তোমাদের জীবনের যাবতীয় গুনাহ ক্ষমা করে এমন বেহেশতে প্রবিষ্ট করাবেন যার পাশ দিয়ে নদীগুলো প্রবাহিত হচ্ছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূলে পাক (সা.) বলেন, আল্লাহর কসম! আমি দৈনিক সত্তরবারেরও বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা এবং তওবা করি। বুখারী শরীফ। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূলে পাক (সা.) বলেন, মুমিন বান্দা যখন কোনো গুনাহ করে তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। অতঃপর সে যদি তওবা করে এবং ক্ষমা চায় তাহলে তার অন্তর সাফ হয়ে যায়। আর সে যদি তওবা না করে গুনাহ বেশি করতে থাকে তাহলে কালো দাগ বৃদ্ধি পায়। হজরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূলে পাক (সা.) বলেন, শয়তান বলল হে প্রভু! তোমার ইজ্জতের কসম! আমি তোমার বান্দাদের গোমরাহ করতে থাকব যে পর্যন্ত তাদের প্রাণ তাদের দেহে আছে। তখন মহান আল্লাহ বলেন আমার ইজ্জত, মহত্ত্ব ও উচ্চ মর্যাদার কসম, আমি তাদের ক্ষমা করতে থাকব যাতে তারা আমার নিকট মাফ চাইতে থাকবে। (আহমদ শরীফ), হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা:) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূলে পাক (সা.) বলেন, গুনাহ থেকে তওবাকারী ওই ব্যক্তির ন্যায় যার কোনো গুনাহ নেই। (ইবনে মাজা)। আল্লাহপাক আমাদের তওবাকারী, ক্ষমা প্রার্থনাকারী ও আল্লাহমুখী বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করে দিন।

লেখক : প্রফেসর মাওলানা মো. সালাহ্উদ্দিন; খতিব, বায়তুল মোকররম জাতীয় মসজিদ, ঢাকা

সুন্দর ব্যবহারের প্রতিদান

| comments

আল্লাহ ত'আলা খারাপ লোকের খারাবি থেকে বাঁচার জন্য এমন একটি হাতিয়ার ব্যবহার করতে বলেছেন যা বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না, কিনতে টাকা-পয়সাও লাগে না। যা বহন করতে কোন কষ্ট বা ঝামেলা হয় না। আর এই হাতিয়ার দ্বারা যে সুন্দর মিমাংসা হবে অন্য কোন হাতিয়ারদ্বারা তা হবে না বরং হাতিয়ার যত বড় হবে বিপদ ততই ভয়ংকর হবে। অশান্তি ততই বাড়বে। হাতিয়ারটি হচ্ছে 'সুন্দর ব্যবহার'।

আল্লাহ তা'আলা বলেন: আপনি সদ্ব্যবহার দ্বারা (অসদ্ব্যবহারের) মোকাবিলা করুন, (তারপরে হঠাৎ দেখবেন) আপনার ও যার মধ্যে শত্রুতা ছিল সে ব্যক্তি আপনার আন্তরিক বন্ধুরূপে গণ্য হয়েছে। (সুরা-হা-মীম সেজদাহ: ৩৪)

মন্দের জওয়াবে মন্দ না করে বরং ক্ষমা করা উত্তম কাজ। অতি উত্তম কাজ এই যে, যে ব্যক্তি তোমাদের সাথে মন্দ ব্যবহার করে তুমি তাকে ক্ষমা তো করবেই এবং তার সাথে সুন্দর ব্যবহারও করবে এতে সে ব্যক্তি লজ্জিত হবে এবং যদি তোমার প্রতি কোন খারাবির সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে তাহলে সে তা থেকে বিরত থাকবে। এমনকি যদি তুমি এই সুন্দর ব্যবহার করতেই থাক আর সে যদি সত্যিই দুষ্ট লোক হয় তাহলে সে অন্যদের ক্ষতি করবে বটে কিন্তু তোমার কোন ক্ষতি করবে না, বরং তোমার আন্তরিক বন্ধুরূপে গণ্য হবে এবং তোমার বিপদে সে যথাযথ সাহায্য করবে। উলেস্নখিত আয়াতের নির্দেশে ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি তোমার প্রতি ক্রোধ প্রকাশ করে তার মোকাবিলায় তুমি সবর কর। যে তোমার প্রতি মূর্খতা প্রকাশ করে, তুমি তার সহনশীলতা প্রদর্শন কর এবং যে তোমাকে জ্বালাতন করে, তুমি তাকে ক্ষমা কর। (মাআরিফুল কুরআন ) রেওয়াতে আছে, হযরত আবু বকর সিদ্দিকীকে (রা.) জনৈক ব্যক্তি গালি দিল অথবা মন্দ বলল, তিনি জওয়াবে বললেন, যতি তুমি সত্যবাদী হও এবং আমি অপরাধী ও মন্দ হই, তবে আলস্নাহ তা'আলা যেন আমাকে ক্ষমা করেন। পক্ষান্তরে, যদি তুমি মিথ্যা বলে থাক, তবে আলস্নাহ তা'আলা যেন তোমাকে ক্ষমা করেন। (কুরতুবী)

হযরত হোযায়ফা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল (স.) এরশাদ করেছেন, তোমরা অন্যদের অনুসারী হয়ো না। এরূপ চিন্তা করো না যে, লোকে আমাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করলে আমরাও তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবো। আর লোকে যদি আমাদের ওপর জুলুম করে তবে আমরাও জুলুম করবো। না, বরং তোমরা এই দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ কর যে মানুষ যদি তোমাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করে, তাহলে তোমরাও তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। আর তারা যদি তোমাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে তাহলে তোমরা তাদের উপর কোন জুলুম করবে না। (তিরমিযি)

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূল (স.) এরশাদ করেন, সেই আলস্নাহর কসম, যিনি আমাকে সত্য-দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন। কেয়ামতের দিন আলস্নাহ তা'আলা সেসব লোকদের আজাব দেবেন না যারা পৃথিবীতে এতিমদের প্রতি রহম করেছে, তাদের সাথে কোমলভাবে কথা বলেছে, তাদের এতিমি ও কমজোরির প্রতি হূদয়ে সহানুভূতি রেখেছে এবং নিজের সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে প্রতিবেশির মোকাবেলায় নিজের বড়াই ভাব দেখায়নি।

-হোসাইন আল খালদুন

নদী ও পানিশাসন : প্রেক্ষিত ইসলাম

| comments

কোরআনুল কারিমে জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কে অসংখ্য আয়াত রয়েছে, যা শিক্ষা ও গবেষণা করে মুসলিম বিজ্ঞানীরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের নতুন দিক উন্মোচন করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তাই আমরা বলতে পারি, কোরআনুল কারিম শুধু ধর্মগ্রন্থই নয়, এতে এক ব্যক্তির জীবনযাত্রা থেকে সামাজিক জীবনযাত্রা তথা মানবজাতির জন্য চিরকল্যাণের দিকনির্দেশনা রয়েছে। জ্ঞান সাধনা ও বিজ্ঞানচর্চার অসংখ্য নিদর্শন কোরআনুল কারিম। জ্ঞান অন্বেষণ ছাড়া আল্লাহর পরিচয় লাভ সম্ভব নয়। সঠিক গবেষণা ও গভীর বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান বাস্তব অর্থে ইসলামের পরিচয় লাভেরই নামান্তর। কোরআন মানুষকে পারিপাশর্ি্বক ও নিজেদের মধ্যে চিন্তা-ভাবনা এবং গবেষণার আহ্বান জানিয়েছে। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, 'নিশ্চয়ই মহাকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, রাত ও দিনের বিবর্তনে এবং সমুদ্রে বিচরণশীল নৌযানগুলোতে মানুষের জন্য কল্যাণ রয়েছে। আর আল্লাহ আকাশ থেকে যে পানি বর্ষণ করেছেন, তার দ্বারা মৃত ভূমিকে সজীব করে তুলেছেন এবং এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সবরকম জীবজন্তু। আর আবহাওয়া পরিবর্তনে এবং মেঘমালায় যা তাঁরই নির্দেশের অধীনে মহাকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে বুদ্ধিমান সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।' সূরা- বাকারা : ১৬৪
সমুদ্র ও পর্বতমালা সম্পর্কে বলা হয়েছে, 'তিনিই কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন সমুদ্রকে, যাতে তা থেকে তোমরা তাজা মাছ খেতে পার, তা থেকে বের করতে পার পরিধেয় অলঙ্কার। তুমি তাতে জলযানগুলোকে পানি চিরে চলতে দেখবে এবং যাতে তোমরা আল্লাহর কৃপা অন্বেষণ কর এবং যাতে তাঁর অনুগ্রহ স্বীকার কর। আর তিনি পৃথিবীর ওপর বোঝা রেখেছেন যে, কখনও যেন তা তোমাদের নিয়ে হেলেদুলে না পড়ে এবং নদী ও পথ তৈরি করেছেন, যাতে তোমরা তোমাদের গন্তব্যস্থলে পেঁৗছতে পার। আর তিনি নির্ণায়ক বহু চিহ্ন সৃষ্টি করেছেন এবং তারকা দ্বারাও মানুষ পথের নির্দেশ পায়।' সূরা-আন নাহল : ১৪-১৬
উপরোক্ত আয়াতদ্বয়ে আল্লাহতায়ালা বান্দার প্রতি কয়েকটি নিয়ামতের কথা উল্লেখ করেছেন। সে নিয়ামতের অন্যতম হলো পানি ও প্রবহমান নদী। শুধু এখানেই নয়, কোরআনের আরও কয়েক জায়গায় আল্লাহ নদী সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। নদীর পানিতেই রয়েছে জীবনের আদি উৎস। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হচ্ছে, 'অবিশ্বাসীরা কি দেখে না যে আমি সব প্রাণবান জিনিসকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছি। তবুও কি তারা ইমান আনবে না?' সূরা আম্বিয়া : ৩০
অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে, 'আর আল্লাহ প্রত্যেক জীবকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তাদের কোনোটি পেটে ভর দিয়ে চলে, কোনোটি চলে দু'পায়ের ওপর, আবার কোনোটি চার পায়ের ওপর চলে। আল্লাহ যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর ওপর শক্তিমান। অবশ্যই আমি সুস্পষ্ট নিদর্শনগুলো অবতীর্ণ করেছি। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সরল পথ দেখান।' সূরা- আননূর : ৪৫-৪৬
কোরআনুল কারিমে আরও ইরশাদ হচ্ছে, 'আর তিনিই (আল্লাহ) পানি থেকে মানুষ সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি তাকে বংশগতি ও বৈবাহিক সম্পর্কযুক্ত করেছেন। আর তোমার রব (প্রত্যেক বস্তুর ওপর) প্রভূত ক্ষমতাবান।' সূরা- ফুরকান : ৫৪
একদা নদীই ছিল বাংলাদেশের প্রাণ। নদীকে কেন্দ্র করেই তো বেড়ে উঠেছে চারশ' বছরের ঐতিহ্যবাহী বাংলার রাজধানী ঢাকা। আজও যত বড় শহর-বন্দর দেখতে পাই, তাদের সবগুলো নদীরই সন্তান। নদীকে কেন্দ্র করেই জমে উঠেছিল ব্যবসা-বাণিজ্য, হয়েছিল শায়েস্তা খাঁর সমৃদ্ধ দেশ। কালের আবর্তনে নদীগুলো দিন দিন শুকিয়ে গেছে, পানির অভাবে শুকিয়ে ধু-ধু মরুভূমি হয়ে আছে নদীর বুক। অথচ নদী বাঁচানোর নেই কোনো সমন্বিত উদ্যোগ।
নদী বাঁচাতে চাই পানির নিরবচ্ছিন্ন ও নিরুপদ্রব প্রবাহ। চাই বলিষ্ঠ কূটনৈতিক চেষ্টা। যতগুলো নদী হারিয়েছে উজানের বাঁধের বাধায়, সেগুলোকে খুলে দেওয়ার জন্য সাহসী উদ্যোগ নিতে হবে সরকারের। ভারত থেকে ন্যায্য পানির হিস্যা আদায়ের উদ্যোগ নিতে হবে। উদ্যোগ নিতে হবে টিপাইমুখসহ যাবতীয় আগ্রাসী অপতৎপরতা প্রতিরোধের। নয়তো যে নদীতে সৃষ্ট এ দেশ, সে নদীর জন্যই না মরে যায় সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশের প্রাণ।
বাস্তবতা হলো, প্রকৃতি, পরিবেশ, প্রকৃতির উপকরণ ইত্যাদি মহান আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন। পৃথিবীতে কোনো কিছু অনর্থক সৃষ্টি করা হয়নি। সবকিছু মানুষ এবং অন্যান্য সৃষ্টির কল্যাণার্থে সৃষ্টি করা হয়েছে। দুনিয়ায় সবকিছু পরিমিতভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। নদী মানুষের জন্য আল্লাহর অপূর্ব নিয়ামত। এই নদী ও জলজসম্পদ ধ্বংস করার অধিকার মানবজাতিকে দেওয়া হয়নি। মানুষ নদীর কোনো একটি উপাদান বিনষ্ট বা অপচয় করতে পারবে না। অযৌক্তিক অথবা বেআইনিভাবে এর ব্যবহার করতে পারবে না। নদীর সাধারণ নাব্যতা ও গতিতে বিচ্যুতি ঘটানো অথবা পরিবর্তন আনা যাবে না। জাতীয় ও সামষ্টিক উন্নয়নের জন্য এগুলো অত্যাবশ্যকীয় কাজ।
ইসলামী জীবন দর্শনে নদী-পানি, প্রকৃতি-পরিবেশ, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আচরণ, পরিবেশ সম্পর্কে মৌলিক চিন্তা-চেতনা, পরিবেশ সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি, পরিবেশ সংরক্ষণে নৈতিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা বা পর্যালোচনা প্রয়োজন। সমকালীন প্রেক্ষাপটে অযাচিত নদীশাসনের ফলে জলবায়ুর পরিবর্তন ও তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া আমাদের জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সমস্যাও বটে। এটি চলমান বিশ্বের অন্যতম একটি সমস্যা। ইসলামী জীবন-দর্শনের আলোকে পরিবেশ সংকট বিশ্লেষণ, সংরক্ষণ করতে ইসলামের শিক্ষা ও মূল্যবোধের প্রচার এবং প্রসার, পরিবেশদূষণ প্রতিরোধকল্পে ইসলামের মৌলিক শিক্ষার আলোকে আইন ও বিধিবিধান প্রণয়নে আমাদের এগিয়ে আসা দরকার।
আরেকটি কথা, মানবজাতি এ কারণে অনেক সৌভাগ্যবান যে, দুনিয়ার সব প্রাকৃতিক সম্পদ ভোগ ও ব্যবহার করার কৌশল এবং ইচ্ছাশক্তি মানবজাতিকে প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ মানবজাতি ও অন্যান্য সৃষ্টির কল্যাণার্থে দুনিয়ার সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। কোরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে, 'তিনি পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।' সূরা- বাকারা : ২৯
পাহাড়-পর্বত, নদীনালা প্রভৃতি সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে আমরা একদিকে যেমন আনন্দ উপভোগ করতে পারি, তেমনি কিছুটা হলেও মহান আল্লাহর নিয়ামত বা অনুগ্রহকে উপলব্ধি করে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে পারি। আল্লাহতায়ালা আমাদের কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে কবুল করুন। আমিন।
- মুফতি এনায়েতুল্লাহ
muftianaet@gmail.com

আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ খাদ্যদ্রব্য

| comments

শিশুকে হারাম বস্তু আহার থেকে অবশ্যই বিরত রাখতে হবে। কারণ হারাম বস্তু আহার মানুষকে হারাম ও অবৈধ কাজের দিকে নিয়ে যায়। তাই শিশুর খাদ্য তালিকায় কোনো অবস্থাতেই হারাম বস্তুর অনুপ্রবেশ করানো বা ঘটানো যাবে না। হারাম বস্তুর বর্ণনা দিয়ে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, তিনি (আল্লাহ) তোমাদের জন্য মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস এবং যেসব প্রাণী আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে জবেহ করা হয় সেসব প্রাণীর গোশত হারাম করেছেন। তবে যে (প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে) বাধ্য হয় এবং সীমালক্সঘনকারীও নয় তার জন্য (সামান্য আহারে) কোনো পাপ হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা ক্ষমাশীল ও দয়ালু। [সুরা বাকারা-১৭৩]

সন্তান-সন্ততিদের ভরণ-পোষণ ও উত্তম আহারের ব্যবস্থা করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করে রাসূল (সা.) বলেন, সর্বোত্তম দিনার (মুদ্রা) হলো তা, যা কোনো ব্যক্তি তার পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করে এবং ওই দিনার যা কোনো ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় তার বাহনের পেছনে ব্যয় করে এবং ওই দিনার যা কোনো ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় তার সঙ্গী-সাথীদের জন্য ব্যয় করে। [সুনানে তিরমিজি]

যে ব্যক্তি সন্তানদের জন্য খরচ করতে কার্পণ্য করে তাকে সতর্ক করে রাসূল (স.) বলেন, আল্লাহতায়ালা যাকে সচ্ছলতা দিয়েছেন তারপরও যে পরিবার-পরিজনের জন্য ব্যয় করতে কৃপণতা করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়। [আদ্ দাইলামি]

রাসূল (স.)-এর নিজের পরিবারবর্গের ব্যয় সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহতায়ালা রাসূল (স.)-কে যে সম্পদ দিয়েছেন তা থেকে এক বছরের খরচ নিজের পরিবার-পরিজনের ব্যয়ের জন্য রেখে অবশিষ্ট সম্পদ বায়তুল মালে দান করে দিতেন। [মুসনাদে আহমাদ]

শিশুর মানসিকতা গঠনে যেমন শিক্ষা ও পরিবেশের গুরুত্ব রয়েছে অনুরূপ গুরুত্ব রয়েছে পুষ্টিকর খাবারের। যে খাবার শরীরে পুষ্টি জোগায় এবং সুস্থতা বজায় রাখে, সহজলভ্য ও সহজপাচ্য তা শিশুকে জোগান দেওয়া এবং ওই খাবার খেতে অভ্যস্ত করে তোলা অভিভাবকদের বিশেষ দায়িত্ব। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য জ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গে পুষ্টিজ্ঞান অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এটা দুর্ভাগ্যজনক বিষয় বর্তমানে অধিকাংশ শিশু রুচি ও স্বাদকে প্রাধান্য দিয়ে খাবারে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে অথচ পুষ্টিকর খাবার সহজলভ্য হলেও তা পরিহার করে চলে। এক্ষেত্রে শিশুকাল থেকেই পুষ্টিকর খাবারের প্রতি অভিভাবকদের বিশেষ দৃষ্টি রাখা দরকার।

আমরা আজকের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে কোরআনের নির্দেশনা ও হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর মহান বাণী থেকে যে শিক্ষা পাই, তা হচ্ছে সন্তানের আধিক্য বর্তমান বিশ্বের জন্য মহাবিপদের কারণ নয়। বরং সঠিক শিক্ষার অভাব, অখাদ্য ও হারাম পানীয় এবং নেশাজাতীয় দ্রব্যের প্রভাব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনকে নানাভাবে প্রভাবিত করছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মানবিক ও মানসিক স্বাস্থ্যহানি ঘটাচ্ছে। সুতরাং আসুন আমরা সম্মিলিতভাবে আমাদের সন্তানদের সুস্বাস্থ্যের জন্য পবিত্র খাবার, সময়ানুবর্তিতা ও প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার জোগানে তৎপর হই। ভ্রূণ হত্যা না করি বরং নেশাজাতীয় দ্রব্য ও মাদক থেকে আমাদের সন্তানদের হেফাজত করতে সম্মিলিত ও সময়োচিত পদক্ষেপ গ্রহণ করি। সঠিকভাবে সন্তানদের লালন-পালন করি। এ ছাড়া নিজ সন্তানের সঙ্গে সঙ্গে এতিম, পথশিশু ও দুর্যোগপূর্ণ এলাকার শিশুদের প্রতি বিশেষ যত্ন নিই।

খতিব : সাইয়্যিদ জুলফিকার জহুর, মসজিদুত তাকওয়া, ধানমন্ডি, ঢাকা।

পানির মাসায়েল

| comments

দুনিয়ায় বেঁচে থাকার জন্য পানি যেমনি একান্ত প্রয়োজন. ঠিক তেমনি পবিত্রতা হাসিলের জন্য ও তা হচ্ছে প্রধান ও অন্যতম উপকরাণ। যার মাধ্যমে মুসলমানগণ সর্বপ্রকার নোংরা বা নাপাকি থেকে পবিত্রতা অর্জন করতঃ এক আল্লাহ্ পাক এর ইবাদত-বন্দেগী করে থাকে। আল্লাহ্ পাক বলেনঃ "এবং তিনি(আল্লাহ্ পাক), তোমাদের পবিত্রতা সাধনের জন্য আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেন।“
এ পানি কত রকম হয় দেখাযাকঃ
হাদীস শরীফে এশেছে “পানি সর্বদাই পাক, যতক্ষণ তাতে নাপাক কিছু পতিত হয়ে পানির গন্ধ, স্বাদ এবং রং পরিবর্তন না করে।
অথাৎ হাদীস শরীফ আনুসারে পানির ৩ টি গুন
(১) গন্ধ, (২) স্বাদ এবং (৩) রং।

পানি প্রথমত ৩ প্রকার
১. বদ্ধ পানি।
২. প্রবাহিত পানি।
৩. ব্যবহৃত পানি।
আন্য ভাবে পানি আবার ২ প্রকার
ক. বেশী পানি।
খ. অল্প পানি।

১. বদ্ধ পানিঃ পানি যদি কম হয় এবং স্হিয়, তাতে নাপাকী পতিত হলে তা দ্বারা ওযু-গোসল জায়েয হবে না। তবে এপ্রকার পানির তিনটি গুণের (রং, স্বাদ, গন্ধ) কোন একটি মওজুদ থাকলে, তা দ্বারা ওযু-গোসল জায়েয হবে।
২. প্রবাহিত পানিঃ আর পানি, প্রবাহিত কিম্বা বেশী পানির হয়, অর্থাৎ স্রোতের পানি অথবা এমন বড় পুকুর কিম্বা হাউজ, যা অন্ততঃপক্ষে ১০হাত দৈর্ঘ্য, ১০হাত প্রস্থ এবং কমপক্ষে এতটুকু গভীর যে, কোশ ভরে পানি উঠালে হাত মাটিতে লাগেনা, এমন পানিতে নাপাকি পতিত হলেও তা পাক এবং তা দ্বারা ওযু-গোসল জায়েয হবে। তবে এ প্রকার পানির তিনটি গুণের (রং, স্বাদ, গন্ধ) যে কোন একটি নষ্ট হলে, তা দ্বারা ওযু-গোসল জায়েয হবে না।
৩. ব্যবহৃত পানিঃ আর ব্যবহৃত পানি, যা ওযু-গোসল সম্পন্ন করার সময় শরীর থেকে নির্গত হয়। এ প্রকার পানি নিজে পাক, কিন্তু অন্য কোন নাপাক বস্তু পাক করতে পারে না।
অতএব ব্যবহৃত পানি যদি কোন পানিতে পড়ে, আর তার পরিমাণ যদি সমান কিংবা বেশী হয়, তবে সে পানি দ্বারা ওযু-গোসল জায়েয হবে না। আর ব্যবহৃত পানির পরিমাণ এর কম হলে জায়েয হবে।

মাসায়েল:
* বৃষ্টির পানি, নদীর পানি, খাল-বিলের পানি, ঝর্ণার পানি, সমুদ্রের পানি, পাতকুয়া বা পাকাকুয়ার পানি এবং পুকুর ইত্যাদির পানিতে ওযু-গোসল জায়েয আছে, তা মিঠা পানি হোক কিম্বা লোনা পানি হোক।
* কোন ফল, গাছ বা পাতা নিংড়ায়ে রস বের করে তা দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করা জায়েয হবে না। তদ্রুপ তরমুজের পানি, আখের বা খেজুরের রস ইত্যাদি দ্বারাও ওযু-গোসল জায়েয নেই।
* যে পানির সাথে কোন জিনিস মিশ্রিত্র হওয়ায় বা তা দ্বারা কোন জিনিস রান্না করায় এমন হয়েছে যে, এখন লোকে তাকে পানি বলেনা, ওটার অন্য নাম হয়ে গিয়েছে, এরুপ পানি দ্বারা ওযু-গোসল জায়েয নেই। যেমন- শরবত, শিরা, শুরবা, সিরকা, গোলাপ জল ইত্যাদি।
* যে পানির মধ্যে কোন পাক জিনিস পড়ায় তার রং, গন্ধ বা স্বাদ পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে, কিন্তু ঐ জিনিস ঐ পানিতে রান্না করা হয়নি আর পানির তরলতা দুর হয়ে গাঢ়ও হয়ে যায়নি। যেমন- বর্ষাকালে নদীর পানির সাথে বালু মিশ্রিত হয়ে থাকে বা পানির মধ্যে জাফরান পড়ে সামান্য কিছু রঙ্গিন হয়ে গিয়েছে কিম্বা সাবান বা অনুরুপ কোন জিনিস পড়েছে। এসব পানির দ্বারা ওযু-গোসল জায়েয হবে।
* যদি কোন জিনিস পানিতে দিয়ে সিদ্ধ করায় পানির রং, গন্ধ বা স্বাদ পরিবর্তন হয়ে থাকে, তবে সে পানি দ্বারা ওযু-গোসল জায়েয হবে না। যদি এমন কোন জিনিস সিদ্ধ করে থাকে যে তার দ্বারা ময়লা পরিস্কার করা হয়, আর সে জিনিস সিদ্ধ করার কারণে পানি গাঢ়ও হয়নি, তবে সে পানির দ্বারা ওযু-গোসল জায়েয আছে। যেমন- মুর্দাকে গোসল দেয়ার জন্য কুলপাতা দিয়ে সিদ্ধ করা হয়ে থাকেম এতে কোন ক্ষতি নেই। কিন্তু যদি পাতা এত বেশী দেয় যে, পান গাঢ় হয়ে যায়, তবে সে পানি দ্বারা ওযু-গোসল জায়েয হবে না।
* পানিতে কাদা অথবা চুন পতিত হয়ে পানির গুন পরিবর্তন হয়ে গেলে, যদি তরল থাকে ও পানির অংশ বেশী থাকে, তবে ওযু-গোসল জায়েয হবে। আর কাদার ন্যায় গাঢ় হলে জায়েয হবে না। দুধ মিশ্রিত পানির রং কিম্বা স্বাদ পরিবর্তন হলে, তা দ্বারা ওযু-গোসল জায়েয হবে না। আর যদি এত অল্প পড়ে থাকে যে দুধের রং দেখা যায় না, তবে জায়েয হবে।
* মশা মাছি, বোলতা-ভিমরূল, বিচ্ছু ইত্যাদি ধরনের প্রাণী পানিতে মরে থাকলে বা বাইরে মরে পানিত পড়লে, তাতে পানি নাপাক হয় না। আর যেসব প্রাণী পানিতে পয়দা হয় না, কিন্তু পানিতে বাস করে, সে সব প্রাণী পানিতে মরলে বা বাইরে মরে পানিতে পড়লেম পানি নাপাক হয়ে যায়।যেমন- হাঁস, পানি কড়ি ইত্যাদি।
* যেসব প্রাণী পানিতে জন্মে এবং পানিতেই থাকে সেসব প্রাণী পানিতে মরলে তাতে পানি নাপাক হয় না। যেমন- মাছ, ব্যাঙ, কচ্ছপ, কাঁকড়া ইত্যাদি। ব্যাঙ শুকনার হোক বা পানির হোক উভয়েরই একই নিয়ম। ব্যাঙ, কচ্ছপ ইত্যাদি পানিতে মরে, পঁচে, গলেও যায়, তবুও পানি পাক থাকবে। তবে এরকম পানি পান করা বা তা দ্বারা খাদ্য পাকানো জায়েয হবে না। কিন্তু ওযু-গোসল জায়েয আছে।
* শুকর ব্যতীত অন্যান্য মৃত জন্তুর পশম, শিং, হাড় এবং দাঁত পাক। তা যদি পানিতে পড়ে, পানি নাপাক হয় না। কিন্তু যদি হাড় বা দাঁতে কিছু চর্বি কিম্বা গোশত লাগা থাকে এবং তা পানিতে পড়লে, পানি নাপাক হয়ে যাবে।
* রোদের কারণে পানি এত গরম হয় যে, তা ব্যবহারে শ্বেতকুষ্ঠ রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে সে পানি ব্যবহার করা জায়েয হবে না।

লিখেছেন : সকাল>বিকাল  
 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. ইসলামী কথা - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Premium Blogger Template