السلام عليكم

যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার (তওবা) করবে আল্লাহ তাকে সব বিপদ থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেবেন। [আবূ দাঊদ: ১৫২০; ইবন মাজা: ৩৮১৯]

ইসলামি ব্যাংকিং আলোচনা

| comments (2)

আমরা ব্যাংকের সংজ্ঞা এভাবে দিতে পারি, অর্থের লেনদেনকারী এমন এক মধ্যস্বত্ত্বভোগী প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংক বলা হয়, যা জনগণের কাছ থেকে বিক্ষিপ্ত, উচ্ছিষ্ট ও নিষ্ক্রীয় পুঁজিসমূহ সংগ্রহ করে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোক্তা ও পুঁজি প্রত্যাশী ব্যক্তিদেরকে উচ্চ সুদ বা লাভের শর্তে ঋণ হিসেবে অর্থ প্রদান করে থাকে এবং নোট ও চেকের প্রচলন দান, অর্থ সংরক্ষণ, বিল বাট্টা করণ, অর্থ স্থানান্তর ও অর্থ সংক্রান্ত অন্যান্য দায়-দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে মুনাফা অর্জন করে থাকে।


ইসলামি ব্যাংক ব্যবস্থার সূচনা
মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র ও বায়তুল মাল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ইসলামে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্পদ সংরক্ষণ ব্যবস্থার সূচনা হয়। হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাযি.)-এর খিলাফত আমলে হযরত আবু উবায়দাহ (রাযি.)-কে এর নির্বাহী পরিচালক নিয়োগ করা হয়। হযরত ওমর (রাযি.)-এর যুগে বায়তুল মালে প্রাচুর্য দেখা দেয়। আধুনিক ব্যাংক ও ব্যাংকিং কার্যক্রমের অনেক কিছুই সেই বায়তুল মালের অনুসরণেই সম্পাদিত হয়ে থাকে। বায়তুল মাল মূলত তখন রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব পালন করত। যেমন :
১. রাষ্ট্রীয় সম্পদ বায়তুল মালে সংরক্ষিত থাকত।
২. মুদ্রা প্রচলন ও মুদ্রা প্রচলনের মঞ্জুরি দান ও মুদ্রামান নিয়ন্ত্রণ করা হত।
৩. জনগণের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হত।
৪. বিনাসুদে ঋণ প্রদান করা হত।
৫. উৎপাদনী ব্যবসায় ঋণ সরবরাহ করা হত। হযরত ওমর (রাযি.)-এর আমলে এসব কাজ বায়তুল মাল থেকে আঞ্জাম দেয়া হত।


অবশ্য ঋণ নিয়ে তা দ্বারা উপকৃত হওয়ার বা অর্থ-সম্পদ কামানোর যে মানসিকতা থেকে আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সূত্রপাত হয়েছে; ইসলাম সেই মানসিকতাকে স্বমূলে উচ্ছেদ করার সর্বাত্মক প্রয়াস চালিয়েছে। কাজেই আধুনিক ব্যাংকিংয়ের কোন সূত্র ইসলামের ইতিহাসে পাওয়া যাবে না। এটি মূলত ইসলামের ব্যর্থতা নয়; বরং ইসলামের নিজস্ব স্বকীয়তার উপর টিকে থাকার উদ্যোগমাত্র।


মানুষের জীবন নির্বাহের জন্য সাময়িক ঋণের প্রয়োজন রয়েছে। এ প্রয়োজনের কথা ইসলাম কেবল স্বীকারই করেনি; বরং এ ধরনের প্রয়োজনে এক মুসলমান অন্য মুসলমান ভাইকে ঋণ দিযে সহযোগিতা করার জন্য ইসলাম ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করেছে এবং এমন ব্যক্তিদেরকে ঋণ দিয়ে সহযোগিতা করাকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। এ ধরনের ঋণ দানকে আল-কুরআনে মহান আল্লাহকে ঋণ দানের সমার্থক বলে আখ্যায়িত করে এর প্রতিদান হিসেবে দ্বিগুণ পুরস্কারের কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
ইরশাদ হয়েছে :


কে আছে এমন যে আল্লাহকে করজে হাসানাহ প্রদান করবে; বিনিময়ে আল্লাহ তাকে দ্বিগুণ প্রদান করবেন।


মানুষকে সাময়িক প্রয়োজনে ঋণ দিয়ে তার বিনিময়ে লাভবান হওয়ার মানসিকতাকে ইসলাম জঘন্য মানসিকতা বলে মনে করে এবং এ পন্থায় উপার্জিত লাভকে ইসলাম সুদ বলে ঘোষণা করেছে।


এক হাদিসে নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন :


‘প্রত্যেক ঐ করজ যা কোনভাবে উপকৃত হওয়ার পথ উন্মোক্ত করে তা সুদ বলে গণ্য হবে।’


এজন্যই ইসলাম করজে হাসানার মাধ্যমে মানুষের সাময়িক প্রয়োজন মেটানোর মানসিকতাকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করেছে। এ ধরনের করজ দানকে ইসলাম কল্যাণকর কাজসমূহের অন্যতম কাজ বলে মনে করে। এমনকি সম্পূর্ণরূপে কাউকে দান করে দেয়ার চেয়ে করজ প্রদানের গুরুত্ব বেশি বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এ পন্থায় ইসলাম সমাজের মানুষের মাঝে ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার এক অনুপম আদর্শ প্রতিষ্ঠার মহৎ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগে সহযোগিতার নামে তার সম্পদকে সুদ রূপে গ্রাস করার কসাইসূলভ মানসিকতাকে ইসলাম চিরতরে খতম করে দিতে চেয়েছে। অনুরূপভাবে নিরাপত্তার প্রশ্নে কারো অর্থ-সম্পদ সংরক্ষণ করা এবং যথাসময়ে যার সম্পদ তাকে ফিরিয়ে দেয়ার এই নিঃস্বার্থ খেদমত আঞ্জাম দেয়াকে আমানতদারির মহৎ গুণ বলে আখ্যায়িত করেছে এবং এজন্যও পরকালীন পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।


মূলত যে দুটি মৌলিক কাজের বিনিময়ে অর্থ উপার্জনের মানসিকতা থেকে আধুনিক ব্যাংক ব্যবস্থার সূত্রপাত হয়েছে, ইসলাম সে দুটি মৌলিক কাজ পার্থিব জীবনে কোনোরূপ সুযোগ গ্রহণ না করে আখেরাতের পুরস্কারের বিনিময়ে ঋৎবব করে দেয়ার জন্য মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে। সুতরাং আধুনিক ব্যাংকের সূচনা কোন ইসলামপ্রিয় ব্যক্তি থেকে হওয়ার কল্পনাই করা যায় না।


অবশ্য পরবর্তীতে বিক্ষিপ্ত পুঁজিকে একত্রিত করে বৃহৎ মানের কর্মোদ্যোগ গ্রহণের যে কাজ ব্যাংক আঞ্জাম দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যাংক যে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করছে শিরকত ও মুদারাবার বিভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে সূচনাকাল থেকেই ইসলাম এগুলোর উদ্যোগ গ্রহণ করে রেখেছে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা লেনদেনের ব্যাপারে শোষণমুক্ত বিনিময় ব্যবস্থা গড়ে তোলার সর্বাত্মক প্রয়াস চালিয়েছে। পূর্ববর্তী মনীষীগণের ফিকাহ গ্রন্থে এ সবের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।


সপ্তদশ শতাব্দীর সূচনাকাল থেকেই আধুনিক ব্যাংক ব্যবস্থা তার সুদৃঢ় ভিত রচনা করে। এ সময় রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়ার কারণে মুসলিম মনীষীরা অর্থনীতির ক্ষেত্রে তেমন একটা তৎপরতা চালাননি। ইসলামি শরিয়াহ এর আলোকে সুদমুক্ত পন্থায় এসব কল্যাণকর ও নিতান্ত প্রয়োজনীয় কাজগুলো কিভাবে আঞ্জাম দেয়া যায় তার বিকল্প উদ্ভাবনের জোরালো কোনো চেষ্টাও হয়নি। ইত্যবসরে আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিশ্ববাজার দখল করে নেয় এবং সুদভিত্তিক শোষণের এই পদ্ধতি বিশ্বব্যাপী প্রচলিত হয়ে পড়ে। তদুপরি সুকৌশলে আন্তর্জাতিক লেনদেনকে ব্যাংকের সাথে এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে দেয়া হয় যে, সুদী ব্যাংক ব্যবস্থাই বিশ্বের মুদ্রাব্যবস্থার একমাত্র নিয়ন্ত্রক ও নিয়ামক শক্তি হয়ে উঠে।


নতুন আঙ্গিকে ইসলামি ব্যাংকিং-এর সূচনা
বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সারাবিশ্বে ইসলামের নবজাগরণের সূচনা হয়। এ সময় মুসলমানদের মাঝে সুদমুক্ত অর্থ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হয়। কিন্তু ততদিনে সুদভিত্তিক ব্যাংক ব্যবস্থা সারাবিশ্বকে এমনভাবে গ্রাস করে নেয় যে, সুদের দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।


সুদের এই সর্বগ্রাসী থাবা থেকে বেরিয়ে আসার চেতনা থেকেই সুদমুক্ত ব্যাংক গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হয় এবং বিশ্বব্যাপী এর চিন্তা-ভাবনা চলতে থাকে। সে চিন্তার বহিঃপ্রকাশস্বরূপ মিশরের আল্লামা আহমদ আল নাগগারের প্রদত্ত রূপরেখার ওপর ভিত্তি করে ১৯৬০ সালে মিশরে সেভিংস ব্যাংক নামে বিশ্বের প্রথম ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬৩-১৯৬৭ সাল পর্যন্ত মোট ৯টি প্রতিষ্ঠান ইসলামি পদ্ধতির আলোকে মিশরে ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করে। এসব ব্যাংক বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে ও ব্যাংকিং কার্যক্রমের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সাফল্য লাভ করলেও ইসলামবিরোধী চক্রের ষড়যন্ত্রের মুখে মিশর সরকার এসব ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। ১৯৭২ সালে পুনরায় ‘নাসের সোস্যাল ব্যাংক নামে অন্য একটি প্রতিষ্ঠান মিশরে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের কার্যক্রম শুরু করে। এ সময় অনেক রাষ্ট্রপ্রধানই মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য পৃথক ব্যাংক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে থাকেন। ফলে ১৯৭৪ সালে ইসলামি সম্মেলন সংস্থা (oic) এর জিদ্দায় অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের সম্মেলনে এতদসংক্রান্ত রিপোর্টের ওপর পর্যালোচনার পর ইসলামি নীতিমালার আলোকে একটি পৃথক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। যার ফলস্বরূপ ১৯৭৫ সালে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক (idb) প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
আই. ডি. বি-এর প্রধান লক্ষ্য ছিল, ইসলামি দেশগুলোর মাঝে জোরালো অর্থনৈতিক বন্ধন সৃষ্টি করা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে ইসলামি নীতিমালার বাস্তবায়ন করা, মুসলিম দেশসমূহের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে কাজ করা। আই. ডি. বি-এর প্রচেষ্টায় মুসলিম দেশগুলোতে সুদমুক্ত ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ব্যাপক সাড়া জাগে এবং দেশে দেশে ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়। এরই ফলশ্রুতিতে ১৯৭৫ সালে দুবাইয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় দুবাই ইসলামি ব্যাংক, ১৯৭৭ সালে কুয়েতে প্রতিষ্ঠিত হয় কুয়েত ফাইন্যান্স হাউজ, সুদানে প্রতিষ্ঠিত হয় ফয়সল ইসলামি ব্যাংক এবং মিশরেও প্রতিষ্ঠিত হয় ফয়সল ইসলামি ব্যাংক। ১৯৭৮ সালে জর্ডানে প্রতিষ্ঠিত হয় জর্ডান ইসলামি ব্যাংক ফর ফাইন্যান্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট। ১৯৭৮ সালে পাকিস্তান সরকার পাকিস্তানের সব ব্যাংককে সুদ মুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। ১৯৮৩ সালের ৩০ মার্চ বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৮৭ সালে আল বারাকা ব্যাংক, ১৯৯৫ সালে আলা আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ও সোস্যাল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক নামে আরো তিনটি ব্যাংক বাংলাদেশে ইসলামি পদ্ধতিতে ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে প্রায় ২৪৩টি ইসলামি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সুদমুক্ত অর্থ লেনদেনের কার্যক্রম আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছে।


সুদমুক্ত ব্যাংক ব্যবস্থার স্বরূপ
ইসলামি অর্থনীতি একটি শোষণমুক্ত ও কল্যাণকর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। আধুনিক ব্যাংক ব্যবস্থা হল শোষণের এক অভিনব কৌশল। এ দু’টি বিষয়কে সমন্বয় করা খুবই মুশকিল। বর্তমানে ইসলামি ব্যাংকগুলো সুদী ব্যাংকের সাথে পাল্লা দিয়ে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে প্রক্রিয়াগত দিক থেকে অনেক ক্ষেত্রে সুদমুক্ত প্রক্রিয়া চালু করা হলেও শোষণের মাত্রা সুদী ব্যাংকগুলোর তুলনায় না কমেই; বরং তা বেড়েই চলছে। ফলে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে যথাসম্ভব সুদমুক্ত করা গেলেও এ ব্যাংক ব্যবস্থার মাধ্যমে শোষণকে অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। সেইসাথে রাষ্ট্রীয় প্রতিকূলতার কারণে সব দেশে পূর্ণাঙ্গ সুদমুক্ত ব্যাংকিং পদ্ধতি কার্যকর করাও সম্ভব হচ্ছে না।


কেননা যে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদমুক্ত অর্থ-ব্যবস্থার আলোকে পরিচালিত নয়; সে দেশের তফসিলী ব্যাংকগুলো সম্পূর্ণরূপে সুদমুক্ত করাও সম্ভব নয়। তফসিলী ব্যাংকগুলোকে তার মোট মূলধনের এক চতুর্থাংশ কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত অনুরূপ কোন অংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিজার্ভ ফান্ড হিসেবে জমা রাখতে হয়। জনগণের প্রদত্ত পুঁজির নিরাপত্তার জন্য উক্ত টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংক জামানত হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। উক্ত টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পরিশোধ ছাড়া কোন তফসিলী ব্যাংক মঞ্জুরি পায় না। অবশ্য এই রিজার্ভ ফান্ডের বিনিময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তফসিলি ব্যাংকসমূহকে নির্ধারিত হারে সুদ দিয়ে থাকে। উক্ত সুদের টাকাকে মুনাফার সাথে যোগ না করলে ইসলামি ব্যাংকগুলোর লাভের পরিমাণ সুদী ব্যাংকগুলোর তুলনায় কমে আসে। ফলে লাভের হার যা দাঁড়ায় তা দিয়ে প্রতিযোগিতার বাজারে আমানতকারীদেরকে ধরে রাখা সম্ভব হয় না। সুদের অংশ যোগ করলে লাভকে সুদমুক্ত করা সম্ভব হয় না। যদি সুদমুক্ত করার গরজে এই সুদের টাকাকে সামাজিক উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় করে দেয়া হয়, তাহলে আমানতকারীদেরকে আকর্ষিত করার জন্য ঋণগ্রহীতাদের ওপর শোষণের মাত্রা বৃদ্ধি করতে হয়।


এই সংকটের মূল কারণ হল সুদী ব্যাংকগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মানসিকতা এবং ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় লাভ বেশি হয় এ কথা জনগণের কাছে জানান দেয়ার প্রবণতা।


ইসলামি পদ্ধতিতে ব্যাংক ব্যবস্থা পরিচালিত হলে লাভের খাতায় টাকার অংক বৃদ্ধি পাবে এ ধারণাও সঠিক নয়। বস্তুত ইসলামি পদ্ধতিতে অর্থব্যবস্থা পরিচালিত হলে নগদ লাভের খাতায় টাকার অংক বৃদ্ধি না পেলেও এমন একটি সামগ্রিক কল্যাণ অর্জিত হবে যার পরিণতিতে সামাজিক সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পাবে, পুঁজিপতি গড়ে উঠবে না, সম্পদ ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষের হাতে কুক্ষিগত হয়ে পড়বে না, শিল্প ও উৎপাদন খাতের মুনাফা ভোগের ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্ত্বভোগী ব্যবস্থা বিলুপ্ত হবে এবং মুনাফার প্রকৃত হারাহারি অংশ লাভ করার সুযোগ হবে দেশের সব অর্থ যোগানদাতার, সুদের অহেতুক ভর্তুকী দেয়া থেকে বেঁচে যাবে দেশের সব মানুষ। এই বৃহত্তর কল্যাণের তুলনায় লভ্যাংশের হার সুদী ব্যাংকের চেয়ে কম আসা একেবারেই স্বাভাবিক। অতএব ইসলামি ব্যাংকে বিনিয়োগ করলে লাভের হার বেশি হয় এটিকে প্রচারণার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ না করে; সামগ্রিক কল্যাণের দিকটি জনগণের সামনে সুস্পষ্ট করে দেয়া প্রয়োজন। তাছাড়া সুদী অর্থ ব্যবস্থায় ব্যাংকের আমানতে সুদের হার বেশি আসলেও দ্রব্যের বাড়তি মূল্য পরিশোধ করে প্রত্যেক নাগরিককে বছরে তার চেয়ে যে অনেক বেশি টাকা গচ্ছা দিতে হয় সে দিকটিও জনগণের সামনে সুস্পষ্ট করে তুলে ধরা প্রয়োজন।


আমাদেরকে স্মরণ রাখতে হবে, ইসলামি ব্যাংকের উদ্দেশ্য সব ক্ষেত্রে সুদী ব্যাংকের বিকল্প গড়ে তোলা নয়, কিংবা সুদী ব্যাংকের সমহারে আমানতকারীদেরকে লভ্যাংশ প্রদান করাও নয় অথবা ব্যাংক পরিচালনা করে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার ইয়াহুদী মানসিকাতও আমাদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ নয়; বরং সুদী ব্যাংকগুলো পুঁজি সংগ্রহ করে বৃহত্তর উৎপাদনে যে কল্যাণকর ভূমিকা পালন করছে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যে অতুলনীয় ভূমিকা পালন করছে, ইসলামি শরিয়াহর আলোকে সুদমুক্ত পন্থায় এই অপরিহার্য কল্যাণগুলো লাভ করার বৈধ পন্থা উদ্ভাবন করা এবং ব্যবসা বাণিজ্যের মাধ্যমে স্বাভাবিক পন্থায় যে লাভ হয় সে হারে লাভ দিয়ে জনগণকে বৃহৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে পুঁজি সরবরাহে উৎসাহিত করা।


অর্থের লেনদেন করে মধ্যস্বত্ত্ব ভোগ করার মানসিকতা বহাল রেখে ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করার কোনো মানে হয় না। তাই ইসলামি অর্থ ব্যবস্থার আলোকে ব্যাংক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ব্যাংকসমূহের অবকাঠামোগত পরিবর্তন করার প্রয়োজন হবে। অন্যথায় ইসলামি ব্যাংকের অর্থ হবে সুদী প্রক্রিয়ায় শোষণের পরিবর্তে বৈধ পন্থায় শোষণ করা। অথচ শোষণের যাতাকল থেকে মানুষকে মুক্ত করে শোষণমুক্ত বিশ্ব অর্থ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যেই সব প্রকার সুদী লেনদেনকে ইসলাম অবৈধ ঘোষণা করেছে। সুতরাং যদি শোষণ বহাল থাকে আর সুদমুক্ত ব্যাংক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য বিকল্প পথ অবলম্বন করা হয়, তাহলে ইসলামি অর্থনীতির মূল উদ্দেশ্যই মাঠে মারা যাবে।


মুফতী ফয়জুল্লাহ
শিক্ষক
জামেয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ, ঢাকা
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
Share this article :

+ comments + 2 comments

March 19, 2013 at 9:42 AM

islami banking is very useful for us so your post very effective Beauty tips

March 19, 2013 at 9:45 AM

thank for the all alherabd

Post a Comment

 
Support : Creating Website | Johny Template | Mas Template
Copyright © 2011. ইসলামী কথা - All Rights Reserved
Template Created by Creating Website Published by Mas Template
Proudly powered by Premium Blogger Template